হোম কবিতা পাণ্ডুলিপির কবিতা : কালো বরফের পিস্তল

পাণ্ডুলিপির কবিতা : কালো বরফের পিস্তল

পাণ্ডুলিপির কবিতা : কালো বরফের পিস্তল
933
0

সিজোফ্রেনিক    

                   [লেইরে বিয়াতে গার্সিয়া-কে]


প্রেমের পা, মৃত্যুবাহক!

পতনের গানে কী এক ঘুম আসে!
ঘুমের অভিনিবেশ থেকে তৈরি হয় শূন্যগামী সিঁড়ি-মেরুন! সিনেমার
মতো ধোঁয়া—ধোঁয়া থেকে বেরিয়ে আসে শিশু, নারী, জম্বি,
পিতামহ, ডাকাত ও নায়িকারা—

সিঁড়ির ধাপ উঠছে, যত উপরে যায় না চোখ
শিশু উঠছে—পড়ে যাচ্ছে, দিচ্ছে হামাগুড়ি
নারী উঠছে—পড়ে যাচ্ছে, জম্বি ধরে ফেলছে হাত
জম্বি উঠছে—উঠে যাচ্ছে প্রকৃত আরশোলার মতো
পিতামহ উঠছেন—পেছন থেকে তাড়া করছে ডাকাত
           ডেগারের চকচকে হল্লা ডাকাতের হাত
সিঁড়ি মুখস্থ—নায়িকা যাচ্ছেন উঠে

শিশুটিকে আমি ডাকি
                                 আমাকে ডাকে ধামর মহিষমারা গ্রাম
                                 দেয়ালে দেয়ালে সিনেমার ছায়াবাজি

জানালার পাশে রাত কম্পমান সুতোর কিস্‌সা
তমসা এমন আয়ু, আত্মজার জামা পতনের ত্বকাসুখ
কেঁপে ওঠা দেখি জানালায়, কাচের ওপারে ভয়
জানলা কি জানলা না—ছনের ঘরে থাকি, জয়
বৃষ্টি-টিষ্টির মধ্যে মধ্যযাম আরো গাঢ় নায়িকাময়
                                 কাচ গলে ঝরে পড়ছি পরনারীর রাস্তায়
                                 জানকবচ করো না বৃষ্টি-টিষ্টির রাতে
                                 ওগো ভয়—ওগো মৃত্যু—তুমি মেঘলাময়

অধিক জীবন রয়ে গেছে ভোরভেজা—
গাঁ দেখব আমি, দুমকলসের চাহনি দেখব
আমার আমারে ফুটবে স্বাতীচোখ—ফজরপর ভাঁটফুল
                      সারা একটা মুখ ঘুমন্ত চুম্বন
                                 যেন তীর্থপুকুরে খলসে মাছের সাঁতার
                                 ওষ্ঠ পুষ্ট এত, পুরে নেয় সবটা সকাল!

ও মৃত্যু, ওগো ভয়, রিরি ছড়ানো চুমুর স্বাদ
নায়িকার কপাল থেকে ডুবে যায় দশরাত্রি বয়সী চাঁদ
মুখে-চোখে পায়চারি করে বেহুলার দেশ

অনেক রাত ফুটে আছে ঘুমের গভীরে
চোখগুলো আমাদের ভ্রমর হতে পারছে না
অপহৃত শীতাবশ রাক্ষুসে শরীর
কে তুমি, আমাতে তোমার কী অধিকার?
বাঁশপাতার মতো সহজ মৃত্যুঝরা জন্ম আমার

মৃত্যুকে চিনি আমি আকারে-প্রকারে
ধরছি প্রেমের পা মৃতের হাট-বাজারে
ওগো জীবন, ও আদৃতা, তাও তুমি ডাকো না সখারে!

—রক্তখোরের মিশাইল অভিমুখ, টাইগ্রিসের বিষণ্ণ জলের চিবুক,
যাযাবরের অনিশ্চিত ঘামের রেখা, ওপেন এয়ার জাদুঘরের শোপিস,
বরফ কাটা চিরবসন্ত, বাভারিয়ান তাড়ি উৎসবে নেচে বেড়ানো
যুবক, মহাসমুদ্রের গির্জা, আশাহত জেলে, জর্জ বেস্টের জীবন,
পর্নস্টার, মেহিকান ড্রাগ সম্রাট, ক্যারিবিয়ান জলদস্যু অথবা
ম্যালকম মার্শাল, পেলে—কালো মানুষের অহং, বুয়েনোস
এইরেসের প্রিয়তম নাম, ধর্মপ্রচারক, প্রফেট—
                                                     এসবের কিচ্ছুটি নই আমি
          ও অন্ধ-মহল্লা, ওগো পরনারী, নতমুখী অপরাধ—
          প্রেমিক কবি আমি, কেবলই ভাষাময়

হতে পারতাম কোনো এক সমুদ্রতীরবর্তী গাঁয়ের লোক
যেখানে দিনভর মানুষের চেয়ে উঁচুস্বরে কথা বলে
পানির সন্ততি ও মাছের দল
দুপুরগুলো বেণিদোলানো কিশোরীদল—কার্পাসতুলোসম ওড়ার বাহানা
বিকেলের দিকে ছেলেরা সাইকেল চালাতে চালাতে
রৌদ্রস্নানমগ্ন প্রতিবেশিনীর জন্যে সমস্বরে গায় ‘ওয়েটিং ইন ভেইন’
বব মার্লে পেরিয়ে ধীরসমুদ্রের পায়ের তালুতে আসে সন্ধ্যা—
গোধূলি পেরোলে পতিত ধর্মালয়ের পাশে
পাদ্রির ক্লারিনেট থেকে বেরোয় নৃত্যরত জোড়া ছায়া

শ তিনেক মানুষের গাঁয়ে লোকেদের চেয়ে
বেশি কথা বলে গোরস্থান, জলধি
ঢেউয়ের সঙ্গে ধাক্কা লেগে গাঙচিল ডানায় বাজে ডুগডুগি

জোয়ারে-স্রোতধারায় কুমিরের পলক ফেলার ভঙ্গিতে রাত্রি আসে—
হিম
ঝিঁঝিঁর সঙ্গে গ্রাম পাহারায় থাকে পতঙ্গের কোলাহল
দূরসমুদ্রগামী পাখির ডাকে
তীব্র চুম্বনের আশ্লেষে তরুণীর চোখের পাতা মেলার ভঙ্গিমায় ভোর
হয়

দৌড় দৌড় খেলা সকাল চিরকৃষকের বারান্দায় হাঁকে,
                  ‘ঘুম হইতে কৃষিকাজ ভালো,
                  সোনা পাবে মাঠে চলো—
                  মাঠে চলো ফসলের বল—
                  মাটির সঙ্গে করো প্রেম,
                  আদরে জড়িয়ে নাও দানা, ফলাও’

কৃষকের বউ কৃষক
         কৃষকের স্বামী কৃষক
                  কৃষকের রক্ত কৃষক
ফুর্তি ক’রে কাটে সোনাগম, রুটির ভবিষৎ—
ফসলের আত্মাকে বানায় নগরের ঘাতকবীজ
ম্যাটিনি শোতে সিনেমা দেখে এসে শোয় যে যার কৃষকের পাশে

 

অভাব সঙ্গে জন্ম আমার বঙ্গে—প্রেমিক কবি আমি
আত্মাময় খসখস সুর তোলা মৃত্যুবাহক—
তোমার প্রতি রইল দোস্তির আহ্বান
তোমাকে নিয়ে যাব মহিষমারা গ্রামে
ছাইতান মাছের অসুখে হারিয়ে যাওয়া শিশুর গল্প শোনাব

পৌষের সকালে টেলকা পানির মান্দা সেঁচতে নামিয়ে দেবো
খাওয়াব ইচা মাছের বড়া

আত্মা-লুটেরা ডাকাত হে, আমি তোমাকে নিয়ে যাব নতুন কবিতার দিকে
হলুদারণ্যে মুখোমুখি বিকেলঘুড়ি ক্রমশ হেলে পড়বে সুতোর কাছে
তুমিও বুঝে নেবে, ভাষার মৃত্যু নেই—কবির আত্মা ইলাহির ভাষামঞ্জিল

              কবির মৃত্যু নিয়ে এলে
              ও মৃত্যুবাহকের হা, প্রেমের পা, ওগো কাহামৌ—
              তোমাদের দেবো আজীবন কবিতা পড়ার সাজা—

 

অপরাপর পদচিহ্ন ধরে দুজনের পা—ওর্তানসিয়া
আলাদা হতে হতে একসাথে কবরের দিকে যাবে
তোমার আঙুলের সাথে আমার আত্মার দেখা হবে
যতটা দেখাদেখি হলে বেজে উঠতে পারে
                              তারহীন সেতার
রক্ত-মাংস থেকে বিচ্ছিন্ন হাড়ের নির্জনতা আমাকে দিয়ে
নিও সমুজ্জ্বল আগুন—দুটো কাঠের চোখে…

রুহুল মাহফুজ জয়

রুহুল মাহফুজ জয়

জন্ম ৩১ মার্চ ১৯৮৪, ফুলবাড়ীয়া, ময়মনসিংহ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক। পেশা : সাংবাদিকতা।

শিল্প-সাহিত্যের ওয়েবজিন শিরিষের ডালপালা’র সমন্বয়ক।

প্রকাশিত বই :
আত্মহত্যাপ্রবণ ক্ষুধাগুলো [কবিতা, ২০১৬, ঐতিহ্য]

ই-মেইল : the.poet.saint@gmail.com
রুহুল মাহফুজ জয়