হোম কবিতা পরিত্রাত্রী : রাসেল রায়হান

পরিত্রাত্রী : রাসেল রায়হান

পরিত্রাত্রী : রাসেল রায়হান
309
0

তোমার উপস্থিতি টের পাই
নাভি থেকে নখে এলে একখণ্ড সুতো
গর্ভাশয় ছেড়ে আসা পরিত্রাণ ছিল না
ছিল তারা পরিত্রাণের ছুঁতো

দূরে জ্বলছে অগ্নিকুণ্ড—শুকনো কাঠ কেশে নিচ্ছে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীর অন্তিম কাশি। চারপাশে মুখোশ পরে উদযাপন করছে এই উৎসব আমাদের পরিচিত রমণী এবং পুরুষেরা। এ উৎসব জন্মের। এ উৎসব পরিত্রাণের। তারা বলছে, পৃথিবীতে যত রান্না সবই বনভোজন। সুতরাং তাঁবু গোটানোর আগে বাজিয়ে নাও শেষ বেহালা, সম্পন্ন করো এই বনভোজন—এবং ডাকতে থাকো যোজন দূরত্বের আস্তিক পশুদের ‘হেই হেই’ বলে।
অন্ধকারে কালো পর্দার মাঝখানে উঁকি দেয়া চাঁদের প্রাগৈতিহাসিক বিধিমালায় যে বাওয়াল তার ফ্যাকাসে হাত বাড়িয়ে দিত মৌমাছির বাসার দিকে—কিংবা প্রাচীন বিমানে মেঘ ভেদ করে যারা দেখেছিল পিরামিডের উদ্যত অহমিকা, তারা সবাই আজ এই বনভোজনে, অগ্নিকুণ্ডের সামনে নৃত্যরত। যারা নিয়ে এসেছিল শ্বেতাঙ্গের শীত, আকবরের সুযোগ্য পুত্রবধূর মতন, এই উত্তপ্ত দোযখের আগুন সামনে নিয়েও কেঁপে ওঠে নি যে দ্রাবিড়সন্ততিগণ—তারাও আজ এখানে জড়ো হয়েছে।

তারা আগুনের মতো নাচে
চায় আগুনে ঝাঁপ দিতে
আগুনের গান গাইছে তারা
তারই সম্মতিতে

আত্মসমালোচনার কৌশলে ক্রমাগত জ্বলে উঠছে আগুন—এ সমস্ত পাথর এবং কাঠমাতৃক আগুন। জ্বলে উঠছে এইসব মানুষেরাও। এরা জাফলংগামী কোনো ট্রেনের ছদ্মবেশ—যার খোলা-জানালায় ঢুকে পড়েছিল নিউমোনিয়া এবং আধোয়া কুয়াশা।
ভূকম্পন আসছে। জটিল প্রক্রিয়ার পর জন্ম নেয়া প্রজাপতিগুলি ইশারায় আগাম জানিয়ে দিচ্ছে সংবাদ। সবাই উপভোগ করতে থাকে তাদের এই ভিড়ের মধ্যে ভুলবশত বেজে ওঠা একটি পোষা কঙ্কনের আওয়াজ। প্রতিটি সন্ধ্যায় এদেরই মাঝে কেউ একজন তার পোষা প্রজাপতিদের ডাকে আঙুলের মুদ্রায়। ডাকতে থাকে ভুলবশত বেজে ওঠে পোষা কঙ্কনকে। প্রজাপতির মুখোশে যে-সমস্ত যাত্রীকে ভাল মানাতো, লাস্যময়ী সঙ্গী নিয়ে তারা কাটাচ্ছে মানুষের জীবন; নির্বাচিত ট্রেনে ছুটে যাচ্ছে অন্ধকার অরণ্য ভেদ করে—যে অরণ্য আমলকি, কষা বরই এবং জোনাকির। নিরীহ কাঠবিড়ালির লেজের আঘাতে ঝরে পড়ছে আখরোট। নৃত্যরত হরিণ ও মেঘের ডাকের সঙ্গে ময়ূরের মুদ্রায় থাবা ঘষছে কুর্নিশের ছলে নুয়ে থাকা বাঘ। জেনে রাখো, সমূহ কুর্নিশ ছোবলের পূর্বপ্রস্তুতি।

এসো জীবনের কথা বলব
প্রতি কুর্নিশে যাব ছুঁতে
জীবনের সব গোপন যাপন রাখব করতালুতে

দূরে জ্বলছে অগ্নিকুণ্ড। আলাদা করা যাচ্ছে না ফুলকি এবং জোনাকিদের।
যে পাখি জন্মায় পাবিহীন, তার কী হয় মা-পাখির মাতৃত্ববোধ লোপ পেলে? সমস্ত জীবন তবে উড়ে উড়ে কেটে যায়? …সমস্ত আত্মহত্যাকারী মানুষের ভেতরে গোপনে সে লুকিয়ে যায়! দূর স্টেশনে যখন কেঁদে ওঠে খোড়া ভিখিরির ভায়োলিন—পাগলা ঘোড়ার লেজের তন্তু। সেখানকার মানুষেরা তখন বেড়ে ওঠার প্রস্তুতি নেয় ডাকাত হিসেবে, আত্মহত্যাপ্রবণ পাখি হিসেবে। চক্রাকারে ঘিরে রাখা অগ্নিকুণ্ডকে উদ্দেশ্য করে তারা বলতে থাকে—পৃথিবীতে যত রান্না, সবই আসলে বনভোজন। সুতরাং তাঁবু গোটানোর আগে বাজিয়ে নাও অন্তিম বেহালা, সম্পন্ন করো রান্না—
এবং ডাকতে থাকো দূরবর্তী আস্তিক পশুগুলিকে ‘হেই হেই’ বলে।

আমিই তোমার কাছে আসি
আমিই তোমার কাছে যাই
জন্মেছি তোমার গর্ভে আমি,
আমিই তোমার আততায়ী

দূরে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল অগ্নির…দাহ্য জামা, বোতাম এবং হাড়মাংসের নিপুণ সেলাই নিয়ে তৈরি হচ্ছিল নিখুঁত কিছু হাত। প্রস্তাব দেয়া হচ্ছিল স্বাস্থ্যকর খাবারের। ‘সুপাচ্য খাবারের জন্য কিছু ইট পোড়াতেই হবে’—মোষের যুদ্ধ দেখাবার আগে তাদের শিঙয়ের নিচে অবাধ্য চিরুণী ও চাঁদ দেখিয়ে যারা প্রচার করেছিল এই ধর্মীয় উপদেশ, দেখতে পাবে, তারা সব নিজেদের দাঁতে সুতো বেঁধে টেনে নিচ্ছে নিজেকেই।
সেই আঁচ তীব্রভাবে ছুটে আসে আমাদের পরিচিত রমণী এবং পুরুষের পানে। আমরা জবাবের ভঙ্গিতে বলতে থাকি, পালিত ময়ূরেরা সাপের সান্নিধ্য বেশি চায়। প্রকৃতপক্ষে আমরা নিজেদের পালিত ময়ূর ভাবি, নাকি ঐ নীরিহ সাপ—সে জবাবটুকু আমাদের কাছে নেই।

সময় দিয়াশলাই, অন্ধ বাড়ি। বসিয়ে পাহারা—
মানুষ জন্মের পরে যতবার হয়ে নতজানু
তোমার নিকটে আসি, আর আসে কারা

দূরে মন্থর আওয়াজ পাচ্ছ কারো, হে মুখোশ পরা ময়ূর ও সর্পকুল? তারা নিকটে পৌঁছবার পূর্বেই শোনো, ডাহুকের তপ্ত ঠোঁটে পিপাসার স্বর—শেখো পলায়ন। সম্ভাবনাময় অরণ্যে জেগে ওঠে একলা জিরাফ—রেখে দাও তার কিছু মানচিত্র। ছুড়ে ফেলো না, কারণ ছুড়ে ফেলবার অহংকার তোমাদের মানাবে না!
একদিন যান্ত্রিক ময়ূর পেখম মেলে দিয়ে নেচে উঠবে, কৃত্রিম মেঘের ডাকে; পৃথিবীপ্লাবী অতিবৃষ্টিতে ধ্বংস হয়ে যাবে মাঠ ও পাহাড়ভর্তি সবুজ; ফিরে আসবে পুনরায় নূহের চল্লিশ দিনব্যাপী বন্যা; অনাবৃষ্টি পুড়িয়ে দেবে মানুষের হৃদয় ও পরমায়ু। তাই জেনে তৈরি হচ্ছে কৃত্রিম মেঘ ও বৃষ্টি—নাচার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে কৃত্রিম ময়ূর।
তখনও পৃথিবীর এক কোণে বেঁচে থাকবে একটি ময়ূর আর তুমি। আর কিছু ক্রীতদাস। যেহেতু তুমি ছাতা মাথায় দিলেই বৃষ্টি নামে—এবং তুমি সেই মা-পাখি নও—তোমার মাতৃত্ববোধ অনন্তকালের, তাই জানি, সামনে জড়ো হওয়া ক্রীতদাসদের অনুরোধে তুমি সেদিন তোমার বিখ্যাত ছাতা মেলে দেবে। আর সেই মুহূর্তেই নেচে উঠবে সেই একমাত্র জীবন্ত ময়ূর।

বাড়িয়ে দেবে বুক—নিজের, পৃথিবী টানবে বুকে
গর্ভাশয়ে আটকে রাখবে আমার পরমায়ুকে

দূরে জ্বলবে অগ্নিকুণ্ড—শুকনো কাঠ কেশে নেবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীর অন্তিম কাশি। চারপাশে মুখোশ পরে উদযাপন করবে সেই উৎসব আমাদের পরিচিত রমণী এবং পুরুষেরা—যে উৎসব জন্মের—যে উৎসব পরিত্রাণের। তারা বলবে, পৃথিবীতে যত রান্না সবই বনভোজন। সুতরাং তাঁবু গোটানোর আগে বাজিয়ে নাও শেষ বেহালা—গর্ভাশয় ছেড়ে নেমে এসো পরিত্রাণের ছুঁতোয়। সম্পন্ন করো এই বনভোজন এবং ডাকতে থাকো যোজন দূরত্বের আস্তিক পশুদের ‘হেই হেই’ বলে।

রাসেল রায়হান

রাসেল রায়হান

জন্ম ৬ ডিসেম্বর, ১৯৮৮; বাগেরহাট। ঢাকা কলেজ থেকে পদার্থবিজ্ঞানে মাস্টার্স। বর্তমানে একটি বেসরকারি কোম্পানিতে কর্মরত।

প্রকাশিত বই:
সুখী ধনুর্বিদ [কবিতা; প্লাটফর্ম, ২০১৬]
বিব্রত ময়ূর [কবিতা; প্রথমা, ২০১৬]

ই-মেইল : rasahmed09@gmail.com
রাসেল রায়হান