হোম কবিতা বাছাই বারো : ‘ঘুমসাঁতার’ বই থেকে

বাছাই বারো : ‘ঘুমসাঁতার’ বই থেকে

বাছাই বারো : ‘ঘুমসাঁতার’ বই থেকে
859
0
দশকী পরিচয়ে রাশেদুজ্জামান প্রথম দশকের কবি।
‘ঘুমসাঁতার’ তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ। প্রকাশিত হয় ২০১২ সালে, প্রকাশক বনপাংশুল।
সেখান থেকে কবি-নির্বাচিত ১২টি কবিতা…

ঘুমসাঁতার


পাগলের গান থেকে
ছিটকে এসেছে এ জগৎ—

এখানে নদীর নাম
ঘুমসাঁতার—
জল আর ছলের ইশারা;

বেজে ওঠে পাখি একতারা
সহসা দুপুর—ঘোর

তাহলে ফুরালো সারস-প্রতীক্ষা…

পার হয়ে আয়নাতরঙ্গ
আকাশ সবচে কাছে,
জ্বলন্ত আর্শিমহল,
আরশের সিঁড়ি…

আর

সে উন্মাদ : নগ্ন ও নির্ঘুম—
ত্রিরাস্তার মহাশূন্যে বসে
নিয়ন্ত্রণ করে মহাবিশ্ব,
লোফালুফি খেলে…

 


চিঠি


আমার সমস্ত কৈশোর জুড়ে, এমনকি সমস্ত যৌবন জুড়ে যে সুন্দরীরা, তাদের উদ্দেশে লেখা চিঠিগুলো কোনোদিনই হয়তো পৌঁছুবে না। পৌঁছুবে না পত্রমোচী কোনো অরণ্যের পাশে বয়ে চলা ঘুম নামক নদীর তীরে আরক্তিম অপেক্ষার কথা। আমার সমস্ত ত্বকের নিচে জমে উঠছে অজস্র বিপুল কত শত বর্ষের ঘুম, শিরা ও স্নায়ুগুলো ফুলে উঠেছে কোটি কোটি স্বপ্নে… এ শুধুই অপেক্ষা ছাড়া আর কী! চিঠিগুলো বিলি না হয়ে ডাকঘরেই পড়ে আছে কত কাল। রোজ কত চিঠি আসে সেখানে? আমি এক বুড়ো পোস্টমাস্টারের রাতদিন কাজ করে যাবার শব্দ শুনি। কলম আর সিলের শব্দ; সে কি প্রুফ-রিডার না হামবড়া সম্পাদক? হাওয়া ও জল ঘেরা এই ভূ-মণ্ডলের কোনোখানে কোনো মহাজীবনে সব কথা কি ফাঁস হয়ে আছে? ভাবি আর ঘেমে উঠি! মনে হতে থাকে সেই চিঠিগুলো ডাকঘরের ভেতর বিচিত্রবর্ণ সাপ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

 


এখানে বৃষ্টি হলে


১.
এখানে বৃষ্টি হলে অনন্তকাল ধরে বৃষ্টি হয়। তোমার দেহ ভেদ করে জেগে ওঠে পাথর, তাতে হাজার যুগের শ্যাওলা। যেন কোনো প্রাচীন পাহাড়ি অরণ্যের অনাত্মীয় দেশে সম্মোহিত বারিপতনের ভেতর দাঁড়িয়েছি। মেঘদূত পাঠ করবার বিহ্বলতা জাগবার আগেই অভাবনীয় স্তব্ধতার এক শাসন আমাকে ঘিরে ধরেছে। সম্বিৎ ফিরে পেতে পেতে কখনো মনে হয়, রাত্রে জানালার কাছে কোথাও সমুদ্র বইছে, আর তার উজান বেয়ে সঙ্গীতের সমস্ত সুর এখানেই ফিরে আসতে চাইছে। যেন কোনো দুর্জ্ঞেয় রহস্যগ্রন্থের চূড়ান্ত উন্মোচনের অপেক্ষায় মুহূর্ত থমকেছে এবং আমাকে ঘিরে রচিত হচ্ছে একে একে প্রাচীন মিথুনমূর্তি। অন্ধকার গুম্ফায় মশাল জ্বেলে কারা ছবি এঁকেছিল, তাদের মুখও ভেসে আসে একে একে। …আর এক জাদুগ্রাসে চিত্রিত হই তুমি আমি, শক্তি অবলুপ্ত, অথচ শুধুই সান্দ্র অমোঘ উচ্চারণের অপেক্ষা পৃথিবীতে…

 


মশলার বাজার


১.
মশলার বাজারে ঢুকেই মনে পড়লো তোমার কথা;
আর রন্ধনরীতি, উনুনতীর্থ এসব শব্দ।
রান্নাবান্না তুমি তেমন জানো না, তবু তোমাকেই ভাবলাম;
রান্নার বিচিত্র আয়োজন নয়, ফিরে এল আমাদের যুগল অপেক্ষা :
জলের প্রচণ্ড চাপে মৃত্তিকা যেভাবে ফুলে ফুলে ওঠে
অদৃশ্য রক্তের চাপে তুমিও সেভাবে গোলাপি হয়ে উঠছ!
মশলার চতুর ঘ্রাণে আমার নাসারন্ধ্র উত্তেজিত,
কিন্তু মনে হলো সুসজ্জিত বিছানার কথা—
পারস্যদেশের মশলার পরিবর্তে প্যারিসের নানান সুগন্ধি
আর গনগনে চুলি­র বদলে বিছানা!

 


অশোকতলার সীতা


প্রতিদিন আমি সেই অশোকের কাছে চলে আসি। অনেক স্মৃতির ভারে ন্যুব্জ সে আমাকে কিছুই বলে না। দ্যাখে আর ফুটিয়ে চলে গুচ্ছ গুচ্ছ নারকীয় ফুলগুলি! ‘নিরীহ ওই পুষ্পচক্ষুর আড়ালে কী ভীষণ রক্তপাত লুকানো, কে বলবে!’, প্রতিদিন ফুল আর পাতা কুড়াতে আসা সন্তানহারা নারীটির এইসব মনে হয়। …আমি শুধু ওর পাতায় প্রতিটি দিনের জন্য একটি করে নতুন নাম লিখে আসি। সেই শ্রমিকেরা, যারা মৃত্যুর পরও দীর্ঘদিন ঝুলে থেকে প্রভুদের পতন ঠেকিয়েছিল, আমি দ্যাখো তাদের আত্মাগুলোকে ভেতরে বহন করি। এই কথা প্রভুদের অগোচরে আমি ছাড়া বিশ্বাস করে ঐ অশোকগাছটি, সে জানে এইসব, কেননা তার তলায় একদিন সীতা বন্দিনী ছিল।

 


বৃক্ষের মুকুর


‘তোমার কালস্রোতে আমি নক্ষত্রমাত্র, সঞ্চরমান সদা, কিভাবে পারো আমায় বহন করে যেতে? আমি তো বেঁচে উঠি স্বপ্নে কেবল!…সম্পর্ক আমাদের বিভেদ-বিরচিত।’ বলেছিল প্রস্থানবেলায়, দগদগে রৌদ্রক্ষতে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গাছ। ‘সন্ধ্যা ও ঊষার সীমাতিরিক্ত, মেঘছত্রের বাইরে শূন্যের পটভূমে আমি দণ্ডবৎ, সুস্থির!’ মনে হলো আমিও তার আয়ুপ্রবাহে একটি নক্ষত্রশুধু, জঙ্গম!

বিবেচনাহীন অশেষ প্রহর-যাপন শেষে যখন ফিরে আসি তোমাদের উঠোনে, সে এক ঘোরের ভেতর, কোথায় সেই বৃক্ষ, নিজ পটভূমিতে যে নিজেই রোপিত? এসেছে নিঃসীম বর্ষণের দিন, বৃক্ষরোপণের কাল। তাহলে কি মুকুর নিজেই বিকার-বিহ্বল, নিরূপণ-অক্ষম?

‘আমারেও স্পর্শাতীত জেনো, অপাপদংশিত; কেননা প্রবাহিত হই আমিও।’

 


দায়


স্নানঘর ভেসে যাচ্ছে রক্তে আর রক্তরঙ এই
অবগাহনকে ঘিরে কুসুমিত হচ্ছে সন্ধ্যা
সমস্ত মৃত্যুচিহ্নের মধ্য থেকে উঠে এসে কবি
সৌর-গোধূলির রঙ করে দিচ্ছে বিষণ্ন, নিভিয়ে দিচ্ছে
সান্ত্বনার অস্তরাগ, নিরন্তর লাঞ্ছনার পিছু পিছু
এই বর্ষণ, ঝাপসা এই দৃষ্টিবোধ কেন্দ্রে রেখে
হাওয়া হিমার্ত, সন্ন্যাসপ্রবণ, দূরস্থিত, ঘোর!
মাকড়ের গুপ্ত তন্তুজাল আমাদের যুক্ত করে রাখে
যুক্ত রাখে হিংসার নৈশ-জ্যামিতি, ভ্রাতৃ-চৈতন্যের অন্তহীন দায়…

 


কে সন্দেহ করে


কে সন্দেহ করে যে ঘুমও একটা পিরামিড
আর তার ভেতরেও আছে ফারাও সম্রাট,
রয়েছে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, যৌন কেলেঙ্কারি, দাসতন্ত্র আর
স্ফিংসের পাহারা; এবং এ সমস্তই একটি ঘুঘুর
চিৎকারের দৈর্ঘ্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে :
যে সঙ্গীত দুপুরকে করে ফেলতে পারে একটি দ্বীপ—
ভাসতে থাকা, একাকী—এই ভেসে ওঠা ধীরে ধীরে
ক্ষুব্ধ সমুদ্রের মাঝখানে, আনকোরা
বৈষ্ণবের আকুতিভরা, বিরহী, ভাষা ভুলে যাওয়া!

এ সমস্তই থামের আড়াল থেকে লুকিয়ে দেখেছি আমি
দেখেছি দাসপ্রভুর সন্তান দাসমাতার গর্ভে।

 


রঙমিস্ত্রি


হাঁচির ভেতর যারা ত্রিলোক দেখেছে, তাদেরই একজন আমি, রক্তে ঝিমধরা মুহূর্তে বুঝেছি আমিই ব্যোম ভোলানাথ স্বয়ং, সংহার ভুলে যাওয়া। ছক উল্টে ব্রহ্মাণ্ডের সে ঝড়ো তাণ্ডবে ঢুকে পড়লাম ইন্দ্রের সভায়, কোথায় সভা ও সভাসদ—তাস ও জুয়ার এক গোপন আস্তানা! তবে আরও মজা হলো, যে সুন্দরীদের স্বর্গে দেখলাম লীলাচপল, নরকে তারাই কাঁদছে চিৎকার করে, জীর্ণ-ভূষণ। খটকা হচ্ছে, এরা যদি পরিচয় জেনে ফ্যালে!… ছিটকে এলাম তাই, মুহূর্তেই। দেখি, সত্য শিব থেকে অযুত যোজন দূর দেশে থাকি, সতী ও পার্বতীর অশ্রুস্রোত পাশাপাশি যে গঙ্গায় বয়, তার তীরে, এক মিথ্যা ভূতনাথ! নেশা না করেই অনায়াসে ঘুমিয়ে যাওয়া ভিন্ন কী করতে পারি! কেবল ঘুমেই ঠিক ঠিক পৌঁছে যেতে পারি ঘরে। ঘুমের-স্বপ্নের বহুতল স্থাপত্যের এক কোনায় রঙের কাজ করি, আলোরও কিছুটা। …পাহারা বসানো সংসারের থেকে দূরে, বিজন নির্জনে, কাঁপা হাতে, স্নায়ুরোগসহ।

 


মৃতদের দেশে


সারাদিন মৃতদের দেশে ঘুরে ফিরে আসি শরীরে লাশের গন্ধ, এসো মেঘ বাষ্পস্নানে, ঢুকে যাই একান্ত কেবিনে, এখানে আসে যা কিছু হারিয়ে গেছে, যারা—তার সব—ভাঙাচোরা চন্দ্রপ্রলাপ, গোপন মুদ্রাদোষ, অর্ধস্ফুট গান, পায়চারি—পাশে শুয়ে আড়ি পেতে শুনি ঘুমের ভেতর থেকে ভেসে আসে, যেন ডাকে, আমি নৈশঝড়ে লিখে রাখি কিছু তার ইশারালিখন দ্রুত, সারা ঘরে ছুটে বেড়ায় ইঁদুর-বাহিনী, সে-ও কি স্বপ্নে, নইলে জেগে উঠে ওদের দেখি না কেন, দেখি এক পরিত্যক্ত জেটিতে ঘুম ভাঙল, পাঁচিল টপ্‌কাবার মন্ত্রও আসে না স্রোতে ভেসে, হাতে আসে যত রোমান কবিতার ভুল অনুবাদ, ব্যাহত ভার্জিল, ঝাউয়ের আলিঙ্গন ছেড়ে আসা মেঘাতিরিক্ত বার্তাসকল, আসমুদ্রশরৎ, ক্রমে আলো, ককিয়ে ওঠে চাকুরি-লাঞ্ছিত কুসুম, আর চোরা ফ্ল্যাশ এসে পড়ে এক অরণ্য-বালিকার প’রে, ও যে ধস্ত জাহাজ, ঝড়ে ডুবে-ভেসে কিনারে এসেছে, বুঝি শ্বাস নাই, তবু ওড়ে পাল, রক্তে ভেসে যায়…

 


বিচ্ছিন্ন পঙ্‌ক্তির মতো


বিচ্ছিন্ন পঙ্‌ক্তির মতো প্রেম এসেছিল—

উৎপ্রেক্ষা ও রূপকের বনে কারা হারিয়ে গিয়েছিল
ভেবে ভেবে হিম নেমে এল, কুয়াশাও—
গোলাপের ভেতরে ঝড় ও ঘূর্ণি শুরু হয়ে অস্তমিত হলো রক্তে
না-কি আরও দূরে ছায়াপথে ছড়িয়ে পড়েছে?

ছড়িয়ে পড়েছে জিঘাংসাপ্রবল হাওয়া
পদ্মগোখরার নিশ্বাস-প্রেরিত, কামনার ঋতু
এসে গেল—আকাশকে মনে হয় বিষের প্রচ্ছায়া!

ছিন্ন-মাথা কার পড়ে আছে তৃণ ও গুল্মের অ্যাসফল্টে!
আর ধড়, দূরবর্তী, ছুটে গেছে আলিঙ্গনে পিপাসায়
বেদুইন সুন্দরীর তাঁবুর দিকে!

এ জগৎ নেহাৎ শয়তানের হাসি নির্মিত—
একে কোনোভাবে বিশ্বাস ক’রো না!

নোঙর উপড়ে, ছিঁড়ে, জাহাজ সে ভেসে গেছে দূরে,
স্রোতের আঁচড়। পাটাতন খসে যায় ক্রমে।
বরং সৌরহাওয়া—
আমাদের মৌন জুড়ে দিতে চায়।

 


কবি


আমাকে বদল করে গেছ দিঘিপাড়ে জন্মানো লেবুগাছের সাথে, প্রতিটি পতনে যার গায়ে একটি করে কাঁটা গজায়! আর কাঁটাগুলো উল্টো করে ফেরানো, নিজেরই দিকে

সেই দিঘি নেই কোনোখানে, পৃথিবীতে

অতল-বিভ্রান্ত কাঁচ। অসত্য প্রতিফলনগুলো কোথাও জমা হচ্ছে।
আসছে ভেতর থেকে আঁশটে ঘ্রাণ রূপান্তরিত মৎস্যীর, প্যারাট্রুপারের হাসি, তুচ্ছ অপরাধে কারো উপড়ে নেওয়া চোখ, বাজনৃত্য, কল্পসমুদ্রের মায়া, রঙধনু, বৃক্ষবোধ…

হেমন্তও পেরিয়ে যাচ্ছি দ্রুত, আসি আসি করছে শীত, ফুল সে ফুটলো কই, টলোমলো, হিমকান্ত লেবুঘ্রাণ?

রাশেদুজ্জামান

রাশেদুজ্জামান

জন্ম ১৭ ডিসেম্বর, ১৯৭৬;টঙ্গী, গাজীপুর।
বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
পেশা : সরকারি কলেজে শিক্ষকতা।

প্রকাশিত বই:
পাখি ও প্রিজম [কবিতা, ২০০৮, র‌্যমন পাবলিশার্স]
ঘুমসাঁতার [কবিতা, ২০১২, বনপাংশুল]

ই-মেইল : rashed_kobi@yahoo.com
রাশেদুজ্জামান