হোম কবিতা পাণ্ডুলিপির কবিতা : ভালোবেসে লেখা পদ্য

পাণ্ডুলিপির কবিতা : ভালোবেসে লেখা পদ্য

পাণ্ডুলিপির কবিতা : ভালোবেসে লেখা পদ্য
408
0

ভালোবাসার অধিক ভালোবেসে লেখা…

যে অনুভব বিষ ! অথবা অমৃতবোধের পাতা ও পাতালযাত্রায় জলের উপর কবিতার বুদবুদ হবে। ঠিক সেই পরিমান অনুভবের ব্যথা অথবা আনন্দের চারটি দূরবর্তী অক্ষর নিকটে এসে স্বর্গীয় মিথস্ক্রিয়ায় কম্পোজিত শব্দের নামই ভালোবাসা।

ভালোবাসা সবসময়ই কবিতা। কেউ কেউ লেখে, কারণ সে নিয়তই কবি হয়ে উঠতে চায়। যে লেখে না, লিখতে পারে না। কিন্তু সে অনুভবের পিছনে বন্ধ দুয়ারের কড়া নাড়া শব্দ হয়ে থাকে। এবং যারা লেখে তাদের শব্দ ছুঁয়ে উত্তাপ নেয়। অসম্ভব ঘোরের মধ্যে স্বপ্ন ওড়ায়। হৃদয় গুমরে ওঠায়। একা হতে হতে শব্দহীন কাঁদে।

তাই, ভালোবাসা নয়, কিন্তু ভালোবেসে লেখা পদ্য বললেই… এতে যে ব্যক্তিগত অনুষঙ্গ নিমজ্জিত থাকে, তার শিল্পরূপ কতটা পার্থক্য হয়ে রচিত হলে, পাঠক তার পাঠক্রিয়ায় আঙুলের ছাপের মতোই বায়োলজিক্যাল আইডেন্টিটি অথবা জেনার টের পাবেন। এবং লেখাগুলো তখন প্যাটার্ন হয়ে দাঁড়িয়ে পড়বে, বাতাসে ভেসে বেড়ানো তুলোবীজের মতো নতুন টানের লোভে।

তাই, ভালোবাসা সর্বত্রই অরক্ষিত সুন্দর মুক্ত ও স্বাধীন—এই দুর্গের সুরক্ষা সে নিজেই। তবুও, অনেকে দ্বাররক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে আরও অনেক দ্বাররক্ষীদের হৃদয়ে ভালোবাসা রোপণ করবে বলে। হয়তো রাহু একটু একটু করে সেই ভালোবাসাকে নামতার বোল শেখালে, এই পদ্যগুলো দুর্গরক্ষীদের বিপরীতে সশস্ত্র হবে—ভ্যানিশিং ক্রিমের মতো…।

– হেনরী স্বপন

০১.

গোধূলি মেঘ, বিকেল জুড়ে আছে
আঁচল পেতে আকাশ ছিল কাছে।

মেঘ করেছে, মেঘের কালো মেয়ে
রাজার ঘোড়া আসবে ছুটে ধেয়ে।

সোনার কাঠি ছোঁয়ায় যদি মন
উঠুক কেঁপে ঢেউয়ের আলিঙ্গন।

 

০২.

বরখাস্ত কবি, চাকরিতে ছিল না তার মন
অধ্যাপক মানুষ কেন, লিখল নারীর স্তন!

চল্লিশ সাইজের ব্রা’গুলো কি, ছিল না তখন?

 

০৩.

খাতায় ভরা লেখা আর ছিল না তার আঁতলামি
গো-বেচারা সাত্ত্বিক কবি ছিলেন, লাবণ্যের স্বামী।

কে বলছে, কোন পাতালপুরীর রাজকন্যে
অভিসারে আসবে কেবল সেই কবির জন্যে…।

 

০৪.

অন্ধকারে লুকাও যদি শরীর ভরা গন্ধ
কামিজ রঙের চাঁদ কেন জ্বলজ্বলে
টের পাই যেন বুকের নদী টলমলে

শরীর জ্বরে কেঁপে ওঠা—কবিতার ছন্দ।

 

০৫.

হ্রদের কাছে মাছের লোভে সারস হয়ে এলে
ঘড়ির কাঁটা গলায় বেঁধে, সময় খুঁজতে গেলে।

হাত-ঘড়িটার সঙ্গে এত খোলামেলা ছুটে চলা
চ্ছলাচ্ছল নদীর সঙ্গে, বললে কথা বাড়িয়ে গলা।

 

০৬.

ঝুমকা জবায় ফুল ফুটলে সেই
ছবিটা আঁকি।
খাঁচায় পাখি একলা তখন করছে
ডাকাডাকি।
ক্যানভাসে প্রাণ ছড়িয়ে দেয়া রঙের
মাখামাখি।

 

০৭.

হাত বাড়ালেই শরীর ছোঁয়া যায়
সন্ধ্যাতারা পাশের বারান্দায় ;

দুলছে দুলুক, আঁধার খুলুক একা
শুয়ে থাকা,—রকিং চেয়ারটায়…।

 

০৮.

খিদায় ফুটছে মনের মধ্যে প্রেমের গরম জল
ঘুমের ভেতর স্বপ্ন দেখি, মেয়েটা চঞ্চল।

চোখ মেলে সেই ঘুম খুঁজি, চোখের কাছেও নাই
পালিয়ে বেড়াও ঘুমের রাজ্যে, কোথায় খুঁজলে পাই।

হঠাৎ দেখি, বিকিয়ে দিচ্ছ বেশ্যা শরীরটাই।

 

০৯.

হাত বাড়িয়ে ধরতে পারি চঞ্চু শরীর বরফ
আগুন হলো কাঠের গায়ে আলিঙ্গনে সরব

উষ্ণ শরীর বুঝতে পারি,… মরুভূমির আরব।

 

১০.

উড়াইলে পুচ্ছ, দোলায় সাদা কাশ
পেখম মেললে মুগ্ধ শরৎ আকাশ,

আঁকার ছলে—রঙিন করলে সর্বনাশ…!

 

১১.

ফুলের গন্ধ, চুলের খোঁপায় সাজ
মনের মধ্যে হারিয়ে যাবে আজ

হাওয়া যদি প্রশ্ন করে…
হারিয়ে যাবে অহংকারে

ডিগবাজি দেয় উড়াল গিরিবাজ।

 

১২.

সন্ধ্যে নামলে, জ্যান্ত পুতুল কিনতে যাব—
চকেরপোল…।
গরদা ভেবেই, কিনব তোকে, ওজন কত—
পালায় তোল…।
ওজন বুঝেই, খদ্দের হব, হাটখোলা তাই—
হচ্ছে-হরিবোল…।

 

১৩.

একটুতে হও, মন খারাপের পাতাবাহার…
পুষতে পারো…বুকের মধ্যে রাগের পাহাড়।

গঙ্গা সাগর বয়ে চলার উত্তেজনা যত…
লুকিয়ে দেখা যায় না, মনের গভীর ক্ষত।

 

১৪.

শরীর চুঁইয়ে জল পড়ছে ঝরনা অনর্গল
গহিন বনের অন্ধকারে জ্বলছে দাবানল

সেই তরঙ্গে অঙ্গ ভাসে নগ্ন ছলাৎচ্ছল।

 

১৫.

একটা লেখা লিখতে গিয়ে এমন
আকুলতা
ফ্রাইপ্যানে তেল, পাঁচ-ফোড়নে পুড়ছি
গভীরতা

বুকের ভিতর বইছে নদী তীব্র খরস্রোতা।

 

১৬.

কাশের বনে কেউ ছিল না
শুভ্র রঙের হাওয়া।
সন্ধ্যা নদীর ঢেউ ছিল না
শরীর কাছে পাওয়া।
শরৎ আকাশ নীল ছিল না
বৃথাই ছুটে যাওয়া।

 

১৭.

উলের জামায় ঘেমেছিলে, শিরীষ তেলের বার্নিশ ;
তলপেটে মেদ জমিয়েছিলে, ঝুল বারান্দায় কার্নিশ।

শীতের ভয়ে মুখের ক্রিম, বুলাও যখন ঠোঁটে ;
উঞ্চ শরীর লেপের তলায়, ঘোড়ার ডিম ফোটে।

শিশির ঝরা শীতের অজুহাতে, তন্দ্রা জেগে ওঠে।

 

১৮.

এমন স্বাদে জড়িয়ে নিলে ম্যাগির
গরম স্যুপে…
রান্নাঘরের ধোঁয়ায় নেচে উঠলে
রঙিন রূপে…
রঙিন নাইটি জড়িয়েছিলে বুকে—
পুড়ে যাচ্ছি ধূপে…।

Henry Sawpon

হেনরী স্বপন

জন্ম ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৫; নতুনবাজার, বরিশাল।

প্রকাশিত বই :
কীর্তনখোলা [জীবনানন্দ, ১৯৯৪]
মাটির বুকেও রৌদ্রজ্বলে [জীবনানন্দ, ১৯৯৪]
বাল্যকাল ও মোমের শরীরে আগুন [জীবনানন্দ, ১৯৯৮]
প্রকাশনী, বরিশাল থেকে প্রকাশিত।
জংধরা ধুলি [শ্রাবণ, ২০০১]
কাস্তে শানানো মোজার্ট [শ্রাবণ, ২০০৪]
ঘটনার পোড়ামাংস [শ্রাবণ, ২০০৯]
হননের আয়ু [কথা প্রকাশ, ২০১১]
উড়াইলা গোপন পরশে [শ্রাবণ, ১৪১৮]
ভাষাপ্রকাশ নির্বাচিত শ্রেষ্ঠ কবিতা [ভাষাপ্রকাশ, ২০১৫]

সম্পাদনা : জীবনানন্দ [ছোটকাগজ]

ই-মেইল : henrysawpon22@gmail.com
Henry Sawpon