হোম কবিতা ফারুক ওয়াসিফের কবিতা : হননকালের পঙ্‌ক্তি

ফারুক ওয়াসিফের কবিতা : হননকালের পঙ্‌ক্তি

ফারুক ওয়াসিফের কবিতা : হননকালের পঙ্‌ক্তি
764
0

সর্বজনীন রাষ্ট্র শবাধার

মানুষ মরে গিয়ে জেগে ওঠে লাশ
ভাষার অগোচরে রক্তে নামে হিম
মুছে যায় শয়নের ভাঁজ
মুছে যায় ঘাস
কথাকলি জল
পার্কের বেঞ্চি
জড়াজড়ি হাত
বিধিরেখা
থরথর বট;
স্নায়ু চেপে ধরে
বিপন্ন লিখনের রাত।

শিরা থেকে রক্ত
বুক থেকে শ্বাস
বিশ্বাসের বাতাস
শুষে চেটে পুরট সংবিধান।
বোবা ধরা দিনে
নদী হয়ে মাতা
হাহাকার ভরা বাঁকে আর বাঁকে
টেনে নিচ্ছে দীর্ঘতম শবের কাফেলা।

মানুষ মরে গিয়ে জেগে ওঠে বাঙ্ময় লাশ
নিজেরাই বের করে খাটিয়া মিছিল
পবিত্র সম্মানে তারা বয়ে নিয়ে যায়
দুর্বহ শোকে গড়া সোনার সিংহাসন
তারা বয়ে নিয়ে যায় রাষ্ট্র—
আমাদের সর্বজনীন শবাধার।

 

রৌরব

আমাদের জন্ম ছিল এক
কল্লোল নদীর ধারে,
আমাদের ঠাঁই ছিল এক
থানকুচি বিছানো মাঠপারে
বনস্পতির গম্বুজ ভরা ছায়,
নক্ষত্রের জরি-ঝরা চালে
শিশিরের মতো ঝরত ডুমুর—
কুটুম্বশোভিত দেশ ছিল সে কি
খলিসা মাছের নিরালা পুকুর?
কোন সীমা-কাঁটা পার হলে পর
উদ্বাস্তু কাহিনি হয়েছিল আমাদের?

যা কিছু ঘিরে ছিল আবর্তন:
ত্রিমোহনী নদী, সপ্তপদী পথ
বিনুদের মণিহারী মন
ঢেউতোলা রোদের দুপুর
গেরস্তের বাতাবি মেয়েরাও
লুটপাট হয়েছিল কিনা—
কিছু আর ইতিহাসে নাই।

এখন,
নদীতে উজিয়ে মরা মাছ
থমথম শাদা, প্রেত আর মেঘ ছিল
আধপোঁতা দেহ ইতস্তত
কাটা বৃক্ষ নাকি নিহত পলাশ
অথবা কেবল জড়বস্তু লাশ
—কিছু ভুলি নাই।

এখন যে যুদ্ধ চলে আসছে কাছে
মনে তো পড়ছে না কুসুমপুর?
শুধু নিহিত দিনের কথা বলে যদি কবি,
নিদাঘে দোলায় সরল জল,
শ্যাওলা-সরের মতো জমে কিছু কথা
মায়াছায়া আল্পনার চক্ষুভাসা গীত—
যা কেবল ঘর-তোলা মানুষের পাশে
বসে বলা:
শোনো,
ফিসফাস জলের কিনারে শায়িত এক দেশ—
সে কি তোমারও পরলোক?
মানুষের কাছে ঘেঁষলে মানুষ—
কেন লুকিয়ে ফেলতেই হয় ডানা,
শুঁড় গুটিয়ে প্রাণের—
দেহের কবরে যার যার গুম
বঙ্গোপসাগরের তীর জুড়ে খুন
বাঁধের ফাটলে জল
গেরিলা গর্জনে করে হুমহুম;
পাথর ফেলালে খাদে,
অতলে আওয়াজ ওঠে টুব্
আমাদেরেও দেশ ছিল খুব
প্রাণমধ্যে হত্যাগুলি জ্বলে—
দগ্ধ রোমশ রি রি রৌরব।


শরণার্থী

ওপরে ফুলকি বৃষ্টি, নিচে কালো বাতাসের ঢেউ। শূন্যের উদ্যান থেকে ফিকে ফেলা হলো আমাদের।

বিচ্ছিন্ন ও অলক্ষিত আমাদের অপেক্ষায় ছিল শুধু আলো, মাটি, পানি, বায়ু ও আগুন। আমরা দুজন প্রথম শরণার্থী পৃথিবীর। জমিনে ও জলে আমি খুঁজে ফিরেছিলাম তোমাকে। তোমার সমীপে আমি ছিলাম শরণাগত; আমার সমীপে তুমি। তোমাকে খুঁজবার পথে, নির্বাসনের দিকে দিকে আমি সৃজন করেছি দেশ। আমাদের রুহ আর পাঁজরার শূন্যতা থেকে আরম্ভ ইতিহাসের। আমাদের মিলন থেকে জন্ম উদ্ভিদের, সময় গণনার আর সব দীর্ঘশ্বাসের।

আজো আমরা খুঁজে ফিরি মাটি, সন্তান, দুধমা ও প্রিয়তমা গান। হাঁটাপথে ফিরে ফিরে আসি তোমার কিনারে হে সভ্যতা! সভ্যতার থেকেও নিকটতর কোনো দেশ ছিল আমাদের। আশার বোন অপেক্ষা সেখানে সন্ধ্যায় জ্বালায় আগর। আজো আমি তোমাকে হারাই, আজো আমি আরাফাতে যাই। আজো আমাকে ঘিরে ধরে অন্ধপিতা ধৃতরাষ্ট্রের ভয়, অন্ধ ঘৃণা মহাভারতের। কুরুক্ষেত্রের রক্তিম ধুলা ওড়ে কারবালার আকাশে। কাবিলের পিতা আমি, কাঁধে হাবিলের লাশ। সীমান্তে সীমান্তে করি, হাওয়া, তোমার তালাশ।

ফারুক ওয়াসিফ

ফারুক ওয়াসিফ

জন্ম ২২ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৫, বগুড়া। পেশায় সাংবাদিক।
বুদ্ধিবৃত্তিক নানা তৎপরতার সাথে যুক্ত।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
জল জবা জয়তুন [আগামী, ২০১৫]

প্রবন্ধ—
জরুরি অবস্থার আমলনামা [শুদ্ধস্বর, ২০০৯]
ইতিহাসের করুণ কঠিন ছায়াপাতের দিনে [শুদ্ধস্বর, ২০১০]
বাসনার রাজনীতি, কল্পনার সীমা [আগামী, ২০১৬]

অনুবাদ—
সাদ্দামের জবানবন্দি [প্রথমা, ২০১৩]

ই-মেইল : bagharu@gmail.com
ফারুক ওয়াসিফ