হোম কবিতা পাণ্ডুলিপির কবিতা : মাতাল আত্মপাঠ

পাণ্ডুলিপির কবিতা : মাতাল আত্মপাঠ

পাণ্ডুলিপির কবিতা : মাতাল আত্মপাঠ
341
0

সুদীপ্ত সাইদ খান। প্রকাশের কালখণ্ড বিবেচনায় বাংলাদেশের দ্বিতীয় দশকের কবি। প্রতিনিয়ত লিখছেন, ভাঙছেন, গড়ছেন। এই কাব্যিক যাপনের মলাটবন্দী নিবেদন মাতাল আত্মপাঠ প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। সেই পাণ্ডুলিপি থেকে কিছু কবিতা ‘পরস্পর’ পাঠকদের জন্য তুলে দেয়া হলো। সেই সঙ্গে সুদীপ্তকে অভিনন্দন। স্বাগতম হে কবি, কবিতার নবতর মহাসড়কে…


বৃত্তপাঠ


ঘোরগ্রস্ত স্বপ্নের ভেতর হেঁটে যাওয়া আমিই কি তবে সেই বিকেল; যার দীর্ঘশ্বাস থেকে বেরিয়ে আসে অসংখ্য ভোর, মধ্যাহ্ন, মধুপূর্ণিমা! আর চেতন-অবচেতনের মধ্যবিন্দুতে বসে তাস খেলে জ্যামিতিক বৃত্ত।

বৃত্ত মানেই—
        গোল
            গোলাকার
                    গোল্লাছুট
                            দুনিয়া…
শূন্যও বটে।

আর কে না জানে, গোল্লাছুট খেলায় দুই প্রান্তের দুটি বৃহৎ শূন্যই আমাদের একমাত্র আশ্রয়স্থল এবং শূন্য থেকেই ছড়িয়ে পড়ি সমস্ত খেলোয়াড়। ক্ষয়িষ্ণু জীবনের খেলাঘরে খেলতে খেলতে শূন্যের ধাঁধায় সময় ফুরিয়ে গেলে আমাদের মনে পড়ে অঙ্ক স্যারের প্রিয় বাঁশবেত। অতঃপর অবোধ রাতের পাঠশালায় আমি এক অবুঝ বালক—জীবনের কেমিস্ট্রি পরীক্ষায় পদ্যের পর পদ্য লিখতে গিয়ে এঁকে চলেছি ত্রিকালদর্শী ত্রিভুজ।


একটি বোধের নিছক ছক


নিস্তব্ধতা ভেঙে শব্দ বানাই। শব্দটি কুত-কুত-কু-উ-ধা। একটি খেলার বুলি—খেলাটি জীবন।

কুত-কুত-কুত-কুত শব্দে ছক কাটা একটার পর একটা ঘর পাড়ি দিয়ে কু-উ-ধা’তে এসে বৃত্তকে ছুঁয়ে দিলেই পূর্ণ হয় ষোলকলা। তবে খেলার নিয়ম অনুযায়ী দম বন্ধ হয়ে গেলে বহু আগেই বেজে উঠতে পারে রেফারির সমাপ্তি বাঁশি।

শৈশবে নিছক আনন্দ ছাড়া খেলাটি আমাকে আর কিছুই দিতে পারে নি—অথচ শৈশবের এ খেলাটিই যেন প্রশ্নবিদ্ধ পাথর; গেঁথে আছে বুকের বাম অলিন্দে।


কোনো ট্রেনেই আমার জন্য সিট খালি নেই


দিগন্ত স্টেশন; বিকেলের হৈ-হুল্লোড়।

প্রান্তরের পর প্রান্তর পাড়ি দিয়ে আন্তঃনগর গোধূলি ট্রেনটি থামতেই—গুটি গুটি পায়ে নেমে এলো রাত।

প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চিতে বসে আমরা আড্ডা দিলাম একপক্ষ সময়। মসজিদ থেকে ফজর আলি মুয়াজ্জিনের কণ্ঠ ভেসে আসতেই উঠে গেল বন্ধুটি। বন্ধুটি উঠা মাত্রই দুজনের মধ্যে আঁকা হয়ে গেল অনন্ত সময়ের ব্যবধান রেখা। অচেনা বন্ধুটির বিরহ শেষ হতে না হতেই পক্ষীরাজের মতো হুইসেল দিতে দিতে থেমে গেল আন্তঃনগর ভোর—

ট্রেন থেকে নেমে এল হাস্যোজ্জ্বল সকাল।

আমাকে সুপ্রভাত জানিয়ে দ্রুত পায়ে হেঁটে হেঁটে চলে গেলেন দুপুরপুরের দিকে। আর আমি কোনো ট্রেনের টিকিট না পেয়ে অগত্যা দেখে যাচ্ছি দিন ও রাতের যাওয়া-আসা।


শিরোনামহীন


হ্যাঁ, একদিন স্বপ্নরাতে কালবৈশাখীর মেঘগুলো জোছনা হয়ে ঝরে পড়েছিল আমাদের এক চিলতে উঠোনের মাঝ-বরাবর। আমরা মরগাঙ্গীর বিলে শাপলা কুড়ানোর মতো ডুব দিয়ে দিয়ে কুড়িয়েছিলাম উঠোনের এক মুঠো ধুলো। অঝোর শ্রাবণের রাতে যেদিন প্রতিবেশী বুড়ো মানুষটি আমার কাছে শেষবারের মতো একফালি কাঁচা আম খেতে না পেয়ে অভিমানে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে তারাদের দেশে। সেদিনও আমরা চাঁদ দেখার ছল করে দেখেছিলাম পড়শিবাড়ির তরুণী নীলাঞ্জনাকে।

নীলাঞ্জনা এবং আমি ভাবনার অতলে যখন দেহ-মনে সমর্পিত, ঠিক তখনই পেয়ে যাই মৃত্যুসংবাদটি। মৃত্যুসংবাদটি কি আমার! নীলাঞ্জনার! না ঐ বুড়ো মানুষটির?

কাল ভোরে চ্যানেল, অনলাইন অথবা পত্রিকাগুলো কি প্রচার করবে সঠিক সংবাদ?


মাতাল আত্মপাঠ


পাঠ করো তোমার নামে প্রকৃতি পুস্তক

পাঠশেষে ঘুম যাও—পাঠ করো স্বপ্নান্ধ হৃদয়।

অতঃপর পাঠকেও পাঠ করো। আরেকটি পাঠ। পাঠের ভেতর পাঠ। সমস্ত পাঠ শেষে হয়ে যাও ঈশ্বর। বলো আ’নাল হক।

এবার শব্দ শরাব খেয়ে হও মাতাল। শব্দে শব্দে পাঠ করো আত্মার অতল। সমস্ত পাঠ শেষে আত্মস্থ হও আত্মার ভেতর—

আত্মা সেই বাষ্পীয় ট্রেন; ক্লেদাক্ত ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে তোমাকে বহন করে চলেছে পরিশুদ্ধির জংশনে।

পরিশুদ্ধ—একটি আপেক্ষিক শব্দ মাত্র।


অবিশ্বস্ত প্রেমিকা


শূন্যতায় হেসে ওঠো অবিশ্বস্ত প্রেমিকা। জীবনের ভোরগুলো মধ্যরাত হয়ে ঝরে যায় তোমার ঠোঁটের কোণে। আমি অবোধ বালক— তোমার চোখে একটি রঙিন প্রজাপতি খুঁজতে গিয়ে হারিয়ে ফেলেছি ভবিষ্যৎ।


আশ্রয়


বিপন্ন বিশ্বাসের অনন্ত অন্ধকার থেকে ফিরে আসি অদ্ভুত আলোকবেলায়!… আলো! বালিয়াড়ির মরীচিকা খেলায় সেই তো একমাত্র সম্বল। তবু, একফালি আলোর উৎসমুখ দেখতে নগরীর ইঁদুর গর্ত থেকে বেরিয়ে যাই উদোম গায়ে। অদ্ভুত জোছনালোকে বাতাসে ভাসে মাইল মাইল পতিত জমির পাশে ঘিঞ্জি গ্রামের দীর্ঘশ্বাস। আমি ফিরে আসি চিরচেনা নদী ও নারীর কাছে—

নারী!

সে তো ভুলে গেছে ঝিনাইজলের শেষ ডুব সাতার।

আর নদী…

তবু হাঁটি,
            হাঁটতে থাকি
                            হাঁটতে     
                                    হাঁটতে
হাঁটতে

শহরের বিলবোর্ড চোখে ভাসে

আলো আসবেই…?

সুদীপ্ত সাইদ খান

জন্ম ১০ অক্টোবর। ফুলকোচা, মেলান্দহ, জামালপুর।

কবি।

পেশা : সাংবাদিকতা।

বিএ অনার্স, বাংলা, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা।

sudiptosaid@gmail.com

Latest posts by সুদীপ্ত সাইদ খান (see all)