হোম কবিতা দুইটি পাণ্ডুলিপি

দুইটি পাণ্ডুলিপি

দুইটি পাণ্ডুলিপি
1.00K
0

নীহার লিখনের দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হচ্ছে বইমেলা ২০১৭-য়।
আমি আপেল নীরবতা বুঝি  প্রকাশ করছে ‘প্রিন্ট পোয়েট্রি’ আর ‘মেঘ’ থেকে বেরুচ্ছে ব্রহ্মপুত্র

এ দুটি পাণ্ডুলিপি থেকে কিছু কবিতা পরস্পরের পাঠকদের জন্য...

 


আমি আপেল নীবরতা বুঝি


ধর্ম

একটি গোলাপ ফুটে আছে লনে
আমি অর্জুনের নিশানা অব্যর্থ দেখেছি বলেই
চলে যাচ্ছি বনে;
খাইবার পখতুনে একটা ইগল নখ দিয়ে এঁকে গেছে গুহাচিত্র।
তোমার মুখের পাশে কাকেদের শীতকালীন সৌন্দর্যে
সরষে ফুলের মৌমাছি হয়ে উড়ে যাই সেইসব গুহায়;
যেখানে তরবারির মহান ব্যবহারের প্রস্তুতিপর্বে
ঘাবড়ে গিয়ে তোমার পাহাড়ে মিশিয়ে দিয়েছিলে আমার নীরব তৃণভূমি।

সেই উষ্ণতা আজো জমা আছে
ভেবেছিলাম এটাই হবে আমাদের ধর্ম।

 

এক ধরনের উট

যারা জেনে গেছে মানুষ এক ধরনের উট, বুক পিঠ নাই
তারাই কবন্ধ শরীরকে ভালোবাসতে পেরেছে নির্দ্বিধায়।
আর যারা জীবনে একবারও মেনিকুইনের দুধ, পাছা দেখে
আঁতকে উঠে হাসতে পেরেছে,
তারাই বুঝেছে কেবল কাতর রসের হাঁড়িতে
ডুবে আছে বোকা ছেলেটি; ফ্রয়েড।
যে কিনা মেনিকুইনকে আশকারা দিয়ে বোঝাতে পারে নি
মানুষ আসলে এক ধরনের উট
যার কোন বুক পিঠ নাই।

 

তেঁতুল একটা সিমিলি

নীরব পুকুরে
ঘাই মেরে চলে যায় অজানা মাছ
চলে যায় পৃথিবীর কোথায় যেন।

রাত গভীর হলেই ভাবি
জলের উপরে যে মানুষ ভাত রেঁধে খায়, সে নুহ।
তার পা ধরে সেলাম করলে প্লাবন থেকে মুক্তি পেতাম
মুক্তি পেতাম প্রোটিন ডেফিসিয়েন্সি থেকে
খুঁজে পেতাম ওই ঘাই মারা মাছগুলো;

বুঝতে পারতাম তেঁতুলও একটা সিমিলি।

 

বাবা ও কাকতাড়ুয়ার ছায়া

নিশুতি রাতের ফেরায় তোমাকে পেতাম না বলে—
কেন জানি ভোরের আলোটা এত উজ্জ্বল হতো।
পায়ের গোড়ালি হতে খেলে যেত রক্তের উচ্ছ্বসিত
রংয়ের ফোয়ারা, ঘুমের ভেতরেও কেউ চেয়ে আছে মুখের
ভূগোলে, অসীম মায়ার মমি;
নিঃশব্দে বলে যাচ্ছে মনের লিরিক। গেয়ে দিচ্ছে সব সুখ
উপচানো গান, সাথে নিয়ে জেগে উঠছে অনেক প্রজাপতি।

এখন নিশুতি রাতের কালে;
আমার রক্তেরা কেবলই জলের জাতক হয়ে
প্রবল বৃষ্টিতে পাহাড়ি কান্নার মতো ছোট নদীতে
মিশে যেতে চায়; যেখানে বাবা হয়তো খুব ভোরে চলে গিয়ে
কোনো নিভৃত কোণে খুব নিশ্চুপে ঘুমিয়ে আছে ব্যথাতুর
একাকী পাহাড়; যে কোনোদিন জাগবে না আর
শৈশবের রঙিন ঘুড়িটি আমার।

 

বিড়াল

একটা কালো বিড়ালের ছায়ার দিকেই
সে রাতে ব্রুনো আর সক্রেটিস আতংক নিয়ে চেয়েছিল,
যেন তা বিভীষিকার দেয়াল।
এদিকে আমরা চমৎকার বেড়ে উঠি সবজি খেত; দ্রাক্ষার বন; অজস্র আলোর ফোয়ারা।
বুঝি নি কী আতংকে কেঁপেছিল তাঁরা।

বিড়ালটা বহুদূর চলে গেলেও
আলোর বিরুদ্ধে তার সামান্য শরীর
রেখে যায় প্রকাণ্ড ছায়া; আমাদের হেমলক দিন।

 

মেলা

শিশুরা মেলা থেকে পুতুল কেনে,
খেলতে খেলতে পুতুলের সাথে প্রেমে বাড়ে;
প্রতিদিন পুতুলটি পৃথিবীর পাঠ শেখাতে শেখাতে আরো পুতুল
হয়ে পড়ে থাকে রক্তের অসীম তেজের কাছে; নীরব হতে থাকে সম্মোহনের
সমস্ত কড়ি ও কোমল। পুতুলটি হারাতে থাকে প্রতিদিন যেনো অস্ফুট মেঘ;
ক্রমেই আলগা হয় মাটি থেকে রক্তের সবটা অহং;
চোখের সামনে পড়ে থাকে তার লাশ।

শিশুরা চলে যায় অনেক অনেক দেশ; আগামী পৃথিবীতে
রয়ে যাবে মেলার ইতিহাস।

 

ট্রফি

কখনো নাচতে পারি নি
কারণ কখনো নাচতে শিখি নি।
অথচ আফসোসে বহুবার দেখেছি
আমার শৈশবের সেইসব নাচুনে বন্ধুদের গর্বিত মুখ
ভিড় ঠেলে সুদৃশ্য ট্রফিটা উঁচিয়ে নিয়ে গেছে।
এখন দেখি, এ তল্লাটে প্রতিটা মানুষ দিন রাত নাচে; নাচতে হয়।
নেচে নেচে অনেকেই ফতুর হয়ে যায়; অনেকেই সম্রাট।
অনেকে তেমন কোনো ট্রফিই পায় না।

 

বোকা হাঁস

বোকা হাঁস, জানো না বলেই ঝেড়ে ফেলো কয়েক ফোঁটা জল
সন্ধ্যায় পুকুরও তোমাকে চায় না কোনোদিন;
বাকি থাকে অনেক গল্পের রাত,
খুব একান্তে পাতার শীৎকারে তলখোঁজা হাঁটায়
নীরবতার গান। বোকা হাঁস, তুমি সেই সুরের বালও বুঝো নাই কোনোদিন।
কিছু পালক ঝেড়ে তুমি শান্তিতে ঘুমাও।
তখন চাঁদ ওঠে। নাচঘরে নুপূর বাজে।
তখন শুকনা পালকে তোমার, পিঁপড়ারা সঙ্গম করে চলে যায়।
টের পাও না কিছুই। তৈ….তৈ….তৈ….ঘুম ভাঙে ফের।
একবার মনেও হয় না পুকুর তোমাকে
কিছুক্ষণ গিলে রেখে বের করে আনতে পারে;
যেভাবে শিশুর মুখে খেলা করে মার্বেল।
তুমি একটা তেলতেলে ছাগলও;
কোথাও একটা খুঁটি অধিকারে রেখেছে তোমায়
ওসব বোঝো না বলেই এতটা সিংহ তুমি।

বন কিন্তু সবকিছুই বোঝে, মুচকি মুচকি হাসে।

 

ঘোড়া

ঘোড়া চলে গেলে
মাঠের গল্পে আবছায়া জমে;
খুরদাগে কেঁদে উঠে সবুজের প্রাণ।
আর হ্রেষাধ্বনি তার আকাশের সব কথা কেড়ে নিয়ে
চলে আসে পুলকের তেপান্তরে;
নাম ধরে ডেকে ডেকে করুণ সেতার বাজে সবটা বিকাল।
পোতাশ্রয়ের কাছে জলের আঁজলাখানি
ভেঙে ছারখার হয়; কাশবনে পূর্ণিমা।

ঘোড়া চলে গেলে
শাপলার সরোবরে আগুন থামে না
মাঠের আদর সব দূরে চলে যায়।

 

ব্রহ্মাস্ত্র

নীরব মাঠে কলসিন্দুরের মেয়েরা ফুটবল খেলেছিল একদিন,
তাদের পায়ের নিচে দেবে যাচ্ছিল ঘাসের স্যাটায়ার;
পৃথিবী মুগ্ধ হয়ে দেখছিল তাদের প্রতিটা লাথি।

তারপর একদিন সব অভিমান ভুলে
ঘাসে ঘাসে কোপার্নিকাসের আংটির
অগুনতি উজ্জ্বল পাথর ছিটিয়ে দিয়ে পৃথিবী বলল—

মেয়েরা শোনো, আমাকে তোমরা মুক্তি দিয়েছ
বিনিময়ে বলছি, পা দুটোর যত্ন নিয়ো
ওগুলোই এযাবৎ আাবিষ্কৃত মোক্ষম ব্রহ্মাস্ত্র।

 

মেহগনি ছায়া

মেহগনি আড়ালের মেঘ
বড় সবুজ সবুজ হয়,
পাতার তলের পোকা
আমি থেকে যাই।

তোমার চোখের নাচে
যেন একচালা রোদের আবাসবাড়ি,
পুুরুষ্টু পুরুষ পোকা
একা হলে বুঝে
নীরব ঠোঁটের পাশে
চিকন শরীর কোনো
কেন তরবারি।

তাই শেষ বিকালের আগে
মেহগনি ছায়ার আড়াল
গায়ে মেখে কোনো ঘোড়া
কোনোদিন রেস জিতে নাই।

 


ব্রহ্মপুত্র


তেত্রিশ

মাঠের গোধূলি আমি বুনে যেতে যেতে দেখি,
কাচের টুকরোতে জমে যাচ্ছি আলোর নাচন;
কী এক প্রশান্তির নিরেট বুকটি তোমার;
কবাট ভেঙেছি কবেই, ছুঁয়ে দিতে বিরান পথের সুখ।
মরে যাওয়া সময়ে, শুনে নিতে জলের শিথানে কোনো উবু হয়ে
বয়ে যাওয়া বাঁশের পাতায় লাগা সুরের রোদন। আলোর
প্রান্তদেশে শালুক তুলতে আসা শ্যামলা মেয়ের মুখে
ঘোর লাগা গ্রামের সবুজে রয়ে গেল আকাশের অব্যক্ত কথার লাটিম।

ঘুরে ঘুরে ফিরে আসি এখানেই—মর্মর ধ্বনির জীবন,
যেন একটি রেখার সাথে জুড়ে আছি অযুত-নিযুতকাল অমল সুখে
বালুর ভেতরে বুনো হাঁসদের কাদাজল খেলায়।
ফিরে আসি মানুষের বেদির বাগানে,
মাংসাশী হৃদয়ের হাঁ-মুখের কাছে।
পাশে ফেলে আসি তাবৎ ঝিলিক ও মহুয়ার মন;
যাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে সাগরকে রুপার পরশে বাঁধো
অসীম স্রোতের টানে।
যেভাবে ভেসেছে সেই বিনোদিনী চিরকাল রাইয়ের আদলে

 

চৌত্রিশ

দূরে জ্বলে থাকা তারার আলোয়
প্রিয় দিন নেমে আসে খুব নীরবে, আমাদের মনে।

প্রলয়ের বিমোহিত হলুদ পাতারা উড়ে যায়—শব্দের লাশ;
যেন কারো কারো উজানের চিঠি। ভাটির নগরে চেয়ে আছে
ভুলে যাওয়া লাল চিঠিবক্স, জংধরা তালা।
চাঁদ ও সন্ধ্যার একলা সারস অনেক অনেক পথ হেঁটে যেতে
যেতে খুঁজে পায় পদ্মাবতীর হাসি
পৃথিবী নুইয়ে গেলে শ্রান্তির পরে, পাড় ভাঙে জল
আর জলের নিয়মে ভাঙি আমি।

 

পঁয়ত্রিশ

হাড়ের শ্যাওলাগুলো
ঘষে ঘষে পেয়ে যাই তোমার সাক্ষাৎ;
দেখি কাশফুলে লুকিয়ে আছে
জীবনের সবখানি দেনার যাতনা, ঠিক যেন মৃত কোনো
হাঙরের দাঁত।

এই পথে ভরাকালে
চাঁদ সওদাগর কবে এসেছিল
জ্যোৎস্নায় ভিজে?
আজো বালিতে বেজায় দাগ;
অপ্সরীর রঙের জরিতে নাচে চিকন আলো!

হাড়ের শ্যাওলাগুলো
ঘষে ঘষে পেয়ে যাই লখিন্দরের দেখা, বেহুলার গান।
ওগো প্রিয় নদ, তুমি পলিতে ছিটিয়ে রাখো রক্তের ধান।

 

আটচল্লিশ

আমি তুলে রাখি;
তুমি ফেলে রাখো
শস্যখেতের পাশে মেঘ, ঠাকুরদার ঘামের কাপড়ে জমা লবণের
দাগ।

আমি চেয়ে দেখি, তোমার বিমর্ষ বর্তমানতার টুপটাপ শব্দের
ফাঁকে উঁকি মারে রুপালি মাছের আঁশটে শরীর; উজান সন্ধ্যার
কালোরঙা হাতির মতন ঢেউয়ে ভেসে যাচ্ছে
সব অনিচ্ছার লাশ।

আমি শুনি,
সেই মাঝি বউয়ের কান্নাভেজা রাতের অভিমান
একবার জলের বুকে মাথাপাতা মানুষ ভাঙা পথে ফিরলেও,
ফেরাটা হয় না তেমন।

আমি এমন অনেক কিছুই তুলে তুলে রাখি
যা তুমি আজন্মকাল ফেলে রেখে যাও,
এবার ফিরেও দ্যাখো না পিছন।

 

উনপঞ্চাশ

কোনো প্রত্যাশায় বাঁধি নাই ঘর
উঠানে কেবলই আসে প্রতীক্ষার মেঘ।
ইন্দ্রজালে পুড়ে যায়, এমন আগুন জ্বলে সলতের পাকে।
ছাই ওড়ে সন্ধ্যায়। প্রিয় ছাই উড়ে যায়, ধোঁয়া পড়ে থাকে
ধূমায়িত পৃথিবীতে, আমাদের বুকে।
বুঝি না কখন গোধূলি জড়াতে চায় ভোরের মায়ায়;
বর্ণান্ধ জীবনের আবছা ছায়ায়।

কোনো প্রত্যাশায় বাঁধা হয় না। তাই বাঁধি না তো ঘর।
তুমিও বোধ হয় না, গড়িয়ে যাচ্ছ জল প্রাণের ভেতর।

 

পঞ্চাশ

প্রাণের সুগন্ধি তুমি
মৃত্যুহীন বেঁচে আছি
গায়ে মেখে অমলিন সুখ।
দুপুরের নীরবতা জল ফেলে তুলে আনে
ভিজে যাওয়া চাঁদ, ভুলে যাওয়া মুখ।

আমি দেখেছি এখানে প্রতিটি রাত
অভিসারে প্রিয়ার চোখের মতো
লজ্জায় ঢাকা থাকে, কাঙ্ক্ষিত ঝিনুকের ডালা।
ব্রহ্মপুত্র, এক বাধাহীন রাসলীলাভূমি, ধুয়ে দেয় অনায়াসে
শরীর তোমার, আমার আগুন লাগা সব কথামালা।

 

একান্ন

অভ্যাসবশত এখনো বোধ হয়
কেউ কেউ আসে, ফিরে আসে, খুব ধীরে আসে—
খুব তীরে আসে। চুপচাপ বসে।

অভ্যাসবশত আমিও বোধ হয় যাই
পানসি নাই, সাঁকো নাই, রাস্তার শরীর নাই
তবু যাই, যেতে পারি আড়াআড়ি,
সাথে একলা শালিক হাঁটে তাড়াতাড়ি।

এভাবেই কিছু অভ্যাসের ভেতর
সময়কে থামিয়ে দিতে চাই।

প্রতিদিন একই রকম, প্রশ্ন নেই, উত্তর নেই
শুধু মুগ্ধতার ছবিগুলো স্থির।
খেলা করে অস্থির জলের যৌবন, যেন ত্রিকালদর্শী
এইসব বটের পাতা।

 

বায়ান্ন

এখানে মানুষ আসে না, গন্ধের
রুপালি আঁশে লুকানো মাছজীবন; ছুটে ছুটে ফেলে রাখে
সুখের অসুখ।
ফেলে যাওয়া, যাতে বহুদিন পর কয়েকটি সাদাকালো
সকালের সজীবতায়, চোখের সামনে ফ্ল্যাশব্যাকে দৌড় দেয়
সেই সব কাছিমের মতো কিছু গানের ভাসা ভাসা ভাষায়,
আমাদের মনের কথাটি বলতে না পারার করুণাকিরণ।

জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে কেবলই যাচ্ছি ফেলে ক্ষয়িষ্ণু চাঁদের আমল;
আমাদের মুখের ও সুখের স্বরূপ।

জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে শুধুই জড়িয়ে যাবার ব্রতে
বৃথা কুঞ্জবনে রেখে দিচ্ছি কত সব জাবরকাটা হাসি,
মায়াবী আঁধারে তোমাকে শাশ্বত ভেবে নিয়ে চলে যাচ্ছি
আশ্বাসের সবজিখেতের আলপথ ধরে।

একদিন ফিরে এসে তোমাকে পাব গহিনে আমার
মাঝখানে একাকার মিশে যাব; জল আর পাতার ছায়া।
তুমুল চুমু খেয়ে থামিয়ে রাখব কিছুদিন
সময়ের ভোঁদড়ের রীতি। যদিও জানা আছে ভোর হলে, পাখি ডেকে গেলে,
তুমি থাকো না কারোর। না আমার। না তোমার।

তবু এরকম নিয়মের মাঝেই,
এসব বিকাল, সন্ধ্যায়, ভোরে তোমাকেই খুঁজে পায় মানুষ;
যদিও আমরা, কেবলই টুকরো টুকরো কিছু গন্ধের আঁশে
লুকানো জীবন, যেন একটি মাছ।

 

তেপ্পান্ন

মনস্তাপহীন কোনো ভালোবাসা, ভালোবাসা না।
সন্তাপ নিয়ে যদি ফেরো কোনোদিন;
শীতফুল, সাইবেরিয়ার পাখি, এসব নীল পদ্মের
চুপটি চেয়ে থাকায় পেয়ে যাবে সেটুকু ফুরসত
যেটুকু পেলে মৃত্যুকে চুমু খেতে বিশেষ আপত্তি বলে
কিছুই থাকে না বাকি।

আমাকে একদিন ধুয়ে নিয়ো
বিবর্ণ ভোরের কালে; সব রংচটা পাপ।
চিটচিটে হয়ে গেছে হাত, কলিজা ও করোটির খাপ।
মন বলে যদি কিছু থাকে তা-ও রেখেছি ফেলে
স্রোত নেই এমন কোনো জলশূন্যতায়।
কুয়াশায় বেঁচে আছি। ভেতরে লুকিয়ে মৃত মৃত কোষ,
কিছু শীতফুল চিরকাল পাড়ে জন্মায়।

মনস্তাপহীন ভালোবাসা, কোনো ভালোবাসা না।

আমাকে ধুয়ো না সখা স্পর্শের সব পাপ থেকে
যদি পারো রেখে দিয়ো সেরকম দাগ আরো কিছু।
আবারো তোমাকে চাই, একবার খুব কাছে;
দূরে থেকে, রেখে।

 

চুয়ান্ন

হাতের রেখায় তোমাকে বয়ে নিতে চাই
আমার অবাধ্য আঙুলের অসমতা।
অনেক চেষ্টায় বুঝেছি, কিছু
সমীকরণ আমাদের বয়ে নিতে চায় হেমন্তের কাছাকাছি;
কিছু সমীকরণ আমাদের দূরের কাশফুল-ঢেউ মনে করিয়ে
দিতে চেয়েও ব্যর্থ হয়ে ডুবে যায় কার্তিকের মেঘে। আসলে
হাতের রেখায় আমি মূলত আমার লাশটার অটোগ্রাফ রেখে
দিতে চেয়েছি।
আপেলের মতো জীবনে লাবণ্য একটি রোগের নাম।

তুমি নিঃস্পৃহতার এত ছল কেন জানো;
আমি গোলাপি রং অলিন্দে মেখে
মাকে দেখতে চাই কতটা ভেসেছিল তার ফিনকি দেয়া রক্তের
ফেনায় পরশুরাম আর আমার পার্থক্যগুলো।

পরশুরাম, দীর্ঘায়ু হও
কিছু পাপের জন্মই হয় আমাদের পুণ্যস্নানের জলে।

লুকিয়ে লুকিয়ে দেখি প্রেম, দেখি কুঠার
দেখি বালুর মহালে ঢুকে যাচ্ছে একধরনের পাখি
দেখি, হাতের তালুতে কোনো নদীর আশা নিয়ে তাকিয়ে থাকছি দূরে
দূরত্বই যেন জীবনের পুরোটা সঞ্চয়।

Nihar Likhan

নীহার লিখন

জন্ম ৩ অক্টোবর; শেরপুর। ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশা : অধ্যাপনা (মার্কেটিং)।

প্রকাশিত বই—
ব্রহ্মপুত্র [কাব্য; মেঘ প্রকাশন, ২০১৭]
আমি আপেল নীরবতা বুঝি [কাব্য; প্রিন্ট পোয়েট্রি, ২০১৭]

সম্পাদিত ছোটকাগজ : উৎপথ

ই-মেইল : niharlikhan@gmail.com
Nihar Likhan

Latest posts by নীহার লিখন (see all)