হোম কবিতা পাণ্ডুলিপির কবিতা : ‘কিছুটা শরীর সহো’

পাণ্ডুলিপির কবিতা : ‘কিছুটা শরীর সহো’

পাণ্ডুলিপির কবিতা : ‘কিছুটা শরীর সহো’
922
0


মানুষ তো তার ছায়ার প্রেমেই পড়ে। তোমার ভেতর আমার ছায়া ফুরিয়ে গেছে বলেই কি আর ভালো লাগে না?
পৃথিবীর মানুষ অন্য কিছুর ছায়া হতে পারে না? আমি নিজেই নিজের ছায়া, আপনিও আপনার ছায়া?
আর আমরা নিজেরেই ভালোবাসি আপেলের মতো।
পৃথিবীতে আমি সত্যিই আমি কিনা তার কোনো প্রমাণ নাই।
এই শরীর বয়ে বেড়ানোর দায় থাকবে কোনো এক দুপুর পর্যন্তই।
আমার সমস্ত পাঁজর দিয়ে তোমায় বেঁধে রাখতে চাইছিলাম।

 


আমাদের প্রথম বিমূর্ততার পাঠ ঈশ্বরের ধারণা দিয়েই শুরু।
পৃথিবীর সমস্ত চাকার মালিকও কি ঈশ্বর!
ঈশ্বর বিমূর্ত, শূন্য নয়।
ঈশ্বর, প্রতিদিন আমায় একটি করে নতুন চেহারা দাও।
ঈশ্বর, তুমি শারীরিক অস্তিত্ব নিয়ে কি এতটা নিশ্চিন্ত থাকতে পারতে?

 


মানুষ আসলে অভ্যাসবশত বেঁচে থাকছে।
এইখানে দিন দিন ব্যক্তিগত পাসওয়ার্ড বেড়ে যাচ্ছে, ফলে ভালো লাগছে না।
মানুষের ভাবনা থেকেও তার হাত ছোট বোধহয়।
কখনো যদি জানা যায় আমরা অর্ধেক শরীর নিয়েই বেঁচেছিলাম…
এমন তো নয়, এইখানে শরীরই আটকিয়ে রাখছে আপনারে?

 


দুইটা কারণে আমরা চাইলেও হাত পা খুলে ঘুমাইতে পারি না; প্রথমত হারায় যেতে পারে, দ্বিতীয়ত কেবল ঘুমানোর সময়ই আমরা নিজেদের হাত পা কাছে পাই।
মানুষের হাত স্মৃতি হারিয়ে ফেলার একটা কারণ অনেকক্ষণ লোকাল বাসের রড ধরে ঝুলে থাকা।
নিজের সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ শরীরের সমস্ত স্থানে পৌঁছানো সম্ভব হতো যদি আমরা কিছুটা কম চোখ নিয়ে জন্মাতাম।
মানুষের শরীরের  শুরু কোথায় আর শেষওবা কোথায়?
দেখা যাচ্ছে, এইখানে শুধু শরীর নিয়েই ব্যস্ত থাকা সুখের, অন্য কিছু নিয়ে ভাবলে অসুখ হয়।

 


মানুষের সঠিক কোনো ওজন নাই আসলে।
মানুষ দু’টা কারণে পচনশীল; প্রথমত না চাইলেও তাকে অনেক কিছু দেখতে হয় আর দ্বিতীয়ত তার শরীরে ঘ্রাণ আটকানোর ভালো কোনো সিস্টেম নাই।
শরীরের স্পর্শকাতর অঞ্চলে মানুষ বয়ে বেড়াচ্ছে গণ্ডার কিংবা কুমিরের অভিশাপ।
দেখতেছি যে, সকলে আত্মার আঘাতের চাইতে শারীরিক আঘাতকেই বেশি ভয় পাইতেছে।
কোলাহল কী?—ট্যাঙ্কের শব্দে কূপের কাতরানো জল।

 


শরীরে তো একটাও পকেট নাই যেখানে ডালিমের দু’টা দানা পুরে রাখা যায়।
মানুষ দেয়াল আর পোশাক আবিষ্কারের পরই বোধহয় আপেল খাইতে শেখে।
বেশিরভাগ মানুষ দুটা কারণে নিজেরে ব্যর্থ ভাবে; প্রথমত, হাঁটার সময় চাইলেও হোঁচট এড়াতে পারে না;
দ্বিতীয়ত, সে বেশিক্ষণ নিজের চোখাচোখি তাকাতে পারে না।
মুখই মুখ্য যেহেতু শরীরের আর কোনো অংশের ওজন না থাকলেও চলে।
মানুষ তার শরীরের যতটা মালিক আবার ততটা মালিকও না।

 


দুইটা কারণে মানুষের এক জোড়া হাত থাকে; প্রথমত এক হাত পকেটে ভরে রাখলেও অন্য হাত বাইরে রেখে হাঁটা যায়।
দ্বিতীয়ত, এক হাতে নখ রাখা না গেলেও অন্য হাতে রাখা যায়।
মূলত শরীর একটি অস্থির জিনিস, এটাকে ব্যালেন্স করার কৌশল একবার শিখে সারা জীবন মনে রাখতে হয়।
যেহেতু সব চাইতে স্থিতিশীল ফর্মটি শরীরের কোথাও সবচেয়ে অস্থিতিশীল ভাবে আছে সো ঋতুভেদে এখানে অস্থির কিছু বায়ুমণ্ডল তৈরি হয়।
বিশ্বাসের চাইতেও বেশি একা হতে চাই আর ঘুমের চেয়েও অধিক বিচ্ছিন্ন।
মানুষের দ্বি-তল পা জুড়ে আঁকা মূলত আদি পৃথিবীর ম্যাপ।

 


প্রাণীগণ কিভাবে খাঁচায় ঢোকে?
মধ্যদুপুরে পকেটে চিড়িয়াখানার ইমেজ নিয়ে আমরা বনের ভিতরে ঘুরে বেড়াইতাম। বনটারে মনে হতো বুড়ো মানুষের পিঠ। চিড়িয়াখানার ছবিগুলা বনের গভীরে ছড়িয়ে দিতাম সন্ধ্যাবেলা। পরদিন ভোরে জানোয়ারেরা বনের বাইরে জমা হতো আর আমরা তাদের কুড়িয়ে নিতাম। পশুবাহী গাড়ি ঝনঝন করে চলে আসত। গাড়ি পশুভর্তি হলে আমরাও ঢুকে পড়তাম গাড়িতে। খাঁচার ভেতর থেকে পৃথিবীটাকে দেখতাম আর পশুর চোখে চোখ রেখে চলে আসতাম ছবির সেই চিড়িয়াখানায়। পশুরা যে যার খাঁচায় ঢুকে পড়লে আমরা দাঁড়িয়ে থাকতাম। দাঁড়িয়ে দেখতাম বিশাল বিশাল প্রাণীরা খাঁচার কোনায় হেলান দিয়ে বসে থাকে। তাকিয়ে থাকে। ওরাও কি মানুষদের খাঁচার ভিতরে মনে করে? আমরা দেখতাম খাঁচায় প্রাণীদের ছায়া আস্তে আস্তে হারিয়ে যায়।
নো মোর টুডে…

 


অর্কিডের ভূগোল বিষয়ক জ্ঞান থাকে না।
ঢেউ ভেঙে জ্বলুক জোনাকি, পথ চলতি দৃশ্য কুড়াব।
মিথ্যা বলো না, ‘লালনের কি বিড়াল ছিল?
ভোর হলে আখের চোখে গড়িয়ে পড়বে শঙ্খের কোলাহল।
তোমার স্বপ্নে এক পায়ে হাঁটা যায়?

 


শরীর ভর্তি মৃত পিতার হাড় নিয়ে আমরা ঘুরে বেড়াই। হাড় সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জনের পর বয়স বেড়ে গেলে কামরাঙা বিষয়ে আগ্রহ বাড়ে আমাদের, পাঁজরে কামরাঙার ঘুম। তবে নখ সম্পর্কে যাবতীয় দ্বিধা থেকে যেত। আসলে কানের ভাঁজ খুঁজতে খুঁজতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে আমরা শরীরের হাড় গুনে রাখতাম। শোনা যায় মেঘের পাঁজরে আকাশের দুঃখ জমা থাকে আর বেলা শেষে নিংড়ে দেয় পাহাড়ের শরীরে। এভাবেই আকাশের স্পার্ম ঝরনার প্রস্রবণে পৃথিবীকে জড়িয়ে ধরে। দোলন চাঁপার বুকে টুকরো আকাশ দোলে। মূলত মানুষের শরীরে মেঘের বসবাস। আর আমরা পেয়ে যাই পূর্ব পুরুষের সমস্ত হাড়।

মারুফ আদনান

জন্ম চট্টগ্রামে। শিক্ষা : এম এফ এ।

ই-মেইল : marufadnan0@gmail.com

Latest posts by মারুফ আদনান (see all)