হোম কবিতা তীব্র ৩০ : শামসেত তাবরেজীর বাছাই কবিতা

তীব্র ৩০ : শামসেত তাবরেজীর বাছাই কবিতা

তীব্র ৩০ : শামসেত তাবরেজীর বাছাই কবিতা
1.61K
0
কবিতার বয়ানে কি বয়নে শামসেত তাবরেজী বাংলাদেশের এক স্বতন্ত্র স্বর। দশকের বিবেচনায় তিনি আশির দশকের কবি। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ৯টি। কবির বাছাইকৃত ৩০টি কবিতা ছাপা হলো পরস্পরের পাঠকদের জন্য।


স্মৃতি


আমরা যে-গ্রামে যাব সেটা তৈমুরের খালার!
খুব খুশি আমি—দেখতে পাব তৈমুরের খালাকে,
খুশিতে প্রবল নাচি, নাচেন আমার অস্থির প্রতিভা
একবার লাফিয়ে নামি গরুর গাড়ির ছই বেয়ে
উঠি আরেকবার, এর মধ্যে কত গ্রাম, কত খেত—
অড়হর, বেগুন, করলা বুনেছে কেউ, সেখানে দোয়েল
দরমার বেড়ার ওপর বসে দেখছে আমাকে
তা দেখুক, এ বয়সে একটু বদমায়েশি চলে,
তাছাড়া, দোয়েলেরও দুর-অনপনেয় সঙ্কেত আছে
তাই রেণু ঝরে বাতাসে বাতাসে গন্ধ উদার,
আমি কিন্তু বুঝতে পারি এ গন্ধ অবশ্যই খালার!
সহসা থামল গাড়ি, গরু দুটি দড়ি ছিঁড়ে দৌড়
হায়, লাশ নামল খালার আমরা পৌঁছুবার আগে
কর্দমাক্ত গোরে, আমারও সেখানে যেতে বড় সাধ জাগে!

 


ভুলে যাওয়া ভুল


বড়ই মধুর লাগে সোনা, আরেকবার গাও
আর আমি ছাদ বেয়ে উঠি—ছিলে যাক হাঁটু,
ও বিগতা গাও না আরেকবার শীর্ষে মিলাও
বৃষ্টির আগে-ভাগে আমার ফাটুক (…)

আগেও বলেছি কত, প্রশ্ন একই, উত্তর মেলা
ভাবো ছাতিহাটি, পার্টি ছিল না, শুধু ও
গিয়েছিল প্রাণ দিতে কি নিঃসঙ্গ, একেলা
কেটে নিয়েছিল ওরা দেহ থেকে পা-ও

একফোঁটা আতপ অশ্রু তবু ঝরে নাই
ব্রিজ বরাবর তারাদের নীরব নিশ্বাস
এসে ফের ফিরে গিয়েছিল, বলেছিল ‘যাই’
আমরাও নিরুত্তর ছিলাম, পাড়ে-পাড়ে নিশ্চল ঘাস

তুমিই তো মাড়িয়ে গিয়েছ, বলি তাই বলি
মধুর এসবও-হত্যাকাণ্ড, ভুলে যাওয়া ভুল
এখনও যে ঘামতে পারি, ও গীতাঞ্জলি
গাও না গাও না প্লিজ, তুমি না পারুল!

 


হাড়কালা


হাড়কালা, সত্যি-সত্যি মধুরাত বলি আমি বলি
বেনিয়ার জাত ওরা, বিশ্বাস তো করেই না, চায় টাকা-কড়ি।
ঘুম আমার শুষে নেয়—বালিশ বিধ্বস্তিয়া আলগা করে অড়ের সুতলি
চোখের কাজল লাগে বেশরম গরম বাতাস-বওয়া উরুত্যকায়
বলি ওরে হাড়কালা, বংশীদণ্ড কাঁপে—দে সুর, দে তড়িঘড়ি
গুল্ম-জড়ানো চাঁদে বেনিয়ারা কারুসাজে কুধর্ম চাপায়
বিগত বউল কান্দে, রে তমসা—কোথা তোর উদ্‌গমের কলি!

রবো না এ খাটে, যাব বাণিজ্যবিতান ছেড়ে মহানন্দপুর
গা থেকে খুলে ফেলব একটানে সংশোধনবাদের পোশাক
ভেঙে হব খান খান, হব আমি কার্বনাগ অনন্ত বহুর
দেখি কত বেইজ্জতি করবার পারে তিন কিসিমের পাতার বাহার!
বঙ্গতটে উছলায় নুনাক্ত অশ্রুজল, তাই চেটে মুছে নিয়ে দাগ
সত্য সত্য ফেটে পড়ব পক্ব ডালিম-হেন ও-কালাহাড়
মধুরাত বলি বলি, আরো বলব যতদিন না জিবে গলে মদিনা-খেজুর!

 


দুজনেষু


ডাবল লাভ ভেবে               দিয়েছি প্রশ্রয়

                    দুজনকেই

কিন্তু বলে না তো               আমার কথা কেউ

                    বানায় বৃথা লেই

একই সে বিশ্বাসে               দুজনে দুইমুখ

                    দ্বিবিধ উচ্চার

যেনবা একটি                    ব্লেডের দুই দিকে

                    ধারাল দুই ধার

যখন তীব্র                           নীলের প্রশ্নে

                    আকাশ ভেসে যায়

মেঘের দাবি নিয়ে               অন্য হাত তুলে

                    কেবলি গর্জায়

কারোর লাগে যদি               বর্ষা বেহতর

                    কদমশয্যা

অন্যে পৌষের                     কুয়াশা সাজিয়ে

                    ঢাকেন লজ্জা

গরিব আমরা                      পড়েছি বিপদে

                    বুঝি না উত্থান

করেন কোলাকুলি               নাম ও অনামের

                    যুগল-ব্যবধান


একরাতে ছাদে


দূরের তারাটা দেখি—বিদেশ-মন্ত্রীর মতো অক্লান্ত,
সারারাত পরিশ্রম করে, দিনেও করে-বা, সংক্ষিপ্ত বাসরে
টুকে নিতে হয় অভিকর্ষণের চ্যুতি-বিচ্যুতি

তুরীয় গণিত—ঋণ-এক রুট-ওভারে আমরণশীল
স্পন্দমিতিময়—কখন ভাষার কাছে এসে
নদী ও রাষ্ট্রকুলে ভেড়ে

জানা হয় না পৃথিবীর অভিমানী ছাদে বসে-বসে

এখানে রয়েছে তদারকি, ভ্রাতৃসঙ্ঘের খুন নিয়ে পর্যালোচনা
অনতি-উনিশ তবু ঢুকে পড়ে অনুমতি ছাড়া

লাঞ্ছনার শেষ নাই কোনো

তারার ব্যস্ততা থেকে আমরাও ব্যস্ততা শিখি
কাজ ও অকাজ, জ্যামিতি, সমিতি, কীর্তি আর অপকীর্তিসমূহ
না-ঘুমিয়ে রূপ ও রূপক-ভেদে
বেদে—নির্বেদে…

13334447_1161335080578278_472764476_o


তেজপাতার গান


মান্দিদের ছায়া ভালো লাগে। তেজপাতা-কাঁপা
হেমন্ত সন্ধ্যায় ডেকেছিল, বাটীতে আছেন গো!
কেউ নাই আর—ডুরে-শাড়ি থেকে ঝরে গেছে রেণু
প্রস্তাবে অসম্মতি দিলে। কিছু নাই আর
ইট-বহনের ট্রাক আসে-যায় গ্রীষ্ম পেরিয়ে
উঠেছে অভ্রংলিহ চোঙ—ধোঁয়া—ধোঁয়া—কার্বন পুড়ছে।

কয়েকটা সজারু-কাটা ধুলোর আস্তর সরিয়ে দ্যাখে:
এ কি মধুপুর? কেন ঘাসে-ঘাসে লেগে আছে যুবতীর বমি?
শালবীথিকার ছায়া আর কায়ার মিলন নাই কেন?

বই ঘেঁটে, হাঁটু ছিঁড়ে, ধর্মালয়ের লাল যতটুকু পারি
বুঝে দেখি, মগধেরও আগে, আরো আগে ছিল বুঝি কিছু
ভাষা-কণা হয়ে, যেটুকু এসেছে স্মৃতি হয়ে, নিরুচ্চারিত তা—
কোনো কাজ হয় না বীর্যে প্রিয় থেকে তমা খসে গেলে—

তেজপাতা কেঁপে-যাওয়া কবেকার হেমন্ত বিকেলে!

 


ক্র্যাকডাউনের পর


মনে যে আন্দাজ-কথা আসে, মনোকোণে,
তাই প্রকাশিব তাহার নিকট?
সাঁকো পেরোবার পরও কিছু কাদা পাড়ে
রয়ে যায়, সমৃদ্ধ নগর থেকে তিনজন কপট
এসেছে গ্রাম-মুক্তির সংবাদ শোনাতে:
একই বীজে সহস্র রকম ধান বাড়ে,
বন্ধ্যা-নারীর সুখ ফেরে কিস্তির লোনে,
প্রতিটি নারীই ব্যর্থ কেন সোয়েটার বানাতে!

আজ এই গান গাহিব কি অন্তর-বিদরি?
কোনো পথ মসৃণ নাই—কচিরও অসুখ বড়দের!
লোকসমাজের কাছে অশোকের ঋণ—
যত বাড়ে—শঙ্কা তত অতিলোভী এই ভারতের
বিবাগী বাতাস বহে বিস্মৃতিবিজ্ঞানের দিকে
তপ্ত লোহার জ্বালা বুকে মোর—কোথায় হরিণ—
ক্র্যাক-ডাউনের পর যেরকম মাথাহেঁট করেছে প্রহরী
আমিও হয়েছি হেঁট, চিনি না তো তোমার আমিকে!

 


কর্নেল তাহের দেখলেন


চাঁদ মৃত পড়ে আছে
পর্বতসানুতে

চাঁদ, ও লুম্মিনি-বিগতা

চুম্বন দাও নি ব্যথায়

সেরে উঠব না তাই

পুরো সভাজুড়ে বিযুক্ত-স্কন্ধ

গালছে পতিতার মাই

ভর করে ক্রাচে

কর্নেল তাহের

দ্যাখেন এ-তো লুৎফাই

 


কুক্ষণে


বায়ু বয় হিরণ্ময় সন্ধ্যা যবে মদের দোকান থেকে তিনহাত দূরে
বায়ু বয় বিরহ’য়—মীরার ভজন সবে শুরু হলো অম্ল-মধুরে।
তুমি যাও কোথা, আমি কোথা যাই, ভরছনি কেন, টাকা-কড়ি নাই!
ফোঁটা-ফোঁটা পানি সোনারঙে দোলে, তুমি দুলছনি, এ কাহারবাই—
নইলে আঙুল সহসা যে-গুল-বাগিচায় ঠমক তুলল বাঁয়াখানিজুড়ে,
এই সন্ধ্যাকাল জাগাল মহাল—সখীরা নাচে না কেন ছন্ন নূপুরে!
ফারুক বুঝবে না, রেহেনা, খায়ের, পলিটিকস যে-মিথ্যা-জালে
আটকা পড়েছে, দাড়ি-গোঁফ চেছে—তাতেও-যে কি লিখবেন ভালে
পরমেশ্বর! কাপড়-চোপড় যা-যা আছে খুলে পথে নামি—
ভজনে ভ্রান্ত ময়ূর-বাহিনী ঘিরে ধরে বলে: বল্, কে আসল আমি…

 


লোকে কেন কনডম কেনে


শুনেছি, লোকে আমার বই কিনছে না, আমিও কিনছি না

কাল দেখি একজন এক প্যাকেট কনডম কিনছেন
নতুন জামাই-হেন হাসি তার মুখে, সেই দেখে
আমিও কিনলাম এক প্যাকেট কনডম প্যান্থার-আঁকা
দেখি একজন ব্লাউজের মাপ দিচ্ছে দর্জির দোকানে
মনে হলো, আমিও না-হয় যাই ব্লাউজের মাপ দিতে
কিন্তু দর্জি বলল: আপনার দুধ নাই, স্তনের বিকাশ
স্যার অত তো সহজ না, আপনি বরং পাশের দোকানে
যান, হেথা আন্ডারওয়্যার আছে নানান মাপের
অতঃপর আমি আন্ডারওয়্যার কিনলাম প্যান্থার-আঁকা
দেখি আরেকজন, জার্নালিজম করে মনে হলো, তিনি
গোলাপ কিনলেন একগুচ্ছ মোটামুটি সস্তা দরেই
আমিও কিনলাম একগুচ্ছ গোলাপ, কিন্তু শুনলাম
এসব গোলাপ নাকি এসেছে শহিদ মিনার থেকে
কি করি, কি করি, দেখি লোকটা গোলাপগুলিকে
খেয়ে ফেলল চিবিয়ে, শহিদি গোলাপ খেয়ে ফেললে লোকটা
আমিও খেলাম সবকটি জ্যান্ত গোলাপ কাঁটাসহ
যদিও শুনলাম যারা আন্ডারওয়্যার কেনে, তারা রাজনীতি করে
আমি তা করি না, তবে আমি হস্তশিল্প হিশাবে কবিতা বানাই
কিন্তু কবিতা, বিশেষত অধুনা-নতুন বাংলা কবিতা
যা কোনো কাজেই আসে না। এছাড়াও যেহেতু আমি
স্তন-বিকাশে ব্যর্থ, এবং কস্মিনকালেও আমার দুধ ঝরবে না,
ফলে, আমাকে মা বলে ডাকবার সম্ভাবনা নাই, তাই সম্পূর্ণ নিশ্চিত হয়ে
আমি কনডম গলিয়ে নিই আলগোছে রাত ভোর হলে।
বাহ! বেশ তো এ আলট্রাথিন আরাম এই ভূত-ভবিষ্যতহীন খণ্ড-টুকরায়?
এইভাবে আমি আমারই বীর্য সংগ্রহ করি আধুনিক কৃৎকৌশলে
তবে আমি আরও শুনেছি যে বীর্যও রফতানি চলে…

এখন আমি বুঝি লোকে কেন বই কিনছে না

 


এরলেবনিস


নিকালো ফল্গু-হাওয়া অবতলা থেনে
মৃত্যুর বয়স দিয়ে আমায় মেখে নে।

কার্বন-কুহু গাথা ধ্বনীন মহলে
রওশন-উজ্জ্বল ফণা দুচোখের জলে,

এ যদি কান্না হয়—আমি তার নুন
জিবের স্বাদের মর্মে হয়ে আছি খুন!

রে জেনোম-জ্যামিতির প্রথম নিষ্ঠা
হেন ফাল্গুনে হোক অন্তিম প্রতিষ্ঠা।

দূরতম স্মৃতি থেকে আর্শি-বিবরে
জোড় হয়ে থাকি যেন ভাষার কবরে।

যা আছে, নিংড়ে নে ক্রিয়ামূলসহ
কে আছে চায় না ব্যথা—ভাষার বিরহ!

শিশুচোখ দেখে নিচ্ছে বিনির্মিত ব্রিজ
কবে সে ওপারে গিয়ে হবে মনোসিজ।

 


কবি


কে বলল তুই তোর?

মৃত্যুর বড়জোর!

আত্মরতির কমল ফুটল, ভেবে নিলি তাকে উষা,
তুর-পর্বতে কতক্ষণ আর থাকতে পেরেছে মুসা?
পাথর-ভস্মীভূত সুরমার কালো ছাই গায়ে মেখে
নেমে এলি নিচে—সবটুকু তোর দিয়েছেন তিনি রেখে!
ওরে ও পাগলা তর্কবাগীশ, মিথ্যা কথার জোরে
বই হয়ে র’বি একুশে-আইনে কড়ইগাছের গোড়ে?
যে দেহ ফাটিয়ে বাহিরিলি তুই প্রত্যুষে আলাভোলা,
দলীয় ফেরেস্তার কেরামতি দিয়ে গেল মৃদু দোলা!
এতেই খুশির বান ডাকল রে… ফুঁসল ক্রিপিটপাল
কিস্তি যে তোর আকাশে উঠছে—এবার মেটাবে ঝাল!
দ্যাখ্, বৃষ্টির মোসাবিদা চলে শিরার ভেতর-মেঘে—
অথ চে পত্থয়সি পব্‌সস, পড়িস না ফের ভেগে।
একদিন তুই খুঁজে পাবি তোকে ভেজাকাদা পাটাতনে—
তুই নোস, তুই বাধা পড়েছিস মাতৃকা-ক্রন্দনে।
ধীরে-ধীরে তোর মগজে গজাবে ষণ্ড-কপিশ শিং
শাহবাগে নেমে বলবি, এয়েছি গীতিকা-মোমেনসিং!
সেই-যে হারাবি, হারিয়ে নিজেকে খুঁজবি গুলিস্তান,
মহাখালি থেকে সটান উঠবি বনানী গোরস্থান।
কত-কত নামে কেন্দে উঠবি, অথচ পাবি না কোল,
মোড়ে-মোড়ে খাড়া ফুঁসে উঠছেন তিন-কিসিমের শোল,
ডরে ভিজে যাবে ডেনিমের খাল, বিশেষে অন্ধকার
টের পাবি তুই কত ধানে চাল, কত ঘৃণা কবিতার।
সামান্যে যার আশ্রয় নাই—বিশেষে বিলাবি কি রে
বজ্রাধুনিক ফসকা গেড়োতে পড়বি আপাদশিরে!
ওরে বাক-দাস, থাম এইবেলা, তর্কের কিছু নাই
ব্রহ্মাণ্ডের কুসুম ফেটেছে, আর রইল না ঠাঁই।
ইয়া নফসি, ইয়া নফসি, চারিদিকে শোন্ রব,
লজ্জার স্থান ঢাকবার নাই জলপাই পল্লব।
ন্যাংটা রাজার দেশে তুই-ও তাই, নামপদজুড়ে ঘা,
ঐ দ্যাখ্ হাট করে খুলে আছে মৃত্যুর দরজা।

                          বেজন্মা, তুই হলি
            স্বাধীন-বিদেশে প্রচ্ছদপটে বলি!

 


পিতৃগর্ভী কন্যার জন্যে


তুই আমার পেট থেকে জন্মাতি যদি
বলতিস মা—নাকি বাপজান!
ওরে মেয়ে তবে তুই দুধ পেতি কোথা?
পুরুষের দুধে নাই সত্যের ইমান!

আমার গর্ভে এলে এলো ও পাথারি
লাথ্ মেরে বলতিস: ব্যাটাছেলে তুই?
জন্মাবার পর যদি মনে এসে যেত
এক প্রহরের তরে এর লগে শুই!

তবে ও প্রেমের সুধা হতো কি হারাম?
পুরুষ-দুধের স্বাদ কন্যাকে দিয়ে
কার সঙ্গে হতো—বাপ করত আরাম?
কি লীলা চলত বল্ বাপে আর ঝিয়ে!

গর্ভোচ্চারণ করে তুই হলি ‘আমি’
‘সে’, ‘তুমি’ নানাবিধ ভাষার আসামী।

 


চক্রনেমিক্রম


    আমি ভাঙছি, ভেঙে যাচ্ছি, কড়ইতলার
যত ছায়া ছিল ভাঙছে ওরাও গোল ও ত্রিভুজ
    ভাঙছে বৃষ্টি অচ্ছ লজ্জা বিশেষ বাদাম
এত ভাঙাভাঙি লোপাট দোপাটি গন্ধ-বিভু
    হুজুর বলেন দোষ নাই তুই ভাঙতেই থাক
এক দরজাকে শতবার ভেঙে আরেক দরজা
    তাহলে তো মজা—ভাঙতে-ভাঙতে যত আছে ফাঁক
আস্ত শাস্ত্র চৌচির করে শূন্য ভরাট
    কেন যে তোমরা দুমনদশাতে বিড়বিড়াচ্ছ
চিত্র-প্রতীক আঠা-আঠা করে, সস্তা দরের
    সেলফোনে দ্যাখো জগৎবিশ্ব আবছা-আবছা
এবং সেখানে মেঘ থেকে নামে ঐরাব(দ)টা
    খাওয়াতে-পরাতে হবে রে একেও হায় আল্লা
গোসল করিয়ে নিয়ে যেতে হবে ঈদগায় তাকে
    ঐ অভাগারে, ঐ ক্লীবটারে নামির নমাজে!
আমি ভাঙছি, ভেঙে যাচ্ছি আমির আমিতা
    বরইতলায়, পিছন-উঠানে, খ-কেন্দ্রতে
ভাঙছি ঘড়ির তিনলোক থেকে আম্মার আদি
    ভাঙতে-ভাঙতে উল্টা গুনছি, ভাঙছি পাল্টা
আব্বার নামে জোড় লাগাচ্ছি সব বেজোড়ায়
    এক ঘোড়া থেকে হ্রেষা জুড়ছি আরেক ঘোড়ায়

 


বিয়ের গান


এই তো এ ঘরে নাচি—রাপ্পা, রাপ্পা
হেনা-হাত ফণা তোলা রাপ্পা, রাপ্পা

বিয়ে হচ্ছে দুর্বহ—তোমারই সঙ্গে
গলায় কলস বেঁধে আ মরি বঙ্গে
মেতেছি ছায়া-কায়া বিপুল জঙ্গে

কি দীর্ঘ বিবাহ গো—এমনই চাপ্পা
কেউরে দেখে না কেউ—পুরাই ধাপ্পা
বিয়ে তো বিয়েই না কি? লা রে লাপ্পা

রাপ্পা, রাপ্পা…

 


বিদাত


হেথায় মনুর লাগি মরে প্রেম নিৎসের বিকারে,
বেহতর বায়ু সঞ্চালনে সে-মৃতের দেহ ধরে কাঁপে
দুটি স্বচ্ছ দৃষ্টান্ত সুগোল। ফিরে আসে যদি
লোহার গৌরব—জ্যোতি-রিক্ত হেমন্ত সন্ধ্যায়
কত গান, আহা, এফএম ব্যান্ডে বেজে গেলে
পুনরায় চঞ্চল হতে থাকে দরোজার বাইরে রাখা
জুতো-স্যান্ডেল। হিজলকে ডেকে নিল কেউ?
কে? কে? কে? পুরনো মার্কসের দাড়ি ওঠে
নব-থুতনিতে, ঐ-ই না তো? হায়, আল্লা সে তো
ইস্থেটিকস ছাড়া আর-কিছু নয়—রুটি ও রুজির
মাঝখান দিয়ে চলা গেরস্ত জীবন চোখ ঠারে:
‘অ্যাই, কেউ ছবি তুলল কি? কার দ্রুত ক্লিকে
আমি মরো-মরো ‘সাবজেক্ট’ হলেম দয়াময়
বাংলা-রঙ্গে?’ ঠিক তক্ষুনি—চ্যুত-চুম্বনের দায়
এসে পড়ল মনুর ওষ্ঠে, নিবে গেল বিদ্যুৎ-বাতি
এত-এত ইমানের পরও এমন বিদাতি!

 


সভ্যতার গল্প


দিঠির আগুন জ্বলে, সেই আগুনেই গুহাপথ দেখি: অসম্ভব দৃশ্য এ-যে! মুসা, ইসা, সকলেই হাত ধরে-ধরে জেরুসালেমের ঢাল বেয়ে নেমে আসছে এদিকে। জিহ্বাগ্রে নুনের ক্যামেরা—তুলে নিচ্ছে একেকটা ছবি প্রত্যুষার—অগ্নিবলয়ের—ঘূর্ণিপাক খাওয়া দশলক্ষ প্রজাপতির—তাদের ডানায় ডানায় চিত্রল মৃত্যু—গদ্য-পদ্য অভিমান!

ফেনিল তীব্র ছুটন্ত ঢেউ ঐ আঘাত হানল শ্যাওলা-ছাওয়া কর্কশ পাথরে, খুনির হাতের ছোরা যেমন ছুটে যায়, ঘন-পল্লবের ভিতর যেমন হামলে পড়ে মাথা-খারাপ সূর্যরশ্মি আর আম্মার বাহু ঠেলে-ঠেলে এগোতে থাকল আমার মতিচ্ছন্ন গণিতবিদ্যা।

এই যে ডানদিকে কাঁপছে সর্পরাজ পেঁচিয়ে-পেঁচিয়ে সাপেরই জিহ্বায়, তার পিচ্ছিল আরণ্যক গন্ধে অবশ হয়ে যাচ্ছে শেষগুচ্ছ জলপাইপাতা আর বাঁ-দিকে লেখা হচ্ছে আদিগ্রন্থ, মার্জিন ছাড়িয়ে ছলকে-ছলকে উঠছে অর্থের বুদবুদ এবং মাইলের পর মাইল নগ্ন-চরাচর ছড়িয়ে যাচ্ছে রাত্রির পরিধি।

এরই ফাঁকে তৈরি হচ্ছে শীত এবং গ্রীষ্ম-ঋতুর নতুন-নতুন উপনিবেশ, এক জন্ম থেকে আরেক জন্মের বিভায় মৃত্যুর কার্নিভাল নানা উছিলায়।

নক্ষত্রমালার লালা শুকিয়ে-শুকিয়ে গড়ে উঠল নতুন-নতুন টিপের মতো দ্বীপ। মানুষ দুপায়ে দাঁড়িয়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকল সেইসব অজানা ভূমিতে। হাজার হাজার উন্মূল উম্মত ছড়িয়ে পড়ল ভাঙাবুকে, তাদের নাভিমূল থেকে গলে নামতে থাকল সৃষ্টি ও ধ্বংসের তরল। ব্যস্ত হয়ে পড়ল সবাই যার-যার দাফন-কাফনে, কবর খোঁড়ার উৎসব চলতে থাকল চারদিকে আর বৃষ্টির মতো ঝরে পড়তে লাগল আরশের শেষ লোবান।

তাহলে কি আরম্ভই সমস্ত শেষের শুরু? সা থেকে পুনরায় সা-তে?

আমি জিব-চোখে তাকিয়ে দেখেছি, তখনও জ্বলছে তোমার দিঠি। ট্রা লা লা লা ব্যালেরিনা গ্যালাক্সি-জাহানে, সিলাবলে সিলাবলে উন্মত্ত সংঘর্ষ একমুহূর্তের তরে মাত্র। তারপর, রাস্তায়-রাস্তায় টাকা-খোয়ানো একাকী সন্ধ্যার মতো প্রতিটি আকাশজুড়ে শুরু হলো তারার ঝিমুনি, বিশাখার শিথিল উরুতে আদিতম কাঁচপোকা খুঁজে ফিরতে থাকল সর্বশেষ চিনির স্ফটিক:

শর্করা-বিহনে শিথিল চুপসে-যাওয়া ধ্বনির আঙুরগুচ্ছ আকাশ-সমান সাদা-শূন্য কাগজের মতো লাট খেয়ে-খেয়ে গুহাসম্মুখে ঝরে পড়ল গোঙাতে-গোঙাতে।

মাতৃগৌরি ফিরে গেল তাঁর আদি ও পুরনো রূপের জ্যামিতিতে।

13340567_1161335097244943_2015514318_o


ত্রি-চক্র যান


কি বিশ্রী, কি বিশ্রী
বাপের কালো-সরীসৃপ,
ঢুকল যে মার পেটে
গোলাপ-ঘের তার কেটে,
রক্ত-পান—পিচকি লাল
করছে বাপ দাঁত খিলাল।
কি বিশ্রী, কি বিশ্রী
অষ্ট-ধাতু মিছরি!

আর আমি এলাম যে
কত-না রাত জেগে,
চণ্ড-চাম জাগল আর
বৃদ্ধিল ষণ্ডতা।
শব্দমূল—গুপ্তপাপ
সেইখানেও খাঁড়া বাপ,
মার পেটে চক্রবেড়
পুরুষগণ সব কাফের।
ক্যান্ আমি তাও এলাম
বাপের দুধ কি খেলাম!

কোথায় মা, তাহলে?
শুধুই কি পার্পলে?
রঙবাহার তিন লীলায়
এই আসে এই মিলায়!
কোন্ তারার কার্বনে,
বীজ বোনার পার্বণে,
ঋতুকাল—এইটুকুই—
তার পেটে শরীর ধুই,
তারপরই বহিরায়
পা রাখি দুনিয়ায়—
সেথাও যে বাপ বসে
ডুবছে মার লাল রসে,
বাপের মা-ই আমার মা,
যা সোনা, তাই তামা।
আমরা ভাই—বাপ-বেটা
আদ্য এক ডিম-ফেটা
হুলুস্থুল—হলুদ জল—
এই কি লুই-কান মহল!

চক্রবেড় রাজধানী,
শুনতেছি তার গানই।
গুম্ফহীন দুই পুরুষ
চারহাতে দুই কুরুশ—
এই লীলা চলতেছে
গর্দান আর ঘাড় বেছে।
কই আমি? কই তবে
জন্মিয়েই রৌরবে?

কবন্ধের কুলজি
রাখ্ লিখে, চায় যদি,
বলবি কি দিন-শেষে?
তুই-ই সর্বনেশে!

জন্ম-জারজ নিখিল—
একটা শুধু আঁচিল,
সেটাই ‘নাই’—জুলুমবাজ
আছে-র অবৈধ রাজ।

তুই নাদান তিরস্কার,
ঘাড়ত্যাড়া—শর্করার
মা-বাপের দ্বিবীজ শ্রী
কি বিশ্রী, কি বিশ্রী…!

 


বাসনা বয়ান


তোমার যে ভালো লাগে এত, লাফিয়ে পড়লেই পারো চৌবাচ্চাটায়
তপ্ত তরঙ্গিত জল মায়াবী মাছের লেজে বাড়ি খাক, আরে, সে তো বাচ্চারাও চায়

ইদানীং! না চাইলে কেনবা শকুন-চিৎকার মাতৃক্রোড়ে, কেন তল্লাশ?
আরে, তুমি তো দ্যাখোই নাই তোমারও জন্মের আগে হয়ে গেল তোমার বিনাশ!

বাহু-কাঁপা, জানু-কাঁপা সঙ্ঘাতুর চাঁদ ক্লাবে-ক্লাবে নেচে যায় ঘূর্ণির ইতর তরলে,
যদি লাগে ভালো, কেন যে পরাও না মালা তব ঐ হারামীর স্বর-বসা গলে?

নিষেধ সমাজহেতু? কে কেয়ার করেছে তাকে কোনদিন—যে করুক তুমি করো নাই
আন্দাজে মেরেছ ঢিল অবতলা গায়েবি আকাশে, তদুপরি, গেয়েছ সাফাই

রাজ্যপাটের, দার্ঢ্য-কঠিন—সুধীনদত্তের মাঢ়ি হেন বলে গেছ যখন করেছে ইচ্ছা
কিন্তু পারো নি মাপতে চৌবাচ্চায় ধরে কত জল—হা হা হা হা… তোমার কিচ্ছা

আমাদের ঘটমান-বর্তমান শুধু, আমাদের দ্বিনিষ্ঠপ্রাণ একশিরা রোগের মহড়া,
তারই এক ছোট কোণে দাঁড়ায়ে অশ্রুসজল তুমি—হত-হাতে মোমবাতি ধরা—

এইতো প্রতীক তোমার—গলমান—নিঃশেষ হতেছে বাসনায়, ধু-ধু বাসনায়—
সারাদিন বক্তৃতা করে, পুলিশ লাগিয়ে বলো, বলো তুমি, সব জানা যায়!

 


ভেদ


আমরা সশস্ত্র হয়ে পরজন্মে নামি
                 কি ঘুটঘুটে আলো গো এখেনে!
আঁধার সুনামি
                 আমাদের বার করল টেনে।

আজ আমি রাধা
                 আর তুমি ননীচোর কৃষ্ণমহাশয়
তোমাকে জিজ্ঞাসিব চূড়ান্ত ধাঁধা:
                 পুরুষের জন্ম কোথা হয়?

নিরুত্তর বোকাচোদা তুমি হে মহান
                 সামান্য অঙ্কে মারলা ফেল,
জানলা না, জিন-মুখে কে স্রোত বহান
                 কার দোষে রহিম একজন, আর-জন তাজেল।

 


ত্রিযামা



এ তো মাইয়ার বেশে
         আসলেন গুরুভাব
উরু ছুড়ে কন হেসে
         লঙ্ঘিবে পর্বত?
শূন্যে ঝুলছে খাড়ি
         কি আজব আসবাব
সিঞ্চন, আহাজারি
         তারাগোলা শরবত


ঐ দূরে যত গ্রাম
         বনাঞ্চলের ছায়া
নাভিমূলে সংক্রাম
         শোণিতে সর্বনাশ
অগণন ক্রিমিসেনা
         তারে করে তল্লাস
নির্বাধে চলে জেনা
         জননী এবং জায়া


আমি কার, কে আমার
         লেখা যত শরিয়তে
ব্লেডের দুদিকে ধার
         ফেড়ে নেয় আড়াআড়ি
শিবানিতে শিব রহে
         ছিঁড়ে ফে’লে আদি নাড়ি
যার যার ভাষা কহে
         ভিন্ন ভিন্ন মতে।

 


কবি আল মাহমুদের আশিতম জন্মদিন উপলক্ষে


মেরে মাহমুদ, তেলাওয়াত শুনি তোর
যেথা হজরত খুলে রাখলেন পাগড়ি
শক-হূনদের খুনে-মেশা সেই বঙ্গে
মিহি কবিতার ট্রফিমূলে হই-চই

কানা মাহমুদ, তোর দৃষ্টির রৌশন
ঝরে বৃষ্টির মতো মুক্তার মমতায়
কেউ দেখল না, জন্মিয়ে তোরই গর্ভে
মরেছি আমরা নানাবিধ নীচুতায়

কে যে কত বড়, ভেবে-ভেবে কাটে কাল
হাতে শোভে খাম দশ-বিশ হাজারের
আহা, কবিদের টাকা লাগে জানি আজ ঢের
মদ খেতে আর খুলে দিতে ঘেয়ো ছাল

মেরে মাহমুদ, কানা মাহমুদ, ওরে ভাই
আমরা ভায়েরা ভাইয়েরই গোসত খাই

 


অনিত্যা


আস্ত একটা চাঁদ জিহ্বায় রাখিনু যতনে,
বড়লোকি ভাব লয়ে নিঃশঙ্ক মনে।

হাওয়াই-মিঠাই যেন লহমায় গলে!
তারপর মুখ ধুই লৌহিনী কলে।

একই দেহে দোসরামি: চিনি ও লবণ,
কেন্দে কেন্দে সারা হই, হয় না বোধন।

অক্ষরে আর্তনাদ, নিরক্ষরে ব্যাধি—
আমারে ছাড়ে না ক্যান বেপরোয়া আদি?

আগে তো জানতাম চাঁদ জানে তত্ত্ব তার,
কেন সে চক্রনেমি করেন বিহার।

তিনিও যে অচেনাই তেনার বিষাদে
জানাজা কায়েম করে ধরা দেন ফাঁদে।

আলগা ফুটানি থেকে ঝরে গেলে মধু,
জানলাম, যে-লাউ তিনি, সেই লাউই কদু!

 


এক্সোডাস


এইখানে                  আসতে বারণ
এইখানে                  নিরুচ্চারণ
এইখানে                  নায়াগ্রাপাত
এইখানে                  বিনষ্ট তাঁত
এইখানে                  ভীমসেন যোশী
খাদে নামা               অর্ধেক শশী
এইখানে                  বায়ু বিস্ফার
রগকাটা                  ব্লেডের দুধার
এইখানে                  জল-উগরানো
শব্দভুক                   মারকুটে দানো
এইখানে,                 এইখানটায়
হাতবোমা                হঠাৎ ফাটায়
তখৎ-এ-তাউসে       কম্পন
পল্টনে                    পুলিশি দমন
এইখানে                  দিকদিশা নাই
ভেলায় ভেলায়          ফিরি তাই
তাহলে কি               নাই রওজার
রোশনি এখানে,       গাঁ উজাড়…

 


গড়াইয়ের বিল


গড়াই বিলের ওপরে বয় হাওয়া                              ও গড়াইয়ের বিল
আমার ছায়া লুঠ করে কে করেন আসা-যাওয়া          ও গড়াইয়ের বিল

ধুতুরাফুল মাথা দোলায় রৌশনি রাত্রির
গৌরিপুরে শিথান গেঁথে কাঁদেন কালা পীর
ঝিম লেগেছে মাথায় আমার, গা করে শিরশির         ও গড়াইয়ের বিল

চোখের কাজল কে মুছল ভাইজান
দ্বিতীয় রাত হওয়ার আগে খবর দিয়া যান
নিখিলজুড়ে ধ্বংস হলো সদ্‌গতির ইমান                  ও গড়াইয়ের বিল

উত্তরে নাই দক্ষিণে নাই তিনি
পুবের হাওয়ায় নাই রে মেহেরবানি
চালাক চালাক পশ্চিমেতে চলছে রাহাজানি               ও গড়াইয়ের বিল

চোখের মধ্যে সাতসমুদ্র তার
মুক্তা ফলায় কার মরণে কিসের ইশারার
বিনা দোষে হয়ে আছি তারই সমঝদার                    ও গড়াইয়ের বিল

চোরাহাসির নাগাল নাহি পাই                                  ও গড়াইয়ের বিল
নারীবৃত্তে বসে হাসেন আমার আলেকসাঁই                ও গড়াইয়ের বিল

 


মুহূর্তমা ২


উজল উছল পিছল ঢেউয়ে
চুল ছড়িয়ে কে রয় শুয়ে?
নাই জানে তার একটু ভয়-ডর,
ঐ মেয়েটি আপন নাকি পর?
আঁতকে ওঠা বিলের ভীরু পানি
আঁচল ধরে করছে টানাটানি।

হঠাৎ এ কি উঠল জেগে চাঁদ
          বিস্বাদ! বিস্বাদ!

উতল ভূতল গীতল বাগিচায়
পাপড়ি খুলে কার কাছে কি চায়?
নাই জানে কী একটু ডর-ভয়,
মিলায় যদি জবান গন্ধ’য়?
চিনবে তারে কেমন করে লোকে,
যারা পুড়ছে পরস্ব তোশকে।

হঠাৎ এ কি জেগে উঠল চাঁদ
          বিদা’ত! বিদা’ত!

 


ফেনোমেনোলজি


মিথ্যার বদলে কি সত্য খোঁজো!

ঠোঁট, নাক, সন্ধি-নিগূঢ়?
                    আহা, বেওকুফ
খুঁজতেছ চিবুকের দূর!

পর্বত? দুর ছাই!—বঙ্কিম পিঠে
                     ঘৃণা অপরূপ
তার আলো ফেলিয়াছ মিঠে!

কঠিন, কঠিনতর করছ সহজও!

 


হত্যাকাণ্ডের পর


মালবিকা, এটা ছিল স্রেফ
হত্যাকাণ্ড, মালবিকা—
সন্ধ্যা-বৃষ্টি—গায়ে লেপ,

বম্ বম্ বম্ চিকা চিকা চিকা

গোটা লাশে লেগেছিল নুন
চোখ-দুটো দেখছিল তোকে,
মায়েও জানে না—এ-কার ভ্রূণ
খেয়ে গেছে পক্ষী ও পোকে।

মালবিকা, কর বিশ্বাস
এ খুনের দায় তোরই, তোর,
শুনছি লোকের ফিসফাস
তুইই নাকি দিয়েছিলি ক্রোড়!

বাদ্যক্রুদ্ধ, মালবিকা
নতুন দিনের গান আসে,
মালিকার জরায়ু বিনাশে

বম্ বম্ বম্ চিকা চিকা চিকা

 


জন্মকাহিনি


কলস ভাসা গাঙে                 ডুব দিয়ে ঘুম ভাঙে

শ্যাওলাদলে রঙ্গ করে অতি,

আঁশ ছাড়ানো মাছ               উল্টাসিধা নাচ

জানে নাকো কঠিন পরিণতি!

বালিশ ভেজা রাতে              বড়শি লয়ে হাতে

ছুটল আমার ধীবর যুবরাজ,

একটা কিছু হবে                   জলীয় রৌরবে

তিন ভুবনের শ্লিষ্ট মন্তাজ।

শিরায় জাগা চাঁদে                 গুপ্ত শেহেরজাদে

রুইয়ে দিল আত্মলীনার বীজ,

বর্ণরঞ্জনাতে                         ফুটল মাংস তাতে

কি মনোহর রাতুল মনোসিজ!


উত্তর-আধুনিক কবিদের উদ্দেশে


অনেক বৃষ্টির পর
এই রোদ এখন সহজ বাংলা কবিতা

আধুনিক যুগ পেরিয়ে
কার্নিশে
একটি শালিক মাথা ঝাঁকিয়ে সে-কথা অস্বীকার করছিল

এখন শালিক যুগ
হয়তোবা

শামসেত তাবরেজী

শামসেত তাবরেজী

জন্ম ৫ এপ্রিল ১৯৬১, ঢাকা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। ফ্রিল্যান্স কনসালট্যান্ট, প্রোজেক্ট ট্রানস্লেশিয়া।

প্রকাশিত কবিতার বই :
১. উদবাস্তু চিরকুট
২. আবাগাবা
৩. আম্রকাননে মাভৈ কলের গান
৪. অবিরাম অরেঞ্জ
৫. তক্তা
৬. হে অনেক ভাতের হোটেল
৭. দুজনেষু
৮. অশ্রু মোবারক
৯. রওজার দিকে

ই-মেইল : shamsettabrejee@gmail.com
শামসেত তাবরেজী

Latest posts by শামসেত তাবরেজী (see all)