হোম কবিতা পাণ্ডুলিপির কবিতা : মেহেকানন্দা কাব্য

পাণ্ডুলিপির কবিতা : মেহেকানন্দা কাব্য

পাণ্ডুলিপির কবিতা : মেহেকানন্দা কাব্য
365
0

বছর ঘুরে আবারও ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। ফের হাজির অমর একুশে গ্রন্থমেলা। প্রতিবছর এই মেলাকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত হয় কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, গবেষণাসহ বিভিন্ন ধরনের কয়েক হাজার বই। কোন বই কিনবেন আর কোনটি কিনবেন না, সেই ভাবনায় গলদ্‌ঘর্ম পাঠকরা। তাদের একটু স্বস্তি দিতে পরস্পরের বিশেষ আয়োজন ‘পাণ্ডুলিপির কবিতা’। এর মাধ্যমে পাঠকরা বইটি সম্পর্কে যেমন ধারণা পাবেন, তেমনি জানতে পারবেন লেখকের শক্তিমত্তা সম্পর্কেও।

আজ প্রকাশিত হলো কবি মুনিরা চৌধুরী’র প্রকাশিতব্য কবিতাগ্রন্থ মেহেকানন্দা কাব্য’র কয়েকটি কবিতা। পাঠের আমন্ত্রণ রইল।


 


আয়নার দাগ


আয়না হতে পিছলে পড়েছে মুখগুলো
আজ তোমার মুখের গভীরে দেখি ভেঙে-যাওয়া সেই আয়নার দাগ।

বিবর্ণ থৈ থৈ
বিধবার শাদা চোখের মতো চারদিক…
হে দিন, হে রাত্রি, হে বসন্ত, হেমন্ত মৌসুম
হে প্রজাপতির ডানা, পাখির পালক, হে বৃন্দাবনের সিঁদুর
কোথাও কোনো রঙ নেই

আমাদের মেহদীবাগান কালো কুয়াশার নিচে ঢাকা পড়ে আছে।

শুনেছি পাথরে মেহদীপাতা ঘষলে রঙের হলাহল বের হয়ে আসে
আমি আজ হৃৎপিণ্ডকে পাথর বানিয়ে নিয়েছি।


মৃত্যু, মুনিরাহেনা…


আজ এই শুক্লা দ্বাদশীর চাঁদ ফেটে গিয়ে
নীল-বর্ণ আলো ঝরছে
নরক প্রদেশে।

নরকের নয় দরজা খুলে বসে আছি আমি আর একটা অন্ধ হরিণী…

দু’চোখ ছিদ্র করে
গলিত চোখের রঙে চন্দ্রের পিঠে এঁকে দিয়েছি গাছের ছবি
এই গাছ স্বর্গের গাছ
এক একটা শিশু মৃত্যুর পর সেই গাছে একটা করে ফুল ফোটে

ওহ ঈশ্বর
সময় হলে কি তুমি দেখে যাবে
সেই গাছে অনেক অনেক ফুল ফুটেছে

তুমি কি একবারও শুঁকে যাবে না হাসনাহেনা অথবা মুনিরাহেনার গন্ধ!


নয় দরজার নদী


১.
তোমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল নয় বছর আগে
এই নয় বছরে নয়-দরজার-নদী তৈরি করেছি
তুমি কি একবার সময় করে আসবে
জলের জানালাগুলো লাগিয়ে দিয়ে যাবে!

২.
সময় পেরিয়ে যাচ্ছে ছিপছিপে এক মাতামুহুরী নদী
নদী পেরিয়ে যাচ্ছে সময়
হাতের নীলবর্ণ রেখায় এ-কার ছায়া দেখা যায়!

ছাদের উপর বৃষ্টির গুঞ্জন থামছে না কিছুতেই
তানপুরার হৃৎপিণ্ডে আঙুল ফেটে গেলে বুঝতে পারি না
এ-কান্না উচ্চাঙ্গসঙ্গীতের নাকি মাতামুহুরীর

ঘরের জানালা কিছুতেই বন্ধ হয় না
আমাদের জানালায় আটকে রয়েছে নদীর দরজা।

৩.
চাঁদের শরীর থেকে বের হচ্ছে ধূয়া ও শিশির
দুই হাজার বছর আগেকার রাত ছাই হবে দুই হাজার সতের সালে

দু’চোখের অন্ধ ছায়া উড়ে যাচ্ছে অন্ধকারে
পাখিরা নৌকা চালায় বাতাসের নদে

নিঃশ্বাস ফেটে যাচ্ছে ধীরে
গাছের
মানুষের…
ফাটা-নিঃশ্বাসে তুমি কি একবারও আত্নহত্যা করতে আসবে না!

৪.
বিষ পান করছি নাকি বিষের নিঃশ্বাস নিচ্ছি
পান করছি পরমায়ু
প্রজাপতির ডানা লাগিয়ে দিয়েছি
ধীরে চলো
ধীরে চলো
নিমাই সন্ন্যাসীর গ্রাম যে বহু দূর

ঐ দূরত্বে
নিভে যাচ্ছে অতলান্ত এক আত্মার ছায়া…

৫.
কে যেন আমার কন্ঠস্বর থেকে
নিদ্রাতুর কিছু শব্দ লুণ্ঠন করে নিয়ে যায় নিধুয়া পাথারে
অতঃপর কাচের করাত দিয়ে শব্দগুলো কুচি কুচি করে ভাসিয়ে দেয়
আড়িয়াল খাঁ’র বুকে

ভাসে গলাকাটা নদী
ভাসে নারী
ভাসে গলাকাটা নক্ষত্র

শকুনের ডানায় চিৎকার ভাসে জল ও স্থলভূমে…
মৃত্যুর গন্ধ চৌদিকে

দূরে যাই
দূরে যাই
পৃথিবীর কোনো এক রান্নাঘরে আলু-পটল কাটতে ভুলে যাই
আমি আমাকে কেটে ফেলতে ভুল করি না
ওহ পাখি, পরমাত্মা…

 

 

 

 

 

 

 

 

মুনিরা চৌধুরী

জন্ম ৬ জানুয়ারি, ১৯৭৬, গ্লৌচেস্টারশায়ার, ইউ কে।

শিক্ষা : গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে স্নাতকোত্তর। কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যেও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন।

পেশা : বাংলা একাডেমি ইউ কে’র পরিচালক। পাশাপাশি কাজ করছেন এনএইচএস-এর সঙ্গে।

ই-মেইল : Banglaacademycardiff@gmail.com

Latest posts by মুনিরা চৌধুরী (see all)