হোম কবিতা দীপান্বিতা সরকারের কবিতা

দীপান্বিতা সরকারের কবিতা

দীপান্বিতা সরকারের কবিতা
1.11K
0

আরোগ্যশিবির


কখনও চাকায় নেশা
যাতনার ক্রোশপথ হেঁটে এলে প্রাণ
পাতা মেঘারণ্যে, পাতা দেহমুক্ত স্তূপ
শতনাম পেরিয়ে এলাম।
মন্দিরপ্রাঙ্গণে একা তিলার্ধ তুলসী সাঁঝ, দ্যাখো
সুদূর অদৃষ্ট হতে চক্ষুচঞ্চু শুষে
কৃষ্ণঅমানিশা, শরীরী বিস্ময় যেন!
জেগে ওঠে অন্নপূর্ণা, অন্নহাহাকার
অনেক অপেক্ষা পার, খেয়া সম্ভাবনা
নদী তবু, বছরবিয়োনি
মানে না সমাপ্তিশোক
একটি ঘুড়ির শুধু চাহনির মাঠ
তারও ছিল তৃণের বাসনা।

 


তার কাছে আলপথ, খেজুর পাতার ভিক্ষাপাত্র, মিনতির
মুঠি ধুলো, সাজটিও রোদে তাপে ফেরে
বিরহললাট সেই
আকাশে আকাশে আঁকা ঘনরক্তঘোর
অগোচরে পাড় ভাঙে পৃথিবীর নদী
দু’পাশে জঙ্গল। ফিরে এসে
সে দেখেছে গ্লানির ভিতর
চিৎ হয়ে, দীর্ঘ চাঁদ, খায় বিদ্যাধর

 


ভূষণে কী কাজ বলো আর?
আয়ুর সমগ্রে নামে ঘুম
সে রিনরিন ছায়ার অতীত
আগাছায় ঠোঁট রেখে চাও
অজান্তেই নিটোল বাতাসে
দূরের আকন্দবনে, বাজো…
রোগ ছুঁয়ে চাক্ষুষ দেখেছি
মুছে গেছে শিশিরের ছাপ—
তবু জেগে কুয়োর গভীর
যেন কোন দেশ, জনপদ
সেতুর ওপারে রঙ, বিগতউল্লাস
রোয়াকের ধারে ধারে বাতিল উনুন
ধিকিধিকি কত রাত শিরাতন্তুজাল—
ক্ষত বয়ে নিয়ে, বয়ে বয়ে
বজ্র দিয়ে লিখেছে তিলক!
শীর্ণকায় নদীর চড়ায়
নিসর্গমলিন আলো,
যে হেমন্ত পাক খেয়ে থেমেছে নির্জন গোলাঘরে
ভেসে ওঠো মৃত্যুমায়া ও-গর্ভকেশরে

 


এ সমুদ্র আরোগ্যশিবির।
ঔরসের তিথি মেনে স্নানপর্ব
পিছনে প্রশাখা।
কুড়িয়ে প্রসবরেণু, অতিদূর ঝাউবন, বালুকা-সকাল…
ওপারের আলো
নরমে এলিয়ে মেশে বৃন্তখসা মায়াদুধ,
পুঁতে রাখা, বিশালাক্ষ মায়া!
লোভ জমে ফুলেদের বুকে।
উন্মাদ লেখনি থেকে নক্ষত্রসজল
তীরবেগে আয়ুরেখা ধরে টান মারে
সীমান্ত শিয়রে তার ভাসা ভাসা পাঠ
ওষুধ শিকারে ফেরে অকূল নিয়তি
আড়ালে অস্থির ডানা,
ঝরো শান্তি
রতির সমুদ্রে টানে,
টেনে নেয় শেষ সে আজানে।

 


রাতের বাঁশরি আজ
সাগরের দেহপট ছেড়ে,
শিথিল আশ্রয় চায়।

এই ক্ষয়ে

এমন সময়ে
ছিন্ন করো নাও—,

জলরঙে ভাসো একা

এ-ভ্রম সঞ্চয় !

 

উৎসব


লোভের ফুলগুলি জ্বলে একা বনপথে… বাতি হয়ে জ্বলে আর প্রতি শ্বাসে ভেঙে পড়ে এক একটা মন্দির আর ফুটে ওঠে অন্য আর একটা, পোড়ো জঙ্গল ঘেরা। তুমি তাকে উদ্ধার করো, স্বপ্ন, তুমি তার পাঠোদ্ধার। কোনও কোনও শীতভোর ওই লেগে আছে এক দেবশিশুর টুপিতে মোজায়, সে তোমার হাত ধরে চলেছে অগম বেলার দিকে, তুমি তার ডালপালা ধরো। আর ঘরগেরস্থালি নিয়ে অন্য অন্য কেউ উৎসব সাজাক।

 


লাল শাড়িদের পাশে এক একটা কান্না জেগে থাকে, শিশুকান্না। জেগে থাকে রসগন্ধ, পাখপাখালির ডানা… তুমি কি রেললাইনও দেখতে পাও? দেখতে পাও, সে এখনও এখনও খুব ছোট আলুথালু, তার দুই চোখ, কিছুমাত্র বয়স বাড়ে নি যার… সে কী করেইবা কোলে নেবে এত কান্না, শিশুকান্না, তুমি যা বিশ্বাস করো খুব!

 


স্মৃতির ভাষা আমি বুঝি না এখনো। স্মৃতি সেই বাল্যখেলা, ঢেউ গুনে যাওয়া, সেই সৈকতবাতাস, তার ভারে ভারী হয়ে আসে রাত, নীল স্থির পরিদের খিদে… দৌড়ে পার হওয়ারই কথা, কিন্তু লন্ঠনের আলোয় সব অস্পষ্ট অন্ধকার কেমন ক্ষমা হয়ে গেল!

দীপান্বিতা সরকার

জন্ম ৩ জানুয়ারি, ১৯৮৮; ভারত। ইংরাজি সাহিত্যে সাম্মানিক স্নাতক, স্নাতকোত্তর। পেশা শিক্ষকতা।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
ঝিমরাতের মনোলগ [অভিযান, ২০১১]
একান্ন থানের নাও [কবিয়াল, ২০১৩]
পাশের উপগ্রহ থেকে [সৃষ্টিসুখ, ২০১৫]
ইতি গন্ধপুষ্পে [শুধু বিঘে দুই, ২০১৬]

ই-মেইল : dipanwitasarkar1988@gmail.com

Latest posts by দীপান্বিতা সরকার (see all)