হোম কবিতা তীব্র ৩০ : মজিদ মাহমুদের বাছাই কবিতা

তীব্র ৩০ : মজিদ মাহমুদের বাছাই কবিতা

তীব্র ৩০ : মজিদ মাহমুদের বাছাই কবিতা
3.89K
0

মজিদ মাহমুদ মূলত কবি। আশির দশকে উন্মেষ ও আবির্ভাব।
কথাসাহিত্যেও তার প্রসিদ্ধি রয়েছে। অনুবাদ, শিশুসাহিত্য, সম্পাদনা—সব দিকেই তিনি সমান আগ্রহী।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ আটটি। সেখান থেকে কবি-নির্বাচিত ৩০টি কবিতা পরস্পরের পাঠকদের জন্য…


মাহফুজামঙ্গল
প্রকাশকাল : ১৯৮৯


কুরশিনামা


ঈশ্বরকে ডাক দিলে মাহফুজা সামনে এসে দাঁড়ায়
আমি প্রার্থনার জন্য যতবার হাত তুলি সন্ধ্যা বা সকালে
সেই নারী এসে আমার হৃদয়-মন তোলপাড় করে য়ায়
তখন আমার রুকু
আমার সেজদা
জায়নামাজ চেনে না
সাষ্টাঙ্গে আভূমি লুণ্ঠিত হই
এ মাটিতে উদ্‌গম আমার শরীর
এভাবে প্রতিটি শরীর বিরহজনিত প্রার্থনায়
তার স্রষ্টার কাছে অবনত হয়
তার নারীর কাছে অবনত হয়

আমি এখন রাধার কাহিনি জানি
সুরা আর সাকির অর্থ করেছি আবিষ্কার
নারী পৃথিবীর কেউ নও তুমি
তোমাকে পারে না ছুঁতে
আমাদের মধ্যবিত্ত ক্লেদাক্ত জীবন
মাটির পৃথিবী ছেড়ে সাত-তবক আসমান ছুঁয়েছে
তোমার কুরশি
তোমার মহিমার প্রশংসা গেয়ে
কী করে তুষ্ট করতে পারে এই নাদান প্রেমিক
তবু তোমার নাম অঙ্কিত করেছি আমার তছবির দানা
তোমার স্মরণে লিখেছি নব্য-আয়াত
আমি এখন ঘুমে জাগরণে জপি শুধু তোমার নাম।

 


এবাদত


মাহফুজা তোমার শরীর আমার তছবির দানা
আমি নেড়েচেড়ে দেখি আর আমার এবাদত হয়ে যায়
তুমি ছাড়া আর কোনো প্রার্থনায়
আমার শরীর এমন একাগ্রতায় হয় না নত
তোমার আগুনে আমি নিঃশেষ হই
যাতে তুমি হও সুখী

তোমার সান্নিধ্যে এলে জেগে ওঠে প্রবল ঈশ্বর
তুমি তখন ঢাল হয়ে তাঁর তির্যক রোশানি ঠেকাও
তোমার ছোঁয়া পেলে আমার আজাব কমে আসে সত্তরগুণ
আমি রোজ মকশো করি তোমার নামের বিশুদ্ধ বানান
কোথায় পড়েছে জানি তাসদিদ জজম
আমার বিগলিত তেলওয়াত শোনে ইনসান
তোমার নামে কোরবানি আমার সন্তান
যূপকাঠে মাথা রেখে কাঁপবে না নব্য-ইসমাইল

মাহফুজা তোমার শরীর আমার তছবির দানা
আমি নেড়েচেড়ে দেখি আর আমার এবাদত হয়ে যায়।

 


এন্টার্কটিকা


মাহফুজা তোমার এন্টার্কটিকা
মানুষের সন্তানেরা পারে না ছুঁতে
কেবল সূর্যের সংগমে তোমার লবণাক্ত ঘাম
বাহিত হয় আমাদের গ্রীষ্মের দেশে

তোমার বরফসুষমা চিবুক
হিমানির দেহ
অসম্ভব বিশ্বাসে নগ্ন হয়ে আছে তুষার-স্তন
আমার বড় হিংসে হয় মাহফুজা
তোমার ওই বিশাল দেহে হেঁটে বেড়ায় পেঙ্গুইন
দংশিত ক্ষতে পচে ওঠে আমাদের বহু ব্যবহৃত শরীর
তোমার স্পর্শে অমর হয় মানুষের মাটি
তুমি যদি বলতে পার মাহফুজা
আমরাও তোমাদের কেউ
তোমার সত্তার কসম
আর তবে ধরব না বেশ্যার হাত
অন্যথায় তোমার জমাটবদ্ধ নুন গলে
আমাকে ডুবায় যেন অতলান্ত সাগর।

 


নদী


সুউচ্চ পর্বতের শিখর থেকে গড়িয়ে পড়ার আগে
তুমি পাদদেশে নদী বিছিয়ে দিয়েছিলে মাহফুজা
আজ সবাই শুনছে সেই জলপ্রপাতের শব্দ
নদীর তীর ঘেঁষে জেগে উঠছে অসংখ্য বসতি
ডিমের ভেতর থেকে চঞ্চুতে কষ্ট নিয়ে পাখি উড়ে যাচ্ছে
কিন্তু কেউ দেখছে না পানির নিচে বিছিয়ে দেয়া
তোমার কোমল করতল আমাকে মাছের মতো
               ভাসিয়ে রেখেছে

 


বল উপাখ্যান
প্রকাশকাল : ২০০০


বল উপাখ্যান


প্রথমে একটি গোল অথচ নিরাকার বলের মধ্য দিয়ে
গড়াতে গড়াতে আমি তোমার শরীর থেকে পৃথক হয়ে গেলাম
আর সেই থেকে তুমি―
মরণকে একটি পিচ্ছিল জিহ্বার মতো বিছিয়ে রেখে
আমাকে ধরার জন্য ছুটে চলেছ, আর আমি
প্রাণ-ভোমরা একটি সিন্দুরের কৌটার মধ্যে লুকিয়ে রেখে
তোমার নাগাল থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছি
এই পলায়ন একটি খেলা
যেহেতু সমুদ্র-সঙ্গমের আগেই তোমার বিছানো
পিচ্ছিল জালের সূক্ষ্ম সুতায় গেঁথে নেবে আমাকে
যেহেতু আমার তর্জনিতে জড়ানো সৌর-মণ্ডল
ঘুরতে ঘুরতে একদিন তোমার চারপাশে গড়ে তুলবে দুর্গ-পরিখা
তুমি ধরে ফেলবার আগেই
আমি সাড়ে সাতশ’ কোটি নিরাকার বল
তোমার চতুর্দিকে ছড়িয়ে দিয়েছি
অসহায় বাঘিনীর মতো তুমি থাবা বিস্তার করে আছ—

হায় রে আমার দুরন্ত সন্তান
একদিন ভালোবেসে তোদের করেছি সৃজন
অথচ আজ আমি পিংপং বল
আমার হাতে আছে বজ্র তুফান ভূমিকম্প
‘বজ্রে তোমার বাজে বাঁশি সে কি সহজ গান’
তোমার বাতাসকে বাহন করে বজ্রের মধ্যে
আমরা তোমার গানকে ছড়িয়ে দিচ্ছি
আমরা বাতাসকে বললাম আমাদের শরীরের মধ্যে
গমন নির্গমন ছাড়াও তোমার কিছু
কাজ করা উচিত
আমরা বজ্রকে বললাম আমাদের ঘরের মধ্যে
আলো জ্বেলে দাও
গরুর পরিবর্তে আমাদের লাঙলগুলি কাঁধে নিয়ে টানতে থাকো
শূন্যতা আমাদের বায়ুযান ভাসিয়ে নিয়ে
বোরাকের মতো ছুটে চলেছে…

এই যাত্রা একদিন শেষ এবং নিঃশেষ হয়ে
তোমাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাবে
তুমি একমাত্র সন্তানের জননীর মতো
হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়বে আমার অপুষ্ট তনুর উপর
আমি বলব, মাগো তোমার বাবা কে
তুমি বলবে, ‘তুই,
আমি তোর জননেন্দ্রিয়ের মধ্য দিয়ে গড়াতে গড়াতে
বেরিয়ে এসে তোকেই করেছি ধারণ’

আমরা যখন বাতাসের কণা ছিলাম
দুই অণু হাইড্রোজেন এবং এক অণু অম্লজান ছিলাম
তখন ব্রহ্মার নাকের মধ্যে ছিল আমাদের অবাধ যাতায়াত
ব্রহ্মা তখন আমাদের মতো ছিলেন
আমরা তখন ব্রহ্মার মতো ছিলাম
ব্রহ্মা কিছুকাল মাটি ছিলেন
আমরা কিছুদিন আকাশ ছিলাম
তারপর একটি মোরগের মতো কুরুক্কু করে
আমরা মানুষের ঘুম ভাঙাতে থাকি এবং
একটি জবে করা শুকুরের মাংস এবং রক্তের সঙ্গে
মানুষের রক্ত এবং মাংস মেশানোর কাজ বহুকাল ধরে
করে চলেছি

অথচ এই গোনাহ থেকে নাজাতের কোনো পথ খোলা নেই
কেবল একটি নিরাকার বল তোমার শরীর থেকে
পৃথক হয়ে অনবরত ছুটে চলেছে…

 


পুত্র ডুবে যাচ্ছে


কেনান কেনান বলে ঘুমের মধ্যে কেঁদে ওঠে নূহু
প্রভু! পুত্র ডুবে যায়

অবাধ্য! তবু সে পুত্র আমার
মানুষের পাশে থেকে করেছে বিদ্রোহ
সবাই জানে তোমার নৌকায় সে লেখায় নি নাম
তাই বলে তার ধান ডুবে যাবে!
পর্বতের গোড়ালির মতো অহংকার নিয়ে জেগে আছে
                                                        মানবসন্তান

একদিকে নবুয়ত অন্যদিকে পুত্রের মায়া
আমি পুত্রের মায়া চাই
আমার পুত্র আজ ডুবে যাচ্ছে গজবের জলে
সেই জলে আমি নৌকা চালাব
                            এক জোড়া মানুষের নমুনা নিয়ে!
তোমার নতুন স্বর্গ গড়ার স্বপ্নে আমার কোনো ভালোবাসা নেই
আমি মানুষের পিতা
মানুষ আমার ভাই
নবুয়তের লোভ দেখিও না
তোমার কিশতি থেকে নেমে যেতে একটুও দেরি হবে না

পুত্র ডুবে যাবে আর পিতা থাকবে প্রমোদতরীতে!
সেই ভিতুদের নবী আজ গতায়ু প্রভু
আমিও জলে যাব আমার পুত্রের সাথে
আমিও থৈ থৈ আগুন পানির মধ্যে হাবুডুবু খাব
জীবন মৃত্যুর স্বাদ মেখে নেব শরীরে

        তোমার কিশতি প্রভু তুমিই সামলাও…

 


বিদ্যাসাগরের মা ভগবতী দেবী


এই বিক্ষুব্ধ ঝড়ের রাত আগুন পানির রাত
ফুঁসে উঠছে দামোদর নদী
নদীর মধ্যে মহিষ
মহিষের শিং ধরে ভেসে যাচ্ছে
              আদিম মেয়োসিস
উঠছে আর নামছে; নামছে আর
উঠছে; এই ভয়াল রাতে অভয়ার কাছে যেতে হবে
অভয়া আমার মা; আর দামোদর
পৃথিবীর আদিমতম নদী
তরঙ্গ নৃত্যের মধ্যে লুফে নিচ্ছে শরীর
আমি শিশুকের মতো ভেসে উঠছি
ডুবে যাচ্ছি; নদীর সমার্থক হয়ে
মহিষ ধেয়ে আসছে আমার দিকে

আমার রক্তের মধ্যে দামোদর
আমার রক্তের মধ্যে মহিষ
মাগো তুই মহিষাসুর বধের মন্ত্র শেখা
আমি তোর কাছে যাব
আমার অর্ধেকটা শরীর জলের কাছে রেখে
বাকি অর্ধেক তোকে দেবো; তোর
পুঁইয়ের মাচা লাল শাক
আর আমার দামোদর নদী
নদীর মধ্যে মহিষ
মহিষের শিং ধরে ভেসে যাচ্ছে
             আদিম মেয়োসিস।

 


অব্যক্ত কান্নার গান


তোমরা কী সব কথা বলো!
আমার জানতে ইচ্ছে করে
তোমরা বলতে বলতে হাসো
হাসতে হাসতে পরস্পর কোলের পরে ঢলে পড়ো
তোমরা কী সব কথা বলো!
আমার কেবল জলপরী আর আকাশপরীর কথা মনে পড়ে
শুনেছি জোছনায় ভিজে ভিজে আকাশের পথে উড়ে আসে তারা
আসতে আসতে নিজেদের মধ্যে কী সব কথা বলে
কী সব কথা বলে তারা
জলের ঘাটলায় এসে খুলে ফেলে নিভাঁজ পোশাক
শুরু হয় ঝাঁপাই খেলা
তোমরাও খেল নাকি
একবার কোন এক ফাজিল যুবক নাকি করেছিল চুরি
পরীদের পরিত্যক্ত পোশাক
বুকের লজ্জা নিয়ে নিতম্বের লজ্জা নিয়ে তাই
জলের অপ্সরী রয়ে গেল জলে
আকাশপরীও উড়ল না আকাশে
এখনও রাত এলে জোছনায়
তাদের নগ্ন দেহের নৃত্যের ভাঁজে
কেঁপে ওঠে পুকুরের জল
দিন এলে পরীদের শব শাপলা হয়ে ফোটে

তোমরা কি সেই পরী-পুকুরের কথা বলো
বলতে বলতে হাসো
হাসতে হাসতে কেঁদে ওঠো মানবিক ব্যথায়
আমার তো মনে হয় না তোমাদের সেই ব্যথা
কোনোদিন জানা হবে আমার!

 


জাতক


তোমাদের তো আগেই বলেছি, তখন আমি ছিলাম একটি পুঁচকে খরগোশ
আমার কান দুটি কেবলই খাড়া হয়ে উঠছিল, আর
পেছনের পা মাটিতে সমান্তরাল রেখে আমার মা
                           শেখাচ্ছিলেন ছুটে চলার কৌশল
খরগোশদের সামনের পা ছোট হয় বলে তখন আমার কী যে আক্ষেপ
মা বলতেন মানুষের তো দুটি পা-ই নেই
ওদের বাচ্চারা দু’পায়েই দেখ কেমন লাফিয়ে চলে
তারপর একদিন একটি শেয়াল সত্যিই আমাকে
তাড়াতে তাড়াতে লোকালয়ের মধ্য দিয়ে
একটি বেগুন ক্ষেত পার করে দিল

আমার পায়ের যন্ত্রণা মাংসের স্বাদ
সে সব এখন আর মনে নেই
কেবল মনে আছে
ঘাসের নরম ডগা নিয়ে ফিরে আসতেন মা, আর
মাটির বিছানায় শুয়ে আমার সহোদর মায়ের উদোরে
আদর ঘষে খুটে খেত ঘাসের ডগা।

 

14191843_1229683227076796_1656813893_o

 


প্রমিথিউস


আমরা ছিলাম কবিতাতান্ত্রিক পরিবারের সন্তান
জলের যোনি থেকে উৎপন্ন হলেও
              ক্যাসিওপিয়া আমার মা
ভূমিতে বিচরণশীল প্রাণীদের মধ্যে মানুষকেই
প্রথম বেছে নিয়েছিলাম
তখন হিমযুগ
পৃথিবীতে দারুণ শীত
মানুষ মাংসের ব্যবহার শেখে নি
সোনা মাছ তেরচা মাছ আর কাঁচা মাছ মাংস দিয়ে
                           উদোর আর নাভিমূল পুরিয়েছে
মানুষ আজ যাকে সভ্যতা জানে
                                         তার নাম আগুন
আমরা বাহাত্তর হাজার কোটি আলোকবর্ষ পেরিয়ে
যে অগ্নিতে সংস্থাপিত ঈশ্বর
যে আগুনে পুড়েছিল তুর
আমরা আমাদের সন্তানকে সেই আগুন চুরির
                                          কৌশল শিখিয়েছিলাম
তিমির তেল থেকে নারী এস্কিমো এখনও যেভাবে
              ধরে রাখে পিলসুজ
শরীরে শরীর ঘষে যে আগুন
সেসব তো অনেক পরের ঘটনা
আমরা মানুষের মধ্যে ঈশ্বর
ঈশ্বরের মধ্যে শয়তান
এবং শয়তানের মধ্যে যুক্তির
             অবতারণা করেছি
হে বিশ্বকর্মা স্বয়ম্ভু‚ সেদিনের কথা স্মরণ করো
অলিম্পাস থেকে নেমে আসছেন জিউস
হংসীর উপর দেবতার আপতনকেও
                            আমরা লিপিবদ্ধ করেছি
তারপর একটি আন্ডাকে দু’ভাগ করে নিয়ে এসেছি
যুদ্ধের মোহন শরীর
মাংসের জন্য মানুষের যুদ্ধ
মাছের জন্য মানুষের যুদ্ধ
তার শরীরে আঁশগন্ধ ছিল
আমরা শব্দকে কালো সুতা দিয়ে
তসবির দানার মতো গেঁথে তুলেছি
শব্দ মানে শব্দ-ব্রহ্ম সৃজন এবং ছেদন
যার একটি বৃহৎ রশি মানুষকে বাঁধতে বাঁধতে
গুহাঙ্কিত চিত্রলিপির মধ্যে পতিত হয়েছে
যখন বৃষ্টি ছিল
রামগিরি পর্বত ছিল
নির্বাসনদণ্ড ছিল
কেবল ছিল না যক্ষের সর্বভুক বেদনার রূপ
আমরা জানতাম পাখির বিষ্ঠাপতনের শব্দ
মানুষকে আহ্লাদিত করে না
মাংস এবং গুহ্যের অধিক কিছু আবিষ্কার
করেছেন কবি।

 


গাছ-জীবন


আজ রাত ভোর হলে আমার গাছ-জীবন শেষ হয়ে যাবে
কাঠুরিয়া এসেছিল কাল রাতে, সব ঠিক হয়ে গেছে
করাত কলের শব্দে আমার রাত্রির ঘুম ভেঙে যাবে
বুকের মধ্যে তুমুল আলোড়ন, আমি শুধু মৃত্তিকার কথা ভেবে
কষ্ট পাচ্ছি; আমার নিবিড় ডালপালা একমাত্র আশ্রয় করে
একটি মা-পাখি দুটো ডিম বুকে নিয়ে কী নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে
তাকে কিভাবে জানাই, পাখির ভাষা গাছের ভাষা এক নয় কেন
অথচ এই বিহঙ্গ ছিল আমার জায়া, যাকে জননী বলে ডাকি
অন্তত একটা দিন আমি তার উদরে ছিলাম
নদীর ওপার থেকে কুড়িয়ে এনে গাছের শূককীট গুহ্যের দ্বার
প্রসারিত করে এইখানে করেছিল বপন, পাখি ছাড়া
আমাদের জীবনের কী মানে হতে পারে
গাছের স্বপ্ন কেবল উড়বার সাধ, মানুষ চায় গাছের জীবন
গাছ বৃত্তের মধ্যম পর্যায়, সিদ্ধার্থের ইচ্ছার সন্ততি বোধিদ্রুম
সিদ্ধার্থ গাছ হয়েছিলেন, গাছের শাখাতে বসেছিল পাখি,
বল্কলের পেটে রেখেছিল হাত, সুজাতার হাত, পায়েসান্ন
নির্বাণ দিয়েছিলেন তাঁকে, করাত কলের শব্দে আমি সেই
মুক্তির আহ্বান শুনি, মুক্তি কেবল দৃশ্যের রূপান্তর
তবু এই খোলসের মায়া আমাকে ব্যথিত করে তোলে
কাল রাতে ফিরে এসে পক্ষিমাতা তার সন্তানের মৃতদেহ নিয়ে
কোথায় যাবে, গাছের বিড়ম্বনা একঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকা
গাছের বিড়ম্বনা পায়ের ব্যথা, তবু মানুষের জন্য অম্লজান
তৈরির আনন্দ আছে, আমার শুষ্ক ডালের মধ্যে রয়েছে আগুন
আগুন মানে ঈশ্বর, জীবনের অক্ষবিন্দু, হা ঈশ্বর!
পাখি আর গাছ, গাছ আর মানুষ
এই ত্রিভুজ কষ্টের মধ্যে আনন্দ কোথায়।

 


আপেল কাহিনি
প্রকাশকাল : ২০০২


আপেল কাহিনি


সৃষ্টির শুরুতে তুমি একটি অখণ্ড আপেলের মতো ছিলে
চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল তোমার রক্তিমগণ্ডের আভা
অরণ্যের মধ্য দিয়ে হাজারো গিরিপথ অতিক্রম করে
              তুমি সমুদ্রের দিকে নামতে থাকলে
তোমার এই একাকী যাত্রা বড় কঠিন ছিল
তুমি কোন দিকে যাবে
বামে গেলে ডান, ডানে গেলে বাম
              বড় অরক্ষিত হয়ে পড়ে
তোমার যাত্রা সমুদ্র অরণ্য মরুভূমি ও পর্বতের দিকে
তোমার ইচ্ছে হলো বাম গালকে দেখার
তোমরা পরস্পর কথা বলতে থাকলে
ঈশ্বর একটি ধারালো ছুরি দিয়ে
তোমার শরীরকে সমান দু’ভাগ করে দিল; আর
সঙ্গে সঙ্গে তোমরা হয়ে উঠলে এক ও অদ্বিতীয়
এবং কেউ কাউকে তোয়াক্কা না করে দুই বিপরীত
                             মেরুর দিকে ছুটতে থাকলে
সেই থেকে তোমার শরীর হতে গড়িয়ে পড়ছে
              লাল রক্তের ধারা
অসম্ভব যন্ত্রণায় তোমরা দূর থেকে পরস্পরকে দেখতে থাকলে
অথচ তোমার শরীরের সঙ্গে এত সুখ ও সৌন্দর্য ছিল
                                          তুমি জানতে পারো নি
কেননা তোমার পিঠ ছিল পিঠের সঙ্গে
তোমাদের একদিকে ছিল সমুদ্র ও পর্বতের ঝর্নাধারা
অন্যদিকে আকাশ ও মরুভূমি
এতদিন বৃথাই তোমরা ছুটছিলে
কিন্তু নিজেদের শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হবার পর
                             যখন তোমরা জানলে
মরুভূমি ও সমুদ্রের মিলনের আকাঙ্ক্ষা তীব্রতর হয়ে উঠল
এবং তোমাদের দুঃখিত করে তুলল…
সেই থেকে বন্ধুর গিরিপথ দিয়ে অমসৃণ শরীরে
গড়াতে গড়াতে প্রায়শ তোমরা ক্ষতাক্ত হয়ে উঠছ
আর কাটা হৃৎপিণ্ডের রক্তের ধারা
সমুদ্রের গর্জন সিংহের আর্তনাদ উপেক্ষা করে
পূর্ণতোয়ার সঙ্গমবিন্দুর দিকে ধাবিত হচ্ছ
কিন্তু তোমরা পুনরায় একত্রিত হবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছ
এই অক্ষমতাই তোমাদের মিলন ও ভালোবাসার গান হয়ে
অরণ্য পর্বত আর সমুদ্র অতিক্রম করে অন্ধকারের
কালোবিন্দুর দিকে ধাবিত হচ্ছে…

 


3909 on


তোমাদের কি এখনও নিউফাউন্ডল্যান্ডের সেই জাহাজ-ডুবির কথা মনে আছে
আমি যখন অতলান্তিকে তোমাদের জাহাজটি ডুবিয়ে দিচ্ছিলাম
নীল হিমশীতল জলের মধ্যে একটি বরফের চাঁই যখন
ষাট হাজার টন ওজনের গ্রিক দেবতার শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছিল
তোমরা যখন নৈশভোজের টেবিল ছেড়ে বলরুমে একত্রিত হচ্ছিলে
আর তখনই তোমাদের বিরুদ্ধে জেগে উঠছিল আমার হিংসার অনল
যদিও আমি সবকিছু খেলার ছলে নিচ্ছিলাম; তবু
তোমরা যখন কায়দা করে জাহাজের গায়ে লিখে দিচ্ছিলে
3909 on অর্থাৎ তোমরা বোঝাতে চাচ্ছিলে
এই তরী ঈশ্বরের নাগালের বাইরে; যদিও ঈশ্বরের থাকা না থাকা
আমার কাছে কোনো অর্থ বহন করে না; তবু যখন তোমরা
ঈশ্বরের রাষ্ট্র থেকে মুক্তি পেতে চাও; তখন আমি ক্রুদ্ধ হয়ে উঠি; কারণ
আমিই তো জলের উপরে তোমাদের নৌকাগুলো ভাসিয়ে রাখি
সমতল ও স্থলভাগের মধ্য দিয়ে জলের ধারা বয়ে নিয়ে চলি
যাতে নদীকে অনুসরণ করে তোমরা তোমাদের আবাসগুলো
গড়ে তুলতে পারো; অবশ্য তোমরা যদি তা নাও করো তবু আমার
কিছু এসে যায় না কিংবা তোমাদেরও; তবু একবার ভেবে দ্যাখো
কিসের সঙ্গে তোমাদের জাহাজটি আমি ঠুকে দিয়েছিলাম
সে তো জমাটবদ্ধ পানি ছাড়া কিছু নয়; এমনকি তোমরাও
বহুদিন জলের প্ল্যাসেন্টার ভেতর ভেসে ভেসে হাত এবং পা
আলাদা করে চিনতে পারো; যখন তোমরা জল এবং বাতাস থাকো
তখন আমরা পরস্পর শরীরের মধ্যে ওঠা নামা করতে থাকি; কিন্তু
যখন আমি জলকে বাতাস থেকে আলাদা করে ফেলি এবং
বিভিন্ন আকারে জমাট বাঁধতে থাকি; তখন তুমি বড় অহংকারী হয়ে ওঠো
কেননা আমাকে তোমাদের ভেতর নিয়মিত প্রবেশ করে তোমাদের
সঞ্চালনকে দৃশ্যযোগ্য করে তুলতে হয়; আর তাতেই তোমরা আমাকে
স্রেফ বাহন ছাড়া কিছুই ভাবতে পারো না; আর তোমরা ভাবতে থাকো
বাতাস এবং পানির সঙ্গে কখনই তোমরা একত্রে বসবাস করো নি কিংবা
তোমাদের এই জমাটবদ্ধ অবস্থার কখনই পরিবর্তন হবে না; অথচ
তোমরা একখণ্ড বরফকে প্রতিনিয়ত গলে সমুদ্রে মিশে যেতে দ্যাখো; আর

তোমাদের চোখের সামনে সূর্যের সাতরঙা শুঁড়ের মধ্য দিয়ে অসংখ্য
পানির সন্তানদের হারিয়ে যেতে দ্যাখো;
ফলে তোমাদের জাহাজটি ডুবিয়ে দেয়া আমার জন্য কোনো কষ্টের কিংবা
নির্মমতার উদাহরণ হতে পারে না; বরং সেদিন যারা পানির সঙ্গে মিশে
গিয়েছিল; ১৩০০০ ফুট পানির তলদেশে রক্ষিত ছিল যাদের স্কেলিটন
তাদের সৌভাগ্যের কাহিনি কখনই তোমরা জানতে পারবে না; ধরো
সেই ভয়ঙ্কর জলের ধারাকে উপেক্ষা করে আমি সেদিন যাদের বরফকে
গলতে দেই নি; আজ কোথাও কি তাদের এক টুকরো অবশিষ্ট আছে
বরং তাদের হৃদয়ের মহান ভালোবাসা তারচে অধিক নিজেদের
প্রাণ নিয়ে টিকে থাকার আনন্দে সহযাত্রীদের মৃত্যুর করুণ দুর্ভাগ্যের
কথা বলতে বলতে মনে হচ্ছিল মড়কের সবগুলো অগ্নিসাগর
তারা অতিক্রম করে এসেছে; অথচ তারা জানতেই পারেনি তাদের
জাহাজটি সাউদাম্পটন ছেড়ে যাবার আগেই তারা প্রত্যেকেই ছিল
              এক একজন ডুবন্ত মানুষ!

 


পরিপ্রেক্ষিত


কোথাও কি ঈশ্বরের রাজ্য কিংবা একখণ্ড জমি আছে
সেখানে আমাকে একটু দাঁড়াতে দাও
সেই জমিতে একটি ফলবান বৃক্ষের ছায়া কিংবা স্রোতস্বিনী
               যা ঈশ্বরের রাজ্যের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত
সেই পূর্ণতোয়ার শীতল জলে আমাকে একটু
                             অবগাহন করতে দাও
যে লোকটি গতকাল দাঁড়িয়েছিল তোমার সানসেটের নিচে
তার কিছুক্ষণ আগেই যে লোকটি সমুদ্রের লবণ থেকে
পানি আলাদা করে করুণাধারার মতো
তোমাদের ওপর ছড়িয়ে দিচ্ছিল
তোমরা তখন বৃষ্টির আদরে যুগলবন্দি হয়ে
রবীন্দ্রনাথের ‘ঝুলন’ কবিতাটি পড়ছিলে
আর তোমাদের শরীরের মাংসের স্ফীতি
একটি গোলাপকলির সৌন্দর্য বিকশিত করছিল
অথচ আগন্তুককে তোমরা হঠাৎ চোর বলে
             সাব্যস্ত করলে
তোমাদের দৌবারিক চেলাকাঠের আঘাতে
             আবার তাকে রাস্তায় বের করে দিল
অথচ তখনও তোমরা তার করুণাধারার মধ্যে এবং সে
তোমাদের শরীরের মধ্যে আগুনের চুল্লি প্রজ্বলিত রাখছিল
প্রকৃতপক্ষে কী আছে তোমার যা থেকে সে চুরি করতে পারে
যাকে তোমরা সম্পদ এবং শরীর বলো, যেমন
একখণ্ড জমি পাথরের দালান ইলেক্ট্রনিক্স কাগজের নোট এবং
             তোমার উরু নিতম্ব বক্ষদেশ ও মুখমণ্ডল; আর
এসব কেন যে সুন্দর
             তুমি ঠিক ব্যাখ্যা করতে পারো না
তখন বলো, এসব ঈশ্বরের কৃপা, কিন্তু
             নগ্নপদ ঈশ্বরকে তোমরা চিনতে পারো না, যখন সে
             বালির সঙ্গে সুড়কি মেশাতে থাকে এবং
নিপুণ দক্ষতায় ইটগুলো একের পর এক সাজিয়ে তোলে
এবং তোমাদের মূর্খতা দেখে হাসি গোপন করতে থাকে
কেননা সে জানে, কয়েক দিনের ব্যবধানে
অন্য কোনো প্রেক্ষিতে তোমাদের সরিয়ে নেয়া হবে
অথচ প্রকৃত মালিককে তোমরা একটু বসতে দিতে পারো না

 


সাপ


আমি যখন বুকে ভর দিয়ে প্রাণভয়ে দৌড়াচ্ছিলাম
তুমি তখন সরীসৃপ ছাড়া কিছু বলো নি
বুকের পাঁজর সংকোচন করে হাঁটতে বেশ কষ্ট হয়
সেই সাপ-জীবনের যন্ত্রণা এখনও আমি ভুলতে পারি নি

অথচ ঈশ্বরের সবুজ বাগানে তুমি দু’পায়ে কী চমৎকার
হাঁটছিলে; পল্লবের আড়াল থেকে আমার ঈর্ষা কেবল
তোমাকে দগ্ধ করছিল; সেই থেকে আমার মনে জেগেছিল
তোমার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়ার সাধ
পা না থাকার লজ্জা তুমি বুঝতে পারবে না; তবু
কেবল কৌতূহলবশত হাত দিয়ে বুকের কাছটা ছুঁয়ে দিলে
জন্ম থেকেই আমার ছিল শরম লুকানো স্বভাব; কেননা
মাথা আর বুক পেটের দিকে কি শ্রীহীন একই রকম
বড় জোর গর্তে ঢোকার সময়ে শরীরের নির্মোকগুলো
                                          কিছুটা পাল্টে যেতে পারে
তখন পিছনের লেজ টেনে কেউ ফেরাতে পারে না
কারণ বুকে হাঁটার যন্ত্রণায় আমার মস্তিষ্কে
             কষ্টের বিষকণা জমা হতে থাকে
সেই গরল দাঁতের ছিদ্র-পথে নির্গমন না হলে
মৃত্যুর চেয়ে ভয়ঙ্কর মরণ আমাকে গ্রাস করতে থাকে
ঈশ্বর দেখে ফেলার আগেই এমন একটি লম্বমান প্রাণী
             তুমি কোথায় লুকাবে
তোমাকে লজ্জার হাত থেকে বাঁচাবার জন্য আমি
পূর্ব-নির্ধারিত গুহার মধ্যে পালিয়ে গিয়েছিলাম
অথচ তুমি তো জানো সাপ নিজে কোনো গর্ত খুঁড়তে পারে না
তবু তোমার সঙ্গে আমার এই লুকানো ক্রীড়া
             ঈশ্বর পছন্দ করতে পারলেন না
তাড়িয়ে দিলেন অভিশপ্ত আমাদের তার সবুজ উদ্যান থেকে
দিলেন বিচ্ছিন্নতার শাস্তি; অথচ এই বিজন
বিরান মরুমৃত্তিকায় তোমাকে ছাড়া আমি কি কাউকে চিনি?
কিন্তু আমি কিভাবে তোমার কাছে যাব
আমি তো পায়ের উপর ভর দিয়ে দাঁড়াতে পারি না; তাই
দিনের আলোতে ঘাসের নিচে লুকিয়ে রাখি পথ চলার লজ্জা
রাত এলে তোমার খোঁজে এঁকে-বেঁকে
                                         বেরিয়ে পড়ি রাস্তায়

 


আমার ছিল ঈশ্বরী


আমার তো বান্ধবী ছিল না
আমার ছিল ঈশ্বরী
আমি তার বুকের কাছে শুয়ে
মুখের কাছে মুখ রেখে জেনেছিলাম জীবনের মানে
শিলার আড়াল থেকে নদীর উৎসমুখ খুলে দিয়ে
বন্ধুর গিরিপথ বেয়ে করেছিলাম আমাদের যাত্রার সূচনা
              ‘বিশ্ব যখন নিদ্রামগন
গগন অন্ধকার
কে দেয় আমার বীণার তারে
এমন ঝংকার’
তোমার ঝংকারে আমার নিষ্প্রাণ পাথর উঠেছিল নড়ে
অযুত সহস্র বছরের পার থেকে একটি শ্যাওলার বীজ
পানির যোনির ভেতর থেকে ভেসে এসে
লেগেছিল পাথরের গায়
তুমি কতকাল শুয়েছিলে শ্যাওলার বুকে
মাছের আঁশটে গন্ধে আমার ভেঙেছিল ঘুম
আমি তখন হামাগুড়ি দিয়ে তোমার দুধের বোঁটা
আকণ্ঠ করেছিলাম পান
তোমার স্পর্শে এইভাবে কতবার উঠেছি জেগে
চলে গেছি মুত্যুর হিমশীতল জরায়ুর ভেতর
তারপর আপন রক্তের মাংসের স্বাদ দিয়ে
পরিতৃপ্ত জীবন মেলে ধরলে সূর্যের পানে
মুমূর্ষুর বিছানার পাশে আপেলের রক্তিম গালের
              আভা নিয়ে কতরাত জেগেছিলে তুমি
আমার ছেদন দাঁতে এখনও লেগে আছে সেই স্বাদ
এইভাবে তোমার দেহের মধ্যে আমাকে লুকিয়ে
ফেলেছি কিংবা
আমার প্রাণবীজ তোমার বরফ-ঠান্ডা অন্ধকারের প্রকোষ্ঠে
গচ্ছিত রেখে
লক্ষ কোটি বছর ধরে অদৃশ্য তপস্যায় মগ্ন রয়েছি আমি…

 


হাত


‘হাত’ হলো মানুষের শুকিয়ে যাওয়া পায়ের নাম
শিশুকে মজা দেখাবার জন্য প্রথমে সে পিছনের
              পায়ে দাঁড়িয়েছিল একদিন
শিশুর ফিকফিক হাসি আর বারংবার বায়নার কাছে
দু’পায়েই টলেমলে লাফিয়ে চলতে হলো কিছুক্ষণ, যেমন
মানুষের বাচ্চারা আজ বাবাকে চারপেয়ে ঘোড়া বানিয়ে
পিঠের উপর চড়ে বসে, কান ধরে চিঁহি ডেকে ওঠে
ব্যাপারটা ঠিক তেমনই ছিল; ফাজিল শিশু বলেছিল
                             ‘বাপ তুই দুই পায়ে হাঁট’
একবার ভাবো দেখি দু’পায়ে হাঁটতে গেলে
সামনের পা দু’টি কি বিচ্ছিরি কাঁধের উপরে ঝুলে থাকে
তবু সন্তানের আবদার কোন জন্তু উপেক্ষা করতে পারে?
মানুষ বহুদিন জানত না শুকিয়ে যাওয়া সামনের পা দু’টির
আসলে কোন কাজ আছে কিনা; অপ্রয়োজনীয় শব্দটি
তখন থেকেই মানুষ বুঝতে শিখল; ঝুলে থাকা হাতে
              তুলে নিল পাথর, এদিক ওদিক ছুড়ে মারল
রক্তাক্ত হলো নিরীহ মহিষের শিরোদেশ
শান্ত গোবৎস বনান্তরে ছুটে পালাল; তারপর
একটি শিম্পাঞ্জিও মানুষকে বিশ্বাস করতে পারল না
সেই থেকে মানুষের জাত প্রাণিকুল থেকে আলাদা হয়ে গেল
কারণ মানুষ প্রকৃতিবিরোধী
এভাবে পাথর আর বল্লমের কাল কবেই ফুরিয়েছে
নিহত শূকরের রক্তে মানুষের আর কোনো আনন্দ নেই
হাত এখন হাতের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি জেগে আছে
মানুষের বুদ্ধিসুদ্ধি ওসব কিছু নয়
মানুষের ইতিহাস হলো হাতের ইতিহাস

 


গ্রামকুট
প্রকাশকাল : ২০১৫


পাখিটি


আমিও চাইতাম পাখিটি উড়ে যাক
আমার ঘরের পাশে সারাদিন যেন না শুনি তার সুমধুর ডাক
তাই ঘরের দরোজায় দাঁড়িয়ে তাকে দিয়েছি হাততালি
সত্যিই কি আমি চেয়েছিলাম—তাকে হারিয়ে ফেলি

অবাক বিস্ময়ে দেখি তার দ্বিধাহীন উড়াল
এখন পাখিটি নেই; পড়ে আছে শূন্য ডাল

আমারও হয়তো ছিল কিছুটা ভুল
তাই দোষারোপ করি না তাকে—গুনে দিই মাশুল

তবে কিছুটা ভুলের আছে প্রয়োজন
যদি পেতে চাই গানের ভেতর নীরবতার আস্বাদন।

 


ধাত্রী ক্লিনিকের জন্ম
প্রকাশকাল : ২০০৬


ডাক্তার


আমি সারাজীবন যেসব স্বপ্ন দেখেছি তার প্রায় সবগুলো যৌনাঙ্গ বিষয়ক
দু একটা অবশ্য—ছুরি-কাঁচি নিয়ে পিছন থেকে তাড়া করছে কেউ
দৌড়াতে পারছি না; কিংবা খুব উঁচু থেকে পড়ে যাচ্ছি
দমবন্ধ হয়ে মরার উপক্রম
এর মধ্যে দু একবার আকাশে উড়া, দরবেশের আস্তানা
সম্মুখে সাপ ফণা তুলে আছে—সাপও নাকি সেক্সের সিম্বল
ফুল, গম, পশু, পাখি—নিষিদ্ধ সম্পর্কের কী সব অজাচার
ঘুমাতে ভয় হয়, ঘুমকে পাপাগার ভাবি
বিছানায় যাওয়ার আগে আয়াতুল কুরসি পড়ে বুকে ফুঁ দিই
তবু আমাকে ঘুমিয়ে রেখে পাপের দেবতারা সক্রিয় হয়ে ওঠে
ফ্রয়েড বলেছেন, এসব অবদমিত কামনার ফল
ভাবতে ভয় হয়, আমার চেতনায় কি কেবল যৌনাঙ্গ
মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাই, তিনি বলেন, এসব কোনো অসুখ নয়
তিনি নিজেও নাকি এমনই স্বপ্ন দেখেন, আমি ভরসা পাই
তবু ভাবি এ কেমন যুক্তি হলো, ডাক্তার কি রুগী হতে পারে না?

 


অর্জুন


অর্জুন গাছ জড়িয়ে ধরলে ব্লাড-পেশার কমে
অর্জুনের ছাল হৃদরোগের মহৌষধ
এমন একটা গাছকে আমি বিয়ে করতে চাই
বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেলে
রক্তের চঞ্চলতা বেড়ে গেলে
যে আমাকে আলিঙ্গন করবে
বল্কলের পোশাক খুলে বলবে
আমার রস শুষে নাও
তোমার হৃদপিণ্ড সচল করো
আমি সপ্রাণ-গাছ তবু ব্যথা নেই
অভিযোগ নেই
আমি সারাদিন সূর্যের আগুনে রান্না করি
রাত এলে অন্ধকারে একা দাঁড়িয়ে থাকি

 

14202992_1229683220410130_113233471_o

 


মৃত্যুমেহন


মৃত্যু চাইলে—আগে জন্মাতে হবে
আগে মৃত্যু, পরে জীবন—এমন হয় না
পূর্বাপর বলে কিছু নেই
আমি একবারই মৃত্যু চেয়েছিলাম
মৃত্যুমেহন—যে কোনো শৃঙ্গার
             তার নখ স্পর্শ করে নি
‘মা’ বললেও আমি মৃত্যুকে বুঝি
আমার নাছোড় যাচ্ঞার কাছে
             ভিক্ষার মুদ্রা সুড়ঙ্গে ফেলে
নিস্পৃহ বসেছিলেন কেউ
             হতে পারে পিতা
আর মৃত্যুর জন্য প্রতীক্ষিতা এক নারীর
             মমতার উদ্রেক না হলে
কে আমাকে নিয়ে যেত মৃত্যুর অনিশ্চিত পথে
কারণ মৃত্যু সবার জন্য নয়
যে জন্মায়ই নি সে কী করে মরে
কিন্তু আমাকে ঠেকাও দেখি
ঈশ্বর কিংবা ইজম
কবিতা কিংবা দর্শন
মারণাস্ত্রের সংগ্রহশালা
সব আমার বিরুদ্ধে উদ্যত করো
এতসব আয়োজনের অর্থ কি এই নয় তবে
যেভাবে তোমারা নববধূকে সাজিয়ে তোলো
তার কাঁচুলি ও বাজুবন্ধ
গলার হার ও টিকলি, কানের দুল
স্বজন ও প্রিয়জনের উপহার সামগ্রী
সব—মৃত্যুর পথে কেউ আসতে চায় বলে
এই দীর্ঘ মহান মৃত্যুর অভিযাত্রায়
আমার আমন্ত্রণ
পৃথিবীর তাবৎ মারণাস্ত্রের সংগ্রহশালা
তবে কি নয়, মৃত্যু-উৎসবের আয়োজন…

 


যাত্রার প্রথমদিনগুলো


মিলনেই তো শুরু হয়েছিল আমাদের প্রথম যোজনা
আমি যাকে মা বলি এবং আমার প্রকৃত পিতা
তারা যখন পরস্পর দেখাশোনায় ব্যস্ত
ঠিক তখনই, আমার গোপন বেরিয়ে পড়া
আমার পর্যটনের শুরু সেখানেই
শিশুদের কি কেউ কখনো একা ছেড়ে দেয়
না মা, না পিতা
তবু অসংখ্য নাবিকের পাল সাগর মন্থন করে
মন্দার দিয়ে ভেসে চলে নিরুদ্দেশ সাগরের জলে
কিন্তু কেউ জেনে ফেলার আগেই
আমার মায়ের উদোরে ঘুমিয়ে ছিল যে বোন
আমার যমজ সহোদরা
সুচিকর্মে নিপুন সহোদরা
তার হাতে ধরা রুমালে
২৩টি ক্রমজোমের সুতোয় আমাকে কী নিপুণ
                                          গেঁথে নিল সে
তার ফুল ও হাতের কাজ
তার সুচ ও রুমাল কেউ আলাদা করে
             চিনতে পারল না
পূর্ণাঙ্গ ডিম্বকের মতো আমাদের এই পৃথিবী
আকাশ ও মাটি
স্থল ও সমুদ্র
পৃথিবীর বাইরে থেকে তুমি তাকে কিভাবে চিনবে
আমাদের এসব গোপন মিলন ও তৎপরতা
আমাদের সিস্ট গঠন ও দুর্গ নির্মাণ
আমার সহোদরা ছাড়া কেউ জানলো না
আমার মাও না, বাবা তো নয়ই
যাকে আমি মা বলি আসলে সে আমার ধাত্রী
পিতাকে না জানলেও সত্যিই কেউ একজন আছে
তো নিশ্চয়
তাদের আনন্দের ফাঁক গলিয়ে
তাদের জগন-মগন বিস্ময়কালে
একটি বলের মতো গড়াতে গড়াতে
পতিত হয়েছিলাম সংযোজিত নালির ভেতর
প্রথম দিন কেউ সন্দেহই করে নি
দ্বিতীয় দিনও এভাবে কেটেছিল
তৃতীয় দিন ধাই মা জিজ্ঞাস করল আমার
              আপন পিতাকে
গত পরশু অসাবধান ছিলে না তো
তোমার সঙ্গে কেউ এ কাজ করে
কিছু একটা হলে তারপর বুঝবে মজা
সত্যিই খুব ভয় পাইয়ে গিয়েছিলাম আমরা
আমার মায়ের পেটের মধ্যে এতদিন লুকিয়ে
                                      ছিল যে সহোদরা
আমাকে দেখে আনন্দিত হয়ে যে সহোদরা
তন্ত্রির নানা রকম বাঁধন কেটে
ডিম্বকের আবরণ ছিন্ন করে
বেরিয়ে এসে আমাকে সবেগে আলিঙ্গন করেছিল
সেও ভয়ে সিঁধিয়ে গেল আমার বুকের ভেতর
সত্যিই কি আমাদের যাত্রার অবসান এখানেই তবে
মাত্র কুড়িদিনের মাথায় আমাদের উপস্থিতি
                                          টের পাওয়া গেল
প্রথমে আমার মা তারপর পিতা
রক্তস্নাতকুমারী মা, সজীব কুমারী মা
বাবাকে বললেন, এখনো এবার হলো না তো
তারপর শুরু হলো তার অসম্ভব বিবমিষার ভাব
যেন মুখ দিয়েই উগড়ে দিতে চায়
                           আমার গোপন অস্তিত্ব
আমরা চুপিচুপি কথা বলি
মায়ার দেবতাকে বলি
প্রভু, এই দম্পতিকে একটি পুতুলের স্বপ্ন দাও
একটি পুতুলের হ্যালোসিনেশন
সহ্য করার ক্ষমতা
মানুষের পৃথিবীতে আসা আজ আর তত সহজ নয়
অনেক মানুষ; পা ফেলবার জাগার অভাব
অনেক যন্ত্র—লিঙ্গ দেখবার মেশিন
ছুরিকাঁচি
নাভির তল থেকে বের করে আনার ক্ষমতা
অ্যাবর্শন করার কথাও ভেবেছিল খুব
ভাগ্যিস আমিই ছিলাম তাদের প্রথম ইস্যু
দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় হলে
কিংবা ওয়াই ক্রমোজমের আধিক্য দেখা দিলে
নির্ঘাৎ গাইনির ফরসেফ খেতে হতো
যদিও এসব ঘটনা নতুন নয়
তবু বাবা ও মার মিলিত হওয়ার লজ্জা
বয়ে বেড়ানোর কষ্ট
এসব বহিঃপ্রকাশ শরীরে স্পষ্ট হয়ে উঠল
ভয়ে খামচে ধরল বাবার হাত, কিন্তু
ওয়াই এবং এক্স, এক্স এবং ওয়াই কেউ কাউকে
ক্রমোজমের গিট থেকে আলাদা করতে পারল না
আমাদের চারপাশে গড়ে উঠল পানির প্রাচীর
শূন্যতাকে প্রসারিত করে বাধা দিল পানির প্লাসেন্টা
তখন ছিল আমাদের নাবিক ও ডুবুড়ির কাল
কেবল ডুব-সাঁতার
কেবল চিৎ-সাঁতার
পানির নিচ থেকে কেউ আমাদের দেখতে পায় না
প্রথমে তো ভেবেছিল একটি বিন্দু
আসলে তোমাদের চোখকে ফাঁকি দিতে
আমার মাকে ভয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে
আমার বাবার সমান হাত পা
বিন্দুর মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিলাম
বিরুদ্ধ বাতাসের কবল থেকে অ্যামিবা
যেভাবে নিজেকে রক্ষা করে
ধীরে ধীরে আমরা নড়ে উঠি
হাত এবং পা-কে বাইরে নিয়ে আসি
কান পেতে শুনি দিদার গল্প
মা-বাবার ফিসফিসানি
মার পেটে বাবা কান পেনে শোনেন
আমাদের সাঁতারের শব্দ
আজ ভয় থেকে আমরা তাদের আনন্দের বিষয়
কোথাও একটু শব্দ হলে আমরাও ভয়ে চমকে উঠি
রাষ্ট্র তো জন্মের বিরুদ্ধেই প্রণোদনা দেয়
তবু মায়ের প্রসবের কথা ভেবে
আমাদের পার্গেটরি জীবনের কথা ভেবে
ভাবি উদ্যানের পথে নিশ্চিত যাওয়া হবে কিনা
তবে বেরিয়ে আসার পরে কেউ জানবে না আমার
              জমজ সহোদরার কথা
কেউ জানবে না আমাদের মিলিত জীবনের যাত্রা
তবু আমি মানে আমরা আমাদের মিলিত জীবন
অচেনা এক পুরুষ ও নারীর কাছে যা একদিন
                                         গচ্ছিত ছিল

 


মুক্তিযোদ্ধা


আমি এক মুক্তিযোদ্ধাকে চিনি
যুদ্ধে যার একটি পা খোয়া গেছে
এখন এক পায়ে লাফিয়ে চলে
আগে তাকে দেখলে কষ্ট হতো
আমাদের স্বাধীনতা তার একটি পা নিয়েছে
বর্তমানে সে পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা
এখন তাকে দেখলে অন্যরকম মনে হয়
ভাবি, মানুষকে চলতে গেলে
সামনে এগুতে গেলে তো
এক পায়ের ওপর দাঁড়াতে হয়
অন্য পা তো সব সময় ওপরে উঠে থাকে
দুপায়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ এগুতে পারে না
দুপায়ে ভর দেয়া মানুষ কোথাও যেতে পারে না
মুক্তিযোদ্ধাকে তো অনেক দূর যেতে হবে

 


পিতা


পিতা হওয়া কি কোনো কষ্টের কাজ?
মাংসের গিরিপথ দিয়ে মানুষের সন্তানেরা বের হয়ে আসতে চায়
ওসব বেয়াদব বাচ্চারা বের হয়ে গেলেই তো বাবার ভালো
বাবা কিছুটা স্বস্তি পায়
নির্ঝঞ্ঝাট কিছুক্ষণ কাজ-কর্ম করতে পারে
তবু বাবা কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে—
তার নাবালক বাচ্চারা যে অজানা সুড়ঙ্গ-পথে বের হয়ে গেল
তারা ঠিক মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারল তো
সেই অজানা পথের পাশে গভীর উদ্বেগে অপেক্ষা করে বাবা
সেই সরু সুড়ঙ্গের মধ্যে শিশুরা ছাড়া তো কেউ যেতে পারে না
কেবল পর্বতের গায়ে হেলান দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে পিতা
বাবা জানে, এই সুড়ঙ্গে ঢোকা এবং বেরুনোর একটিই পথ
পরিত্যক্ত সন্তানের জন্য তার মন কাঁদে
যখন ফিরে আসে তখন আর পিতা সন্তানকে চিনতে পারে না
মনে করতে পারে না যাত্রাকালে কেমন ছিল তার আত্মজ
কী ছিল তার ভাষা
আবার শুরু হয় তাদের পরিচয় পালা
এ ভাবে অনন্ত অপেক্ষা তাদের হয় না শেষ
তাই পিতা ও পুত্র আজীবন কাছাকাছি থাকে

 


আমার মার্কসবাদী বন্ধুরা


আমার মার্কসবাদী বন্ধুদের অনেকেই এখন এনজিও কর্মী
কেউ দল বদল করে ক্ষমতাসীন দলে লিখিয়েছেন নাম
অনেকেই মোটা অঙ্কে বেতন পান। কেউ বাড়িগাড়িও করেছেন
খুব ভালো, তাদের জীবনে সত্যিই মার্কসবাদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে
ভালো থাকার জন্যই তো সমাজতান্ত্রিক অন্দোলন
কিন্তু আমরা যারা তারুণ্যে মার্কসবাদ করি নি—
‘বুর্জোয়া রাইটিস্ট—প্রগতি-বিরোধী!’
এখন তারাই প্রলিতারিয়েত

মার্কসবাদী বন্ধুরা আগেও আমাদের ঘৃণা করত
                            লাল বই পড়ি নি বলে মুর্খ ভাবত
এখন অনেকেই একই পার্টি করি, একই নেতার অধীন
নেতার বশংবদ হওয়াই এখন তাদের একমাত্র কাজ
কিন্তু এখনো আমরা তাদের পঙ্‌ক্তিতে বসতে পারি না
চটাং চটাং সাম্যের কথা বলেন
কারণ সবার জানা, কিছু লোক সমানের চেয়ে বেশি

লাল বই মানেই বুদ্ধিজীবীর ডায়েরি
এখন গোপনে লাল বই পড়ি। তবে সবই পুরনো
আমাদের বন্ধুদের শেলফ থেকে পরিত্যক্ত এসব বই
ফুটপাতে নিয়েছে আশ্রয়। সোভিয়েত ভেঙে গেছে
মাওসেতুংয়ের দেশে হয়েছে পুঁজির বিকাশ
রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা নেই, তাই বেওয়ারিশ
সর্বহারা, বইগুলোও এখন ছিন্নভিন্ন প্রলেতারিয়েত

তবু মার্কসবাদ মানেই শ্রমিক-অসন্তোষ
              মালিকরা মন খুলে হাসতে পারে না
মার্কসবাদ মানে অলাভজনক কারখানা বন্ধ না হওয়া
আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকের উন্নয়ন খায়েশ প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া
মার্কসবাদ মানেই মরার আগে অন্তত হাত উত্তোলন করা।

 


মিলনের অপরাধে


অত বাকবিতণ্ডার ইচ্ছা নেই
অপরাধ যাই হোক, রায় এক
কিছুদিন হাজতবাস
তারপর সোজা ঝুলিয়ে দেয়া হবে
পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও মৃত্যুদণ্ড
             নিয়ে কথা নেই
জেলখানার হুজুর কলমা পড়াতে এসে
             সান্ত্বনা দেয়—
বলে ঈশ্বরের অভিপ্রায় এমন
আচ্ছা এতে সান্ত্বনার কী আছে
ঘাড়টা মটকে দিলে কিংবা
গলা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হলে
ক্রসফায়ারেও তো একটা বুলেট অন্তত
             এফোঁড়-ওফোঁড় হতে পারে
ধরো কেউ জানতেই পারল না
তবু মিলতে না পারার কষ্ট তো থেকে যায়
মৃত্যুকে ভয় পাই বলে, তোমরা কাপুরুষ বলো
মৃত্যুকে ভয় না পাওয়ার মতো
আমার কাছে একটিও কারণ নেই
আমাকে গলায় রশি দিয়ে টানতে টানতে
             বধ্যভূমিতে না নিয়ে গেলে
শূন্যে যূপকাঠে তুলে ধরা না হলে
অহেতুক সাহস দেখাতে যাব না
অন্যের পাপে মৃত্যুর বিধান ঈশ্বর রেখেছেন
বুঝতে যে চেষ্টা করি নি—তা না
এটা ঠিক অপরাধ নয়, পাপ
ঈশ্বরের চোখে নারী-পুরুষের মিলন মহাপাপ
স্বর্গে মানুষ তার অবাধ্য যে পাপ করেছিল
সেই থেকে মানুষ একই পাপ ও মৃত্যুর অধীন
অর্থাৎ প্রতিটি মানুষকে ঈশ্বর হত্যা করেন
তার পিতামাতার মিলনের অপরাধে

 


তাজমহল


পাথরগুলো তো আগেও ছিল
এমনকি বাবরের বাবা মির্জা ওমর কিংবা
তাদের বাবা তৈমুরেরও আগে

পাথরগুলো বিচ্ছিন্ন ছিল
কেউ কাউকে চিনত না
তাদের কেউ পাহাড়ের গুহায় শৃঙ্খলিত
কেউ খনির গহ্বরে বন্দি ছিল
রামগিরি পর্বতে যন্ত্রের মতো
উত্তরে মেঘ দেখলে তাদের
             উজ্জয়িনীকে মনে পড়ত
তাদের কান্না ও দীর্ঘশ্বাস
তাদের বিরহ-বেদন
কেউ শুনতে পায় নি
রাজারা ছিল রাজ্য রক্ষায় ব্যস্ত
আর গরিবের তো পেটই মন্দির
পাথরের কান্না শোনার সময় তাদের ছিল না

এমনকি আকবরের বিশাল সাম্রাজ্য
তার পুত্র প্রেমিক সেলিম মিলনমত্ত
পাথরের কান্না শুনতে পান নি

অথচ পাহাড়ি ঝর্না আর যমুনায়
কান পাতলেই তো তারা বাঁশরির সুর
                           শুনতে পেতেন
রাই ও মাধবের মিলিত হওয়ার কান্না
             এবং বিচ্ছেদের যন্ত্রণায় তো
             ভারি হয়ে ছিল যমুনার কুল

এই কান্না প্রথম শুনলেন সেলিমের পুত্র খুররম
যে সব পাথর সময়ের ঘাতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়
তারা কি আর মিলিত হতে পারে না
             তাদের অভেদ আত্মার সাথে?
তারা কি মাধব মাধব বলে শুধুই কাঁদে?
মমতাজ সে তো তার অখণ্ড জীবন
সময় তাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে
             জীবনের পরিক্রমা থেকে

তাই পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া বিরহ-পাথর
লক্ষ কোটি বছর ধরে খনির আঁধারে জমাটবদ্ধ প্রেম
যমুনার বিরহ জলের ধারায় মানুষের শ্রম ও মেধায়
             মমতায় গেঁথে তুললেন অমর মমতাজ

অথচ নিন্দুকেরা বলে কোনো এক দাম্ভিক রাজার
ঐশ্বর্য প্রকাশ এই তাজমহল
মানুষের রক্ত ও ঘাম, শোষণ ও নির্যাতনে নির্মিত স্মারক
             গরিবের প্রেম করেছে উপহাস

আজ কোথায় সম্রাট, কে তার বাপ
পুত্রদের কথা হয়তো রয়েছে লেখা ইতিহাসের পাতায়
কিন্তু এই তাজ মানুষের মেধা ও শ্রমের মূর্তিমানরূপ
             ভেঙে পড়া প্রেমিকের জাগার মন্ত্র

মোগলের সাম্রাজ্য উড়ে গেছে ইংরেজের বাত্যাহতে
ইংরেজ আজ ভাঙা ব্রান্ডির বোতল
কিন্তু দূর-দূরান্ত থেকে মিলিত হওয়া পাথরগুলো
মানুষের প্রেম ও মহানকীর্তির ভাস্বর নিদর্শন হয়ে

আজো বাঁশি যেন ডাকো যমুনায়…

 


মূর্তি-পূজক


তুমি থাকো না কাছে, দাও নি দেখার ক্ষমতা
সবাই জানে, তুমি আছ, খুব কাছাকাছি
তোমার নিশ্বাসের দাগ লেগে আছে আমার শিরোদেশে
চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছে মথিত আত্মার গান
মসজিদ থেকে আজান হাঁকে, নামাজের জন্য এসো
ছুটে যাই; নামাজ মানে তো তোমার দিদার
রাত জেগে বসে থাকি, তাহাজ্জত পড়ি
তোমাকে দেখতে চাই, পারি না
না দেখার বিরহে কেঁদে উঠি, ঈমাম সান্ত্বনা দেয়—
চর্মচক্ষে তুমি দাও না ধরা, নিরাকার তোমার ভূষণ
মুমিনের দিলে তোমার বসবাস
কিন্তু প্রভু  আমি তো দৃশ্যমান
স্পর্শে আমার সুখ, অধরা রমণীতে কী-বা এসে যায়
তুমি মানে তোমার সৃষ্টির হাত—
তাই তোমার হাত ও হাতের পুতুল আমাকে টানে
তুমি নানান কাজে ব্যস্ত থাকো
আমাকে ভোলাতে দাও পুতুলের সামগ্রী
প্রথমে আমি বেছে নিই একটি মা-পুতুল
তার বুকে মুখ রাখি, কাঁদি—তার মমতার দুধে
ভিজে যায় আমার ঠোঁট, তোমাকে না পাওয়ার দুঃখ ভুলি
তারপর আমার নজর কাড়ে একটি পুতুল-বৌ
মা-পুতুলের বিরহ আমাকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে
বৌ-পুতুলের শরীরে তাকে তন্ন-তন্ন খুঁজি
মা-পুতুল আমাকে যেখান থেকে এনেছিলেন, আমি
সেখানে আবার ফিরে যেতে চাই; আর এরই ফাঁকে
ওঁয়াও করে কেঁদে ওঠে আরেকটি বাবু-পুতুল
বাবু-পুতুল ছাড়া কিভাবে সম্পন্ন হয় পুতুলের সংসার
এতসব পুতুলের ভিড়ে প্রভু তুমি কোথায় থাকো
আজ মনে হয়, তুমিও ব্যস্ত নিত্য-নতুন পুতুল বানাতে
আর আমি তোমার পুতুলের সমঝদার
হয়ে যাই পুতুল-পূজক

 


ধাত্রী-ক্লিনিকের জন্ম


পৃথিবীতে আসার রাস্তা পিচ্ছিল
নদীর পাড় থেকে শিশুরা যেভাবে পানিতে গড়িয়ে পড়ে
মাঝে মাঝে শামুকের আঁচড় লেগে পাছার নিচটা কেটে যায়
কিছুটা রক্তপাত হলেও শিশুদের কেউ থামাতে পারে না
শিশুদের দুর্দান্ত কৌতূহল—
দাইমার হাতের স্পর্শেও তারা বিরক্ত হয়
তাদের পতন অনিবার্য
তবু নদীতে গড়িয়ে পড়া সন্তানদের
নিরাপত্তার কথা ভেবে মায়েরা কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়
এসব ভয় ও উদ্বেগ থেকে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ক্লিনিক—
              মাতৃসদন
গাইনি ও নার্সদের কাজ
মা ও হবু বাবাদের ভয় আরো উসকে দেয়া
শিশুদের নদীতে গড়িয়ে পড়ার পথ
              পানিবিহীন শুকিয়ে দেয়া
চিরাচরিত জলের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে
মরুভূমির মধ্য দিয়ে গঙ্গার ধারা প্রবাহিত করা
গঙ্গা কি তোমাদের মা নয়?

গাইনি ও নার্সদের জন্মের আগে মা কি তার সন্তানদের
                            একা ছেড়ে দিতে ব্যর্থ হয়েছিল
একটু ভেবে দ্যাখো, শিশুদের আসার চেয়ে
বৃদ্ধদের যাওয়া কি আরো অনিবার্য নয়
তাদের মা নেই
গড়িয়ে পড়ার মতো পিচ্ছিল কোনো পথ নেই
এমনকি সবাই ধরাধরি করে শুইয়ে না দিলে
শেষ পর্যন্ত কবরেও নামতে পারে না
তখন ভাবি কোথায় নার্স, কোথায় গাইনি
কবরের পাশে তো একটিও ক্লিনিক নেই!
অথচ সংখ্যা ও অনিবার্যতা শিশুদের চেয়ে ঢের
              প্রয়োজন ছিল

 


কবরে শুইয়ে দেয়ার পর


এক সময় ভাবতাম মরে যাব বলে সবকিছু দ্রুত দেখে নিতে হবে
সময় ফুরিয়ে গেলে পারব না, ইচ্ছা থাকলেও সম্ভব হবে না
কী কষ্ট করেই না পাহাড়ে ওঠার কসরৎ করেছি
বোকার মতো হিমালয়শৃঙ্গেও উঠতে চেয়েছি
পোখরায় মহাদেবের কেভ, ডেভিস ফল,
মেঘের মধ্য দিয়ে বিমানের লক্কর ঝক্কর উড়ে চলা
আর কিছুটা হলে তো পা হড়কে জীবন কাবার
মানুষ সব সময় বড় কিছু দেখতে চায়
বড় পাহাড়, বড় সমুদ্র, এমনকি মরুভূমিও বড় হতে হবে
ক্ষুদ্র তো বড়কে ধারণ করতে পারে না…
সময় ফুরিয়ে যাবে বলে সন্তানকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাওয়া
ললনাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হবার জন্য তড়িঘড়ি করা
আর কবিতা লিখতে না পারলে ভীষণ মন খারাপ হওয়া
এসব তড়িঘড়ির কারণ হয়তো মানুষ খুব কমদিন বাঁচে

কিন্তু আজ কবরে শুইয়ে দেয়ার পর সব নিরর্থ মনে হচ্ছে
কারণ এখানে শুইয়ে সব দেখতে পাচ্ছি
আগে যা দেখা হয় নি সেগুলোও
প্রথম কয়দিন অবশ্য নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হয়েছে
হাড় থেকে মাংস খসানো, একই সঙ্গে কোষগুলো বিচ্ছিন্ন করা
এসব করার কারণ অনেকদিন মন খুলে হাসব বলে
হাড্ডির সঙ্গে মাংস না থাকায় সারা শরীর দিয়েই হাসতে পারছি
জীবিতরা ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে সামান্যই হাসতে পারে

প্রথমে অনেকদিন হেসেছি বেঁচে থাকার বোকামির জন্য
সবকিছু দেখার তড়িঘড়ির জন্য
এখন হাসছি সব দেখার কী অফুরন্ত সময়!

জীবিতদের যদিও বড়কিছু দেখার প্রতি সর্বাধিক আগ্রহ
তবু তারা জানে না মৃত্যুর চেয়ে বড় কি ছিল

মজিদ মাহমুদ

মজিদ মাহমুদ

জন্ম ১৬ এপ্রিল ১৯৬৬, পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার চরগড়গড়ি গ্রামে। এম.এ (বাংলা), ১৯৮৯, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। লেখালেখি ঠিক রেখে কখনো সাংবাদিকতা, কখনো শিক্ষকতা; আর পাশাপাশি সমাজসেবা।

প্রকাশিত বই:
কবিতা—
মাহফুজামঙ্গল (১৯৮৯), গোষ্ঠের দিকে (১৯৯৬), বল উপখ্যান (২০০০), আপেল কাহিনী (২০০১), ধাত্রী ক্লিনিকের জন্ম (২০০৫), নির্বাচিত কবিতা (২০০৭), কাঁটাচামচ নির্বাচিত কবিতা (২০০৯), সিংহ ও গর্দভের কবিতা (২০১০), শ্রেষ্ঠ কবিতা (২০১১), দেওয়ান-ই-মজিদ (২০১১), গ্রামকুট (২০১৫), কবিতামালা (২০১৫)।

প্রবন্ধ ও গবেষণা—
নজরুল তৃতীয় বিশ্বের মুখপাত্র (১৯৯৭), কেন কবি কেন কবি নয় (২০০১), ভাষার আধিপত্য ও বিবিধ প্রবন্ধ (২০০৫), নজরুলের মানুষধর্ম (২০০৫), উত্তর-উপনিবেশ সাহিত্য ও অন্যান্য (২০০৯), রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণ-সাহিত্য (২০১১), সাহিত্যচিন্তা ও বিকল্পভাবনা (২০১১), রবীন্দ্রনাথ ও ভারতবর্ষ (২০১৩), নির্বাচিত প্রবন্ধ (২০১৪), সন্তকবীর শতদোঁহা ও রবীন্দ্রনাথ (২০১৫), ক্ষণচিন্তা (২০১৬)।

গল্প-উপন্যাস—
মাকড়সা ও রজনীগন্ধা (১৯৮৬), মেমোরিয়াল ক্লাব।

শিশু সাহিত্য—
বৌটুবানী ফুলের দেশে (১৯৮৫), বাংলাদেশের মুখ (২০০৭)

সম্পাদনা—
বৃক্ষ ভালোবাসার কবিতা (২০০০), জামরুল হাসান বেগ স্মারকগ্রন্থ (২০০৩); পর্ব (সাহিত্য-চিন্তার কাগজ)

অনুবাদ—
অজিত কৌড়ের গল্প (২০১৬), মরক্কোর ঔপন্যাসিক ইউসুফ আমিনি এলালামির নোমাড লাভ এর বাংলা অনুবাদ ‘যাযাবর প্রেম’

ই-মেইল : mozidmahmud@yahoo.com
মজিদ মাহমুদ