হোম কবিতা নিখিলের ভাষা

নিখিলের ভাষা

নিখিলের ভাষা
1.22K
0

বই আর টেলিভিশন বৈমাত্রেয় ভাই।  তাদের সম্পর্ক ভালো নয়, একে অপরকে খুন করতে আস্তিনে ছুরি নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। তাদের বড় বোন শ্রুতি, সেও বৈমাত্রেয়, বইয়ের জন্মের পর জঙ্গলে হারিয়ে গেছে। তাদের বাবা নিখিলেশ, মদখোর। রোজ রাতে টলতে টলতে নবদ্বীপ হাইওয়ের টংয়ে এসে তলিয়ে যায় অতলান্তিক ঘুমে।

বই-টিভির জন্মের আগে নবদ্বীপ গ্রামে ইলেক্ট্রিসিটি ছিল না। সূর্য ডুবে গেলে নিখিলের মিনার থেকে শ্রুতিশর নিক্ষেপ করে সন্ধ্যার আরশ থেকে নামিয়ে আনত রাগিনী। হালটের শেষ মাথায় এলাকাবাসী জড়ো হয়ে সমবেত স্বরে প্রার্থনা করত সেই সুর। কিন্তু বইয়ের জন্মের পর জীবনানন্দ জানালো, আলোর সন্তানদের মধ্যে তার নাম সবচেয়ে প্রথম। অতএব বইয়ের জন্য উত্তরের জঙ্গল কেটে গড়া হলো দুর্গ। মেদিনীপুর থেকে সু-বর্ণ রথে এল সেনাপতি ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা।

তারপর দ্রুত বদলে গেল নবদ্বীপ। অকস্মাৎ একদিন ভাষাকে বন্দি করে টানতে টানতে নেওয়া হলো দুর্গে। ঢোকানো হলো মুদ্রিত কারাগারে। গেজেট হলো ভাষার নীতিমালা। গ্রামের লোকেদের বলা হলো, এখন থেকে তোমরা পরস্পর সম্ভাষ করবে দুর্গের ভাষায়। মুখের ভাষায় লিখন নিষিদ্ধ হলো। প্রতি গ্রামে একটি করে পাঠাগার হলো, আলোকিত মানুষ গড়তে সায়ীদ স্যার খুললেন ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি। প্রতিবছর ভাষা-উৎসবের জন্য চালু হলো মাসব্যাপী গ্রন্থপূজা। নবদ্বীপ থেকে বইয়ের দোর্দণ্ড প্রতাপ ছড়িয়ে পড়ল চরাচরে।

পরদিন সুবেহ সাদিকে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল শ্রুতি, এরপর তাকে আর কোথাও দেখা যায় নি। গ্রামের যে ছেলেরা ছাগল চড়াতে হঠাৎ পুবের জঙ্গলের গভীরে হারিয়ে যায়, তারা নাকি তার আওয়াজ শুনেছে, কিন্তু শ্রুতি বেঁচে আছে এ কথা কেউ বিশ্বাস করে না।

এর মধ্যে নিখিলের তিন নম্বর বউ গর্ভবতী হলো, কোল জুড়ে হাসল রঙিন টেলিভিশন, বিচ্ছুরিত আলোয় চমকে গেল আপামর চোখ। বই রেখে গ্রামের লোক হুমড়ি খেল সেই দৈবরশ্মির পর্দায়। গেল গেল রব উঠল স্মার্ত সমাজে। বিশেষজ্ঞেরা মত দিল, টিভি দেখা বই পড়ার আগ্রহ কমায়, জ্ঞানীরা কদাচিৎ টেলিভিশনে যায় না।

আলোর সন্তানদের মধ্যে কার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সবচেয়ে কম, তা নিয়ে তুমুল বিতর্ক হলো। সম্পত্তি ভাগের চাপ এল নিখিলের ওপর। বহুলি বাজারে তরুণেরা রাত জেগে ভিসিআর দেখে। তাই পঞ্চায়েত প্রস্তাব দিল সমঝোতার। এরপর দুইটি মহাসমর একটি স্নায়ুযুদ্ধ দেখল পৃথিবী। যে বছর সোভিয়েত ভাঙল, মাঘ মাসের কনকনে শীতে নিখিলের চতুর্থ স্ত্রীর গর্ভে জন্ম নিল ইন্টারনেট। নবদ্বীপে নতুন হাহাকার উঠল। একরাতে একশ গ্রামবাসী আল ভেঙে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল অনলাইনে। মনস্তত্ত্ববিদেরা বলল, এটা ভার্চুয়াল এডিকশন।

ইন্টারনেট ক্রমিক ভাঙতে লাগল গেরস্থের বুলি ও লিখন। তছনছ হলো ভামহের বাগান, কেরির কাঁচারিঘর। বদলে গেল দৃশ্যের ধারণাও। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নওদিয়ার শিশুরা দেখল চৌদিকে ব্রহ্মের নিরাকার খাঁচা। তখন বই আর টেলিভিশন শত্রুতা ভুলে এক হলো। বরকন্দাজেরা সাইবার নিরাপত্তার কথা তুলল, বত্রিশটি ধারা হলো। তবু অপ্রতিরোধ্য অান্তর্জাল হারানো বোনের খোঁজে পুবের জঙ্গল থেকে ছড়িয়ে গেল অখিলে।

সারারাত মদ খেয়ে সুবেহ সাদিকে হালটের শেষ মাথায় এসে নিখিলের কদম জড়িয়ে যায়। নাকে এসে লাগে তড়কার ঘ্রাণ। গাঙে লাশ ফেলে কারা যেন শ্যালো নৌকা থামিয়ে নাস্তা করছে টংয়ে। ছুটন্ত হাইওয়ের পাশে এসে নিখিলের চোখ রোজ ঘুমে তলিয়ে যায়।

আলমগীর নিষাদ

জন্ম ১৩ নভেম্বর, ১৯৭৯; সিরাজগঞ্জ। কলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। পেশায় সাংবাদিক।

প্রকাশিত বই—

জোছনার ওহি [কবিতীর্থ, কলকাতা, ২০০৪]
জোছনার ওহি ও অন্যান্য কবিতা [বাংলালিপি, ঢাকা, ২০১৪]

ই-মেইল : kobialnishad@gmail.com