হোম কবিতা প্রিয় ১৫ : শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা

প্রিয় ১৫ : শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা

প্রিয় ১৫ : শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা
446
0

বৌদ্ধ লেখমালা


২৫

শুধু মগ্ন শ্রমণের কথা ভেবে জাগিয়ে রেখেছি এই টিলা, বধির,
আমারও তো সামনে কিছু  প্রশ্ন
কেন জেগে থাকা, কেন বারবার সন্তানের দিকে চলে যায়
সভ্যতার তীর ও কৌশল, কেন থাকব
এই সূর্যাস্তের চূর্ণ লেগে তেতো জিভে ভুল শব্দের ভিড়ে?

কেবল উড়ে যায় কাকের পেটের ধূসরিমা এই বিকেল
আরও কত দূর গেলে তোমাদের ওই উজ্জ্বলতা
স্পর্শ বলে তো কিছু নেই শুধু জেগে আছে
এই নিখিলের পাশে ব্লেড ও তারের ভাস্কর্য

তবু ছেড়ে যাচ্ছি না, তবু ধাপে ধাপে ভেঙে আসছি
আসঙ্গ নির্মাণ, পাশে থাকতে চাওয়া সঙ্গী,
এক চড়াই পাখি দিয়ে ঢেকে থাকা দূরপাল্লার রেললাইন,

আর শরীর ঢেকে যাচ্ছে অনভিপ্রেত আয়নায়
প্রতিফলনে ধরা পড়া পাখিদের স্বরে বলে রাখব
ভূমিহীনতা, একদিন অপেক্ষায় ছিল
একটানা শুদ্ধ সারঙের বিকেল ৩টে

 

২৬

অথচ শরীর দিয়ে ঠেসে দেওয়া যায় না সন্ধে
মাংসের স্তূপে হাত দিয়ে অভ্যস্ত চলনে বুঝি
অব্যবহৃত লোহার গায়ে শ্যাওলার সবুজ এই সময়
কেবলি নিজের কথা চুপিস্বরে বলাবলি করে

জংধরা যন্ত্রপাতির ঢিপি অতিক্রম করে যাচ্ছে
গোলাপি গলি, ঢিলে রাস্তা ক্রমশ আলগা হয়ে
রিবনের মতো নেমে আসছে কোমরের নিচ থেকে
পায়ের পাতায় ধারালো ব্লেড

দীর্ঘ চিত্রকল্প তৈরিতে মন দি
একটানা রক্তের ছিটে লাগা পালক দিয়ে ঢেকে
থাকা রাস্তার শেষে যদি একটা বাড়ি থাকে
তাকেই কি দেশ বলব?

 

২৭

তাহলে এই অপরিমিত আসবাব, এই না দেখাতে পারা থাকাকে
কী করে বলবে?

শুধু মাংসল থাবা শুধু উগ্রগন্ধ শুষ্ক চামড়া ঘষে সাদা
পায়ে চলা পথ গায়ে

এভাবেই কি অনিবিড় গড়ে ওঠে?
কথার ভগ্নাংশ ঘিরে রুক্ষ উদ্ধৃতিচিহ্নের কাঁটা

তাহলে ঘর কি আসলে একটা সন্ধ্যা মাত্র?
বন্ধুহীনতাকে না বলতে পারা কিছু চিৎকার?

বাষ্প জমে জিভের নিবিড় ডানা কোথায় মিশছে গিয়ে
নভেম্বর চওড়া অ্যাভিনিউ জুড়ে বুকশেলফ রেখে গেছে কেউ
ধুলো জমা পুরনো খামের গায়ে কেন কোনও ঠিকানা মিলছে না?

 

২৮

ঘরের ভিতরে জমা নিষ্ঠুরতা আমি মেখে নেব
ভেবে চোখ তুললে এই নীলচে সুরের পাশে
বাসা করেছে নভেম্বর, দেখ তুই নেই
তুই হিংস্রভাব… অথচ পাখির চোখের চঞ্চলতা
ছড়িয়ে রেখেছে আলো, এইসব
পুরনো অক্ষর ছাড়া আর কি কিছু নেই?

গান দিয়ে তৈরি একটা সুড়ঙ্গের মধ্যে বেঁচে থাকা
সময়টার মধ্যে বাদ্যযন্ত্র কি আসলে উষ্ণতা?

যখন কিছুতেই আর জোড় বাঁধছে না তার
বিকেলের শীর্ণ আলোয় কি আমাকে আর মায়াময় লাগে?

নিজের ব্যবহৃত হয়ে যাওয়া বলিরেখাগুলোর দিকে তাকাই
কিছুতেই যেদিকে ফিরে যাওয়া যায় না সেই ঘরের দিকেও

যেসব রাস্তার গায়ে এতকাল বাড়ি লিখে রাখা ছিল
সেখানে একটানা পেয়ারার গন্ধ মাখা রিবনের বহির্মুখী বিস্তার

পোস্টম্যানবিহীন এই শহরের ডাকবাক্স উপচে উঠছে কি?

 


ধাতব কবিতা


নিজেকে বলি আরও হিংস্র হয়ে ওঠো
গত বছর যাদের সঙ্গে খারাপ ছিলে
এবছর যাদের সঙ্গে আরেকটু নিম্নগামী স্বেদ
জিভে ব্লেড কে রেখেছে?
প্রতিদিন পায়ে জড়িয়ে উঠেছে লতানে রোদ
মাথা নামানো সকাল নয় বরং ঝকঝকে দুপুরগুলো
সারিবদ্ধ কীটনাশকের সামনে মেলে রেখেছে বই
পাতার পর পাতা শুধু বন্ধুদের না লেখা অনুপস্থিতি
তুমি কি অন্য দিকে যাবে?
পছন্দ মতো বাসের পাশে অনায়াস নেমে যাওয়া স্টপ
আরেকটু গেলেই গলি গ্রীষ্ম আসার আগে কুকুর ধরার গাড়ি
আর্তনাদ খালি করে চলে গেছে
তুমি দ্যাখো বেঁচে যাওয়া সন্ত্রস্ত জানোয়ার
তার কম্পন

প্রতিদিন বাবার কথা মনে হয়?
আয়নার সামনে অফিস যাওয়ার অনিচ্ছা
না দেখার অভ্যেসে বুড়িয়ে গেল

 


পাথুরে উড়াল


বিশ্বাসই তো বেরিয়ে পড়া
পুরনো সন্ন্যাস অথবা
আমি স্থির ফাতনার অপরে রাখি এই বেরং দুপুর
ভাসমান মজনুর টিলায়
সেই কবে চিনে সেনার তাড়া খেয়ে বেরিয়ে
পড়েছিলেন এই বৃদ্ধ সন্ন্যাসী সুদূর তিব্বত থেকে
পাওয়া কি গেল কিছু?
একটানা চলতে গিয়ে হাতের গায়ে বেড়া লেগেছে
পায়ের দেহে ফাটল বরাবর দীর্ঘ চলনবীজ
শুকিয়ে রয়েছে
রঙিন কেউ কি দিল?
রিবন যেখানে রোদ
একটু পরে অ্যাসফল্ট ধূসর রাশি
পাথুরে পাখি
কে তোমায় নেবে বলো
এখানকার কোনও খেলা বিকেলের স্নিগ্ধতা জানে না

 


ফেরত যাবার কথা


নির্মাণ করে নিয়েছি চলন
উদাসীনতার ফাঁকে ইলেকট্রনিক গান
          দমকা টিয়াপাখি
কখনও কি স্পষ্ট হাওয়া দেয়?
দিক নির্দেশক কোনও ধুলো?
এইসব রাস্তাগুলো দিয়ে চিন্তা নিয়ে হাঁটা যায় না
অবরোহণ বিঁধে থাকে পায়ে
চকিতে ফেরার পর মনে হয় খেলাগুলো আর নেই
ডাঙায় ফেলে রাখা নৌকা তারা
তাহলে কী বাকি আছে?
একটানা শব্দগুচ্ছ ক্ষয়াটে সাক্ষ্য দেয়
এইসব রাস্তা কি আমি চিনি?
বাড়ি তো সহজ উপমা
তবু চলন্ত ট্রেনে মাছি দেখলে
এক ধরনের কষ্ট হয়, চাক চিনে ফিরতে পারবে তো?
কেইবা পারে? এলোমেলো ধুলো ঝাড়তে গিয়ে
ফেরত যাওয়ার ব্যাগ তৈরি হয়ে যায়,
মাটি ও বীজহীনতা টানটান প্রস্তুত
এই ছিলার গায়ে ফেরা তো হলুদ কোনও সার্বজনিক ফুল
বিনীত সংঘাতে যাবে,
তার আগে ট্রেনে ঘুমন্ত মাথা লেখে
নেমে যেন বৃষ্টি হয়

 


উৎসবের নিভৃতি


এইভাবে কবিতাগুলো প্রতিদিন সবুজ ডেলা হয়ে উঠতে চায়
প্রবল মেঘলা ভোরে নিভৃত বেড়াল এসে শুঁকে দেখবে

অথচ আমি তো শুকনো জঙ্গলের সামনে এখন
পাতায় পিছলে যায় রোদ রৌদ্র
কীটহীন ডালের অন্বয়ে কোনও মাংসলতা নেই

আমাকে নতুন কোনও দেশ দেবে
এই উৎসবের নৈঃশব্দ্য?

শুষ্কতা কি নিঃশব্দ হয়?
ক্রমশ ধুলোর কাছে কর্কশ ব্যাকরণ
হাতে পায়ে শুকনো কাটার দাগ
টুকরো রক্ত আমাকে কী করে দেবে
সদ্য কলেজে যাওয়া মেয়েদের
চুলে খুশকিরোধক শ্যাম্পুর খোলামেলা ভাষা?

 


চলমানতা


পুরনো সজলতা আসলে পেপার ওয়েটে বন্দি গাছপালা
তীব্রভাবে ভেঙে ফেললেও তাদের স্পর্শ করা যায় না
ভাঙা কাচে মোড়া বিকেলগুলো পল্লবিত শিরায়
নতুন শহরে শীতল পাথর?
এখানে রাস্তাগুলো এলোমেলো হয় না কখনও
সামান্য স্খলনহেতু নিজে ছিন্ন হয়ে গেলে
রক্তাক্ত তালুর গায়ে বয়সের সন্ধি মুছে যায়
এ হাত কি চলন চায়?
চলমানতা কাকে বলব
ছোট দৃশ্যে আটকে থাকা গ্রীষ্মকালীন
সকালের খাঁ খাঁ পার্ক?

নাকি স্পেস চিহ্নের গা বেয়ে
লেখায় চুঁইয়ে ঢোকা
শিখ তরুণের প্রভাতী চুল বাঁধা?

 


ধাতব কবিতা


এইসব কথা নিজের সঙ্গেই গেঁথে রাখা
নিজের ভিতরে ক্রমাগত জ্যোৎস্নায় পতনশীল
ব্লেড ও মৃদু ধাতব আওয়াজের পাশে কান
কতদূর নিয়ে যায়?

হয়তো এভাবেই সময় প্রবাহকে ঘটনা
ভাষাকে ব্যাকরণ দিয়ে তৈরি
নমনীয়তা
বুলেট ঢুকে যাওয়া কাচকে
টুকরো হয়ে যেতে দেবার আগে
হাত দিয়ে মৃদু স্পর্শ করি
তপতপে স্পন্দন সে তো অনেক আগের
তাহলে কি ভাষাও ভাঙে?
চামড়ায় বিঁধে থাকে মাতৃভাষার ক্ষত?

 


অতুলপ্রসাদ সেন


এভাবেই বাংলা আসে
পরিচিত মাংসের দোকানের রাস্তায়
আমরা অস্থির হয়ে ওঠি বৃষ্টি

অথচ জোরালোভাবে বলি না কলকাতার রান্নাঘরে
জলের ছাট আসছে জানলা বন্ধ করতে গিয়ে
মা কী যেন ভাবে, ভাবে কি?
গত বছরের রঙে এবছরের শ্যাওলা
গত বছরের রাস্তায় এবছরের খনন
পানযোগ্য করে তোলা এক টুকরো বসবাস
এইসবের মধ্যে কী থাকে?

আমার এই নতুন শহরে বর্ষা কম
শুকনো রাস্তায় জল ছড়ালে কি আশ্বিনদুপুর
বাবার অতুলপ্রসাদী শোনার মতো ভঙ্গুর হয়ে ওঠে?

 


কুকুরদিন


এভাবে নিজেদের কী ফিসফিস করি?
শাসকদল নিস্পৃহ মৃতদেহ ফেলে গেলে
শহুরে বন্ধুরা বিশ্বাস করে না?

জমাট হাওয়ার পাশে শীতল তো আমি চাই নি
শুধু হাড় আঙুলে নিজস্ব বাঁক নিলে
হাত নিজে থেকে কিছু আঁকড়াতে চায়…
সামনে প্রস্তর নির্মাণে একটানা ক্ষয়

বুকের ভিতরে শুকনো রাস্তা আঁচড়ে
কুকুরদিন কী পায়?

 


ব্যাকরণ


বড় বেশি করে ভেবেছ আর্দ্র নভেম্বরের কথা
পেঁচিয়ে গেছে জানুয়ারির কাচের গাছে
ভিজে মাটিতে কি শীত লতিয়ে চলে?
ঋজু পাতায় জলজ ব্যাকরণময়
একটা শব্দ—বাসস্থান—বারবার ঝাঁপিয়ে পড়ে
ছত্রখান করে দিয়েছে চলন
তুমি ফিরতে পারো না বলে নিজের
অতি সাধারণ চামড়ার দিকে দ্যাখো
সামনের নির্মীয়মাণ বাড়ির দিকে

মিস্তিরির বউ কি লজ্জা পায়?
সকালের স্নানের সময়ে হঠাৎ বমি পেল
গমখেতে হলে এমন হতো?
এই সিমেন্ট ও ইটের পাশে এক টুকরো চালাঘর
শাশুড়িও তরুণী কিন্তু ঘোমটা দেয় না
শ্বশুরের তক্তপোশ থেকে গোঙানির শব্দ
এখনো সপ্তাহে তিন দিন
মেঝের জলদি সোহাগ সে তো গ্রাম বা মেলা নয়
সন্তানের অভ্যাস

বাচ্চা ছেলেমেয়ে দিয়ে ভরে গেছে
সপ্তাহান্ত প্র্যাম কুকুর ও প্রাচুর্য
শুধু কখনই স্নিগ্ধতা না জানা খেলা ঘিরে রাখছে তাদের

তুমি কি এসব থেকে ছিটকে যাও?
শুধু খেলা থেকে ছিটকে আসে রুক্ষ চলন
রাস্তার বাঁকে একটা ভেজা জারুল
পেতেও বুঝি কেউকেটা হতে হয় দূরের শহরে

 


উপস্থিতি বিষয়ক


ভাস্বতীকে

ভাঙা নয় তবু কাচে ঢাকা ভিজে ঘাসের রাস্তায়
হাঁটছি আমরা, কেন মুড়ে রাখতে হয়
প্রশ্নচিহ্ন কমে আসা
বিকেলের গায়ে জমা হিমেল…

শব্দহীন গিয়েছিস তুই
তোর জায়গা নিয়েছে  শান্ত

আর তোর নাম নেই কোথাও
শুধুই উপস্থিতি

 

নামে ঢুকিয়ে দিয়েছি আয়নার ভাঙা টুকরো
আর কোনও সন্ধান নেই
উত্তর বা দিকনির্দেশ

এ পাথর কি যথেষ্ট নিজের জন্য?
শুধু গ্রাহক তুমি
উপস্থিতির না থাকা…

 


অনুপস্থিতির দিকে


আমাদের বৃষ্টি শক্ত হয়
কথা বলি বীজ ভিজিয়ে তোলার বাইরে
ভাষা জিরোনোর দিকে
তোমাদের দিকে বেড়ে ওঠা প্রতিদিন আমি বেরোতে চাইছি
বলতে চাইছি এই থাকাটা একটা বিজ্ঞাপন বিরতি হোক
এই প্রাত্যহিকতায় আঁতকে ওঠা শহর
এখন আর পালক নেই
ঘাসের ওপর গড়িয়ে যাচ্ছে ধাতব বল
আমি তোমার সঙ্গে বলছি
তোমার নিটোল সন্ধে আমি না বুঝে বিষিয়ে দিয়েছি
অথচ তুমি শুনছ চুপ
তোমার গানগুলো ভেঙে দিচ্ছি
সন্ধের শরীরে বেড়ে উঠেছে ভাঙা লং প্লে
সুরের একটা ভ্রান্ত খোল আমার ভিতরে ঢুকে এসেছে
কিছু নোটপত্তর তোমার সঙ্গে তবু ছড়িয়ে থাকছে নৈঃশব্দ্য
আদতে কথা মানে কি প্রজন্ম? নিজের সময়ের দিকে আগল খুলে দেওয়া
বিকেল বন্ধুর বাড়ি শিরদাঁড়ায় ম্লান হয়ে থাকা কোনও আলগা রসিকতা?
আমি বুঝি না কেন তোমার সময়ের দিকে একটা বই ভেসে থাকে
আর আমাদের বাড়ি ফেরাগুলো ঘিরে থাকা ভেজা পাখি
পরপর না জোড়া রাস্তা অযথা যুক্তাক্ষরজ্ঞান
ভায়োলেন্সগাছ ভায়োলেন্স-পান্থশালা

তোমার শোনার কথা মনে করি
পরপর ফিসফিস ভাবি পুরনো কাগজ ছিঁড়ে
পেজমার্ক করে রাখা কোনও সামাজিক বই
তার সামনে তোমার মাথা নাড়া
পরপর তৈরি হওয়া স্বরলিপির বাক্স
বাতিল সুরের দিকে ভেঙে আসা দিন
পুরনো হলুদ পাতা হাতে নিয়ে তুমি কী ভাবতে?

এভাবেই লাউসবুজের মধ্যে দিয়ে এসেছি
উপনীত শব্দটাকে পুরনো সংস্কার  থেকে দূরে রেখে
আনত গানের হারানো ইপি রেকর্ড বা দোতারা সমেত
                                              ভিক্ষাজীবী
এই দুপুরই তো সত্তা বারবার নম্র নির্মাণের পথে ফেলেছে শীত
নস্যি চাদর গায়ে দেওয়া বাবার জন্য বিকেল ৩টের চায়ে
গীতা দত্ত কতটুকু উদ্বেলতা?

আর খুঁজি না। ভিন দেশজ গ্রীষ্মহেতু খসে গেছে যাবতীয় শীতকাঁটা
শুধু সামাজিকতার লোভ একটা ফ্লুরোসেন্ট ফিতে রাখে
রাতে বাড়ি ফেরায় কে দেখে চলার কথা ফেলে রাখত আলগোছে
এই বেরোনো এই নিঃশব্দ ছুরি চলা ধৈর্য তো আসলে আনাজপাতি
বর্ষা এলে মেলে দেবে বছর দশেক শ্বাসাঘাত
স্বর জোড়বার আগেকার বর্ণ বা লিপি
তোমার ক্যাসেটের ফিতের রঙের বিকেল এই আকারহীন ছাতে

আমি মাথা তুলি, তোমার সঙ্গেই তো সহজে কথা বলা যায়
এই যে ভারি সুর চুপ করে সান্নিধ্যযাপন কোনও বর্ষার সন্ধেবেলা
আমি তো তোমাকে ফিরিয়েই দিয়েছি
অপেক্ষা করেছি কখন তুমি ঘর থেকে বেরোবে
তুমি কি বুঝেছিলে বৃত্ত সম্পূর্ণ হয়েছে
বাতিল শব্দটার ওপর ঘষে দিয়েছিলে আব্বাসউদ্দীন আহমেদ

মনে হয় বেরিয়ে আসাই শ্রেয়
একটা করে মাংসপিণ্ড স্পর্শ করি আর
ঠিকরে আসার রাস্তাটা হারিয়ে যায়
এখানেই চোরাপথ ধর্মে যায়
তুমি বলে উঠতে হয়তো
তোমার মাথায় একটা বীজক্ষেত কাজ করত
বাড়ি ফেরার পথে একফালি কর্ষণযোগ্যতা
তারপরেই তো জট ছিল, তাই না?
তাহলে ওভাবে মাথা নাড়তে কেন?
কেন আবহাওয়ার খবর এত মন দিয়ে শুনতে?
ক্যালেন্ডারে শতক বদলানো সহজ বলো
বিশেষত যেসব বছরের পাতায় শ্বাপদের ছবি থাকে?

অথচ আমার ঘুমে শুধু একটা ভারি যন্ত্র
চিন্তাশক্তির পিছনে একটা শুকনো লাঠি
আয়নাওলা বিরাট ঘর
দূর থেকে কথা ঝাপসা একটা ভাষা
কোঁকড়ানো চুলে আঙুল খেলার প্রজাপতি

এরপর তো বইহীনতা
সপ্তাহ দিয়ে ঠেসে রাখা একটা সুড়ঙ্গ
নিজেকে ছাড়ছি অথচ ফিরে আসছি
শুকনো দৃষ্টি দিয়ে ভরা থলি হাতে—কোথাও সময় নেই কোনও
আমার ক্রমাগত বেশি কাচে ঢেকে যাওয়া
ঘড়িতে জল দেখছি
রক্তে এক ধরনের বেতের ঘুনি
খিচুড়ির হলুদে মিশে থাকছে জাগরণ গল্পমালা
আমি কি জানি না চিন্তাশীলতার পিছনে কোথায় সুর?

কিন্তু তোমার সঙ্গে কথার সময়
শুধু ময়লাটে সাদা জামায় অভ্যস্ত মুখ
ভাঙা ক্ষয় না কর্ষণ বুঝি না
দীর্ঘ একটা দুপুরস্তম্ভ এই আস্ত মাঠ
কাদা লেপটানো ফুটবলের গন্ধে তৈরি হওয়া বুঁদ একটাই দিকে যায়
তোমার দাগিয়ে পড়া কিছু বই
যা তোমায় চালাক হতে দিল না

ভূগোল তো আসলে তোমার পাখি বা খাঁচার প্রচলন
দেবব্রত বিশ্বাস চৈত্রপবন কিন্তু শব্দহীন সাদা
কিছু সমবয়সীর ঘরের কংক্রিট অথবা নিবিড়তায়
স্পন্দিত হচ্ছে অন্ধকার সুন্দরবন
সন্ধের মুখে কেউ খবর দিল বুঝি নৌকা নিয়ে কারা ফেরে নি
এই ধুলোর গাছ এই কাচের কাটা ডালপালায় নির্মিত
অসুখহীনতায় তুমি কি গ্রাম খালি করা দেখেছিলে?

কয়েকটা ঘরকে বাসস্থান বলে বুঝি রক্তের দাগ দেখে—সমসময় কী?
আমি দেখি কয়েকটা বাক্সের মধ্যে নির্মীয়মাণ ভাষা
কয়েকটা বিধেয়হীন ক্রিয়াপদ তীক্ষ্ণ মাত্রায় আটকানো
শেষ আর্তনাদ থামার পর গলিতে তখনও গুঞ্জন
একেই কি থমথমে বলে? কোথাও সেতু ভাঙে নি
তাই সুর অবিচ্ছিন্ন প্রবাহ
নিরবিচ্ছিন্ন আমাদের বিশেষণ প্রবণতা
আমার ভাষা কি সমবয়সী পুরুষটির সন্তানের দিকে চেয়ে
চোয়াল শক্ত হওয়া ধরতে পারে?

সন্ধান ছিল চৌপর্ণ এলাচপাতার দীর্ঘ বৃষ্টির জাঙাল পেরিয়ে
সদ্যগজানো বাঁশের তেড় পায়ে ছড়ে যাওয়া হাতে লাল ছোপ
তবু এক ধরনের বিশ্বাস—হাতে পায়ে মাখা দুপুর আমি তোমাকে দিতে চেয়েছি
আমি শিশু, বালক, আমি কিশোর অব্দি—বহুদিন না দেখার পর
যেভাবে প্রথম বীর্যপতনের কথা অপ্রাসঙ্গিকভাবে
তখনই তো শুরু বধিরপর্ব
শর্টওয়েভ তখন শুধুই প্রাচীর পতনের কথা বলে না
আমরা পেরিয়ে আসছিলাম লালচে প্রদেশ
আমি পেরিয়ে আসছিলাম তোমার নির্মিত চৌখুপ্পি
দারুচিনির গন্ধে ভরে ছিল সমস্ত রঙ
এলাচ রঙের বাড়ি ফেরাগুলোয় এখন আর গন্ধ নেই
শুধুমাত্র অনেক মানুষের নিশ্বাস নেবার জায়গাকেই
নিরাপদ মনে হয়, ছটফট করে উঠি নৈঃশব্দ্যের চেয়ে
কম ট্র্যাজিক কিছু পাবার জন্য
ভিডিওর নারীশরীরের চেয়ে কিছু বেশি
দাঁতে দাঁত হস্তমৈথুনের চেয়ে
           এরপর লিখব ভাষার একটা নৈশঃব্দ্য থাকা দরকার
আর এখানেই মনে হয় ব্যাকরণ আসলে একটা দরকারি সমাধিক্ষেত্র

প্রতিনিয়ত কথা আর এই অচেনা বর্ণমালা
ধাতুজনিত ক্ষয় লেগে এই যে আকারহীনতা
                                    সর্বব্যাপ্ত আচ্ছাদন
মাথার পাশেই পড়ে রয়েছে শিমুল
দরজার সামনে গজিয়ে উঠছে ঘাস তবু কেউ মাড়াচ্ছি না
একটানা দৃশ্য নির্মাণের মধ্যে একটা অনুজ্জ্বল রঙের পাড়া
অথচ আমরা শুধু ভারি জুতোয় পিষে দিচ্ছি সর্বনাম
শুধু বিশেষ্য আর বিশেষণে ভরে থাকছে বিনিময়
এটাও কি তোমার ছিল?
কোথাও কি দমকা একটা ডিসেম্বর এসেছিল
পাথুরে রাস্তার পাশে একটা সাইকেল
হারিয়ে যাচ্ছে তীব্র ইয়েলো অকারের মধ্যে
অথচ তাকে কিছুতেই ফেরানো যাচ্ছে না প্রিয় পাতার দেশে

পরিচিত গানগুলো কি আসলে সংস্কার?
কেন তাহলে পিচবোর্ডে ঢেকে যাচ্ছে শ্রবণপথ?
আর কেউ কি হাঁটবে না শিশির ও নভেমবর ক্রমাগত
স্পন্দন বলবে মিথ্যে
            পাথরের গায়ে
আমার মস্তিষ্ক
ফ্যাকাশে হাতের মাংস কাচে চাপা সাদা দুপুর!

তোমার সামনে চৈত্র ছিল দলবদ্ধ ভক্তি
বা কারুর আপনমনে সন্ন্যাস নেওয়া
                                       দুপুর একটা পর্দাঢাকা গাড়ি
গরম আটকাতে সব জানলা বন্ধ
কেউ কোথাও বালকের সামনে নিজেকে উন্মুক্ত করছে
বালক তার স্ত্রীলিঙ্গ স্পর্শ করছে
বালকমাথা তার সম্পূর্ণ দেহ দেখতে চাইছে কেন কোনও ব্যাখ্যা পাচ্ছে না
ধু ধু মার্চ মাস সুরের ভিতরে আসছে একটানা রেওয়াজ
একটা কাচের ঘর স্নানফেরত মায়ের বয়সী স্ত্রীশরীরের সামনে
ফের বালক, ফের তার বাতাসকে ভয় পাওয়ানো চোখহীন মুখোশ
এই আস্ত প্লাইউড দুপুর

পরতে পরতে ফাঁকা খেত…
শেষবারের মতো কেটে নেওয়া
মাথা তুলি
আর কোনও বড় দৃশ্য নেই
চকিত শব্দের ঘোরে পায়রা উড়ে যাওয়া নেই
পরপর কংক্রিট পড়ছে শিশিরে
পরপর ইট এই বৃষ্টির ওপর

subhro

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

জন্ম ১৫ অগাস্ট ১৯৭৮; কলকাতা। জীববিদ্যায় স্নাতক, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। স্পেনীয় ভাষায় দিপ্লোমা সুপেরিওর, ইন্সতিতুতো সেরবান্তেস।

পেশা : স্পেনীয় ভাষা শিক্ষক, ইন্সতিতুতো সেরবান্তেস নয়াদিল্লি।

প্রকাশিত বই :
জাদু পাহাড়ের গান [ভাষাবন্ধন, ২০০৫]
চিতাবাঘ শহর [কৌরব, ২০০৯]
Ciudad leopard [Olifante, 2010]
বৌদ্ধলেখমালা ও অন্যান্য শ্রমণ [কৌরব, ২০১২]
Poemas metálicos [Amargord, 2013]
কাচের সর্বনাম [কৌরব, ২০১৪]
ঋতু দ্বিপ্রহর [পদ্যচর্চা, ২০১৭]

ই-মেইল : subhropoesia@gmail.com
subhro

Latest posts by শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (see all)