হোম কবিতা পাণ্ডুলিপির কবিতা : ব্রায়ান অ্যাডাম্‌স ও মারমেইড বিষ্যুদবার

পাণ্ডুলিপির কবিতা : ব্রায়ান অ্যাডাম্‌স ও মারমেইড বিষ্যুদবার

পাণ্ডুলিপির কবিতা : ব্রায়ান অ্যাডাম্‌স ও মারমেইড বিষ্যুদবার
576
0

বছর ঘুরে আবারও ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি। ফের হাজির অমর একুশে গ্রন্থমেলা। প্রতিবছর এই মেলাকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত হয় কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, গবেষণাসহ বিভিন্ন ধরনের কয়েক হাজার বই। কোন বই কিনবেন আর কোনটি কিনবেন না, সেই ভাবনায় গলদ্‌ঘর্ম পাঠকরা। তাদের একটু স্বস্তি দিতে পরস্পরের বিশেষ আয়োজন ‘পাণ্ডুলিপির কবিতা’। এর মাধ্যমে পাঠকরা বইটি সম্পর্কে যেমন ধারণা পাবেন, তেমনি জানতে পারবেন লেখকের শক্তিমত্তা সম্পর্কেও।

আজ প্রকাশিত হলো কবি হাসনাত শোয়েবের কাব্যগ্রন্থ ব্রায়ান অ্যাডাম্স ও মারমেইড বিষ্যুদবার-এর  কয়েকটি কবিতা। বইটির প্রকাশক জেব্রাক্রসিং।


শীতকালীন দস্তানা


কেউ কি আছে জুতার ফিতে বেঁধে দেবে? আমার হাত থেকে খসে পড়েছে ব্যাগ এবং শীতকালীন দস্তানা। জুয়ার আসরে কেউ কেউ বাজি রাখে পিতামহের সম্ভ্রম, বোর্ডিং ইশকুলের ক্লান্ত রাত, প্রেমিকার পুরনো চুম্বন।
—আমি কেবল জুতার ফিতেটাই বেঁধে উঠতে পারি নি।
তবুও মানুষ বিকেল হলে ইশকুলের দিকে ফিরে আসে। ইশকুলের ছাদ থেকেই দেখা মেলে জোয়ান বায়েজের বাদামি বারান্দা। এভাবেই তুমি খুঁজে পাবা তোমার নিজস্ব সিম্ফোনি। একটা মানুষ সিঁড়ি লাগিয়ে ক্রমশ আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে।
তোমার বুকে চাষ হতে পারে ধানক্ষেত। এরকম একটা দৃশ্যে ছাতা এবং বৃষ্টির প্রয়োজন আবশ্যক। একটি মানুষ ছাতা মেলে বৃষ্টির হাত থেকে ধানক্ষেত এবং তোমার বুক বাঁচানোর চেষ্টা করছে। পৃথিবী তার অনাবাদী জমি নিয়ে ঝুম বৃষ্টিতে একা হয়ে যাচ্ছে।


গভীর গোপন অসুখ


সারি সারি লাল মোরগ আমার দিকে ছুটে আসছে। যাদের চিবুক জুড়ে বিষণ্নতা। মোরগের চিবুকে হাত রাখলে মানুষের পাকস্থলীর ওজন সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যাবে। সেইসাথে বিষণ্নতারও। পোষা মোরগের চিবুকে হাত রেখে বাবা একদিন বলেছিল
—যিশু মোরগ ভালোবাসত। কারণ তার আছে সংখ্যা সম্পর্কিত যাবতীয় ধারণা। তারা বরাবর ফুরিয়ে যায় এক, দুই করে।
—আচ্ছা বাবা, পাখিদের মধ্যে মোরগ সবচেয়ে কাছে থাকে মানুষের, কেন?
—সে পাকস্থলীর বেদনা বুঝতে পেরেছিল।
—তবে ছুরির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে মানুষ কতটুকু জানে?
—ঠিক ততটুকু, যতটুকু মানুষ মাংসের ক্ষেত্রফল আঁকতে পেরেছিল।
—কনকের মাংসে মৃত্যুর দাগ ছিল সেটা তুমি বুঝতে পারো নি কেন?
—দ্বিপ্রহরের যেকোনো মৃত্যু গণনা অযোগ্য। এমনকি যিশুর সেই প্রিয় মোরগেরও।


স্করপিও বালিকারা


দ্রুত ভাঁজ করে নাও তলোয়ার। চলে যেতে হবে রেইন ট্রি অথবা বৃষ্টির লনে। মধুফুল থেকে শুষে নিতে পারো যাবতীয় সংকট। দ্রুত ভাঁজ করে নেব তলোয়ার। চলে যাব স্করপিও শূন্যতার ভিতর। মধুফুলে একা একা অন্তরঙ্গ সবগুলো বিকেল।
—বরফের একান্ত কোনো উষ্ণতা নেই। তারা কেবলই বিচ্ছিন্নতার দিকে পাশ ফিরে শুয়ে থাকে।
—স্করপিও বালিকারা স্বপ্ন দেখে হ্যামলেট-জীবন অথবা ষোড়শ বেনিডিক্টের ছদ্মবেশী বারোটি তলোয়ার।
—একটা রেলগাড়ি প্রতিদিন পার করে যাচ্ছে জরায়ু মধ্যস্থ বিকেল।
—মধুফুল, বরফের ভিতর রেখে দিও গোপন সব চুলের রহস্য।


কী বিষাদ! কী বিষাদ!


সহজ আত্মহত্যার দিন আর ফিরবে না। চুলের ভাঁজে ভাঁজে জড়িয়ে গেছে তোমার পুরুষের আঙুল। আমরা ক্রমশ ভুলছি মেরুন রঙের পোস্টম্যান। ‘কী বিষাদ! কী বিষাদ!’ বলে চিৎকার করছে একদল পাহাড়ি যুবক। কনক এসবের পায়ে পায়ে রেখে আসে বব মার্লেও সোলো কনসার্ট।

—এইসব মৃত্যুদিনের গান, তার পাশে দৈত্যাকার বেইজিস্ট।

—তবুও কোথাও কোথাও আফিম বাগানে হাই তুলছে ক্লান্ত অডিয়েন্স।

—দেখো, ড্রামস্টিকের তালে তালে চলছে হেডব্যাঙিং, তার সাথে মিশে যাচ্ছে অলিভের গাঢ় ছায়া।

—যারা এখনো ধুতুরা থেকে বিষ আলাদা করতে শেখে নি?

—প্রতিটি ভোরের জন্য রয়েছে আত্মহত্যার আলাদা আলাদা নিয়মাবলী।

—তবে আরেকটু অপেক্ষা, এরপর ডানা মেলবে বিষাক্ত কনসার্ট।


কনক কিংবা ধূসর জীবনানন্দ


আমরা পাপের দিকে ভাগ হয়ে বসি। প্রতিটি উপদলে দুজন মানুষ এবং একটি অযৌন তরমুজ ফল। ওইসব দিনে আঙুলের ডগায় পাখিদের হাড় লিখে রাখতাম। কনক তার স্তনের বোঁটায় ছিপ গাঁথতে গাঁথতে বলত :

—এই বরষায় আমরা মাছ এবং মৈথুনের পার্থক্য ঘুচিয়ে দেবো।

আবার সন্ধ্যার দিকে শুয়োরের আনাগোনা বেড়ে যাবে। ওভারকোটে লেগে থাকবে রক্তাক্ত তরমুজের দাগ।

কনক আর ধূসর জীবনানন্দের খোঁজে আরও একটা অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি পুড়িয়ে ফেলব। ধূসর ছাইটুকু ওভারকোটে রেখে অপেক্ষমাণ মোটরগাড়িতে উঠে বসব।


মটরশুঁটি জীবন ও অন্ধ শুঁড়িখানা


সেখানে মেরুন রঙের পাহড়ের সাথে ঘুমিয়ে পড়েছিল কিছু বুনো শুয়োর। পাশেই আমাদের যৌনতার ভিতর খেলা করছিল মটরশুঁটি জীবন ও অন্ধ শুঁড়িখানা। কনক শুঁড়িখানার গ্রাহকদের চোখে মৌ চাষ করত আর একা একা বলত :
—বসন্ত উড়ে গেলে মটরদানাও ফুরিয়ে যায়।
আমরা হাসতাম অথবা হাসার ভান করতাম। বুনো শুয়োরের পিঠে মটরদানার দাগ দেখে বিষণ্ন কোনো নক্ষত্রের দৃশ্য কল্পনা করে নিতাম। কখনো আবার সান্ধ্যকালীন মটরশুঁটি পকেটে নিয়ে শুঁড়িখানায় এসে বসত ক্লান্ত যিশু। অতঃপর আমি, কনক এবং যিশুর হলি ট্রিনিটি। যিশু বলতেন :
—আঙুর ফলের দিন শেষ হয়ে এসেছে। এবার আমাদের ফিরতে হবে।
শুনে মন খারাপ হতো খুব। আমরা শেষবারের মতো মেরুন পাহাড়ের কাছে চলে যেতাম। দু জোড়া জুতা রেখে আসতাম বুনো শুয়োরের মাথার কাছে। আঙুর ফলের দিন শেষে শুয়োরেরা জুতা পরতে ভালোবাসে।

হাসনাত শোয়েব

জন্ম ৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৮৮। স্নাতকোত্তর (দর্শন), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই :
সূর্যাস্তগামী মাছ [কবিতা, মেঘনাদ প্রকাশনী, ২০১৫]
ব্রায়ান এডামস ও মারমেইড বিষ্যুদবার [কবিতা, জেব্রাক্রসিং, ২০১৭]

ই-মেইল : soyeb69@yahoo.com