হোম কবিতা পাণ্ডুলিপির কবিতা : বৃষ্টি ও বরফের গাঙচিল

পাণ্ডুলিপির কবিতা : বৃষ্টি ও বরফের গাঙচিল

পাণ্ডুলিপির কবিতা : বৃষ্টি ও বরফের গাঙচিল
175
0

বৃষ্টি ও বরফের গাঙচিল অনিন্দ্য আকাশের প্রথম কাব্যগ্রন্থ। ‘১৮-এর বইমেলায় বইটি প্রকাশ করছে মনদুয়ার। প্রচ্ছদ এঁকেছেন ধ্রুব এষ। স্টল নং- ৫৯৬-৫৯৭ (সংহতি প্রকাশনী)। পরস্পরের পাঠকদের জন্য পাণ্ডুলিপি থেকে তুলে আনা হলো কয়েকটি কবিতা…


 

নভেম্বরের বৃষ্টি

একটি নির্দিষ্ট দিনে আমরা মিলিত হব আর পৃথিবীর সব উপত্যকা থেকে পাখিরা উড়ে আসবে যাতে পরবর্তী বর্ষায় আমরা আমাদের জাতীয় সংগীত নতুন করে গাইতে পারি। একথা যেহেতু পাখিরাই জেনেছিল আর নভেম্বরে পৃথিবীর যে প্রান্তেই বৃষ্টি নামবে আমরা সেখানে নতুন কোরাস রচনা করব। যুবকেরা বুঝেছিল সকল ভ্রমণের পর আমাদের অন্ধ হতে ভালো লাগে, আর নিক্তির মাপে বেড়ে ওঠা যুবতীরা বখাটেদের শেষ ইচ্ছে নিয়ে আলোচনা করে। জিজ্ঞাসার শুরু সেখানেই—আর এভাবেই নদীর বয়স ক্রমশ কমে। আর নভেম্বরে যুবক-যুবতীরা বৃষ্টি নামিয়েছিল যতবার, ততবারই তারা নগ্ন শরীর নিয়ে হারিয়েছিল পাহাড়ের অদূরে হঠাৎ জেগে ওঠা শৈবাল-খালে। আর কেউ না জানুক পাখিরাই তো জানে বনের ভেতর মানুষ নগ্ন হতে ভালোবাসে।


নীলসিঁদুরপুর

ভোরে ঘুমাতে যাওয়া নাবিকদের সাথে দেখা হয়
আর দুপুরের গরম মানচিত্রের সাথে
আমরা একটু একটু করে বড় হই।
জাহাজের চিৎকার এখনো আমাদের বাড়িতে মেহমান আনে
আর আমরা শৈশব ভুলে দৌড়ে যাই কুমার নদীর কাছে।
আমাদের শৈশবের কান্না এখনো লুকিয়ে রেখেছে বহতা নদী।
সবজি ক্ষেতে যারা নৌকা নিয়ে হারিয়ে যেত
বিপুল বন্যার দিনে তাদের নামে এখনো শাপলা ফুল ফোটে
কোনো এক পশ্চিমা বিলে।
জেনেছি বিকেলের রোদ মাঝে মাঝে বান ডেকে আনে
অন্যথায় উড়ে যায় মেঘ চলন্ত বকের সুষম শরীর ছুঁয়ে—
আর এভাবেই গ্রাম হয়।
আমরা সবাই জন্মের পর একটা গ্রামের দিকে হেঁটে যাই
সেখানে পথ থাকে, পথিক থাকে, বটবৃক্ষ থাকে
আর গ্রামের নাম হয় ‘নীলসিঁদুরপুর’।


মাতালের জন্ম

খুব বেশি মাতাল হতে নেই, বলেছিল শীর্ষ বন্ধুরা।
সেই থেকে নজরানার অজুহাতে গেয়ে চলেছি শ্যামাসংগীত
কতটা নাটাই ঘোরালে ঘুড়ি ওড়ানো যায় বলে নি ভূগোল-শিক্ষক
এখনো পথ অচেনা, স্বরবিন্দু শাস্ত্রের নামে
সুর তুলি বিহ্বল পাড়ায়।
শুনেছি বটবৃক্ষের পাশে একটি সংসার সকালের রোদ
মেখে শুরু করে ভুল ভ্রমণ আর প্রিয় জমির
আইলের ধার দিয়ে চলে যায় বিলের জলে
খামাখা জীবন।
শেষ কবে বৃক্ষ ছিলাম ভুলে গেছি।
এখনও লতার গন্ধে পাখির চঞ্চলতায় বৃষ্টি নামে,
আহা, বুঝি বৃক্ষের সংসার!
বৃক্ষপাড়ায় বর্ষা হলে ঋতুবতী হয়ে ওঠে
পাড়ার মেয়েরা, আর এভাবেই মাতালের জন্ম
কোনো এক রমণীর ডাক নামের ছলে।


জুয়ার টেবিল ও একটা মানুষ

প্রতিবেশীর ছাদে জ্যোৎস্না দেখা শেষে আমরা একটা জুয়ার আসরে মিলিত হই, যার পথ মিশেছে অগোছালো সমুদ্রের সাথে।

যেহেতু জুয়ার টেবিলে কেউ বন্ধু হয় না, তাই আমরা একটা অপরিচিতি সম্পর্ক গড়ে তুলি, যার সম্মুখে সবাই জয়ী হতে চাই।

প্রতিদিন ইশকুলের স্যারের সাথে দেখা হয়, যিনি আমাদের জীববিজ্ঞান পড়াতেন, সমুদ্র দেখার ছলে জুয়ার টেবিলে আসেন আর দিন শেষে বাড়ি ফেরার পথ হারিয়ে ফেলেন। তার আর কখনো সমুদ্র দেখা হয় না।

জুয়ার টেবিল আর সমুদ্রের মাঝখানে একটা মানুষ নিঃস্ব হতে থাকে, যার আর কখনো ঘরে ফেরা হয় না।


জ্যামিতি না হওয়া দুঃখ

জলে পুড়িয়েছি সকল ধ্বংসের আহত যন্ত্রণা। তাই আগুনের উৎসবে আজ বড় বেমানান হয়ে ফোস্‌কা ফুটাই। নিজের ক্ষুধাবিহিত রতি যন্ত্রণায় ধুলিস্রোতের যে আঁচ নিমজ্জমান ডানা ভেঙে যায় তার পাখি শাসকে। রাতের নিমগ্ন পাহারায় যত না নামতা সংখ্যার কোলাহল তারও বেশি জ্যামিতি না-হওয়া দুঃখ। আমি দুমড়ে-মুচড়ে বেড়ে ওঠা এক স্কেচ যার ফ্ল্যাপে কখনো ছিল না শিল্প হওয়ার ভয়ঙ্কর তাড়না। অথচ আলোস্পর্শে হয়ে যেতাম কার্বনের ছাই। জলের স্পর্শে পুড়িয়েছি পাপ, তাই আগুনে মেলে না কোনো গর্ভপাত।


বৃষ্টি ও পিঁপড়ের শহর

গ্রামের হাটবার শেষ হলেই আমরা পিঁপড়েদের রাজধানীতে যাই আর প্রতি সোমবার একজন আদর্শ স্কুল শিক্ষকের কাছে বরফের বিরহ শুনি। পিঁপড়েদের প্রার্থনা শুরু হয় জুয়ার টেবিলে। যে যত লাভবান সে তত স্রষ্টা।

প্রভু নিমগ্ন হয়ে যাই বরফের ছলে।
আর তাতেই বৃষ্টিবন্ধ্যা হয়। পিঁপড়ের শহরে লাঙলের জন্ম কোনো এক বরফের বিকেলে। এভাবেই কৃষকের শুরু কোনো এক পিঁপড়েশহর থেকে, যেখানে মাটি দেখিয়েছিল প্রথম সঙ্গমসুখ। সে কথা ভুলে গেছে পিতারা।

পিঁপড়েরা হারিয়ে যায় বর্ষায়
বৃষ্টি তাদের জন্মধস ঘটায়।


সন্ধ্যার বন্ধুরা

নীল রঙের বন্ধুরা যারা কখনো সার্কাস দেখে নি, সাঁতার শিখবে বলে তারা ভ্রমণে বের হয়েছিল, আর যারা বৃষ্টিতে ভিজে মাতাল হয়েছিল তাদের পূর্বপুরুষ রাখাল ছিল। এ কথা জানা সত্ত্বেও কিছু নদীর ঢেউ আজও বহে আদিম পিতার স্নিগ্ধ আঙিনায়। যারা ঘরে ফিরবে না বলে শপথ নিয়েছিল পশ্চিম আকাশে তারা আজ নক্ষত্র পাহারা দেয়। তাদের নামে এখনো বৃষ্টি নামে লাল ফকিরের মাজারে। বৃদ্ধাঙ্গুল ছুঁয়ে তারা দেখেছিল সমুদ্রের শেষ জাহাজটি—যেখানে সমুদ্র ও আকাশ একসাথে জলপিঁপড়া খেলে। আবার যখন ছাতামেলা হবে সব বন্ধুরা আসবে রেইনকোট পরে বৃষ্টিউৎসবের অতিথি হয়ে। অতঃপর শুরু হবে বর্ষা আর বুঝেছিলাম জলই কেবল বন্ধুদের মাতাল করেছিল এবং শিখিয়েছিল সন্ধ্যার আয়োজন।

অনিন্দ্য আকাশ

জন্ম ২৬ মে, ১৯৮৪; নাসিরাবাদ, চট্টগ্রাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনসিওরেন্স বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে একটি বেসরকারি ব‍্যাংকে কর্মরত আছেন।

প্রকাশিত বই—
বৃষ্টি ও বরফের গাঙচিল [কাব্য, মনদুয়ার, ২০১৮]

ই-মেইল : babuariyan1@gmail.com