হোম কবিতা তীব্র ৩০ : জুয়েল মাজহারের বাছাই কবিতা

তীব্র ৩০ : জুয়েল মাজহারের বাছাই কবিতা

তীব্র ৩০ : জুয়েল মাজহারের বাছাই কবিতা
1.47K
0

জুয়েল মাজহার আশির দশকের একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি। ভাষা ও ছন্দে বৈচিত্র্যপ্রয়াসী এই কবির বিশেষ সুখ্যাতি রয়েছে অনুবাদের ক্ষেত্রেও। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ তিনটি। অনুবাদের বই দুটি।

কবি-নির্বাচিত ৩০টি কবিতা মুদ্রিত হলো পরস্পরের পাঠকদের জন্য…


জন্মাঞ্জলি


আমার বাবার ছবি মুছে দিল রাতের জঙ্গল;

আমার মায়ের মুখ এখনো বেড়াতে আসে
পাতাঝরা গাছের মিনারে!

 


মেগাস্থিনিসের হাসি


নিঃশব্দ কামানে তুমি একা বসে ভরছো বারুদ
শীতকাল গেল;

নিঃশব্দ কামানে তুমি একা কেন ভরছো বারুদ?

আমি ভাবছি : মেগাস্থিনিসের হাসিও কি মেগাস্থিনিস?

শক্তিচালিত এই তামাশার মধ্যে বহু
বাদামি ঘোটক উড়ে যায়;
—এঞ্জিনের শব্দ আর রোবটের কাশি শোনা যায়।

নিঃশব্দ কামানে তুমি এখনো কি ভরছো বারুদ?

 


ক্রমহননের পথ


অপাপবিদ্ধের মতো জোড়া জোড়া চোখ দেখে ভয়;
এই বুঝি রিরংসা নামের কোনো বিস্ফোরণ ঘটে।
তবু নিথরতা;
দূরে ট্রেন চলমান, ঝাউবনে স্রোতকল্প দোলা।

এসো, তোমাকে উদ্ভিন্ন করি রাতপরিদের নামে
ইন্দ্রিয়ের ক্ষমজলে, তরল ক্ষীরের মতো
গলমান নির্বেদের স্রোতে।

সহস্র তিরের শব্দ, শত হুল তোমার পেছনে;
তুমি একা। তাতে ভয়!

ভয় বুঝি সংবেদনের কোনো ডানা?

তাহলে উড্ডীন হও, উড়ে চলো বনের ভেতর।
ক্রমহননের পথ পাড়ি দিয়ে দ্যাখো:
ঘাসে ঘাসে সিঁড়ি চলমান।
পর্বতের ধাপে ধাপে মনুষ্যখুলির ছায়া প্ররোচনা আকারে সাজানো;

আর দ্যাখো, জলের আঙুলে আঁকা চিত্রময়
শুয়ে আছো তুমি।

তোমাকে ঘিরেই জাগে শত শত দেয়াল, প্রাকার;
ক্রমহননের পথ আমাকে বেষ্টন ক’রে
ঝুঁকে আছে তোমার উপর!

 


রাত্রি ও বাঘিনী


বাঘিনী আমারে শুধু ডেকে চলে ভরা পূর্ণিমায়
বারবার কাতর মিনতি করে আমি তারে বলি :
দয়া করো, আমায় খেয়ো না, আমি অসহায় অতি ছোটো জীব

বাঘিনী করুণা করে, আমাকে থাবায় পুরে কি ভেবে
ঘুমিয়ে পড়ে। এ-সুযোগে আমি তার মুঠো গ’লে নামি;

বুকে হেঁটে-হেঁটে তার গর্জনের সীমানা পেরোই
সন্তর্পণে ঢুকি পড়ি বনপ্রান্তে, পরিত্যক্ত ঘুমের গুহায়

ভাবি, বাঁচা গেল! ভাবি, আমাকে পাবে না আর তার
দাঁত-নখ, অত্যধিক প্রেমের আঁচড়।

অবশেষে এ-গর্ভগৃহের ছায়ায় বসে আমি নিরাপদ!

থ্যাঁতলানো অণ্ড-শিশ্ন, কালশিটে ঊরু ও জঘন, আর,
এই দুটি রক্তমাখা ঠোঁটে বিশল্যকরণী ঘষে ফিরে পাবো
অনাঘ্রাত আমাকে আবার।

আমাকে পাবে না আর বাঘিনীর অতিরিক্ত রতি-আক্রমণ!

কিন্তু হায়, প্রতিবারই স্বপ্নে বাঘিনী তবু পিছু নেয়;
তীব্র চোখে ফসফরাস জ্বেলে
এক লাফে সীমান্তের নদীটি পেরিয়ে
অতর্কিতে সামনে আসে; ভয়ানক দু’পায়ে দাঁড়ায়, আর
দু’বাহু বাড়িয়ে তার সে আমাকে কোলে তুলে নেয়;

ধীরে ধীরে চুমু খায়, ঠোঁটে ও গলায় তার দাঁত-নখ গেঁথে রক্ত চাটে
বেপরোয়া জ্বালামুখে আমাকে পুড়িয়ে শুধু কাবাব বানায়

শেষ রাতে মাতাল চাঁদের নিচে অ্যাম্বুলেন্স এসে
আমাকে উদ্ধার করে দ্রুত কোনো হাসপাতালে ছোটে

 


রুবিকন


আমার সামনে এক রুবিকন, পুলসিরাত, ভয়ানক ক্রূর অমানিশা
এর সামনে একা আমি;
কিস্তিহীন, নিরশ্ব, রসদহীন
পিগমিদের চেয়ে ছোটো আমি!

আর আমার ভাঙা হাড়, থ্যাঁতলানো খর্বকায় দেহের ভেতরে যতো
রক্ত-পিত্ত-কফ-থুথু-বীর্য-লালা সবই
অসীম বরফে-হিমে গ্রানিটের মতো ক্রমে হতেছে জমাট;

আর ওই থেকে-থেকে ফুঁসন্ত ব্লিজার্ড এক,
আর এক আনক্যানি করাল হিমানী
আমাকে আদ্যন্ত ঘিরে আছে।

সান্নিপাতিক হেতু নাসিকার ছিদ্র বেয়ে
চোখ বেয়ে যে-জল গড়ায় সে তো মাটিতে পড়ে না;
শূন্য থেকে বর্শা হয়ে সিগ্নি ঝুলে রয়—যেন নর্স দেবতার!

সারি সারি শতশত বল্মীকূট পেছনে আমার।
তাদের আড়াল হতে জুল্‌জুল্‌ চেয়ে থাকে লোম-কর্ণ শিবা।
লোলজিভ, অভ্রংলিহ জিভ নাড়ে মেদুসা-মনসা আর কালী।

আমার তরবারি নাই। তাই
দু’হাতে নখর আমার তরবারি!
আমি কি ডরাব?
না, আমি ডরাব না।
অসীম হিম্মত লয়ে এক পায়ে হয়ে আছি খাড়া ।

কিস্তিহীন, শস্ত্রহীন, নিরশ্ব, রসদহীন আমি একা;

আমি ফুঁ দিচ্ছি হাপরে আমার।
আমি আমাকে বলছি: ওঠো, জাগো!
আমার অশ্ব নাই।
এক দুর্বিনীতাশ্ব জন্ম নিচ্ছে ভেতরে আমার।

থ্যাঁতলানো ভাঙা পায়ে আমি লাফ দিচ্ছি। আমি সাঁতরে চলেছি
আমার আয়ুর চেয়ে দীর্ঘ এক গন্ধকের নদী।

আমি ভেদ ক’রে যাবো ক্রূর অমানিশা
আমি জয়ী হব,
আমি পার হব রুবিকন!!

 


পাহাড়ে বেড়াতে যাবার পর


পাহাড়ে বেড়াতে যাবার পর ক্রমশ তরঙ্গবহুল হয়ে উঠল তোমার গ্রীবা। রজস্বলাদের গুরু নিতম্বের ক্রম শিহরন প্রাগৈতিহাসিক গাছেদের গায়ে এসে লাগে। আর আমি, ঝুলন্ত ডেউয়াফলের সঙ্গে তুলনা করে, তোমার গরিমাময় কুচযুগের দিকে তাকাই নতুন করে।
আমার লোভের চাহনি, গ্রীষ্মদিনে, তপ্ত স্বেদবিন্দুর মতো, ক্ষীণধারায় গড়িয়ে শুধু নামে।

উপত্যকায় হাজার রাত্রিশেষের রাত্রি আর হাজার দিনশেষের দিনে লোহু-রঙিন জবাফুলের মতো উপহার তুমি। কালচে-সবুজ পাতার আড়ালে বসে তোমাকে জারিত করি ক্রমাগত চোখের লবণে। তুমি শাদা শাদা অপার্থিব কাচের মিনার থেকে উঁকি দাও। লহমায় লহমায় তোমার মুখ জ্বলে উঠতে দেখি এই অরণ্য-প্রদোষে।

যখন পাহাড়ে যায় লোক, ভালুকদের কাছ থেকে তাদের ভারী চলনগতি আর যূথবদ্ধতার মন্ত্র শিখে নেওয়া ভালো। এসবের কিছু নমুনা নিয়ে এসেছি। বরফে, বক্ষবন্ধনীর ভেতরে সেসব তুমি বহুদিন যত্নে রেখে দিও। আর চলো চিরখল, চিরলোভাতুর, চিরকুটিল আর চিরবদমায়েশ শহরে ফিরে না যাই আবার। চলো শীতরাত্রে গোপনে ডিঙি নিয়ে বেরিয়ে পড়ি সরল অসভ্যতার দিকে। চলো ঘুমের ভেতরে! চলো পরস্পরকে কাঁধে নিয়ে ছুটি আবছা ভোরের কুয়াশায়।

শাদা ফসিলের মতো বৃষ্টিতে ট্যাক্সিরা গর্জন করে ওঠে—শুনি। আর দেখি, হাতের তালুর মতো ঢালু উপত্যকায় ভোর-সন্ধ্যার আভারূপে ক্ষণে-ক্ষণে হেসে ওঠো তুমি; আর, কেঁদে ওঠো ভালুকশিশুর মতো। কেঁদে ওঠো অতিদূর সাইবেরিয়ায়। সেসব কান্নাকে এখন জড়ো করছি; আর ভাবছি, এঞ্জিন-রব আর খুরধ্বনি থেকে দূরেই রয়েছে তোমার অভিজ্ঞান। তুমি লম্বা দৌড় আর পত্রালির ভেতরে সাঁতার—বায়ুবাহিত বেলুনে বেলুনে।

পাহাড় গোপন জলধারা নামায় আর ডাকে তোমায়। আর তাতে শব্দ করে ওঠে রাত্রি;—যেন একাকী তক্ষক। যেন ছল। এটুকু ছলই একদিন আমাদের জোড়া ঠোঁটের কাছে প্রেম হয়ে আসবে কামের পেয়ালায়। সেখানে রঙিন পাথর থেকে পাথরে, চূড়া থেকে চূড়ায় লালাভ সূর্য আর মেদুর রাত্রির চুপ-সিরাপ ছল্‌কে পড়বে তোমার গুরু নিতম্বে; আর তোমার তরঙ্গবহুল গ্রীবায়, ডেউয়া ফলের মতো ঈষৎ-ঝুলেপড়া তোমার স্তনে আর গ্রানিট পাথরে গড়া নাভিনিম্নদেশে।

 


দশ পায়ে নাচি


সামনে খুঁজি তাকে, পেছনে তাকাই
ঘুমের পোশাক গায়ে, দশ পায়ে নাচি

কোথায় সে? যখন সূর্য-পূজারির ঘরে
জ্বলে উঠছে উপমা, আগুন?

ঘোড়া ফেলে দিচ্ছে আমাকে আর তার জিন;
তবু বাতাস এক ঘোড়া।
সে ছুটছে আমাকে নিয়ে!

রাত্রির উপসংহার এলিয়ে পড়ছে মোরগঝুঁটিতে
তার শিরদাঁড়া বেয়ে নামছে রক্তঘন চিৎকারের নদী
তখন কোথায় সে?
কোন গাঢ় কুয়োর অতলে তার শব?

নেকাবঢাকা কোন শরবনে গিয়ে তাকে খুঁজি!

পথের ক্লান্তিহেতু গ’লে যাচ্ছে খুর
আমার ঘোড়ার;
আমার হৃদয় আজ ঝুলছে অনেক ডালে ডালে

ঘুম পালিয়ে যাচ্ছে এক জানালা থেকে
আরেক জানালায়

ঘোড়া ফেলে দিচ্ছে আমাকে আর তার জিন
—এক চিৎকারের নদী থেকে আরেক চিৎকারের নদীতে!

 


অভিজ্ঞান


১.
চোখ দুটো দেখাও আমাকে। আমি
রাত্রির বাতাস, ঘ্রাণ
তবেই না বয়ে নিয়ে আসি

২.
কোথায় আশ্চর্য মেঘ?
কোথা গেলে ভিনদেশি? আমি যে কাতর

তোমার বাড়ির পাশে দুপুরে কোকিল হয়ে
বসন্তে গোপনে এসে ডাকি

 


রক্ত-সম্পর্ক


বসন্ত সরাইয়ের পথ পাড়ি দিতে দেখেছিলাম
দু’জন হোমোসেপিয়ান তাদের হোসপাইপ
ছেড়ে দিয়ে হাসছে

এতে ভিজে যাচ্ছিল সবার গা
আর আমার সদ্য ঋতুবদল-করে-আনা মন;

সমস্ত ঘটনার সঙ্গে সম্পর্ক মূলত ক্রিয়া ও অব্যয়ের
তাদেরই তা’য়ে বড় হ’য়ে ওঠে যৌথ মমতার কোকিল

পথে ছড়িয়ে রয়েছে পরিচয়হীন অসংখ্য সর্বনাম
তাদের বাধা ডিঙিয়ে ঘটনার হেরেমে ঢুকে দেখি:
বিশেষ্যের খোকা ঘুমিয়ে পড়েছে
বিশেষণের বিপজ্জনক বাঁকা ডালে

তারপর চলো হোসপাইপের ঘটনা ভুলে
পরখ ক’রে দেখি নিজেদের পেন্ডুলাম;
দেখি, সম্পর্কের ভেতর ওঁত পেতে আছে কত রকম বিষ

নিজেদের হোসপাইপ পরখ করে দেখতে চাইলাম
জল ঝরানোর ক্ষমতা।
একদিন আমারই ঘ্রাণে-ঘ্রাণে লাল হ’য়ে উঠেছিল মেয়েলি অব্যয়

সেই থেকে তুমি গেঁয়ো যোগিনীর মতো
অবিরাম ভিক্ষে ক’রে চলেছ হোসপাইপ আর পেন্ডুলাম

একদিন অনেক আগামীকালের প্রাসাদে বসে
আমি পান ক’রে যাব এসব ঘটনা

—প্রবল কাশির সঙ্গে মনে মনে…

 


চান্নিপশর  রাইতের  লৌড়


চান্নিপশর রাইত, লিলুয়া বাতাস। সুমসাম
আন্ধাগলির চাইর পাশ আচানক ফক্‌ফকা শাদা।
চাক্কা-নাই-রিকশা-এক রাইতে একা হইছে মাতেলা;
যেমুন জোয়ান লৌড়ের টাট্টু!
রিকশার গতরে মর্দামি খালি ফাল্ পাড়ে ।

দুই চউখে সুরমা দিয়া
বুড়া চৌকিদার কালা মিয়া
পাহারা শিকায় তুইলা
নবাবের হুমুন্দির লাহান
চৌকিতে পুটকি উঁচায়া ঘুম যায়।

গল্লির ঘাউড়া কুত্তা, হে-ও ভি ঘুমায়;

এই মওকা লা-জওয়াব!
গ্যারেজের খিড়কি দিয়া,
সরু হয়া, সরু হয়া-হয়া,
চিকনে সে আইছে পলায়া ।

বাবরিচুল, আ-বিয়াইত্তা, চানখাঁরপুলের কেরামত;
হালায় এক আজিব মিস্তিরি!
মহল্লার হগলে ওরে ‘আটিরিস্ট সা’ব কয়া ডাকে।
রিকশার পাছায় একদিন খুবসুরত ছবি একখান
বড় মহব্বতে আঁইকা দিছে—খানদানি হাতে!

আসলে হালায় এক আউলাচান্দি
ইস্কুরুপ ঢিলা। মাগার খাসদিল্।
ওর ওই ফাগলাগা দিলে
নানান রঙের তেলেস্মাতি ;
মখলুকাতের বেবাক সুন্দর পিনিস
জিন্দেগিভর ওর দিলের জমিনে আঁকা।

কেরামত বহুত যতনে আঁকে আজগুবি ছবি বেশুমার;
সেই ছবির জমিন জুইড়া গাছপালা-নাও-নদী
পশুপঙ্খী-লায়লা-মজনু-শিরি-ফরহাদ
ভাল্লুক-উল্লুক সব, বান্দর-উন্দর হনুমান
ডানাঅলা বোর্‌রাক, পঙ্খীরাজ ঘোড়া, জিনপরি
ছিনেমার নায়িকা মৌছুমী আর পপি-ছাবনুর
ফুল পাতা আসমানের চান ও সিতারা।

ওরা সব বোবার লাহান
চায়া চায়া দেইখা যায় দুনিয়া ও
আসমানের আন্ধাউন্ধা তামাম খেইল।

মনে অয় রাইতের লিলুয়া বাতাস তারে—রিকশারে—
উড়ায়া নিবার চায় দূরে

হীরা-পান্না সোনা-দানা, মায়, জহরতের পিদিম
জ্বলে তার দিল-পিঞ্জিরায়। আর ওই
তারার জেওরে ভরা আসমানের নীল সিংহাসনে
বেহুদা বইসা এক আকেলা সুলতান
খালি খালি ভাব লয়, গাইল পাড়ে
দুনিয়ারে দিমাগ দেখায়।

আউলা কেরামতের লাহান ওই হালারও ভি
ছিলা চান্দির তলে দুই একখান
ইস্কুরুপ ঢিলা—মনে অয়;

চান্নি-পশর রাইতে লাখে লাখে গুলবদন পরি
রিকশার গতরে খালি খুশবো ছিটায় আর
চউখ মাইরা ডাকে ইশারায়

রাইত এক  সমুন্দর। আলিশান ঢেউ তার দিলের কপাট
চাবি ছাড়া খুইলা দিয়া যায়। দেখায় তেলেসমাতি।
গতরের পানসি তার সেই ঢেউয়ে খালি লৌড়্ পাড়ে ;

লৌড় পাড়ে না উইড়া চলে ?
ঠাহর মিলে না ওর মালেটাল-বেচইন দিলে।

আর্মানিটোলার রাস্তা, ডাইলপট্টি, ডুরি-আঙুল লেন
নবাবপুর, সুরিটোলার গতরে জোনাক জ্বলে—আর—
দিলখোশ চান্দের পিদিম ভি লড়েচড়ে

মোরজ্বালা! এইটা খোয়াব না খোয়াবের
মাঞ্জামারা আজগুবি ঘুড্ডি একখান
—জানে কোন্‌ হউরের পুতে?

চিপা গল্লির ভিতর থিক্যা, ইবলিসের চেলা যেমুন,
দল বাইন্ধা আৎকা-আচানক ঘাউড়া কুত্তাভি আহে।
খামাখা চিক্কুর পাড়ে, পিছে পিছে খালি লৌড়্ পাড়ে।

মান্দির পোলারা এলা লৌড় পাড়ে ক্যালা?

 


যোগাযোগ


দূর থেকে পাথর ছুড়েছ;
সে-পাথর স্বনিয়মে কাছে এসে পড়ে

বস্তুবিশ্বে ক্রমাগত অভ্যাসের টান

আমি চুম্বক-কান্তার থেকে
মফস্বলে পত্র পাঠালে
তরঙ্গের শতভঙ্গি অগোচরে তোমাকে সাজায়

 


জন্মান্তর


নিজেকে সরিয়ে দূরে, আলগোছে,
গাছের গোপন কোনো ডালে রেখে আসি;
নানা রকমের হাওয়া, রোদবৃষ্টি হিম-কুয়াশায়
পাখি এসে ঠোকরায়। ভাবে :
পেয়েছি কেমন ফল। বোঁটকা-ঘ্রাণ।
তবু কাছে টানে!

মৃত্যু-অশ্রু-হাওয়ার নিস্বন থেকে
তৈরি হয় গান। বাজে পাতার মর্মর
বিশাল ছাতার নিচে।

হয়তোবা আনে শিহরন
পরিযায়ী ডানা;

নিজেকে ঘুমন্ত রেখে, ছায়ারূপে, বেরিয়েছি
সূর্যহীন কান্তারের পথে
নিচে গিরিখাত, নিচে পতনশীল হিমবাহের
ভেতর দিয়ে আধো-ভোরে নৌকা চলেছে একা।
বুঝিবা তারও গায়ে এসে লাগছে
বাঘের লাল ক্ষুধার আঁচ;

আর এখানে, এই সূর্যহীন অচেনা প্রদেশে, এই মৃগমদ-লালায়িত দেশে
অপণা মাঁসের পানে ছুটে যাচ্ছে তীর-ভল্ল, পাশুপত, সহস্র বৃশ্চিক।
আর, চতুর্দিকে জমে উঠছে
রক্ত-ফেনিল শুধু শিকার! শিকার!

রক্ত-মাংসপরিতৃপ্ত শকুন-চিতা-হায়েনাদের ঘুমের বুদ্বুদ নিয়ে
নবদশাপ্রাপ্ত এই পৃথিবীতে ফিরে আসি যদি,
নিজেকে কি ফিরে পাব
এরকমই চেনা রোদে, পাতায়-ছত্রাকে মেঘে মেঘে?

এ-আমার লুপ্ত দেহ ধূমায়িত
অফুরান পাতার শিহরে!

 

13682554_1200979473280505_1680689487_o


বীতশোক ফিরে এসো


১.

বিকেলের করোটিতে সন্ধ্যারাগ ঢেলেছে আগুন;
জ্যোতিরথে চোখ রেখে চেনা পথ শান্ত পায়ে হেঁটে
নিজেকে শুনিয়ে কোনো গূঢ়কথা, গোপন মর্মর
বীতশোক, চলে গেছে। পশ্চিমের প্রত্যন্ত প্রদেশে।

আমার ‘সামান্য ক্ষতি’? বিপর্যয়! খসে পড়ে ফল!
বহুঘুম-রাত্রিব্যেপে অনৃত ঢেউয়েরা! তরী ডোবে!

২.

পুরাতন বিষণ্নতা, গোপনে যে আঙুরলতায়
ফল রূপে পেকে ওঠে, সারারাত তস্করের ভয়ে,
শুষ্ক তৃণে ঢেকে তারে সযতনে দিয়েছে প্রহরা।

৩.

প্রত্যহের দুঃখ-দৈন্য-বেদনা ও ক্লেশে—হয়তো সে
বসন্ত-রুধির এনে চেয়েছিল কিছুটা মেশাতে;

যেন নীল প্রজাপতি এসে তার কাছে চায় মদ;
অধীর মক্ষিকা শুধু দ্রাক্ষা মেগে উড়ে উড়ে চলে।

৪.

সন্তর্পণে একা বসে পানপাত্রে দিল সে চুমুক;
লম্বা ঢোঁক গিলে নিয়ে স্তনলোভী শিশুর নিয়মে
আলগোছে মৃগনাভী ভরেছে উদকে স্বার্থপর!!

‘শিশির-চোঁয়ানো রাতে, মধ্যদিনে দহনের শেষে’
অন্যরা ঘুমিয়ে ছিলো? এ-সুযোগে হলো সে কর্পূর?

৫.

হেমন্তের মঞ্চ থেকে গরুড়ের ছড়ানো ডানায়
অতর্কিতে চড়ে বসে শরীর সারাতে গেছে দূরে।
কত দূরে? কাউকে বলে নি; শুধু উপশমহীন
অনন্ত গোধূলিপথ ছেয়ে আছে হলদে পাতায়!

এই তবে গূঢ়লেখ? বৃথা তব নর্তকী ও মদ?

৬.

বীতশোক, তুমি আছো! অনন্ত পশ্চিমে নাকি পুবে?
অসম্ভব ভুলে থাকা; লিথিজলও স্মৃতিসমুজ্জ্বল!
অফুরান দ্রাক্ষা থেকে অন্ধকার প্রশীর্ণ আঙুলে
নিজের ভিতরে, চুপে, শমদায়ী পেড়ে আনো ফল?

৭.

বিকেলের করোটিতে সন্ধ্যারাগ! জ্বলছে আগুন!
ফিরে এসো সেই পথে;—ঝরাপাতা-মুখর সরণি—
কিছুটা যবের মোহে, কিছু প্রেমে, শর্করার টানে।

৮.

উপশম হলো ব্যথা? পিঞ্জিরার ভেতরে পাখির?
দ্রুত তবে চলে এসো, পরিত্যক্ত আঙুরের বনে;

অনন্ত গোধূলিপথ ভরে দিয়ে পাতায়, মর্মরে।

 


শীতের দৈত্য


‘কেননা তোমার দ্বারা আমি সৈন্যদলের
বিরুদ্ধে দৌড়াই,
আমার ঈশ্বরের দ্বারা প্রাচীর উল্লঙ্ঘন করি’
                  —স্যামুয়েল ২২/বাইবেল

 

আর দ্যাখো, ভৈরবে মেঘনার তীরে আমি বাদাম ফলাই;
আর, শাদা বালুর ভিতরে হাত গলিয়ে
ক্রম-বর্তুল বীজের স্নেহ কুড়িয়ে চলি;—ধীরে,

কুলিয়ারচর থেকে মাছ আর
তাদের সম্ভাবনাময় তরুণ ডিমগুলিকে
উপহার হিসেবে পাঠাই নানা দিকে;

নানা রিরংসাঘন শহরের ঠিকানায়।

অসংখ্য বনঘুঘু আর পায়রার লাশ মাড়িয়ে
আমাকে পৌঁছাতে হয় তোমার উঁচু, প্রাকারঘেরা শহরে;

সেখানে ঝাঁ-ঝাঁ রোদের ভেতরেও
করমর্দনের উষ্ণতাগুলি হ’য়ে আছে
ঠাণ্ডা-হিম ঘুমন্ত কামান!

আর, প্রেম সেখানে ছেঁড়া ও পুরনো তাঁবুর ভেতরে
মৃত্যুর তরঙ্গ-বেষ্টিত

দূর,ধস্ত, মলিন, কাতর মফস্বলে আমি থাকি!

রাত্রির অসংখ্য মরানদী উজিয়ে ভাবি:
স্মৃতি-ভস্মের ধু-ধু প্রান্তর পেরিয়ে
বিপুল দামামাসহ আমি আবার
এক শীত থেকে অন্য শীতে
তোমার ক্রূর সৈন্যদলের পেছনে দৌড়াবো

 


মধুব্রজনের জ্যামিতি


মধুবসন্তে আমরা রওয়ানা হলাম
উৎপ্রেক্ষার বাড়ির দিকে
পথে উপমার গিরিখাতে তুষারে আটকে গেল
আমাদের গো-শকট। থেমে গেল চলমান পায়ের মর্মর

আহা! এখানে অনুপ্রাসের মতো বয়ে গেছে পর্বতচূড়া
এখানেও উপমার আক্রমণ;

ব্যাজস্তুতির বাঘ নেচে বেড়াচ্ছে
গজদন্ত ছড়ানো নৃশংস অরণ্যপথে

আর এই আপাত সরোবর
সে তো স্বপ্নহননের শীতল চাকুতে ভরা

বরফ গলার প্রতীক্ষায় আমাদের মদ শেষ
অপচয়িত সকল যবদানা;

শুধু হাওয়া এসে বলে যায়: ‘অপেক্ষা ভালো
রানি আসবে উচ্ছ্রিত ঘোড়ার বাহনে চড়ে!’

জানি না কী করে পেরোতে হয় কেওক্রাডংয়ের পথ
—ডানায়, জেব্রার পায়ে নাকি উড়ে?

শুধু আধোঘুমের ভেতর গতায়াত করছে
চিত্রকল্পের পাখি আর টুসুগানের সুর

কেবলি ঢুলছি আর হাই তুলছি

রক্ত-সরোবরের জলে কেউ শানাচ্ছে শীতল চাকু
—কেউ আঁকছে জ্যামিতি!

 


পলায়ন


অরণ্য শয়ান ভেঙে দিব্যচক্ষু কানা ভিক্ষুদল
এসেছে পালিয়ে এই জলতাঁবুঘরে;

তাদের পেছনে নৌকা, যবচাষী, ধুঁধুলের তরী
ছায়াপথে শূন্যে ভাসমান।

দশ লক্ষ চুপ-ঘোড়া কেশর ফুলিয়ে যায় অরণ্যের কোলভরা চাঁদে।

তখনও অনেক দূরে তাঁবুঘর;
ছায়ামতো ভিক্ষুগণ গগন-পাতালে উড়ু-উড়ু

তাদের সাক্ষাৎ লোভে আসে যতো নগ্নদেহ কালো যবচাষী

—এবং শকটারোহী সুন্দরী ও অপটু মেয়েরা

শান্ত, ধীর পদধ্বনি হাওয়া-সেঁকা বাড়ির উঠানে এসে থামে
ততক্ষণে ভিক্ষুদল আচম্বিতে ঘুমে অস্ত যায়;

আকাশ-বিপণিজুড়ে জমা হয় সংকেতের গাঢ় লাক্ষা-মেঘ

চাষীরা ধ্যানের মই বেয়ে উঠে দ্যাখে:
অস্তমিত ভিক্ষুদের চোখে স্বপ্ন, পাত্রে পাত্রে মদ

শাদা ফেন-তাঁবু ফেলে মুখশ্রী ও ময়ূর পালিয়ে গেছে ভয়ে!

 


 সাধুবচনের ভার


সোনার পুত্তলি, আমি প্রেমবশে তোমাকে জানাই
সাধুবচনের ভার আজি আমি স্কন্ধে তুলি ল’ব;
আর, রচিব যতেক মনোকথা।

কেননা সে প্রসারণক্ষম, কেননা সে স্প্রিং
রাত্রির জীবাশ্মমাখা ক্রমরোমাঞ্চিত তার ডানা।
পদদ্বয় বিদ্রোহপ্রবণ; তবু সেই স্প্রিংয়ের প্রসার
পরখ করিতে বলি তাহাদের;

যেন বাড়ে অভিজ্ঞতা, যেন ফাঁকা রাত্রির রেস্তোরাঁ
উদ্ভাসিত হয় আর বহুগুণ মন্ত্র বিরাজে গৃহে-গৃহে।

অগণিত স্প্রিংসহ আজি আমি তোমার ফটকে দিব হানা
—এই মতো অভিলাষ মনে।

অপিচ জানাই, লাক্ষাগৃহের পথ আজি বড়ো অগ্নিপ্রবণ;
সোনার পুত্তলি, তুমি চক্ষু মেলি দ্যাখো, তার পাশে সরোবর
হেঁতাল কাঠের তরী নৃত্যপর, ঊর্মি-উজল।

অনন্তর, টিলার ওপরে যত ছায়ালিপ্ত বর্ণবিথার
লতিকাসম্মত তারা বিস্তারিয়া অগণিত বাহু
তোমারে ধরিতে চাহে সংকেতে, ভাষায়।

সোনার পুত্তলি, আমি ইহার অধিক আর কিছু বলিব না
শুধু তোমাতে অর্পণ করি যাবো তার ধনাত্মক স্প্রিং;

যদি পারো তার মর্ম ধরি দাও টান!

 


দর্জিঘরে এক রাত


শূন্যতা বল্লম এক; গেঁথে আছে দর্জিমহলে!
রাশি রাশি বস্ত্র ফেলে দর্জিদল গোপনে উধাও

শুধু দেয়ালের গলদেশে ঝুলে আছে
একটি পুরনো ঘড়ি;—মৃত!

দশবস্ত্রে-দিগম্বর বেশ্যার ইশারা আজ মেঘেতে উত্থান;
তাই, লক্ষ শিশ্ন হাতে চেপে দর্জিদল মেঘে ধাবমান।

শৃঙ্গারের গোলাপি আরকে আজ প্রতিপার্শ্ব ঢাকা ;
আঁধারে ঝর্‌নার মতো বেজে ওঠে গণিকামহল।

সবুজ প্রিজমে আমি চোখ রেখে সবকিছু দেখি:
দর্জিদের অনুপস্থিতির এই দীর্ঘ অবসরে
আতশি কাচের গুঁড়ো জড়ো করে চুপে
ঢেকে রাখি ফাঁকফুক, দর্জিঘর, ঘড়ি ও জানালা।

 


তন্দুরের পাশে বসে


হেরাক্লিতাসের নদীতে, দ্যাখো, ভেসে চলেছে
অটো হানের লৌহ-ময়ূরেরা;

সকালের রেস্তোরাঁয়, দ্যাখো, টনকে টন গমদানা
ফুলে উঠছে সূর্য-তন্দুরের আঁচে

চাঁদের উপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছে স্বচ্ছ-শাদা মেঘ
আর, স্বনির্মিত ভুট্টাবাগানের মধ্যে
উবু হয়ে আছেন বিনয় মজুমদার!

মনে পড়লো তাকে
যখন আত্মধিক্কারের মতো মাথা নাড়ছে ঝাউবন;

পাতারা অকারণেই ঝরছে আর দিনভর
কেশে চলেছে ভূতগ্রস্ত আশ্চর্য মেশিন!

কতো রকম তাস উড়ছে বাতাসে
চাষাধরাকলে ক্রমশ ভরে উঠছে আমাদের রক্তপলিটান ;

আর, কবি দাঁড়িয়ে আছেন জ্বলন্ত গ্যাস বার্নারের সামনে

অহো, সিলভিয়া প্লাথ! নিজেকে পোড়ালে তুমি কাচের মতো!!
—নড়ে উঠল ভ্রম-দুর্বিপাক!

যারা পেরিয়ে এসেছ বহু ট্রাফিক-সংকেত
তাদের কার কী চেহারা?
কে তৈলাক্ত ভুট্টার প্রচারক আর কে নিজেরই পাখা
ঠেসে ধরেছিল উনুনে?

আপাতত তন্দুর থেকে কী বেরোয় দ্যাখো;
দ্যাখো, কোথায় ঘাপ্‌টি মেরে আছে ধাঁধা

‘লুনাটিক ইছাইলামে’ কে গো তুমি রয়েছ তন্ময়!
কি তোমার অভিজ্ঞতা এই নগ্ন তন্দুরের পাশে?

আগুন নিভল কিনা দ্যাখো,
দ্যাখো, দিনের আশ্চর্য রুটি কার দিকে প্রথমে দৌড়ায়!

 


সহোদরার জন্য একটি লাজুক টিট্টিভ


টিট্টিভ পাখি: দূর অতীতের লোবানে ডোবানো পাখা
নিয়ে এসেছিল; তার মুখ আজো উঁকি মারে জানালায়।

কামার্ত স্রোত খসাচ্ছে কার বসন্ত-আঙরাখা?
মা মেরি তোমার?—এ-রাম! এ-রাম!
কী বাতাস বয়ে যায়!

দূর নেব্যুলার খাঁজে খাঁজে শুধু ইশারার উপহার;
তীব্র প্যাশন! উড়ছে মেদিনী স্পর্শের বিদ্যুতে;

আর টিট্টিভ উগরে দিচ্ছে নীল বিষ—জিহ্বার।

ওগো সহোদরা, জ্বালো যোনিপোকা ঘুমন্ত পর্বতে!

বিশাল-বিপুল বরফের চাঁই ঘুমের কারখানায়
নিজেকে ভাঙছে; আর দিকে দিকে একাই একশোখান
হযে উঁকি দেয়।—দূর-দূর দেশে অলিন্দে-জানালায়;

শীৎকারময় অসীম ধুমল গ্লেসিয়ারে জাগে গান।

স্মৃতি-টিট্টিভ, যোনিপোকা আর বাতাসের উৎপাত
স্রোতে ভেসে আসে ওই দ্যাখো, ওই, অযুত-নিযুত পাখা!

মুচকি হাসেন মা-মেরি, এবং, বুনেই চলেন তাঁত!

—কে এসে খসায় ভগিনী তোমার বসন্ত-আঙরাখা?

 


ইতিহাসের বই


এক হাতে ফুল ও মরিচা
অন্য হাতে মৃত কৃকলাস;

তোমার দুয়ারে রোজ ছায়া হয়ে, উবু হয়ে আসি।

নদীর খাঁড়ির কাছে দলছুট বসে
কয়েকটি শিশুমেঘ, পরিশ্রান্ত-ক্ষীণতনু মেঘ
নিজেদের নাট-বল্টু খোলে আর জোড়া দিয়ে চলে।

হাই তোলে। ঘড়ি দ্যাখে। হোসপাইপে হালকা মরিচা
ঘষে ঘষে তুলে ফেলে তারা;

আর একটু দূরে বসে
একটি কিশোরী-মেঘ ভাইটির জামা
ধীরে ধীরে রিফু করে ভাসমান সেলাই মেশিনে।

অপলক চোখ মেলে
শান্ত হয়ে দ্যাখে গোল চাঁদ!

ধীরগামী, স্বচ্ছতোয়া এইসব নদীর কিনারে
কোলে নিয়ে মৃত কৃকলাস
সপ্তপর্ণ গাছ বেয়ে একা আমি,
দমে দমে উঠব শিখরে। তবু যদি
রেখে আসা যায় ওকে, চুপে,
শূন্যে শয্যা পেতে হাওয়ার রোদনে।

খাঁড়ির আড়ালে বসে এভাবেই
ওয়ারেন হেস্টিংসের আমলের মদ তুমি পেয়ে যাবে
ইতিহাস-বইয়ের পাতায়।

 


নোঙ্গরের পাশে


নোঙ্গরের পাশে তুমি, মনে হলো, ফেলেছ নোঙ্গর।

সূর্য থেকে দূরতম পশ্চিমের এলানো বিকেলে;
বিষণ্ন  ও একা ছিলে। ডুবন্ত জাহাজ থেকে
জেগে ওঠা বুদ্বুদের মতো।

রাত্রি এখানে তবে, অগোচরে, হয়েছে গোচর?

 


স্টেশনের নাম যশোদল


স্টেশনের নাম যশোদল
রূপবান বাষ্পের এঞ্জিন
রাতে এসে হিস্ হিস্ থামে;

—এটুকুই স্মৃতি-সম্বল।

ক্ষতনীল তৃতীয় বিশ্বের
প্ল্যাটফর্ম ভ’রে আছে লোকে;
ক্ষণ পরে ফাঁকা, চুপচাপ
ঘন রাত যেন স্ফটিকের

দিগম্বর নওল কিশোর
মরাসোঁতা নদীতে সদল
ঝাঁপ দেয়, সাঁতরায় জলে;

ছোটো তরী ভাসে অবিরল।

—এতটুকু স্মৃতি, সম্বল!

বটপাতা দুপুর-বাতাসে
ঝিরিঝিরি স্বর মনে আসে;

বোঝাখানি নামিয়ে পথিক
গামছায় মুখ মোছে, কাশে;

লাল পাকা ফলের গতরে
ঠোক্‌রায় পাখি ডালে ব’সে

ফ্লোরোসেন্ট চোখ নিয়ে যদি
এ-আঁধারে খুঁজি শ্রীচরণ
সলিলে কী ওহে, কালাচান
চলমান নৌকাই নদী?

মোরে ফের ডাকে যশোদল
মম হৃদি হয়েছে উজল

মোরে আর কাটবে না নাগে
মম চিত ভরে আছে ফাগে!

 


ভ্রমণের ভাষা


সুদূরে ঘুমায় পথ, স্বপ্নে জ্বলে সুপ্তিভেদী চাকা
ম’রে-যাওয়া তক্ষকের গোপন মাংসের মধ্যে
ছলকায় ভ্রমণ-ইশারা

তবু এই পর্যটন মুহূর্তের
অন্ধের একটি চোখে সুর্মাটানা প্রণয়ের ভাষা।

লোকভেদে ভিন্ন ভিন্ন স্বাদ
সসীম হ্রদের পাড়ে আমরা জমিয়ে রাখি
ক্ষণজীবী দাম্পত্য-সাঁতার

ভঙ্গুর কাচের মর্মে আমরা টম্যাটো হই
—রেলোয়ে যেদিকে যায় যাক

সূর্যের টম্যাটো চায় আরো ঊর্ধ্বে যেতে
স্ফীত, কালো মঞ্চে উঠে সে-ও চায় নিদ্রার দ্রবণ

এরই ফাঁকে বেচাকেনা। অঘ্রাণের কল্কেভরা আগুনের মধু
সকল কথার পিঠে উলুধ্বনি। প্রয়োজনে উড়ে আসে নুন

কৌতূহলী ব্যাখ্যা চায়
তাকে দেবো ভ্রমণের ভাষা

 


মেরুন রাতের ডায়েরি


তোমাকে খুঁজতে এসে ঝর্নার কিনারে গিয়ে দেখি
সমস্ত জঙ্গল ঘিরে ঠুস্‌কে পড়ছে কালো রাত

সাঁকো নেই, চতুর্দিকে নদী;
জলের ডানার নিচে ওঁতপাতা হাঙ্গর, কুমির।

তদুপরি ভয়! মাংসলোভী কাফ্রিদল
ছুরি আর অজস্র মুষল নিয়ে ঘোরে

তবু আমি তোমাকে দেখার লোভে
সকল গাছের দৈর্ঘ্য মেপে মেপে ওপরে উঠেছি;

চাক্ষুষ প্রমাণহীন সেই ছবি জ্বলবার আগে গেছে নিভে

তবু আলট্রা মেরুন রাতে
একটি ইঁদারা তার সাক্ষ্যে টলোমল

হে গরুড়,
ক্ষিপ্র ওজনহীন ডানা
তোমার স্ফটিকজলে শুয়ে আমি দেখব আকাশ

অবসরে কনুইবন্ধের নিচে
মদেচুর লাটাই নাচাব।

 

13663509_1200979463280506_1046458440_o


জেব্রা যায় জল খেতে


স্বপ্নে এক উঁকি দেয়
নাতিদীর্ঘ আশ্চর্য মাস্তুল
জঙ্গলের কালো চিতা পড়িমরি দৌড়ে ভেসে আসে

জেব্রাদের পিঠে তার ধিকি ধিকি জ্বলছে লালচ!

আমাকে ঘায়েল করে পরমাত্মীয়ের কত
ক্ষিপ্র প্ররোচনা;

ব্যারেলে গুলির মতো
শকুনিমামার হাসি বন্ধুগণ রেখেছে প্রস্তুত!

শব্দহীন উপত্যকা-খানাখন্দে, অপ্রকাশ্য হ্রদে
শত শত মৃত্যু মশগুল

—জেব্রা চলেছে জল খেতে!

 


মম প্রিয় বন্ধুগণ


[আশির দশকের কবি-বন্ধুদের]

১.
মম প্রিয় বন্ধুগণ তপ্ত লাল শলাকা শানায়। আর
রক্তজবা কানে গুঁজে শব্দ করে ভয়ানক হাসে

মাঝে মাঝে বক্ষো’পরে বসে তারা
মোর পানে উঁচায় খঞ্জর।

তাদের চেহারাগুলি ঘোর লাগা
লাল আর বিভীষিকাময়

আমারে তারাই ফের পিঠে নিয়ে চলে বহুদূর।
আমারে তারাই ফের তৃপ্ত করে
লেহ্য-পেয়ে, সুরায় আরকে!

দিন ক্রমে নত হয়!
সূর্যের গ্রীবা ঢলে পড়ে

যখন সবাই ঘুমে
বদ্দিরাজ গাছে এক চোর
মগডালে রুপালি বর্তুল।

সাদা-নীল পরচুলা, উঁচু টুপি,
লাল মোজা, কালো মোকাসিন
বিনোদক বাঁশি নিয়ে
রাতেই নীরবে তারা আসে;

সময় হলেই তারা অবলীলাভরে
বুকে উঠে দ্রুত হাতে চালায় খঞ্জর!

সুর্মাটানা চোখজোড়া প্রপীড়িত
প্রেমময় অন্ধ খোড়লে!

রুপালি নদীর জলে ভিস্তি ভরে
দল বেঁধে কারা আসে, কারা যায় হেঁটে
মোগলটুলিতে আর আরমানিটোলায়

বৈকালিক পথে-পথে
বাজখাঁই হাঁক দিয়ে যায়?

আর আমি, হয়তো চোখের ভ্রম, দেখি :
খাম্বিরা তামাকে তৃপ্ত পুরান ঢাকার সব
রাংতা-মোড়া জানালার কাচ ভেঙে পড়ে।

২.

এ সময় তুষারঝড়ের গ্রীবা নড়ে যদি সমূহ বিপদ
সুবিস্তীর্ণ স্তেপজুড়ে ঠাণ্ডা হিম করাতের দাঁত
তারপর শান্ত সবই। গর্জনেরা নীরব হঠাৎ!
চতুর্দিকে অসীম বরফ শুধু, ধ্বংসরেখা
পাহাড়ের উচ্চাবচ চূড়া
যেন এক বিমর্দিত স্তনের কাফেলা

৩.

ঝড় শেষ হওয়া মানে
আকাশে রুপালি তাঁবু ফুলে উঠবে এখন আবার।

ধারালো নখের নিচে ইগলেরা লুকায় শিকার।
আর তারা বিপুল ডানার তলে ছানাদের আগলে রাখে
সুকোমল লোমের আদরে, শুশ্রূষায়

অপর্যাপ্ত খাদ্যকণা, যবদানা, ঠান্ডা মাংস পথে-পথে এখন সম্বল;
মিতব্যয়ী, সচেতন তারা জানে রসদ সামান্য কিন্তু
সামনে লড়াই লড়াই শুধু লড়াই লড়াই!!

ঠান্ডা রুটি ধেনো মদ যবদানা তারা তাই ভাগ করে খায়।
নিজে খায়, পশুকে খাওয়ায় আর পালান নামিয়ে রেখে
ঘোড়াগুলো ছেড়ে দেয় ঘাসে।

ত্রস্তে তারা জড়ো হয়
চমরি গাইয়ের ত্বকে তৈরি এক
দড়িটানা তাঁবুর ভিতরে;

মধ্যরাত। বাইরে হু-হু হাওয়ার ঝাপট
তাদের ক্লান্ত হাতে অভ্যাসের তাস জমে ওঠে!

তাঁবুর ভেতরে তারা
খুমিশ ঢালছে পেয়ালায়!!

৪.

ক্রূর, বক্র ভীতিপ্রদ, অতিকায় তাদের নাসিকা।
গুম্ফ নেড়ে নেড়ে তারা
ত্রাহিরবে দুনিয়া কাঁপায়!

তাদের করাল ঠোঁটে রক্ত-চর্বি, ছিন্নমাংস চুনিগাঢ় লাল!
বক্র-শ্যেন-ঘোরলাগা
রক্তজবা তাদের নয়ান!!
তাদের চক্ষু থেকে ক্ষণে ক্ষণে ঝরে শুধু
শত শত মৃত্যু আর শব

তারাই আমার সখা
সদাহাস্য তাহাদের কপালে তিলক;

যুদ্ধ আর রিরংসার তরবারি দিয়ে তারা
ক্রমাগত আমাকে শাসায়!!
আস্তিনের ভাঁজ খুলে বের করে খড়্‌গ-চাকু,
জংধরা বাঁকা তলোয়ার

কল্লাবালু দিয়ে তারা, সঙ্গোপনে,
ছুরি-কাঁচি ধার দিয়ে চলে।

আর আমি ঈশ্বরের প্রিয়তম ভেড়া যেন
প্রতিদিন দিবালোকে বলি হয়ে যাই
কপালের ফেরে হায়, এ-যেনবা শেষ নিশিভোজ
সকলের মধ্যে একা। নীলমণি-যিশু!

নিজের কলবে আমি কান পেতে
রই আর শুনি:
পাপাল বুল-কে ঘিরে
টানাদীর্ঘ চারশো বছর
কোটি কোটি মার্জারের
অবিরাম মরণ-চিৎকার!

৫.

অভ্রভেদী লাফ দিয়ে, ভয়ে আমি,
অবিরাম দ্রুত উড়ে উড়ে
শত শত ক্রুশ আর সূচ্যগ্র শলাকা থেকে
নিজেকে বাঁচাই।

ক্রমাগত ভিক্ষা করি
লক্ষ নিমেষ আর একটি নিমেষ!

আর আমি দুই চোখ মুদে
প্রেমপূর্ণ রিরংসায় মম প্রিয় বন্ধুদের
দেখে যেতে চাই :
মধ্যরাত। তাঁবুর ভেতরে তারা
খুমিশ ঢালছে পেয়ালায়!!

 


ঈর্ষার এঞ্জিন


[সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের জন্য]

ঈর্ষার এঞ্জিন গরজি ওঠে আজ; ঘুরছে মঞ্জুল মেঘাঙ্কুর;
ঘুম এক চিৎকার! আকাশে চুনিলাল সূর্য-ক্রন্দন ঝরায় খুন।
উন্মাদ চায় তার অধরে অনিবার স্বর্গবেশ্যার স্তনাগ্র।
কোন্ মন্‌কির কোন্ নকিরে লিখে মোর কোন সে-পাপ কোন অধর্ম?

অন্ধের তন্দ্রায় ক্রমশ খ’সে যায় রাত্রে বর্তুল ডালিমফল;
জন্মের-জঙ্ঘায় অঝোরে ঝরে মেঘ;—ফুটছে ফুল এক অলক্ষ্যে।
নিঃসীম কান্তার ঘুমে ও তৃণে পার। রজ্জুপথ—দূর—গভীর ডাক;
এক-ক্লোন-চণ্ডাল ঢুঁড়েছে পিপাসায় নফ্‌সে আম্মার—কী লান্নত!

বোর্‌রাক জন্মায় জেগেছে চিঁহি তার; শুনছে তন্ময় মদনটাক!
লোল্‌জিভ রাক্ষস আঁধারে খুঁজে যায় কূর্মপৃষ্ঠের আ-নীল মদ।
আর কার চরকায় কে এসে ঢালে তেল কার আপনজন কে কার পর?
রক্তিম জল্লাদ চেয়েছে রতি আজ বন্যরাত্রির আলিঙ্গন।

কোন মান্দাস্‌ কোন্‌ গরলে অচেতন ভাসছে ঘুম-নীল লখিন্দর?
কোন্‌ মৎসীর লেজ নিমেষে হয়ে সাপ বক্ষে বিষদাঁত ছোবল দেয়?
এক হিঙ্গুল মুখ ক্রমশ জোড়া চোখ ফুটছে ঘোরলাল এ-রাত্রে!
ঝঞ্ঝার মেঘ ধায় ছুটিয়ে ঘোড়া তার হানছে মৃত্যুর অপস্মার!

আজ তোর স্কন্ধের গরিমা খ’সে হায়! ছিন্নমস্তার তাথৈ নাচ!!
মনসুর হাল্লাজ জপেছে দমেদম্‌ মাংসে মজ্জায় আনাল হক্‌
ষণ্ডের তিন-শিং খুঁজেছে যোনিকূপ অন্ধ মুদ্গর আসন্ধ্যা
বল তোর উড্ডীন ডানাটা চাটে কোন ধূর্ত জম্বুক—মানিক মোর!

শিশ্নের উদগম! পেত যে উপশম জাগত হররোজ বালার্ক
ছম্‌ছম্‌ রাত্রির বেভোলা পথিকের রক্তে রম্ভার রতির স্রোত
চুপ-শ্যাম দাঁড়কাক দ্যাখে না কোনো চাঁদ উষ্ণ ফল্গুর সে-উদ্গার!
শয্যায় চুপচাপ দু’জনে দুটি লাশ ক্লান্ত, প্রেমহীন, নিরুত্তাপ!

স্পন্দন শেষ হায়! নদীতে ভেসে যায় কার গো কার লাশ মুখের ডৌল?
অস্থির খুর তার কাঁপিয়ে গিরিপথ রক্তে চঞ্চল ঘোটক ধায়।
হায় কোন্‌ খঞ্জর বাঁকানো খরশান চায় ঘুমন্তের লোহুর মদ?
দুগ্ধের নির্ঝর নোনা এ-শরাবের পাত্র উপচায় আ-সৎকার।

দিলখোশ পক্ষীর ঠোঁটে যে ধরা মাছ তারচে’ উজ্জ্বল কে ঝল্‌মল্‌?
স্পর্শের বিদ্যুৎ ছড়িয়ে কুহরণ রাত্রি বন্ধুর—উড়ালময়!
নিষ্ফল পুষ্পল কাননে মদালস জমছে হিম-নীল লিথির জল
বঙ্কিম চন্দ্রিম হেরো হে, এ-আনন—একটি ফল্গুর একুশ মুখ!

সুমসাম প্রান্তর!—তবু কে কুহু গায় শূন্য মঞ্চের নেপথ্যে?
তবলায় তিনতাল বেজেছে অনিবার নৈশযুদ্ধের আমন্ত্রণ!
অদ্ভুত বর্ষার জঘনে ঝরে নুন লক্ষ তীবরীর তীরাস্ত্র।
ভঙ্গুর মুখ যার বোতলে ভরো তার তপ্ত নিশ্বাস ব্যথার ক্ষার।

পঙ্গুর ঈর্ষার কত না গুরুভার মৃত্যু-মুদ্রণ আকৈলাস!
অদ্ভুত পিঞ্জর পাখিরে ফিরে চায় স্বপ্ন-সম্ভব অলিন্দে;
মর্মের সংক্ষোভ বেদনা হাহাকার করছে মশগুল ভূমণ্ডল
ডুম্বুর পুষ্পের স্মরণে অনিবার মন্দ স্পন্দন এ-অঙ্গার!!

 


একশো করোটি আর মদ


দাও, একশো করোটি আর গোপন যত মদ
রাতের নীল কথায় বাঁকা ঘুমের তরবারি

বিজন ঘরে পারদঘন বুকের মঞ্জরি

আচম্বিতে হরণ করা এখনো সম্ভব
কামশীতল সোনার ঘুঘু, মোমের অপ্সরী

যদি না দাও পালকঢাকা গোপন কুঁচফল
চালাব তবে হঠাৎ এসে গলায় খঞ্জর

জ্বলবে আগুন, রক্তধারা ফিনকি দিয়ে মদ
গোপন ঘরে পারদঘন গহন মঞ্জরি

 


দিওয়ানা জিকির


১.

আমারে পড়ব মনে, জানি তুমি, ডাকবা আমায়।
খাড়া-সোজা-উপ্তা হয়া; দিওয়ানা জিকিরে অবিরাম।

বাঁশের ঝিংলা দিয়া, জালিবেত-সুন্ধিবেত দিয়া
কানমলা দিয়া মোরে আর কত করবা প্রহার।

আমি এর প্রতিশোধ নিব ঠিক। খাল-বিল-নদীনালা বাইদ
পার হয়া চলে যাব একশো ক্রোশ দূরে একদিন।

যেন, কনফুসিয়াসের স্বপ্নে বিভোর কোনো চীনা
সারাদিন একা একা খালেবিলে কিস্তি ভাসায়;

২.

ডাকবা আমারে তুমি লুকায়া লুকায়া একদিন!
যেন এক ভেকশিশু হাইঞ্জাকালে কচুর বাগানে
ডর পায়া, চিল্লায়া, মায়েরে একলা তার ডাকে।

যেমতি বাদলা দিনে পাইতা মোরে হাকালুকি হাওরে হাওরে
সাড়া তবু পাইবা না।
যেন বোবা কালেঙ্গাপাহাড়!
চুপ মাইরা বইসা রবো; আর দেখব তোমার জিল্লতি।

যতো জোরে ডাক পাড়ো কোনোদিন পাবা না আমায়।
লক্ষ ক্রোশ দূরে গিয়া তোমা হতে থাকব স্বাধীন!

খেলব, খেলার ছলে একা বসে তাস সারাদিন।

৩.

আমারে খুঁজবা তুমি হবিগঞ্জে,
তেকোনা পুকুরপাড়ে,
মিরাশির মাঠে আর উমেদনগরে,
করবা তালাস চুপে
পুরান মুন্সেফি আর বগলা বাজারে।

দুই হাত উঁচা কইরা হাঁক দিবা যেন ক্যানভাসার:
চিফ রেইট,
দুই টেকা,
হলুদি ব্যাটাটা!

৪.

বেফিকির উড়াধুড়া আমি এক ফকিন্নির পোলা
আন্ধা-কানা ঘুইরা মরি লালনীল স্মৃতির বাগানে ;

চান্নি-পশর রাইতে জারুলের নিচে বেশুমার,
আবালের সর্দি যেনো সাদা-নীল ফুল ঝরে পড়ে;

৫.

মগরা নদীতে আর লাফুনিয়া-কইজুরি বিলে
তোমার নাকের মতো বেঁকা-ঘোলা জলে নাও লয়া,
মনভরা গোস্বা লয়া, পেটভরা ভুক লয়া আমি
অলম্ভূত কালা বাইদে ভাইসা রবো একলা স্বাধীন।

যেন আমি বাচ্চা এক উদ!
খিদা লাগলে উপ্তা ডুবে আচানক কালবাউস ধরে
কুশার-খেতের ভিত্রে বইসা খাব ফুর্তি লয়া মনে;

৬.

আসমানে লেঞ্জাহাঁস উইড়া চলে হাজারে-বিজারে
চিতলের পেটি য্যান্‌ কল্‌কলাবে সামনে ধনুগাঙ;
তার বুকে ঝাঁপ দিব, করব আমি সেখানে সিনান

৭.

আমারে না পায়া যদি
নিজের জাগ্না চউখে মাখো তুমি নিদ্রাকুসুম,
আমি তবে পুটকিছিলা বান্দরের মতো

বসে রবো চুপচাপ
বদ্দিরাজ
গাছের
আগায়!!

জুয়েল মাজহার

জুয়েল মাজহার

জন্ম ১৯৬২ সালে; নেত্রকোণা। মার্কসবাদী। কোনো অলৌকিকে বা পরলোকে বিশ্বাস নেই। ঘৃণা করেন পৃথিবীকে খণ্ড-ক্ষুদ্র করে রাখা সীমান্ত নামের অমানবিক ‘খাটালের বেড়া’। লেখেন মূলত কবিতা, বিচিত্র বিষয়ে প্রচুর অনুবাদও করেন।

বর্তমান পেশা সাংবাদিকতা। কৈশোরে বাড়ি ছেড়ে নিরুদ্দেশযাত্রা। দীর্ঘ ভবঘুরে জীবন। পেটের দায়ে নানা কাজ। যৌবনের একটা বড় অংশ কেটেছে পাহাড়ে। সেভাবে বাড়ি ফেরা হয় নি আর।


কবিতার বই :
দর্জিঘরে একরাত [ফেব্রুয়ারি ২০০৩, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা]
মেগাস্থিনিসের হাসি [ফেব্রুয়ারি ২০০৯, বাঙলায়ন প্রকাশনী, ঢাকা]
দিওয়ানা জিকির [ফেব্রুয়ারি ২০১৩, শুদ্ধস্বর, ঢাকা]

অনুবাদগ্রন্থ :
কবিতার ট্রান্সট্রোমার (নোবেল সাহিত্যপুরস্কারজয়ী সুইডিশ কবি টোমাস ট্রান্সট্রোমারের বাছাই করা কবিতার অনুবাদ সংকলন) [শুদ্ধস্বর, ফেব্রুয়ারি ২০১২]
দূরের হাওয়া (বাংলা অনুবাদে ২০০ বিশ্বকবিতা) [চৈতন্য, ২০১৬]

ই-মেইল : jewel_mazhar@yahoo.com
জুয়েল মাজহার