হোম কবিতা পাণ্ডুলিপির কবিতা : জলবন

পাণ্ডুলিপির কবিতা : জলবন

পাণ্ডুলিপির কবিতা : জলবন
1.21K
0

সামগ্রিক ইতিহাস


পিচঢালা রাস্তার ক্ষতগুলো শুকিয়ে দুঃখ উড়ে আসে বুকের ভিতর
দালান ফেরত শূন্য বস্তাগুলো উস্টা খেতে খেতে ঘরে ফিরে
ককিয়ে ককিয়ে হাঁটে বুড়ো জয়নুদ্দিন আর শাপলার মা
হিশেবের খাতায় বাড়ে যোগফল ও উচ্চাভিলাসী নান্দনিক আবহ

শুকনো ঘাম আর রক্ত মিশে গড়ে ওঠে কংক্রিটের জীবন
লাল ইটের দেয়াল জুড়ে বিচ্ছেদ আঁকে পা-কাটা মতিন
তবুও থেমে থাকে না উন্নয়ন, উচ্ছেদ কিংবা সামগ্রিক ইতিহাস
বঞ্চনার অন্তর্গত বিদ্রূপের রঙ খুঁজে ফেরে সান্ত্বনার হিশেব।


আমরা তখন এলিয়েন হয়ে যাব


বাঁশের হুকা টানতে টানতে আমাদের সকাল হবে
আমরা বাড়ি ফিরব—
কাশতে কাশতে লাঙল আর জোয়াল কাঁধে
সরিষার তেল মাখতে মাখতে টুকটাক প্রেম করে নিব
গাওয়া ঘি দিয়ে কাসার থালায় খেয়ে নিব ভাপ উঠা ভাত
কিছুটা দুপুর কাদা গায়ে ছুটে আসবে বাড়ি
আমরা ছায়া আর সন্তানের আসায় কাটিয়ে দেবো সমস্ত বিকেল
তারপর সন্ধ্যা নামার আগেই কাঁথা-বালিশ নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ব প্রচণ্ড একটা ভোরের আসায়
কখনোই ভোর নামবে না মাটির পৃথিবী জুড়ে,
আমরা তখন এলিয়েন হয়ে যাব।


বিচ্ছেদের পোস্টার


প্রচণ্ড দুপুর বেগে চলে যায় নাগরিক পরিবহন
কারো হৃদয় ছিঁড়ে ডাস্টবিনে গড়িয়ে পড়ে
ব্যস্ত ফুটপাথে সাজায় কারো সংসার
ডাস্টবিন থেকে কুড়িয়ে পেয়ে হৃদয় সস্তায় বিকিয়ে দেয় ভাঙারির মালিক।
চুপচাপ চলে গাড়ি চুপচাপ পথচারী, দুপুরের শূন্য রোদ
আইল্যান্ডে দাঁড়ানো গাছে শূল হয়ে বিঁধে প্রতিটি হর্ন
ধুলোবালিগুলো লুটোপুটি খায় গাড়ির পিছন পিছন
রাস্তার পাশে দাঁড়ানো তারের মতো কারো কথা জড়িয়ে ফ্লাইওভারে নামে ট্রাফিকজ্যাম
মানুষগুলো ফড়িংয়ের মতো উড়ে চলে চোখের কোণে।
চাকা যায়, চাকা আসে
রাস্তার পাশে ছড়িয়ে থাকে মরা গাছের ঝরা পাতা
আর বিকেলের পিলারগুলো সেঁটে যায় বিচ্ছেদের পোস্টারে।


দুঃখবোধ


জমানো দুঃখবোধ নেড়ে দেবো উঠোনে বাঁশের আড়ে
পেছনের খিড়কি দিয়ে দেখে নিও এক পলক উঁকি মেরে
শান্ত বাতাসে দূর থেকে আসে যে পিঠার ঘ্রাণ সে দিকে গেলাম
বেখেয়ালি মন বেঁচে দেবো একমুঠো পান্তা-মরিচের আশায়।

ঘুম থেকে জেগে যাই যে নারীর প্রেমে সে নারীর শরীর বড় চেনা
চুল থেকে নিয়ত ঝরে তিলের তেলের সুঘ্রাণ। চুলে গুঁজে বাঁশফুল
কদমের ঘ্রাণে সাঁতরিয়ে যাব ধলা নদী আর কৃষকের কাচা আল
মিলিয়ে নেব ঠোঁট কালচে মাটির লাহান জবজবে মায়াবী পিঠে।

যাব আরো বিরান পথ যেতে যদি বলে গ্রামের শেষ অবধি
বাঁধানো শাড়ির আঁচল তলে দেবো ডুব প্রাচীন ঘুমের নেশায়।


হেমন্তের প্রেম


হেমন্তের ভোরে যে নারী শীতল করে প্রাণ
সে নারী রক্তের ভিতর তোলে নীল ঢেউ অস্থির
শান্ত কোষের ভিতর জমিয়ে নীরবে হাবুডুবু খায়।
সৈকতে দাঁড়িয়ে দূরে দেখে কেউ হাস্যোজ্জ্বল সূর্য।

তারই অপেক্ষায় চেনা পথ প্রতিদিন নতুন দেখায়
ঝাপসা আলো ছুটে মাঝির নোঙর ছুঁয়ে সমুদ্রতল
সহসা কাঁদে শ্রমিক জড়িয়ে ধরে প্রিয় ক্লান্ত তারামুখ
স্বপ্ন-সহবাসে হাঁপিয়ে ওঠা প্রাণ খোঁজে সোনালি রোদ্দুর।


মায়াজাল


মায়াজালে লটকে গেছে হৃদয়!
মায়াজালে পড়ো না মন
বিভেদ ভুলে উতরিয়ে যাও গভীর পদ্মায়
ওখানে আছে নীল আকাশ, শাদা চাতক আর মেঘ।

বড়জোর মেঘে আটকে যেতে পারো
শুদ্ধতার কাফন জড়িয়ে হাঁটতে পারো সূর্যরশ্মি বেয়ে উজান বানে
যেখানে আছে অনাবিল অসুখ আর মাধ্যাকর্ষণ

কোন পথে যাবে—আলো না আঁধার!
তাহলে বেছে নাও সামুদ্রিক নোনাজল অথবা বৃষ্টিফোঁটা
আমি না-হয় কাশবনে গাইব শরতের গীত।


ধর্মনিরপেক্ষতা


আমাদের শহরে চাঁদ উঠলে তোমার ঘুম পায়
নীল ঘুম, ঘুমের ভেতর
আড়ালে তোমার হাত খোঁজে অন্য কোনো জোছনা
কালীর কাছে দুর্গার কাছে ফেরে হতাশার সুর
সোনার জমিন জুড়ে নামে নিতান্ত অমাবস্যা।

কেলোদের কোলাহলে আমার শুধু হাসি পায়।


সাম্প্রদায়িকতা


পিঁপড়াগুলো খেয়ে নিক চোখের মণি,
সঁপে দিলাম অবশিষ্ট ঘুম
তারচে বরং কেউ হৃদয় ছিঁড়ে ফেলুক
পাঁজর খুলে নিয়ে যাক কারো ধারাল ঠোঁট
সঁপে দিলাম দশমীর চাঁদ
যাও নিয়ে যাও প্রাণের অতিরিক্ত নীলস্পন্দন
তাও যদি মিটে আজন্ম ক্ষুধা।

ধিক্কার তোমার মিনারের, ধিক্কার
বেহেশতের পাঁজরে বসে খাও পাঞ্চালীর শরীর!


পরিবেশবাদ


একটা কাক যেতে যেতে ট্রাক হয়ে যায়।


যুগলবন্দি সময়

[উৎসর্গ: সারা আন্দালিব]

স্মৃতির ডাকবাক্স খুলে বসেছে সময়
কাবাবের হাড্ডি সাজে ঘুমহীন রাত
এক জোড়া লাল ঠোঁট লাফ দিয়ে ঘাড়ে চড়ে
কোণে কোণে হাত নাড়ে ঝুল ছায়ামুখ।

পাঞ্জাবির ডোরে বাঁধে কালো টিপ
হিমকফি হিমগায়ে হাঁটে কলাবতী
পাতার আড়াল থেকে খোরগোশ উঁকি বায়
গাভিন শহর ছুটে ক্লান্ত কৃষকের গাই চূর্ণ চুমুর নেশায়।

কবিতার ঝোলা থেকে বেরিয়েছে ঘ্রাণ
বিকেলের সাথে হাটে মহুয়ার গান।

দৃষ্টিগুলো বিঁধে যায় কাজলের মতো
ডাহুকী জমিন জুড়ে নামে নিশাচর।
প্রেমের হাওয়ায় ভাসে কলাবতীর জীবন।

প্রাচীন নেশায় কাটে যুগলবন্দী সময়
প্রেম আকুতিতে গোনে জীবনের ধারাপাত।

 

মাসুম মুনাওয়ার

জন্ম : ১ মার্চ ১৯৮৮, ১৭ ফাল্গুন ১৩৯৪। রাম জীবন পুর, মোহনগঞ্জ, নেত্রকোনা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় হতে সরকার ও রাজনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর।

জাহাঙ্গীরনগরের একমাত্র সাহিত্য সংগঠন ও ছোটকাগজ ‘চিরকুট’-এর প্রতিষ্ঠাতা।

‘ষোলপৃষ্ঠা’ প্রকাশনী থেকে অমর একুশে বইমেলা ২০১৬ তে প্রকাশিত হয় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ সূর্যকুসুম। ‘জলবন’ তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ।

ই-মেইল : mihir1856@gmail.com

Latest posts by মাসুম মুনাওয়ার (see all)