হোম কবিতা তীব্র ৩০ : মৃদুল দাশগুপ্তের কবিতা

তীব্র ৩০ : মৃদুল দাশগুপ্তের কবিতা

তীব্র ৩০ : মৃদুল দাশগুপ্তের কবিতা
963
0

মৃদুল দাশগুপ্ত সত্তরের দশকের কবি। বাংলাভাষী কবিতাপাঠকের কাছে প্রিয় একটি নাম। আমাদের আমন্ত্রণে কবি ‘তীব্র ৩০’ সিরিজের জন্য যে কবিতাগুলি পাঠিয়েছেন, তার সবই অগ্রন্থিত। সমগ্র কাব্য থেকে বেছে নেয়া কবিতা নয় এগুলি। ফলে ‘বাছাই’ কথাটি ব্যবহার করা থেকে সরে আসতে হলো।

 

নববর্ষের প্রথম দিনে এই কবিতাগুলিই হোক আমাদের
‘আঁজলা-ভরানো পানীয়ের খোঁজ’…

 



গুপ্তপুঁথি-জ্ঞানে আমি দিয়ে যাব পাণ্ডুলিপিখানি
বিরাট কাঠের ওই পেটিকায় রেখে দিও গৃহে, এক কোণে
সযত্নে কিছুটা কাল, ক্রমে তুমি ভুলে যাবে, জানি।
কী আছে ভিতরে শুধু ভাবনাই ঢেউ দেবে মনে

সহজ সরল বাক্সে মনে হবে দাপাদাপি চৈত্রের বিকেলে
কলরব, হট্টগোল, ঘোররাতে ক্ষুধাতুর ক্রন্দনের ধ্বনি
আবার প্রভাতে হাসি খিল খিল—আমাদের একশত ছেলে!
তখন মুদ্রণে দিও, ওরা যেই চেঁচাবে—জননী

 


যেই হস্তক্ষেপ করি তুমি বিন্দু, বৃত্তাকার হও।
হয়েই ঘুরতে থাকো, তখন বাতাস বয় শন শন শন
এ গৃহে পাড়ায় ক্রমে শহরে সদরে, টোকা দিতে
                                      পৃথিবীও ঘোরে
যেন বিপরীতে, জোরে। চন্দ্রসূর্য হতবাক হয়ে
কে আগে উদিত হবে, ভাবে।

কী কাণ্ড ঘটাও চিত্র, বিচিত্র হওয়ার পথে
                                       বন্ বন্ বন্!

গেল গেল রব ওঠে তারায় তারায় আর
                                         পাড়ায় পাড়ায়
পাহাড়ের চূড়ে যেন হায় হায়, সাগরের ঢেউয়ে ঢেউয়ে
                       হাহাকার মরু সাহারায়

পুনরায় হাত দিই, এবার এবার থামো
তখনই তো হয়ে যাও, স্তন।

 


পছন্দ হয় না বলে অপকর্মে কালি দেই ঢেলে
কী কাণ্ড প্রকাণ্ড দেশ মানচিত্র থেকে যায় মুছে
ঝপ করে নামে রাত্রি ঝকঝকে রোদের বিকেলে
সে ভয়ভীতিতে যাই অতি ঊর্ধ্বে একাকী, জাগর

তুষারে আবৃত হয় পৃথিবীর বিবিধ অঞ্চল।

একে একে সাত রাত যদিওবা যায় যায় ঘুচে
তবু না ফুরায় নিশি। মহাসূর্য করে হাহাকার
সেই ছায়া নিচে পড়ে, ক্ষোভে দোলে সকল পাহাড়

কাতর পাথর বলে, ‘থামো থামো’
অতি শূন্যে ভাসমান এক ফোঁটা জল
সে বলে, ‘এবার নামো, নইলে ধমক দেবো
                         আমি…আমি বঙ্গোপসাগর’

 


মানো বা না মানো তবে টোকা দিলে
                               ওড়ে এই ঘর
আমার এ গৃহখানি সেভাবে বানানো
তা ছাড়া বলার কথা, বিচিত্র শহর
যখন তখন রাতে বয়ে যায় জোনাকির ঝড়

এইখানে খুন হব, অথবা উল্লাসে যাব
                             জেলা কারাগারে
আমার বিশাল ছায়া তবু তো দুলবে ওই
                                   নদীর কিনারে
যে তুমি নিখোঁজ হবে, তুমি এসো
                      ঠিকানা তো জানো
আমাকে পাবে না কেউ ঘটনার পর

 


লাগো তো পিছনে লাগো গোয়েন্দা সকল
উড়ি কিনা
ডানা ছাড়া, জেট বিনা
করি কিনা দুনিয়া দখল

পিছু নাও, হাঁটো বা গাড়িতে চেপে খোঁজো খোঁজো
                                         তুমুল তল্লাশে
পদচিহ্ন আছে কিনা ঘাসে
বাতাসে গায়ের গন্ধ
কোন্ কাব্যে কোন্ ছন্দ
ধরো দেখি ছল!

কোথায় গড়ায় দেখো কোথাকার জল!

সকল সন্ধান করো, ধাও
ওই যে রোরুদ্যমানা, তার কাছে যাও

 


আবার আবার ফের পুনরায় পুনরায় ফের ফের
                                             আবার আবার
সময় হয়েছে যেন গুরুতর বিষয়ে ভাবার
শিখরে, গিরির শীর্ষে, অতলান্ত তলে বা অতলে
কোথায়বা যেতে হবে, কিভাবে যে যাব
কী দেবো তোমাকে আমি এবারের রথের মেলায়?
সে বড় চিন্তার কথা, তাও শূন্যে দপ দপ জ্বলে
যাত্রার সবুজ আলো, যে রকম পথ খুঁজে পাব
নিয়তির কোলে বসে উড়ে যাব খেলায় খেলায়
কী দেবো পৃথিবী আমি নদীতটে, সাগরবেলায়?
কী দেবো তোমাকে আমি

 


সঙ্কটে, সময়কালে কলহ-বিবাদ করো
                                    তুমিও, নীরব
ঘুমন্ত জাগ্রত দেখি কুকথায় ছোড়ো হস্তপদ
তবে তো সবাক স্তব্ধ, শাদা ধবধব
তোমার ইস্তফাপত্র দূর মহাশূন্যের সনদ।

কে পায় এবার—ভেবে অতিভারী জড়বস্তু
            কাপাস তুলোর চেয়ে ওড়ে
আগুনশলাই ছাড়া ধূম্রশলাকাখানি
                           নিজে নিজে পোড়ে

বলে চিত্র, ছোঁও ছোঁও, কাঁপে তার
                                 চক্ষুর পল্লব
পিপীলিকা দলটির শুনি কলরব

 


হয়তো অর্ধেক পথে বাধাপ্রাপ্ত হব, পেরোব না
                                 মরু বা প্রান্তর
থেমে যাব, কখনও হব আর কোনও নদী পার
অতএব তাকাব না, ঝটিকায় উড়ে যাবে ঘর

হতে পারে তারপর আবছায়া দেখা যাবে
                                    আমাকে আবার

কোথায় কে জানে তবু চারিদিক নীল বা নীলাভ
তখন পাব না স্তন, হয়তো মেঘের গায়ে
                                   দুহাত বোলাবো

 


সভয়ে আমার মন কাকুতি মিনতি করে, ছেড়ে দেয় হাল
আছাড়ি বিছাড়ি খায় দেহখানি, তবে হয়, এমন নিষ্প্রাণ
তথাপি সকল দৃশ্য
দিনরাত্রি শীত গ্রীষ্ম
অনুভূত হয় বলে ঢেউয়ে ঢেউয়ে বয়ে চলে কাল
আমি ক্ষত চিহ্নহীন
অতি শুষ্ক, বা রঙিন
যেখানে রয়েছি পড়ে, তা নয় শ্মশান।

আমার ওপর দিয়ে তবে কেন মেঘ যায়, ছোঁয় কেন
                                               সমুদ্রের জল
কানের ভিতর দিয়ে কেন পোকা ঢুকে যায়
               কেনবা শনাক্ত করে তারকা সকল

 

১০
‌‍‍‍‍‍‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‘তুমি চন্দ্রে হাত দিয়েছিলে! গহ্বরে আঙুল দিয়ে
                                   পেয়েছিলে মধু!
চেটেছিলে চাঁদের বরফ? গড়ালে চাঁদের গায়ে, চাঁদে?
চাঁদ কী বলল, শুনি’—কন্যা জিজ্ঞাসা করে,
                          ‘বলো বলো’—হেসে বলে বধূ
চুরুট ধরিয়ে আমি ধীরে ধীরে উঠে যাই ছাদে।

‘এই তো চাঁদের লোক’—অযুত তারকারাশি একযোগে বলে
‘ওর গায়ে বালি লেগে, তা চাঁদের ওপিঠের বালি!’
‘ও চাঁদের।’ ‘ও চাঁদের’—চারিদিকে ঘন ঘন তালি
আমি উড়ে চলে যাই পুনরায় চাঁদের দখলে

 

15782419_1349283875116730_866016987_n

১১
রিঠায় আমাকে কেচে আকাশে টাঙিয়ে দিল
                        তারাদের কাজের মাসিটি
দেখো কী সফেদ, শাদা
অতীতের কাদা
আর নেই।

বাতাসে শুকোবো। পরে খুলে দিলে
                                           ছাদে
ধপ করে পড়ে যাব, সেই
তোমার গামলাটিতে, সে কথা আলাদা।
তার আগে চাঁদে
নামটি তোমার লিখি?

দেখি তো অমর করে দিতে পারা যায় কিনা
তোমার হাসিটি

 

১২
ভীত ও চঞ্চল কেন মনে হলো তোমাকে দর্পণ?
আমার করুণ ছায়া উঠেছিল অতিরিক্ত দুলে?
দুটি হাত মনোযোগ ভুলে
আঁচড় কাটার মতো হয়েছিল তখন, তখন?
আয়না তুমি কি তাই ঈষৎ ছলকে পড়া
                        শুষে নিলে কিছুটা জীবন?

হতে পারে। হতে পারে। তথাপি উদ্বেগ কেন
                        কেন কাচে মৃদু ঝনঝন?
ওরা, ওরা ভয় পায়, ঘুলঘুলি, ছিটকিনি
                                     আত্মীয় স্বজন

 

১৩
জানে না ঘরনী কিছু, যখন একেলা আমি, মুণ্ডহীন ধড়
গৃহ শূন্য, অর্থাৎ উড্ডীয়মান, তবে শীর্ষে কটি কবুতর
ভাবি তা আকাশফেরি নীল নভে অতিকায় উড়ন্ত শহর
চাঁদ সূর্য একযোগে ঢুকে পড়ে ঘরের ভিতর

কতনা দুর্যোগ ঘটে এর ফলে, হয়ে যায় দিনরাত্রি রদ
ওড়ে গ্রন্থ, কাঠ-খড়, ঢেউ-টিন, পোপের সনদ
চন্দ্র সুভদ্র অতি, তবে সূর্য অতিশয় বদ
খ্যা খ্যা করে হাসে আর খালি গায়ে ঢেলে দেয় মদ

 

১৪
তুমি চিন্তা রূপে এসে স্ত্রী-ফড়িং উড়ে বসো ফাৎনার উপর
দিঘিজলে ছায়া পড়ে চৈত্রমাসে সূর্যাস্তবেলায়
তখন জটিল ঢেউয়ে অতীব সরল পুঁটি করে ধড়ফড়
বাকি যা বিবিধ মৎস ভয়ে চুপ তোমার খেলায়

নীলাভ রঙিন ডানা, লাজে তাতে ঈষৎ কাঁপন
অবাক শরীরখানি, টুকটুকে লাল
অতলের তলদেশে এরপর সুতো যায় শন শন শন
কে বলে অলস আমি, অযথা পুকুরপাড়ে
বসে থাকি সকাল বিকাল

 

১৫
এই যে জগৎ দেখে নিজকানে করি ফিস ফিস
ধারণা আকার নিয়ে
উত্তর-দক্ষিণ দিয়ে
যেই ঘরে ঢুকে পড়ে
ঘোরতর জল ঝড়ে
আমাকে জাগ্রত রেখে নিদ্রা যায় মাথার বালিশ
কী করি তখন আমি
উঠি ঊর্ধ্বে নিচে নামি
দেখে এ আমার খেলা
অকারণে ভোরবেলা
খোদ সূর্য ঠুকে দেয় সদরের থানায় নালিশ
গগন-পুলিস আসে
ভরে দেয় ইতিহাসে
দামাল মেঘের দল চেটেপুটে করে দেয় আমাকে পালিশ

 

১৬
কী করে কী হলো আমি জানি না তথাপি কোনও
                                          গোলযোগ হেতু
আমার অচেনা বলে মনে হলো আপন শহর
তখন দয়ালু এক স্ত্রীলোক বলল এসে;
                               আমি…আমি হাওড়ার সেতু
আমার ওপরে এসে পার হোন, হোক জলঝড়

আমি তাকে পেরোলাম, তবু কর্মফল
কেন ট্রেন ভুল হলো? কিছু কেন পড়ল না মনে?
কোন অলিগলি আজ নিয়ে এল হেতালের বনে?
শুঁকে কেন ছেড়ে দিল রয়াল বেঙ্গল?

 

১৭
কর্তব্য, তোমার কথা লিপিবদ্ধ করা
জলে, স্থলে, অন্তরীক্ষে, পর্বতের গা-য়
টঙে, শীর্ষে, সূর্যের ললাটে, চন্দ্রে, হাসে যেন তুষ্ট হয়ে ধরা
নিশীথে তারকাপুঞ্জ কৌতুকে তাকায়

কুচি কুচি চিরকুটে ভেসে ভেসে নিনিভির নীল গ্রন্থাগারে
যদি যায় আগুনের হরফেও, আর অশ্রুপাতে
ক্ষতে, রক্তে, গ্রন্থে, পটে, এ বিশাল জগৎ-সংসারে
সকলের মাঝে বসে কত কথা হতে পারে
                                       পুনরায় তোমাতে-আমাতে

 

১৮
আমি আবছায়া আঁকি, তুমি তাতে স্পষ্ট করে লেখো নিজনাম
ফলে মৎস্য খাবি খায়, দপদপ করে পুষ্করিণী—
এই চিত্র নিজে হাঁটে, পার হয় দুইশত তিনশত গ্রাম
কালের কেতাব হয়ে যখন নগরে ঢোকে, লোকে ভাবে
                                                 এ তবে কাহিনি

আমরা উভয়ে তাই এসো কিছু সরে থাকি, বনতরুতলে
এ বাদে নিশুতে আর কীবা কাজ তামাম বাংলায়
খেজুরের রাঙা ফল টুপ টুপ ঝরে পড়ে অন্ধকার জলে
                                               নদে ভেসে যায়…

 

১৯
অতি অল্পে চলে যাবে আমাদের বাকি দিনগুলি
শুনে চক্ষু ছলছল, তবে বুঝি—সম্মত সম্মত
নাসা মৃদু স্ফীত হয়ে পুনরায় শ্বাসকার্যরত
নীরবে দুকান শুনে কর্তব্যে উন্মুখ, চারিদিকে শব্দ শত শত
দক্ষিণ হস্তটি স্থির, ঈষৎ বিদ্রোহ করে বাম হস্তে কনিষ্ঠ অঙ্গুলি

এরপর দশদিকে ওলে ওলে বয়ে যায় নানাবিধ বায়ু
নখ, ত্বক, হাঁটু, কব্জি, হৃদি, লিঙ্গ, পায়ু
সমবেত পরামর্শে শরীরে জটলা করে, ভাবে
যত বলি বাকি দিন হেসে খেলে অল্পে চলে যাবে
সকাতরে মেনে নেয়, যেন-বা আমার শত সহস্র বছর পরমায়ু

 

২০
চিন্তায় নেব না কোনো জটিলতা, কাটাব না রাত
কেবল অবাক চোখে ক্ষণকাল বাতাসে সাক্ষাৎ
পাওয়ার কাতর লোভে, জেগে জেগে থাকব না আমি।
                সোজা যাব গুটিগুটি সুগম অঞ্চলে।
ভারী কিছু কখনো নেব না আর, তুমি ক্রমে ডুবে যাবে
                                               মনের অতলে।

তবে কিনা এও খেলা, হয়তো দৈবাৎ
ভুলে সূর্যে দিয়ে দেবো হাত

 

15801211_1349283838450067_867857134_n

২১
কোথাকার দুটি হাঁস এমন নিশুতরাতে পাতাল পুকুরে?
ছাদে মেলে দেওয়া শাড়ি এ তারায় ও তারায়
                                 গিঁট বেঁধে ঝোলে
বিবিধ বিজ্ঞানশাস্ত্র একত্রে উড়ন্ত পেয়ে
                   তোমার চোখের পাতা এইবার খোলে
আমাকে কামড়ে দেয় কাজ না থাকার ক্ষোভে
                                    রোবট-কুকুরে

তখন কোথায় বাড়ি, কোনখানে বালিশ-বিছানা
                                         কোথা রান্নাঘর?
জগৎসংসার এক নীল সরোবর

 

২২
চিন্তার বিক্ষোভ শুরু হয় বলে সরে থাকি
                   তবে কিনা হাত বাঁধা, পায়েও শিকল
তথাপি আমাকে ঠেলো
যেখানে সেখানে ফেলো
কাতর কবিতাখানি দেখো দেখো করে ছলছল
যদি-বা কর্দমে পড়ি
থেমে যাক হাতঘড়ি
মোবাইল ফোনখানি করে দাও ব্যাপক বিকল

আঁচড়াও, কামড়াও, ব্যথা ও বেদনাভরা
                        এই প্রাণ করে ধড়ফড়
তাহলে ল্যাংটো করো, ছিঁড়ে খুঁড়ে বের করো খড়
তবু তো দুপুরবেলা
তোমার-আমার খেলা
আমার চানের জল রোজ রোজ হয় নীল
এ তোমার কারসাজি বঙ্গোপসাগর

 

২৩
প্রায় তীরে এসে যায় আমার তালের ডোঙা
                               কাকভোরে কাদায় কাদায়
আমি সেই শরবন লগি ঠেলে ভেদ করি ধীরে
এইবার গুটিগুটি
রবি চাঁদ সখাদুটি
সহস্র নক্ষত্ররাশি নড়ে চড়ে যে যেমন, তার সুবিধায়।

দেখি সে আকাশভরা পলায়ন আগমন সে কী দ্রুতবেগ!
কালপুরুষের ঠেলা একটু খেয়েছে যেই—ছিটকোয় মেঘ।
সে গগন নিচু হয়ে
ভেঙেচুরে ক্ষয়ে ক্ষয়ে
জলে নেমে মতলবে ঢেউ তোলে নাওখানি ঘিরে
এখন সামলানো তাকে…
ভোরবেলা বাঘ ডাকে
আমার করুণ ডিঙি ঘুরপাক খেয়ে যায়
                               হাওড়ে বাদায়

 

২৪
অবাক হবো না আর প্রাণপণে ভাবি বলে
                                        মনে হয়, সব স্বাভাবিক
ওই তো তালের গাছ
জলেও তেচোখা মাছ
জাহাজগুলিতে, আহা, কত না নাবিক।

তবে কিনা এত উঠে
চারিদিক ঘুটঘুটে
স্তম্ভিত হই না বলে সকল ধীমান
ওই কালো নিয়ে ভাবে
অচিরেই জানা যাবে
আপাতত আর নিচে নেমো না, বিমান

 

২৫
যেন না গড়িয়ে পড়ি, আমাকে জড়িয়ে ধরে
                                          পানীয় সকল
চোখে ঠুলি এঁটে দেয় চাঁদ সূর্য একত্রে দুজন
জানলার ফাঁক দিয়ে ধেয়ে এসে হাওয়া নেয়
                                        আমার দখল
কানে তুলো আঁটে মেঘ, যেন না কখনো শুনি
                                      পাখির কূজন

এক পা দুই পা করে ছুপছুপ এগোয় দেয়াল
চাবিটি স্বয়ং উড়ে নাসারন্ধ্রে দিয়ে দেয় তালা
সিমেন্ট সুড়কি বালি ইট কাঠ লোহা আঠা গালা
আমাকে জাপটে করে হুটোপুটি—তাদের খেয়াল

যত বলি আমি ধীর, সদাশয়, নিপাট নিরীহ
চকিতে পালাই যদি, ঝুড়ি চাপা দিয়ে দেয় গৃহ

 

২৬
আর তত উঁচু নয়, তবু তার ছায়াখানি তা প্রায় বাতাস
নীরব মসৃণ বেলা, এলোমেলো ঢেউ আর চারপাশে নত
এ বনের গাছগুলি, বুকউঁচু অন্তহীন ঘাস
সেসব পেরিয়ে গেলে জলাশয়, বাঘিনী শাবকসহ জলপানরত

এ সকল গ্রন্থের মলাট
পাথরে হেলান দিয়ে পাঠ করে ওই সে বিরাট

 

২৭
কী হবে মুখোশপরা করবী ফুলের গাছ এসে গেলে
                                          কাছাকাছি খুব
অনুযোগ জানাব না
ভুলে যাব দেখাশোনা
শিশিবোতলের জলে ঘোরতর ভয়ে দেবো ডুব।

জানি তো ধারালো ঘাসে খুন হয়ে যেতে পারি
                                      দিনে কিবা রাতে
তখন উল্টিয়ে দেখে কত রক্ত লেগে যাবে
                  চাঁদ, সূর্য, তোমাদের হাতে

কী হবে সাগ্রহে এলে সশস্ত্র বকুল ফুল
                  কত না সাঁজোয়া গাড়ি, কত অশ্ব, রথ
রয়ে যাব কোনোটিতে
একা একা বিপরীতে
লুকিয়ে দেখব গৃহে ঢুকেছে পর্বত

 

২৮
অতীতের ডাল-ভাত, মাছ ও মুর্গির মাংস
গরম করছি বলে ইতিহাস ঘরে এসে ঢোকে
                            দুলে ওঠে আমার এ ঘর।
বেঢপ পোশাক পরা, মাথায় মুকুট
প্রীত হয় আমার সাক্ষাতে
এমন রোদের দিন, বেলা দ্বিপ্রহর
                        পরিণত হয়ে যায় থমথমে রাত-এ।

—এই নিন হাফশার্ট, জোব্বাটা খুলুন,
আমি বলি, এই নিন বুট
                পরুন পরুন।

খুশিতে আমার কাঁধে হাত দুটি রেখে ইতিহাস
বলে, তুমি তরুণ তরুণ
                            ঝক্কাস ঝক্কাস!

—জিও
দুই কাঁধে তাঁর হাত, পুনরায় উনিশ বর্ষীয়!

আমরা দুজনে বসে আহারাদি শেষ করি। আর
                                                   তারপর

বাংলায় শুরু হয় ঝড়

 

২৯
ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রের পাশে অতি ছোট, অতি ছোট
                        খেয়াল করেছি কিছু দ্রষ্টব্য রয়েছে
বিবিধ রঙের ঢেউ
চলাফেরা করে কেউ
প্রথমে ঝাপসা দেখা, ক্রমে ক্রমে সুস্পষ্ট হয়েছে
বৃক্ষ, গুল্ম, লতা, তরু
ভূমি, নদ, হ্রদ, মরু
মুঠোয় সর্বোচ্চ গিরি তুলে নিলে
                   বলে সিন্ধু, আমিও তো কয় ফোঁটা জল
যে কিনা ঈষৎ ছিদ্র, দাবি করে, অতল অতল
কৌতুকে আমার কী যে
চশমাটি নিজে নিজে
             এদিক সেদিক দেখে দূরে দেয় পাড়ি
হস্তীযূথে মনে হয় পিপীলিকাসারি

 

৩০
সে বড় অজ্ঞাত বস্তু, লঘু, ভারী আনয়ন করে
কিছু আসে ঘড়া ঘড়া
কোনোটা বোতলে ভরা
কিছু রাখে, কিছু ঢাকে, কী বিপদ এ গৃহের
                                                একখান ঘরে!

আমি যদি বলি, থামো
শুরু হয় বাঁদরামো
             সে কী জল! সে কী ঝড়! খালি বাজ পড়ে।

ঘাটে ধুলো, তেলকালি
চিনিতে মেশায় বালি
সকাতর যত করি মানা
                   আদরে আমার পিঠে
                   সোনালি সুতোর গিঁটে
                   জুড়ে দেয়, বোধ করি, ইগলের ডানা

মৃদুল দাশগুপ্ত

জন্ম ৩ এপ্রিল ১৯৫৫; শ্রীরামপুর, হুগলি, পশ্চিমবঙ্গ।
বিজ্ঞানে স্নাতক, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
জলপাই কাঠের এসরাজ [সাহিত্য চক্র, এপ্রিল ১৯৮০]
এভাবে কাঁদে না [প্রতিভাস, জানুয়ারি ১৯৮৬]
গোপনে হিংসার কথা বলি [প্রতিভাস, মে ১৯৮৮]
সূর্যাস্তে নির্মিত গৃহ [প্রতিভাস, সেপ্টেম্বর ১৯৯৮]
ধানখেত থেকে [কলম, জানুয়ারি ২০০৭]
সোনার বুদ্বুদ [সপ্তর্ষি প্রকাশন, জানুয়ারি ২০১০]

ই-মেইল : mridul_dasgupta@yahoo.co.in

Latest posts by মৃদুল দাশগুপ্ত (see all)