হোম কবিতা বই থেকে : পৃথিবীর শেষ কয়েকছত্র মেঘপত্র

বই থেকে : পৃথিবীর শেষ কয়েকছত্র মেঘপত্র

বই থেকে : পৃথিবীর শেষ কয়েকছত্র মেঘপত্র
630
0

মেঘপত্রকথা


খানখান ভেঙে যাওয়া মেঘ। সূর্যের ঠিকরে ঠিকরে যাওয়া আলোতে নিয়ত উজ্জ্বল মেঘপত্রসমূহ। তাতে উৎকীর্ণ নিচের বিস্তীর্ণ মনুষ্য ভূগোল। এই মেঘপত্রসমূহের কবি নাঈম ফিরোজ। হ্যাঁ, তার তৃতীয় কবিতাবই পৃথিবীর শেষ কয়েকছত্র মেঘপত্র কবিতাসুষমার এক অভিনব ও সুনন্দ চিঠিগুচ্ছ। বইটিতে আছে মোট ২০২টি মেঘপত্র। প্রতিটি মেঘপত্রই পরিচিত আসমান বিদীর্ণ করে অভিজাত শব্দঝঙ্কারে ঝনঝন বেজে ওঠে।

স্ফুরণের কালখণ্ড বিচারে নাঈম ফিরোজকে শূন্য ও দ্বিতীয় দশকের কবিতাসেতু ধরা যায়। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ গ্রীনহাউজের বন্দিনী বের হয় ২০০৮ সালে। ১৯৯৭ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে রচিত হয়েছিল ঐ বইটির কবিতাগুলো। অসম্ভব মেধাবী এই কবি তারপর গুছিয়ে ফেলেন তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ উবে যাও জলচোখ । প্রকাশের পর এই বইটি হয়ে ওঠে আরেক শব্দপ্রাসাদ। ভাব, চিত্রকল্প ও ভাষাবিন্যাসের এক অনুপম নদী উঠে আসে এই বইয়ের কবিতায়। প্রথম বইটি নিয়ে কবি আসাদ চৌধুরীর লেখা ফ্ল্যাপে আমরা পড়ি :

বলার বিষয় ও ভঙ্গি, বাক্য ও ভাষা—মোটেও গতানুগতিক নয়; জগতের বিভিন্ন রাজ্যে হানা দিয়ে কবিতার জন্য পঙ্‌ক্তি—এই অস্থিরতা, চঞ্চলতা আমার বেশ ভালো লেগেছে।

আমার কাছে মনে হয় বর্তমান বাংলা কবিতায় স্বতন্ত্রলিপির নাম নাঈমলিপি। তার কবিতা পড়ামাত্রই সামান্য বোধগ্রস্ত পাঠক বুঝে যাবেন—এ কবিতা নাঈমীয়। যদিও ছোটবেলা থেকেই তুখোড় তার্কিক এই জ্ঞানপোকা দাপিয়ে বেড়িয়েছেন সম্ভব সব কাব্যকৌতূহলে।

বর্তমান মিনিটগুলো অস্থির ভীষণ। পারস্পরিক কবিতাকর্মকে জোরপূর্বক ও ষড়যন্ত্রমূলকভাবে অস্বীকার করার সংস্কৃতি চলমান। আর এরই ভিড়ে কবি নাঈম ফিরোজ একজন হাই প্রোফাইল কবি। দেশি ও বিদেশি ভাষার পরিমিত ও অপূর্ব অক্ষরশৈলী ও সুচিন্তিত ব্যঞ্জনা তার কবিতাকে করেছে অনন্য ও অভিজাত।

তার প্রকাশিতব্য মেঘপত্রগুলো জাদুর তুলোর মতো। পাঁচটি অধ্যায়ে বণ্টনকৃত মেঘপত্রগুলো আপনাকে ভাসাবে অসীম নীলে—কবিতার নতুনতম আস্বাদে—সন্দেহ নেই। শুভকামনা রইল নাঈম ফিরোজ।


—মোসাব্বির আহে আলী

 


মে ঘ প ত্র ২৫


বস্তুত কাক তাড়িয়ে কখনো মানুষের কান্না থামানো যায় নি।
এটা জানা হয়ে গেলে
ঝুলবারান্দায় পাধুল লুকিয়ে রাখো
তুমি
আর তোমার পোষা মেঘপুঞ্জ যত।
আমি লুকোচুরি খেলি,
তোমায় খুঁজি আর
ভালোবাসি তোমার গোঁধরা ন্যাকামি, স্মিত খুকিপনা।
উবে গেলে জলচোখ,
তোতাপাখিগুলো খাবে শীতের প্রণয় ও শেষ কয়েক পিস কাকতাল।
শাশ্বত উড়াল দেখি আমি আর তুমি, আমাদেরই।


মে ঘ প ত্র ৫৫


অ্যান্ড্রোমিডায় যাওয়ার পথে আমার কান্না জমছে।
চাঁদকে ঘুমিয়ে যেতে দেখি আমি
রোজ ভোরে আমার পিতার চোখের জলে।
বস্তুত অতলান্তিকে ভাটি নেই, ভাটিয়াল কোনো।
সব মায়া পরান্মুখ হারিয়ে গেছে!
গ্রিনহাউসের বন্দিনীর উবে যাচ্ছে জলচোখ।
অভ্রপুষ্পও এনডোরস করে দেয়….. এই না শাশ্বত উড়াল!
রাইমাধবের দিন, ক্রমাগত সিতাংশু হতে থাকো।
সুবিনীত সাক্ষরতার নিচে আমার পিতার পোড়ে আত্মা।
আমি কাঁহাতক আর্চডিউকের একাকিত্ব মুছে ফেলি
আর ডাইনোসরগোষ্ঠীর মনের বাও খুঁজে পাই!
কাঁদো ডায়নো কাঁদো!
তোমাদের হিমেল বিলুপ্তির দিনে আমার রক্ত ঝরে ভাই।
ডানা মেলে চাই রোদছাওয়া অমল সূর্যশব।


মে ঘ প ত্র  ৯১


মাঝে মাঝে কবিতা ও জীবনের বাইরে যেতে যেতে
চলে যাওয়া যায় স্নানোৎসবে।
একটা পেয়ারা বাগানে ঘুরে ঘুরে নিজেরে জানাতে মন চায়—
আমি টোটালি মিথ্যায় না-ঘুমানোর দলে, জানো?
আহা আমার অনগ্রসরতা জুড়ে কী অমাংসল
গুটিয়ে যাচ্ছে সারি সারি ঢেঁড়সের তীক্ষ্ণতা!
ইটের মতন করে কাঠেরপুতুলগুলো
এই এক নভোনীল গ্রহ গড়ে দিল
থিম্পুর কমলালেবুর সারল্যে।
গাছে গাছে ক্ষুধিরামের ছায়া না থাকা জনপদ এই।
বাল্যকালে খোদা শুনতেন,
আমরা শোনাতাম প্রিয়কথার সুর রেহেলে ঝুঁকে ঝুঁকে।
তাহারেই হারায়ে খুঁজি ইতিউতি, অতিহাসে-ইতিহাসে,
নিরল নিয়ন্তার প্রচ্ছন্নবেশ মা’র কাছে রেখে আমরা,
অতিদূর লুব্ধদৃষ্টির সহিস-মাহুতের অরবিটাল ভেঙেছি!
সাত আসমানকে জানিয়ে দিচ্ছি
আজ কেবল বুক দুরুদুরু, নিযুত ক্বলব!
ঈশ্বরবোধ অথবা শব্দবিয়োগের নিওলিথ গল্প
ফারাও শরীরে ধীরে ধীরে নেমে আসছে।
এদিকে মা’র কাছেই জমছে আমার ঈশ্বরবোধ।


মে ঘ প ত্র ১৫৭


নিদ্রোত্থিতা স্ত্রীর প্রতি মেঘপত্র :
তুমি যেদিন তরল মৃত্যুর দিকে সলজ্জিত ঝুঁকে ছিলে নরমহিম নীহারের মতন
আমি কি ভুলেছি হায় কী ভালো আমি বেসেছিলাম সেদিন তোমায়!
আমাদের ভালোবাসা চোখের অযুত অশ্রুধারা হয়ে
থেমে থেমে উত্তুঙ্গ,
ধীরললিত খুব গড়িয়ে যেতে দেখো আহা নীহারিকা মুক!
আমায় ভালোবেসে তোমাতে ধীরে ধীরে
নামি এক বহুপদী পতঙ্গের দীপিত জ্যোছনাস্মৃতির মতন
কম করে করে উরঙ্গী, খুব নীলাভ কামুক!


মে ঘ প ত্র  ১৯১


১.
আহাজারি, অজ্ঞেয় শব্দ।
আমিও থেমেছি ফের।
কথার উচ্চতার সাথে ক্রীতদাস হয়ে যায় প্রিয়া, ভেস্তে যায়,
গুলিয়ে যাও, বুভুক্ষিত আছো মানবাধিকারকাতরতা!
এই শীতলতার মেট্রোপলিটন জুড়েই প্রাণহীন জাহাজের সাড়া পড়ে গেল
দেখো কেমন, যত্রতত্র ধু ধু নৈসর্গ আর আত্তাহিয়াতু রব তীব্রতর হয়!
গাছের প্রার্থনাকেন্দ্র জুড়ে বসে আছে
আমার মতন আরো গুগলসংখ্যার কালোধলো দাস।
আমরা নিশ্চয় পানির অভাবে মারা যাচ্ছিলাম,
অতএব আমাদের জিজ্ঞেস করো আমরা সেখানে ওভাবে
অতদিন কেন ঝুঁকি নিয়ে তার টেনে গেছি দানবের গলায় ফাঁস পরানোর ভ্রমে?

২.
আবার নেয়ে আসো প্রিজম,
মহাকালে কালোরঙ চুইয়ে পড়ছে দেদারসে
অস্পৃশ্য মেঘ কিনে যত পারো ধুইয়ে দেবে আমাদের কুকুরপ্রিয় কপাল।

৩.
লালায়িত মুখের নিচেই শুয়ে থাকো পাখি
জানি পানি আনি আনি করে
তমসাই নামবে শুধু উত্তর হাওয়ার লগ্নে!

নাঈম ফিরোজ

জন্ম ২৬ ডিসেম্বর, ১৯৮৩; ধানমন্ডি, ঢাকা। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত ব্যান্ড বিটলসের শহর লিভারপুলে প্রবাসী।

শিক্ষা :
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতকসহ স্নাতকোত্তর এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্নাতকোত্তর। ব্রিটিশ সরকারের কমনওয়েলথ স্কলার হিশেবে লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে উচ্চতর স্নাতকোত্তর।

পেশা : বিচারক (বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস এর সদস্য)।

প্রকাশিত বই :
গ্রীনহাউজের বন্দিনী [কবিতা, ভোরের শিশির, ২০০৮]
উবে যাও জলচোখ [কবিতা, মূর্ধন্য, ২০১৬]
পৃথিবীর শেষ কয়েকছত্র মেঘপত্র [কবিতা, তিউড়ি, ২০১৭]

ই-মেইল : nayeemfiroz.jurisprudent@gmail.com