হোম কবিতা প্রিয় ১৫ : সঞ্জীব পুরোহিতের কবিতাগুচ্ছ

প্রিয় ১৫ : সঞ্জীব পুরোহিতের কবিতাগুচ্ছ

প্রিয় ১৫ : সঞ্জীব পুরোহিতের কবিতাগুচ্ছ
1.85K
0

২৭ আগস্ট ২০১৬, আজ কবি সঞ্জীব পুরোহিতের জন্মদিন। তাকে পরস্পরের শুভেচ্ছা। এই জন্মদিনে কবির প্রিয় ১৫টি কবিতা ছাপা হলো পাঠকদের জন্য…


মিমুর প্রতি


জানলার ক্যাকটাসের
সুচালো কাঁটামালাতে
এখনো মিমু’র চুল আটকে আছে
রোদের আলোয় প্রায়ই টের পাই

লোডশেডিঙে জ্বালানো
নিগূঢ় মোমের আলোয়
এ যে এমন চকমকিয়ে উঠবে
তা কে জানে
আর আমিই কি জানতাম
কুকুরের লোমে চোখ এত জ্বালা করে!

 

রচনাকাল : ৩০.০৪.১৯৯৮  মধ্যরাত
২০০০ সালে প্রকাশিত জারজ কবিতারা কাঁদে গ্রন্থের উৎসর্গপত্র

 


সঙ্গমের আগে


এমন একটা কবিতা লেখা যাক
‘তুমি-আমি’ না লেখা এ প্রতিকূল স্রোতে শুধু ‘তুমি-তুমি’
পৃথিবীর সকল উপমা নিভে গিয়ে নিজেই হয়ে ওঠো
জোসনা ছড়ানো, কখনো গন্ধ বিলানো

আজ গর্ভবতীর পেটে লাথি কষানো নেই
সেই মেরু পেরোনো সুদীর্ঘ পা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে
বাথরুমে ঢুকেছে
মহামান্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট
কমোডে বসে বার বার ফ্ল্যাশ টেনে
ফোঁপানোর শব্দ চাপা দিচ্ছেন

বেসিনে জলের ঝাপটায়
হাজারো মৃত শিশুর চোখের জল ধুয়ে
অবনত মস্তকে বাথরুম থেকে সোজা
ঘুমন্ত মে’র মুখে চুমু খেয়ে বলছে—
ক্ষমা ক’রো

সেই মুহূর্ত একটা পলাতক প্রজাপতি!

দুষ্টু বালকের ক্ষিপ্রতায় ওটিকে কাচের বয়ামে পুরে
দমবন্ধ করা দীর্ঘ চুম্বন কষছি তোমায়
যেন
তোমার মতো ফুল ফুটছে, চাঁদ জ্বলছে, ঝরছে নদী
লুটোপুটিতে ঝরছে না একটাও বাসি ফুল

অবিরাম তুমি থেকে তুমিময়
আর কিছু নয়
ভালোবাসা ছাড়া ।

ঘাসের ডগায় বৃষ্টির চুমু
মর্মমূলে জাগায় শিহরন
আচানক কেঁপে উঠি আমূল
পলে পলে ঝিঁঝিঁর কোরাস
ঝিরঝির ঝরঝর।

 


আমার এতটুকু


আমাকে এক চিমটি নাও
তোমার আঙুলে
এক থোকা লবণ—এই আমাকে
নাও—নিয়ে মাখো—ভালোবাসার পাতে
উপহাসে নয়—অপমানে নয়—বিলাসিতায় নয়
চাহিদায়;
বেশি নয়—খুবি সামান্য ও পরিমিত

নাও—মাখো তোমার ভাতে
বেলী ফুলের শাদা ভাত
ঝরেছে সারা রাত
আমার বুকে তার গন্ধ
‘ও হাঁড়ি উপচে পড়া বাষ্প’ নিয়েই দেখো
তবু বেশি নয়, বেশি  হলে ফুলেরা মারা যাবে—

নাও তোমার ক্ষুধায় এবং চাহিদায়
ঘাম ও অশ্রুতে সঞ্চিত
শাদা শাদা রেখা ছুঁয়ে, চিবুক ও পিঠে
আর চাবুকের নোনা স্বাদে
তার থেকে সবটুকু নয়, আমাকেও নয়
আমার এতটুকুকে!

 


শিশুপাঠ


সোহেল অমিতাভ, কবিবরেষু

 

এরপর একদিন সত্যি সত্যি বাঘ এল। পাড়ার লোকরা লেজ উঁচিয়ে বাঘকে দেখল মাঠে যেতে। অথচ রাখাল বালকের চিৎকার পেল না শুনতে। বরং ভেসে আসছে বাঁশির সুর। লাঠি-সোঁটা নিয়ে হাজির হয়ে দেখে আজব কাণ্ড! বাঘ সত্যি সত্যিই ওর মামা ব’নে গেছে!

২.
একদিন স্কুল পালানো এক কিশোর গেছে পশুদের অলিম্পিক দেখতে। তখন সাঁঝ হয় হয়। জুরিরাও পড়েছে বিপাকে। ঘন ঘন দেখছে ঘড়ি। ব্যাপার কী দেখতে ছেলেটি একটু এগোলো…

দ্যাখে, ঝোপের নিচে খরগোশ ঘুমিয়ে আছে। আর কচ্ছপ ঘাসফুলের ডাঁটে সুড়সুড়ি দিয়ে জাগানোর চেষ্টা করছে। শেষমেষ দু’জন কাঁধে কাঁধ রেখে ‘আমরা সবাই রাজা’ গাইতে গাইতে এগিয়ে গেল, প্রতিযোগিতার নোংরা যুদ্ধকে ফেলে পেছনে…

 


এইসব শিল্প শিল্প খেলা


আহত পথশিশুকে পাশ কাটিয়ে যে লোকটি এইমাত্র চিত্রশালায় ঢুকল
ঝোলানো ফ্রেমে বিবিসি মুদ্রিত একটি শিশুর লাশের দিকে অপলক তাকিয়ে
তার চোখে জল জমতে দেখেছি

বাছুরের গলায় চুমু খেয়ে যে ছুরি চালানোর মর্মকে হৃদয়ের মর্মর উঠানে
আছড়ে দিয়েছেন, গরুর গলার ঘুঙুরের শব্দ যিনি জুড়েছেন
গোঙানির সুরের সাথে
ব্রেকফাস্টের তন্দুরি আর কচি গরুর ঝোলে তাকে দেখেছি আপ্লুত হতে

শিল্পের চেয়ে চুমুতে যার আস্থা সেই জীবনবাদী মানুষকে
ভয়াবহ জীবাশ্মবাদী আচরণে পিষ্ট হতে দেখেছি

হে মহীয়ান শিল্পী হে মহীয়সী পোট্রেট
আমাকে লণ্ডভণ্ড করো নতুবা বাঁচাও
দূর করো অস্থিরতা, পথে পথে ছড়িয়ে থাকা
টাটকা খবরগুলো আমার নিয়েছে পিছু
তবুও বেড়ে যাচ্ছে খবরের কাগজের বিপণন!

এসব কথা যখন হচ্ছিল, তখন তুমি আর আমি এক রিকশায়।
হঠাৎ কেন কথা থামিয়ে ডান হাতে নাক চেপে ধরলাম, তা দেখতে ঘাড় ঘুরিয়ে
পথপাশে তাকালে; তারপর আমারি মতো নাক চেপে ধরে বললে,
: কী দুর্গন্ধ!
: তোমার সংবেদনশীলতায় সন্দেহ আছে

এবং নিজেরো, কারণ তা আমাকে অপরাধী করে
উপচানো ডাস্টবিনের ভেতর থেকে জীবনের রসদ কুড়ানো এক শিশুর নাক
বাঁ হাত দীর্ঘ করে মামদো ভূত হ’য়ে চেপে ধরছি।

 


খুনি


ঝাউগাছের সঘন পাতার ফাঁক গলে দড়ি হয়ে ঢুকছিল প্রথম রোদ্দুর। হাঁটার জন্য বেরুতাম। হাঁটা আর হতো না। এ গাছের নিচে কংক্রিটের বেঞ্চিতে শুধু কথার মেদ বাড়ছিল। দড়ি বেয়ে বেয়ে নেমে এল সোনার মাকড়শা, আকাশ থেকে তোমার সকাশে ওর তামাশা দেখছিলাম। তোমার ঠোঁটের, নাকের চারপাশ ঘিরে সে বুনে চলছিল সোনালি জাল। ধীরে ধীরে জড়িয়ে যাচ্ছিলে। নার্সারি স্কুলে বর্ণচোরার খেলা দেখিয়েছিল এক জাদুকর। তার চোখ বরাবর ওড়ানো পালকের—বারবার রঙ পাল্টানো ফিক ফিক হাসি শুনেছি। সে হাসির গুঁড়ো মেখে নিয়েছিল এক ফ্রক পরা কিশোরীর মুখ। সে মুখ আবার হয়েছে জাগরূক—

ঘুম যদি ভাঙে দেরিতে তাই ট্র্যাকস্যুট পরে সারারাত করেছি পায়চারি। সারারাত দেয়ালে ঝুলে থাকা জীবনানন্দ ডান দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে দেখছিলেন। সুনিশ্চিত হতে ঘরের কোনায় কোনায় দাঁড়িয়েছি। রাতভর ওঁর মণির নড়াচড়া পেয়েছি টের। হলুদ তোয়ালে ফ্রেমে জড়াতেই ঘুম নেমেছিল চোখে।

আজ যেদিকে তাকাই সেদিকেই সরে সরে যাচ্ছিল মাকড়শাটি। এক সোনালি মাকড়শা। ভয়ে ভয়ে তোমার বুকে তাকাতেই গলা বেয়ে ওটি নেমে এল তড়িঘড়ি। দু’টি মাংসপিণ্ড হয়ে উঠল সোনার। সোনার আপেল ঘরে আনার ভরসা পেলাম না।

ঘরে বাস করে এক খুনি। তাকে দেখে ঘুমাতে পারেন না জীবনানন্দ দাশ। একদিন এ ঘরে সোনার ডিম দেয়া রাজহাঁস কাটা হয়েছিল। একসাথে সব ডিমের আশায়। মাঝে মাঝে রেগুলেটরের বাড়াবাড়িতে শাদা হাওয়ায় হাজির হয় ইতস্তত লুকানো তার সোনালি পালক। বৈদ্যুতিক পাখার সাথে ঘুরে ঘুরে নাচে। নিউটনের পতনমুখী আপেল, সোনার আপেল হয়ে পড়ে থাকে ঘাসে। একটি মাকড়শা দেয় তারে পাহারা…

 


বন্ধনাবন্ধন : ১


কৈশোরের খাতা থেকে

 

আমাকে যদি কষ্ট দাও
আমাদের সম্ভাবনাময় বৃক্ষের কাণ্ডে
ফণীমনসার মতো কষ্টের কাঁটা
কাঁদাবে অশথকে
এখন বরং চুপ করে থাকো

বৃক্ষের বগল বেয়ে ঝুরি নামবে
ছুঁয়ে যাবে তুরাগের স্রোতকে
সে জলে বিম্বিত চাঁদ
দোলায় দোলায়, ঝুরি বেয়ে বেয়ে
উঠে আসবে বুকে
অক্টোপাস প্রশাখারা
প্রেম শেখাবে

তখন অমাবস্যার মতো, কোথায় লুকাবে তুমি?

 


সন্দেশ


এ কোন মৃত্তিকাশাঁস
শিশুসবুজ লোশনে
খলবলে নিটোল আমেজে আরামে
বুঁদ হয়ে চোখ মুদে আসে
সুখ সুখ বুকে মাখি
পেলব প্রশ্বাস; আহা!—

পাঁজর-চূর্ণ’র কৌটা
জলে পুঁতে দিলে
সেখানে নিশ্চিত গজাবে শাপলা
সাইবেরিয়ার পাখি শীতে এলে
এ ফুলের বুকবুক গন্ধ
ওরা ছড়িয়ে দেবে দিগ্বিদিক

জানি ভোমরের ভাষা জানে দোয়েল

দোয়েল দোয়েল ভোরে
সুনিপুণ শিশিরে স্তন ভিজে এলে
তোমার বুকের লাল তিল বাদ দিয়ে
সমস্ত শরীর সবুজ হয়ে ওঠে

এসো আজ রস পান করে
হেঁড়ে গলায় রবিবাবুর গান ধরি
দেখো—গানে গানে লোমের মতো
জেগে উঠবে
ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল।

 


নীল কলার খোসা ও মেঘে ভরা বালিশ


ছায়া মানে অস্তিত্ব’র অনুবাদ
ছায়াসোপানের প্যারায় প্যারায় কলার খোসা পড়ে আছে

ছায়াগুহায় মুখ রেখে প্রতিধ্বনি তুলে না-নাম্নী তোমাকে তুমি তুমি করে ডেকে উঠি
ডাকি, যেভাবে ডাকে আকাশ আকাশকে
ডাকি, যেভাবে ডাকে জল বিজলকে
তিনদশকের পৃথিবী শেখা কতটা পেরিয়েছে ভোর; বর্ণমালা, মুখস্থ নামতা, বাকবাকুম ছড়া—
খুব ভোরে
যৌনতাচর্চিত বাগানে থোকায় থোকায় কনডম ফুল ঝরে আছে
রাতভর যে উদাম হাওয়া আগলে রেখেছে শিশির খচিত ঘাস, তার গালে একগোছা চুল আর বিক্ষত ওড়না লেগে আছে। থমকানো স্বাধীনতা উদ্যানের হাঁটাপথ—বেদনার পিচ্ছিল খোসা পরেছে।

জলাতঙ্ক সূর্যের তাড়া খেয়ে ঘরে ফিরে কফির মগে চুমুক চুমুক বেদনা টানছিলাম। কে জানে হয়েছিল কী। কে সে যত্ন করে বিধুর করেছে আজকের সারাবেলা। বোমার আঘাতে ভেঙে পড়া বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বাঁচা লেবানিজ তরুণী, সেও বালিশ হাতে পাড়ি দিচ্ছে ভোর। পত্রিকায় বেরিয়েছে সে ছবি-খবর, আর কিছু নেয় নি, শুধু বালিশ, নিশ্চিত ঘুমের প্রত্যাশা। আহা! কতযুগ জেগে আছে ফিলিস্তিন।

বনিবনা না হওয়া কোনো এক বারবণিতার বুকের মাংসে যে দিচ্ছে কামড়, তার শাপ আমাকে কেন সাপ হয়ে করে দংশন; কফিতে, দুপুরের গরম ভাতে, ডিনারে-ডেসার্টে?

আকাশে কার্পাস ভাসে। মেঘপুরে যে লেপ-তোশকের দোকান আছে, আমি সে কারিগরের কাছে ঘুম-কলার দীক্ষা নেব।

 


শিশু বিষয়ক একটি আকর কবিতা


কফিমগে নিউজপেপার ডুবিয়ে নাস্তা সারছিলেন এক কবি। শিশুমৃত্যুর চমৎকার সব ছবি ঠাসা ছিল খবরের পাতায়।

শেভস্নান সারা হলো। দুপুরে এক প্রথিতযশা কবির কাঁধে চাপড় মারতে মারতে ঠা ঠা হাসছিল সে। সেই চা এমন ভরিয়ে রাখছিল, অনেক চেষ্টাতেও সারাদিন লোকটির পেটে কিছুই ঢুকল না। কেউ তা পেল না টের।

গড়ালো দুপুর…
কোত্থেকে টন টন মেঘ উড়ে এসে বসল আকাশজুড়ে। জ্বরতপ্ত বাতাসের শরীর এল মিহি হয়ে। এক লহমায় ঘনিয়ে এল শুরুর বিকেলে সাঁঝ।

ঘাসমূলে জাগে শিহরন। দলে দলে পিঁপড়ে চড়ে বসছে তৃণচূড়ায়। নারী পুরুষ নির্বিশেষে দাঢ়া চেপে আঁকড়ে রইলো পরস্পর। মিখাইল পাঠিয়েছে মেঘবার্তা, বাদল করবে আজ। যাতে তারা না ডুবে। নিরবচ্ছিন্ন থাকে ভাসতে ভাসতে। গড়তে পারে নতুন বসতি। ঘটাতে পারে প্রজনন।

মেঘেদের বেদনা সারা হলে, গাছেদের মন সবুজ ভালোলাগায় ভরে ওঠে। বীজে ঘুমিয়ে থাকা শিশুর দোলনায় লাগে অঙ্কুরোদগমের দোলা।
রাত হলো। রাতে—
পাখির ডানা কাঁধে নিয়ে
একটি নারীর অস্থির ওড়াউড়ি
আমি চিনি তারে
বুকে টইটুম্বুর দুধ
টনটন করছে বোঁটা
কখন তুলে দেবে শিশুর মুখে

বহুদূর থেকে
বিস্ময়কর ধ্বনি তুলে,
প্রতিধ্বনি খচিত সড়কে
করছে তালাশ বাছারে
মানুষ নয় বানর নয় তিমি নয়
বিদ্যুতের তারে তার বাচ্চার বাবা
কঙ্কাল হয়ে ঝুলে আছে
ডাসা পেয়ারার পুষ্টিতে ঠাসা। ‘নিডো’ নয়, আগামী জয়ের প্রতিযোগিতায় নাম লেখাবে না। শুকনো পাতা ঝরছে। ডালে ডালে ঝুলছে স্ববর্গীয়। পুরুষালি সার সার পিঁপড়েবাহিনী তুলে নিয়ে গেছে ওর শাবক। তার অস্থির ব্যাকুলতা আমাকে ভাবায়। আমাকে জাগায়। আমি চিনি অই বাদুর নারীরে। শেক্সপিয়রের আগে পেত্রার্কেরও আগে, সেই ত্রুবাদুর জাতির সঘন সনেট সদৃশ ওর স্তন; পেঁচার চোখ ধার করে আমি সারারাত দেখি।

এই অত্যাশ্চর্য অ-ঘ্রাণে আমি টের পাই, আমিও নেই পিছু ব্যাঘ্র মাতার, ঘ্রাণ শুঁকে শুঁকে যে খোঁজে তার বাছারে…
বাঘিনীর আঁকা চক্র ভেদ করে
ঢুকে পড়ে কামুক বাঘের নখ
রাত এখন মধ্যমাঠে…
একটি নিঃসঙ্গ রিকশা শাহবাগের কালো লেক বেয়ে পিপীলিকা গতিতে চলছে। পেন্ডুলামের মতো দুলছে হ্যারিকেন। সাথে ঝুলছে বংশের বাতি। হঠাৎ এক প্রত্নবিলাসী হাঙর উঁকি দেয় জাদুঘরে।
হাঙরের হা থেকে একটি শিশুর হাত
আঙুলে হেল্প হেল্প ঢেউ তুলে ডাকে ইশারায়
একবিংশ ওর হাতে দিল ধরিয়ে রজনীগন্ধার ডাঁটা। শিশুটিকে আমি বাঁচাতে চাই।
ওর মখমল কোমল আঙুল চাই ছুঁতে। হাঙর উদরে ডেবে যাওয়া ওর মুখে  চুমু খেতে চাই। ভ্রু-প্লাক করার সুন্দরীর নির্দয় চিম্টা সেজে, হাঙরের দাঁত শাসায় আমায়। কল্পনায় শিশুটির কালো মুখ দেখি হুবহু শিশু সঞ্জীব। এক লহমায় সকল ভ্রুকুটি ভুলে রাতের সফেন সাগর হয়ে আছড়ে পড়ি—
অথচ
অকস্মাৎ এক অসৎ কবিতা লেখক
রোজ হাশরের গনগনে দশহাত সূর্যসোডিয়াম তলে
দুনিয়ার তাবৎ রাত্রিগন্ধা
মাত্র পাঁচ পয়সায় ক্রয় ক’রে ঘরে ফেরে।

 


শিরদাঁড়ার অসুখ


ইদানীং কেউ দেখতে দিচ্ছে না কিছুতেই আমাকে।

চিনির আগুনে পুড়ে যাচ্ছে পিঠ। থুহ্ করে ফেলে দিয়েছি নকল দাঁত, জানলা দিয়ে। অজস্র তৈজসপত্রের সাথে তার ঝনঝন কাচ ভাঙা কোরাস শুনি। ডিজিটালপত্রের ভেতর দিয়ে শুনি ক্রিস্টাল হাসি।

ইদানীং কিছুতেই নিজেকে দেখতে পাচ্ছি না। বাথরুমে আয়নার পায়ে ধরেছি। ভাবা যায় : এক সময় এ আয়নাতে দাঁত ব্রাশ করতে করতে ‘তুমি সুন্দর’ বলেই চুমু খেয়েছি ঝটপট। আবেগে অনিচ্ছাকৃত ফেনা লেগে গেছে গ­াসে। সরি সরি বলে হাতের চেটোয় মুছে দিয়েছি।

আজ আয়না কিছুতেই দেখতে দেবে না বলে শাসিয়েছে। নিজের পিঠ থেকে সে খসিয়ে ফেলেছে পৌরনীতির পারদ।

 


ঈশ্বরের মরামুখ


ক্লীব ঈশ্বরে বিশ্বাস নেই তবুও অলৌকিক প্রস্তাব
ওঠে দুর্মর শহরাচারে। মানুষ মূলত উভলিঙ্গ
বিশেষত স্বমেহন বশে এনে যারা স্তনের ওপর
পরেছে পুরুষ-পাঁজর আর নারী স্থৈর্যর আভরণ
মেখেছে যুবারা। আজ কম্প্যুটার চর্চিত পর্নোপ্রবণ
নারীগণ লেহন তৃষ্ণায় কাতরাতে কাতরাতে সঙ্গমের
ক্ষণকাল ঠোঁটে দাঁত পিষে করে প্রলম্বিত। হেমমগ্ন
শরতে সড়কের পাশে দুলে ওঠা কাশের ডগা থেকে
উড়ে যায় কতো ফুল, যেমন শিমুল তুলা, তাতে চড়ে
দেবো পাড়ি অক্টোপাস সভ্যতা থেকে চন্দ্র যোজন দূরে

চাঁদবুকের দুধ খেতে খেতে যে শিশু ঘুমিয়ে পড়ে, ওর
বৃন্তচ্যুত অধর বেয়ে এক ফোঁটা জোছনা থুতনিতে থমকে
থাকে, সে বড় হয়ে নারীপূর্ণা হলে চিবুক-খাঁজে মুক্তো
ফলাবে। সেই মণিতে বুকের তা’-এ জন্মাবে শিশু চাঁদ।
ছাত্রীবাস থেকে খুব ভোরে ট্রেন আসে, হুইসেল বাজায়,
থামে। হাত ধরে উঠে বসি। এভাবে চলে সুখ-বোরাক।
ঈশ্বরের স্বরচিত পথে পথে মানুষের পাদুকার
সুকতলি পড়ে আছে। আসন্ন হিমে কাঁপে একপাটি মোজা
ভোরে শিশু কোলে তুলে যে উদ্যানে হাঁটি তার ঘাসে ঘাসে
কনডমফুল ঝরে আছে—স্বর্গ’র সাপ ফেলে গেছে নির্মোক।

 


ডিএনএ এবং নীল আজাজিল


শিশুদের মাঝে এক ধরনের নূতন রঙের বিস্তার টের পাওয়া যায়
চর্মচক্ষে দেখা সকল রঙ ছাপিয়ে না দেখা না জানা এক দূরাভাস
যা পৃথিবীর নয়, এমন অদ্ভুত অপার্থিব রঙের প্রচ্ছন্ন বর্ণালি
আমি অনুভব করি

বর্ণান্ধ মানুষ যেমন বিশেষ একটি রঙ চেনে না
যেমন তুমি কালার-ব্লাইন্ড ছিলে বলে
‘ও আমার বৃন্তছেঁড়া জারুল’—
তুমি বোঝো নি গোলাপির ভেতর থেকে ঠিকরে বেরুনো বেগুনি কষ্ট
তবুও তুমি ঠিকঠিক বুঝে নিতে
নীলের প্রায়োগিক বেদনা আর ব্যবহারিক সক্ষমতা

শিশুদের ভেতর এক নূতন নিষ্ঠুরতার এবং অজানা কষ্ট দেবার প্রবৃত্তি টের পাই
মুহম্মদের দিকে ছোড়া পাথরেরা তা জানে
জানে শেকলবন্দি কবি শাদাব, জানি আমি
জানে টাইট সুতোর গিঁটে টাটানো ছট্ফটে ফড়িঙ
জানে পেস্টালের আঁকিবুকিতে মাখা শাদা দেয়াল

শিশু এবং তোমার মতো কেউ এত ভালো করে ভালোবেসে
কষ্ট দিতে আর ছবি আঁকতে পারে না
তবুও আমি বাবা আর তোমার হবার স্বপ্ন দেখি

 


বোধনের বুকে কাঁটার কম্বল


ক্যামেলিয়াদি, প্রিয়বরেষু

 

ক্ষণে ক্ষণে কব্জি কামড়ে রক্ত চাটছে আর হাসি হাসি মুখে বলছে, ‘তারপর?’
গল্পের ঘাস দাঁতে কেটে অপরজন বলছে, ‘শেষ প্রশ্নটি করেছি, কাহিনির খাতিরে ন্যুড হতে হলে আপনি রাজি?’…বলতে বলতে মাঠ থেকে আরেকটি ঘাস উপড়ে ফেলল…কলার খোসা চিবুবার আগে ছাগল যেমন নাক কুঁচকে শোঁকে, তেমনি শুঁকলো। আর আড়চোখে দেখল সবুজ শুঁয়োপোকাটি ততক্ষণে মাঠ ছেড়ে প্যান্ট বাইছে কবির। মজা দেখতে আরেক টুকরো তৃণ দাঁতে কেটে বলে চলল, ‘প্রথমে চুপ করে রইল। তারপর বলে, ক্যামেরার সামনে ফ্রি হতে পারব না। হ্যাজিটেড লাগবে। অস্বতঃস্ফূর্ত ভাবটা দর্শকের চোখে ধরা পড়বে ঠিকঠিক…(রেকর্ডারে পজ চেপে বলি) আর ক্যামেরার বাইরে?’

কবি তখন লাগসই কামড় বসালো কব্জিতে। যেন বেসামাল যন্ত্রণার ঝাঁজে কানে কিছু না ঢোকে। অথচ কব্জি তখনো অক্ষত। গভীর ক্ষত বুকে। কাঁটার কম্বলে মোড়ানো শুঁয়োপোকাটি ততক্ষণে পৌঁছেছে সেখানে। পাঁজরের ওমে দ্রুত প্রজাপতিতে কনভার্ট হয়ে শার্টের ফোঁকর দিয়ে দিল উড়াল। মজা দেখতে বসা হলদে জার্নালিস্ট গল্পগুজব থামিয়ে বিস্ময় নিয়ে দেখল সে উড়ে যাওয়া। ওদিকে মে’টির বাবা তখন গ্রিলে মাথা ঠেকিয়ে উদাস হয়ে ভাবছিল কন্যার কথা। হঠাৎ শ্রী প্রজাপতির আগমন সে ভাবনার তারে বাজালো শুভ মিড়।

আরেক দিন চালের কণা, যবের দানা, ঘাসের বীজ বুকে বিছিয়ে বই দিয়ে মুখ ঢেকে শুয়ে আছে মাঠে। হাজারো নবজাত পক্ষীশাবকের কিচিরমিচির ঘিরে আছে কবিকে। তখন সন্ধ্যা বিগত। তবু পাখিরা ঘরে ফিরে নাই।

 


লেজসংক্রান্ত


এবার ঝাঁকে ঝাঁকে হরিণেরা গেছে মরে
এই নৃশংস সিডরে। সাথে গেছে মানুষ
ওদের কেউ ভালো, কেউ মন্দ
যারা মন্দ, তাদেরও কিছুটা ভালো,
যারা ভালো তাদেরও মন্দ কতকটা

অথচ হরিণেরা সবাই ভালো ছিল
যা গেছে পুরাটাই ভালো

মানুষের পক্ষে আর আমি নাই
এদের পক্ষে উকিল আছে, আছে বিপক্ষেও

আমাকে যারা মানুষ ভাবে, ভুল করে তারা
শেষ কশেরুকা থেকে গজিয়েছে লেজ
ক্রমশই বাড়ছে এর দৈর্ঘ্য
কুমির মার্কা আন্ডারঅয়্যার ধামাচাপা দিয়ে রাখছে একে

শাক আর কতদিন রাখবে মাছ ঢেকে

Sanjib Puroh

সঞ্জীব পুরোহিত

জন্ম ২৭ আগস্ট ১৯৭৮, ঢাকা।

ই-মেইল : darkak1978@gmail.com
Sanjib Puroh