হোম কবিতা দুইটি পাণ্ডুলিপি

দুইটি পাণ্ডুলিপি

দুইটি পাণ্ডুলিপি
971
0

কবি ও বাচিকশিল্পী রবিশঙ্কর মৈত্রী বর্তমানে প্রবাসী। আছেন ফ্রান্সে। এবারের বইমেলায় প্রকাশিত হচ্ছে তার একাধিক বই। কবিতার বই দুটি—যিশু হলেই ক্রুশবিদ্ধ হতে হয় এবং কথাবুদ্ধ
পাণ্ডুলিপি থেকে কিছু কবিতা পরস্পরের পাঠকদের জন্য…


যিশু হলেই ক্রুশবিদ্ধ হতে হয়


অনির্বাণ

তর্জনী মরে গেছে গতকাল,
আজ সকালে কনিষ্ঠ।
ডান চোখ লাফাচ্ছে খুব
মা যেন কী বলেছিল
মনে পড়ছে না ঠিক—
হয়তো বড় কোনো বিপদের আশঙ্কা
ঝুলে আছে কড়িকাঠে।

আমাকে মৃতের বিছানায়
শুইয়ে দিয়েছি গত বছরের আগে।
মরা আঙুল মৃত চোখ
বিদীর্ণ বক্ষ নিয়ে বসে আছি
বোধিবৃক্ষের নিচে।

আমার দিবা রাত্রি হচ্ছে
আহ্নিক-নিয়মে;
নির্বাণব্যর্থ অনির্বাণ আমি
তোমাদের প্রাণাধিক প্রিয় হব বলে—
আমি অপার হয়ে বেঁচে আছি।

 

যিশু হলেই ক্রুশবিদ্ধ হতে হয়

হে আথেন্সের অধিবাসীবৃন্দ—
আমি আজও বলি
আমার কোনো জ্ঞান নেই
কিছুই জানি না আমি—এইমাত্র জানি।
তোমরা যে কিছুই জানো না,
তোমরা তাও জানো না।
আমার জানা ছিল না
তোমরাও ভাবতে পারো নি
আবার একদিন আমার জন্য বসবে
বিচারসভা।

শুনতে পাচ্ছ হে পরমবাদী অ্যানিটাস—
দুই হাজার চারশো পনের বছর পর
তোমাদের অভিযোগ আজ মিথ্যা প্রমাণিত হলো;
মিলেটাস, লাইকন, তোমরা ক্রোধ কোরো না,
হেরে গেলেও ক্রুদ্ধ হতে নেই।
যদি আত্মাকে শুদ্ধ করতে চাও,
দৃঢ়কণ্ঠে বলো—
আমি অক্রোধী আমি অমানী
আমি নিরলস কাম-লোভজিৎ-বশী
আমি ইষ্টপ্রাণ সেবাপটু।’
সকল প্রাণীর ইষ্টই আমার আমার ধর্ম।

হে আথেন্সবাসীবৃন্দ—
ডেলফি থেকে আমার বন্ধু চেরোফেন
দেবতার যে দৈববাণী নিয়ে এসেছিল
আমি তা আজও বিশ্বাস করি না,
আমার অধিক জ্ঞানী ব্যক্তি নিশ্চয়ই
এই পৃথিবীতে বর্তমান;
কিন্তু আমি তাঁকে চিনি না এবং
তোমরাও তাঁকে দেখো নি, আজও।
মাননীয় বিচারকগণ, আপনাদেরকে ধন্যবাদ
আজ আবার প্রমাণিত হলো—
আমি কারো অনিষ্ট করি নি—
আমি প্রচলিত দেতাদের উপেক্ষা করি নি
আমি নতুন নতুন দেবতার প্রবর্তন করি নি
যুবকদের আত্মাকে আমি কলুষিত করি নি।
আমি কেবল প্রকাশ্য পথসাক্ষাতে
বাজারে ও মহাজনের টেবিলে
আথেনীয়গণকে যুক্তি দিয়ে সৎ ও
সত্যের পক্ষে খুব সাধারণ কথা বলেছি।

শুনতে পাচ্ছ অ্যারিস্টোফিনিস—
নাঃ, আমি বাতাসের উপর দিয়ে হাঁটি নি কখনো
নাঃ, আমি মেঘ ও পবন দেবতার পূজারী নই
নাঃ, আমি ভাবনার দোকানদারি করি নি
নাঃ, আমি সুবক্তা ছিলাম না কখনো।
মিথ্যা আবেগভরা মনভোলানো কথা আর
জ্ঞানীর ভান ছাড়া সুবক্তা হওয়া যায়?
আমাকে নিয়ে তুমি ভয়ানক মিথ্যা নাটক
বানিয়েছিলে অ্যারিস্টোফিনিস;
সত্যরে লও সহজে বন্ধু
মিথ্যাকে করো ঘৃণা।

হে আমার শিষ্যবৃন্দ—
আমার মৃত্যু তোমাদেরকে ব্যথিত করেছিল
আমার মৃত্যু তোমাদেরকে মুষড়ে দিয়েছিল
জল্লাদের বিষপাত্র তোমাদেরকে আতঙ্কিত করেছিল।

ক্রিটো, মনে আছে তোমার
কারাগার ভেঙে আমাকে নিয়ে তোমরা
পালাতে চেয়েছিলে; আমি রাজি হই নি।
আমি জানতাম পৃথিবীতে এমন কোনো দেশ নেই
যে দেশে মৃত্যুকে অতিক্রম করা যায়।

ক্রিটো, শেষ মুহূর্তটি মনে পড়ছে আজ—
রক্তমুখ সূর্য বিদায় নেবার সময়
সেদিন আমার মৃত্যুক্ষণ ক্রমে ক্রমে নিকটে আসছিল;
আমার শিশুপুত্রকে বিদায় দিয়ে
আমি তোমাদের দিকে হাসিমুখে ছেয়েছিলাম—
তোমরা সকলে উচ্চস্বরে সেদিন কাঁদছিলে,
কান্না তোমাদের মানায় না বন্ধুগণ,
পরের দুর্দশা দেখে ভেঙে পড়া এলিয়ে পড়া
কারো মৃত্যু দেখে লুটিয়ে পড়ে কান্না করা
—ওসব দুর্বলতা।

মনে পড়ে, সেদিন নির্মম স্বাস্থ্যবান জল্লাদ
পূর্ণপাত্র বিষ এনে বলেছিল—
একফোঁটা হেমলকও যেন নষ্ট না হয়।
নাঃ, আমি সম্পূর্ণ বিষ পান করেছি,
একটুও নষ্ট করি নি।
ক্রিটো, তুমি তো জানো
সেদিনের সেই বিচারসভার
শত শত মুখভরা বিষের চেয়ে
জল্লাদের হেমলক ছিল অমৃতসমান।

বিষপান করে জল্লাদের নিষ্ঠুর অনুরোধে
আমি তোমাদের সামনে পায়চারি করছিলাম
আর আমার সারা দেহে বিষ ছড়িয়ে পড়ছিল;
আমি অসাড় হতে হতে বুঝতে পারছিলাম
আমার দেহে তখনো বেদনার অনুভূতি আছে
যতক্ষণ বেদনা আছে, ততক্ষণ সৃষ্টির আনন্দ বর্তমান
—আনন্দই মৃত্যুহীন আত্মার প্রাণ।
হে আথেনীয়গণ—
আত্মার মৃত্যু নেই,
সত্য ও সূর্য অস্তহীন, চিরন্তন;
আজ আমি আমার আত্মার পক্ষ থেকে
তোমাদেরকে ধন্যবাদ জানাই।

প্লেটো, জেনোফেন—
বিশ্বসভার সুবিচারে আমি আজ আনন্দিত,
আমি আজ পাহাড়বিদীর্ণ ঝর্নার গান;
ওই দ্যাখো, গ্যালিলিওর পরম সূর্যালোকে
জ্বলজ্বল করছে তোমাদের অনুলিখন;
বিচারসভার জবানবন্দি আজ আবার
উচ্চারিত হচ্ছে পথে পথে, সমস্বরে।

হে বিশ্বনাগরিকবৃন্দ—
আমি আজও বলি
আমার কোনো জ্ঞান নেই
কিছুই জানি না আমি—এইমাত্র জানি।
তোমরা যে কিছুই জানো না
তোমরা তাও জানো না।
আমি জানি—
সক্রেটিস হলেই বিষপান করতে হয়
যিশু হলেই ক্রুশবিদ্ধ হতে হয়।

আজও একই মাটিতে বিষ ও অমিয় ফুল ফোটে,
অগণিত সক্রেটিস বিষপানের জন্য প্রস্তুত হয় এখনও।
আজও অগণিত যিশু ক্রুশবিদ্ধ হবার জন্য
সারিবদ্ধ দাঁড়ায় অকুতোভয়;
মানুষ কাঁটার মুকুট পরে
কেঁদে কেঁদে শুদ্ধ সুন্দর হতে চায়।

পৃথিবী নরক ছেড়ে কোথাও যাব না

চন্দন কাঠের সাজানো চিতায়
ঘি-উৎসারিত আগুন জ্বলছে দাউ দাউ
রাশি রাশি বীভৎস উল্লাস পুড়ছে,
ধোঁয়া উঠে যাচ্ছে স্বর্গের দিকে—
আমি ফিরে এসেছি
আমার আজন্মলালিত প্রিয় নরকের কাছে।

নরকের মৃত্যু নেই
নরকই বিশ্বস্ত ঠিকানা আমার।
স্বর্গে কোনো শাস্তি নেই
ক্ষমার স্বর্গকে আমি বিশ্বাস করি না,
স্বর্গে পূর্ণমূল্য শোধের সুযোগ নেই।

ফড়িঙের মতো আমাকে যারা ছিন্নভিন্ন করেছে,
অচেনা স্বর্গে আমি তাদেরকে খুঁজে পাব না,
আমি নরকের কীটপতঙ্গগুলোকে
পোড়াব এখানেই;
পৃথিবী নরক ছেড়ে
আমি কোত্থাও যাব না।

 

ঈশ্বর ও শয়তান

ঈশ্বরকে ডাকলাম, একটি কুকুর সাড়া দিল। কুকুরটিকে আমি ধমক দিয়ে সরিয়ে দিলাম। সে ঘেউ ঘেউ করে চোখের আড়ালে চলে গেল।

আবারও আমি ঈশ্বরকে ডাকলাম, এবার একটি বিড়াল এসে আমার গা ঘঁষতে লাগল। আমি বিরক্ত হয়ে লাথি মেরে তাকে সরিয়ে দিলাম।

এবার আমি শয়তানকে ডাকলাম। না, কেউ এল না। কিছুক্ষণ পর আবারও ডাকলাম—এবারও কেউ এল না—না কুকুর, না বিড়াল।

শয়তানকে ডাকতে ডাকতে আমি রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম। আমাকে দেখে কুকুরটা দৌড়ে পালালো। আরো একটু হেঁটে গিয়ে দেখি সেই বিড়াল, সে আমাকে দেখেই একলাফে গাছে উঠে গেল।

 

প্রার্থনা

অদৃশ্যমান কোষ, স্নেহ এবং রক্ত পরম্পরা বারবার ফিরে আসে। জগতের সকল নকল সদৃশ্যমানতায় মগ্ন হয়ে নগ্ননৃত্য দেখে দেখে কী মদির ভুলে থাকার ছল, তবুও।

লো গারদোঁর জলের দিকে চেয়ে চেয়ে আমার এখন মাতৃনদীকেই মনে পড়ে। ফুলেশ্বরী—সতত তুমি উষ্ণ জলের স্নেহকেলি।

লো গারদোঁ নদ, তোমার অতিস্বচ্ছ জলে আমার মাকে দেখতে গিয়ে কেবলি শাদাকালো পাথর দেখি, কেবলি রঙিন মাছের সাঁতার দেখি—

এখন আমি আর সেই ছোটটি নই; কোনো রঙিন আইসক্রিমে আমার আর মন ভোলে না।

হে সিভেন পর্বতমালা—যদি পারো, তোমার আকাশসমান মাথাটা নিচু করে মাঝে মাঝে আমার মাতৃভূমিকে দেখতে দিও।

 

অভিমান

জলেই শুধু জল থাকে না;
ফুলে এবং ফলেও থাকে
পাতায় এবং খাতায় থাকে
অকূল সে জল তোমার চোখে
কাতর চেয়ে বৃষ্টি হয়ে
জল ভেসে যায় জলের স্রোতে।

 

ঘরের চাবি

খরার আগে তৃষ্ণা জাগে
মেঘ চিনি না, তোমায় জানি
আদরবৃষ্টি ভিজে আসি।

আমার ইচ্ছে এবং স্বপ্ন
আমি শুধুই জানান দিই
চাবি তোমার হাতেই থাকে।

 

আমার পৃথিবী

আমি তখন বিরাট শিশু
তুমি ছিলে ছোট্ট আকাশ
আমি যখন ঘুড়ি হলাম
তুমি দিলে গভীর বাতাস।
আমি এখন উপগ্রহ
তুমিই আমার এক পৃথিবী।

 


কথাবুদ্ধ


প্রেমময় তুমি এবং কবিতা

১.
সাত আসমান ছুঁয়ে ছুঁয়ে তোমার চিঠি আসে। উত্তরে বিলম্ব ঘটলে মেঘে মেঘে বর্ণমালা ভিজে যায়। যখন খুশি তুমি ডাকো ওপার থেকে। তুমি আমি যোজন যোজন দূর থেকে বাক্য রচনা করি। কোনো লাবণ্য না ছুঁয়ে আমরা সম্মোহিত হই। সকল উষ্ণতা শাসিত সম্মোহন-পদাবলিই আজ আমাদের উত্তর আধুনিক প্রেম, তোমার আমার নিষ্কাম মুগ্ধতা।

 

২.
যেতে যেতে পথ শেষ হয়ে যায়, যাওয়া শেষ হয় না। ঘাট বসে থাকে, নৌকা ওপারে। পার হলেই নতুন পথÑ এই অপার হয়ে বসে থাকাটাই প্রেম।

 

৩.
একজোড়া শঙ্খচিল জলকেলি করছে, আমিও। কোথাও তুমি যাচ্ছিলে, যাওয়া ভুলে গিয়ে কী দেখছ তুমি? শঙ্খচিল নাকি আমাকে? আমি কি সুখ? আমি কি পিঞ্জিরা? নাকি শঙ্খচিল? না আমি, না শঙ্খচিল—তোমার যাওয়া ভুলে যাওয়াটাই অনুরাগ।

 

৪.
কেবলি আত্মরতি, নিজেকে নিয়ে দিনরাত্তির বিভোর হয়ে থাকা, সুখ রচনার বেহায়া ইতর বাসনা—কামনার জলকেলি ইচ্ছে সারাবেলা;—প্রকাশ্যে এবং গোপনে কামনা চরিতার্থ না-হলেই ক্লান্তি, হতাশায় আত্মনিমজ্জন।
এই বেলা রচনা করো আত্মঘৃণা। নিজেকে ধিক্কার দিতে শিখে নাও। নির্লজ্জ ইচ্ছেগুলোকে পোড়াও দুপুরের গনগনে রোদে—আত্মরতি থেকে বিরত হয়ে তুমি লজ্জিত হও, পরিশ্রান্ত হও, পৃথিবীর পথে পথে ঝরাও বিন্দু বিন্দু স্বেদ—
এইবার তুমি দেখছ মাটি, ঘাস, লতা পাতা ফুল পাখি—
এইবার দেখছ তুমি মাছেরা কেমন বিপরীত স্রোতের দিকে কাটছে তুমুল সাঁতার—এইবার দেখছ তুমি সহস্র সহস্র পিঁপড়ে কণা কণা খাদ্য নিয়ে ছুটে যাচ্ছে, কোথাও ওরা সঞ্চয় করছে কয়েক মুহূর্তের জীবন।

 

৫.
আহার করো আমাকে, বিহার করো আপাদমস্তক। সম্পূর্ণ গ্রহণ করে নিঃশেষে অশেষ করো আমাকে। আলোর বন্যাময় পৃথিবীতে জন্মান্ধ জন্ম আমার তোমারই জন্যে।

 

১৩.
ভালোবাসি তোমাকেই, ভাব দেখাই তোমাকে না বাসলে আমার কী এসে যায়। সিয়েন নদীর কাছে তোমার গল্প বলেছি। সে বলেছে, ফিরে যাও মধুমতির কাছে, শৈশবের জলেকলি কেউ কোনোদিন ভুলতে পারে না।

 

১৪.
মাঝে মাঝে বেঘোর জ্বর হওয়া ভালো, মাঝে মাঝে একটু আধটু মাথাব্যথা। জ্বরের ঘোরে একা পড়ে থেকে একটি হাতের জন্য অপেক্ষা করা আরো ভালো।
মাঝে মাঝে এক-আধবেলা ক্ষুধায় কাতর হওয়া ভালো। ক্ষুধা ও সুধার দুই অভাবই ভুলে গেলে মনে রাখতে পারি না—আমি অতি সাধারণ। আমি প্রবল স্নেহকাতর, আমি ভালোবাসার নুলো কাঙাল। ভুলে যাই—তোমাকে হারালে আমিও প্রাণহীন কারুকার্যময় কাঠের চেয়ার।

 

১৫.
কোথায় হৃদয় আছে জানি না। যাকে আমি নিজেই দেখতে পাই না তাকে তোমায় দেখাই কিভাবে?
গুচ্ছ ফুল, ধাতব অলঙ্কার এবং কালো কাপড় হয়তো-বা কোনো সংকেত তোমাকে পাঠাতেও পারে।

 

১৬.
পাখি উড়বার শক্তি হারালে জড় হয়ে যায়; মানুষ ভালোবাসা হারালে প্রাচীন দালান, ভাঙা জানালা, আর বন্ধ কপাট ছাড়া অন্য কিছুই নয়।

 

শূন্যমাঝে যে বাঁশি বাজে

১.
নিজেকে মন্থন করে যে কথা উঠে আসে তাকে রাখব কোথায়? করোটিই কথা মাধুরীর যোগ্য আধার—অক্ষরই তার সুযোগ্য মাধ্যম।

 

২.
কবির জন্ম আমি দেখেছি। দেখেছি সময়ই কবিকে জন্ম দেয়, কবিও সময়কে। কবির মৃত্যুও আমি দেখেছি। সময় কবির দেহত্যাগ করে চলে যায়, কবিও মৃতঘড়ি হাতে বেঁধে রাখে।

 

১০.
যে বৃক্ষের বক্ষ বিদীর্ণ করে লিখছি
নিজের নাম সাকিন,
সেই বৃক্ষই আমাকে দাহ করবে একদিন।

বিদীর্ণ নাম, বক্ষ, বৃক্ষ, ভস্ম
কিছুই থাকবে না জানি,
তবু আমি নিয়তিনিষ্ঠ,
নিত্য নিরন্তর আমি এক খোদাই কারিগর।

 

১২.
যার মুখভরা আমি আমি,
থাকে না তার অন্তর্যামী।

 

১৬.
সৃজনশীলতায় সবাই একেশ্বর হতে চায়,
ঈশ্বরও দ্বিতীয় কাউকে স্বীকার করে না।

 

২০.

আমরা দুজন একই সঙ্গে হাঁটা শুরু করেছিলাম। একদিন পর হঠাৎ দেখি, পথের পাশে দুটি ঘোড়া আপন মনে ঘাস খাচ্ছে। আমার বন্ধু হঠাৎ একটি ঘোড়ার পিঠে উঠে পড়ল। আমি বোকার মতো থমকে থেমে রইলাম। চেয়ে চেয়ে দেখলাম আমার সঙ্গী দ্রুত বেগে গন্তব্যের দিকে ছুটে চলেছে।

অতঃপর আমি ঘোড়ায় চড়া শিখে এক মাসান্তে যাত্রারম্ভ করলাম।

সাতদিন পর গন্তব্যে পৌঁছে দেখি আমার বন্ধু পান্থশালা নির্মাণ করে আমারই জন্য বসে আছে। সে বলল, দশ স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে তুমি আমার পান্থশালায় একমাস বিশ্রাম নিতে পারো।

পান্থশালা পেয়ে আমি আরো ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। আমাকে আরো অবাক করে দিয়ে আমার বন্ধু একটি ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে নতুন গন্তব্যের দিকে ছুটে চলল। আমি কদিন বিশ্রাম গ্রহণ করে একটি ঘোড়ার গাড়ির বাসনা লিপ্ত হয়ে উঠলাম।

 

২৪.
আজকের ভরা পূর্ণিমায় যে অমলিন চাঁদ দেখে মুগ্ধ হই—পরের পূর্ণিমায় তাকে দেখার আলো কি পাব আমার চোখের তারায়? পরের পূর্ণিমাচাঁদ কি মেঘঢাকা তোমার আঙিনায়?

মরা পাতা, শুকনো ঘাস, ঘোলাটে চাঁদ, চরপড়া নদী, ভেঙেপড়া সাঁকো—আমি তোমাদের কাছে বারবার ফিরে আসি। আমি আর কোথায় যাব? আমাকে ঘুমাতে দাও তোমার বিছানায়।

 

২৬.
শেকড়গুলো এক মাটিতেই আছে,
তুমি ফাঁকা আকাশ আলো পেয়ে
অনেক উপরে উঠে গেছ,
এই দেখো, আমি হাত তুলেছি—
নত না হলে
তুমি আর আমার
আপন হতে পারছ না।

 

২৭.
নরম কোমল সুন্দর ডানা নিয়ে
ধানখেত পরিভ্রমণ শেষে
ফড়িঙ বসেছিল ঝিঙের মাচায়

আহা ঝিঙে ফুল আহা স্বপ্নফড়িঙ
তোমাদের কাঁচা হলুদরঙে
আমি বাবলার আঠা দিয়ে
অমিয় প্রেম বিনাশ করেছি;
আমার সেই শৈশব অপরাধ
পরিণত আজ—আমি অনুতপ্ত
হতে ভুলেছি বারবার
আজ শেষবার মিনতি আমার—
আমার গুরুভার লাঘব করে দাও।

 

৩২.
আমি গাছ লাগাই এবং গাছে ওঠার সামর্থ্য হারাই—এটাই আমার সার্থকতা।

 

৩৫.
আঘাতেই অনুভূতি আরো সজীব হয়ে ওঠে। আঘাতেই তারযন্ত্র মন্ত্রগুণে বেজে ওঠে। কর্ষণ করেই মাটিকে ফসল-ফলন উপযোগী করে তোলা যায়।

আঘাত মানেই ব্যাঘাত নয়। একমাত্র যৌন অনুভূতি আঘাতপ্রাপ্ত হলে ব্যাঘাত ঘটে—এবং সেই ব্যাঘাত থেকেও কবিতা সৃষ্টি হয়।

পরম অনুভূতিগুলি কোনো আঘাতেই আহত নিহত হয় না। ধর্মীয় ও অপার্থিব অনুভূতিগুলোকে কেউ কোনোভাবেই আঘাত করতে পারে না।

একটি পিঁপড়ের কামড় খেয়ে যারা একসঙ্গে সহস্র পিঁপড়েকে পায়ে পিষে মেরে ফেলতে পারে তারাই প্রতিটি আঘাতের বিপরীতে প্রত্যাঘাত করে।

 

৩৮.
ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছি
তোমরা এখনো চোখ বুঁজে আছ
দুচোখ মেলবে যখন
দেখবে তোমাদের পায়ের উপর দিয়ে
মিহিদানা মুখে নিয়ে সারি সারি পিঁপড়ে
ছুটে যাচ্ছে কোনো প্রাচীন বৃক্ষের নিকটে।

দিগন্তের দিকে চেয়ে দেখবে
কেউ একজন ভূমি থেকে দুহাত তুলে
নৈর্ঋত মেঘ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

রবিশঙ্কর মৈত্রী

জন্ম ১৬ ডিসেম্বর ১৯৬৯; মধুখালি, ফরিদপুর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় সম্মানসহ স্নাতকোত্তর।

পেশা : মিডিয়াকর্মী, আবৃত্তিকার, লেখক।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
দুঃখ পরেছে দীর্ঘ পাঞ্জাবি [অনন্যা, ২০০৩]
দস্যুরোদ ভালোবাসি যক্ষমেঘ [অনন্যা, ২০০৪]
আগুনে আগুনে পুড়ছে আলো [অনন্যা, ২০০৫]
বুকের ব্যথাটা বেড়েই চলেছে [অনন্যা, ২০০৬]
রাত গেল রাত্রিলিপি লিখে [অনন্যা, ২০০৭]
পুনরায় প্রেরিত ঈশ্বরের চিঠি [অনন্যা, ২০০৮]
খোলা জানালা বন্ধ আকাশ [অনন্যা, ২০০৯]
কাঁটাতারে গাঁথা বিষাদবিন্দু [শব্দশৈলী, ২০১০]
নির্বাচিত একশো কবিতা [বিভাস, ২০১২]
বাছাই কবিতা [সাংস্কৃতিক খবর, কোলকাতা, ২০১৩]
একলা সুখের শূন্য দুপুর [শব্দশৈলী, ২০১৪]
বোতাম খোলা নোনা হাওয়া [শব্দশৈলী, ২০১৫]
মনভাসির টান [শব্দশৈলী, ২০১৬]
যিশু হলেই ক্রুশবিদ্ধ হতে হয় [পাললিক সৌরভ, ২০১৭]
কবিতা সমগ্র প্রথম খণ্ড [পাললিক সৌরভ, ২০১৭]

উপন্যাস—
জলগৃহ [আগামী প্রকাশনী, ১৯৯৫]
জলের সঙ্গে অভিমান [র‌্যামন পাবলিশার্স, ২০০৬]
মেয়েটি কবিতার সঙ্গে ছিল [শব্দশৈলী, ২০১১]
প্যারিস থেকে ফেরা না ফেরা [সব্যসাচী, ২০১৭]
যাও, কিছু রেখে যেও না [আলোকায়ন, ২০১৭]

দর্শনকাব্য—
পাখিবাগান [চারুলিপি, ২০১৫]
মুক্ত মানুষ [পাললিক সৌরভ, ২০১৬]
Hamming Harmony [চারুলিপি, ২০১৪]
The Songs of Blooming [পাললিক সৌরভ, ২০১৬]


বাংলাভাষা বিষয়ক—
দেশি বাংলা শব্দের অভিধান [অনন্যা, ১৯৯৮]
বিদেশি বাংলা শব্দের অভিধান [অনুপম, ১৯৯৯]
আধুনিক বাংলা বানান-অর্থ-উচ্চারণ অভিধান [অনুপম, ২০০০]
আমরি বাংলাভাষা [আজকাল, ২০০৬]
লালন শব্দকোষ [র‌্যামন পাবলিশার্স, ২০০৮]
বাংলা উচ্চারণের নিয়ম [শব্দশৈলী, ২০০৯]

আবৃত্তি বিষয়ক—
আবৃত্তির সহজপাঠ [রেয়ার বুকস, ১৯৯৭]
এই বইটি আবৃত্তির [অনন্যা, ২০০০]
সুন্দর কথা বলবেন কীভাবে [শব্দশৈলী, ২০০৯]
আবৃত্তি ভাবনা [শব্দশৈলী, ২০০৮]
আবৃত্তির নতুন পাঠ [চারুলিপি, ২০১৭]

ভ্রমণ—
বাল্টিক সাগরের এপার ওপার [শব্দশৈলী, ২০১৪]
ফাদার মারিনো রিগনের গ্রাম ভিল্লাভেরলা [শিল্পৈষী, ২০১৭]

জীবনী—
মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধু [আজকাল, ১৯৯৯]
ছোটদের রোকেয়া [অনুপম, ২০০০]
ছোটদের অনুকূলচন্দ্র [সৎসঙ্গ, ২০০১]

ই-মেইল : rsmaitree@gmail.com

Latest posts by রবিশঙ্কর মৈত্রী (see all)