হোম কবিতা তীব্র ৩০ : গৌতম বসুর বাছাই কবিতা

তীব্র ৩০ : গৌতম বসুর বাছাই কবিতা

তীব্র ৩০ : গৌতম বসুর বাছাই কবিতা
1.03K
0
কবি গৌতম বসুর জন্ম পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিংয়ে। তিনি সেই বিরল সৌভাগ্যবান কবি,  প্রথম বইতেই যিনি
কবি-পাঠকের মনোযোগ কেড়েছেন এবং খুব অল্প লিখেই সমকালীন বাংলা কবিতায়
হয়ে উঠেছেন স্বতন্ত্র ও তাৎপর্যপূর্ণ।
.
 
পরস্পরের ‘তীব্র ৩০’ সিরিজের আয়োজন এবার তাঁকে ঘিরেই…
.

অন্নপূর্ণা ও শুভকাল  থেকে
[প্রথম প্রকাশ ১৩৮৮ /১৯৮১]

অন্নপূর্ণা ও শুভকাল
∏ ৩ 
.

একটি মানুষ ঘাসের জনতায়
রয়ে গেছে, যখন ফলকের সঙ্গে ফলকের সংঘাত
ধাতুর ক্রোধে বীর পড়েছে ভূতলে, রথ
টলতে-টলতে প্রবেশ করল যুদ্ধের আরও ভিতর;
সহস্র পদাতিক ঘাসফুল ঘিরে ধরেছে, শুঁড় দোলে
ঐরাবতের এই বুঝি শেষ হিংস্র দিন, ঘাসের
পায়ে অন্য ঘাসের মাথা, মাথা থেকে চিৎকার
নির্গত হলে হাওয়া ঘুরে ধুলো আঘাত করবে।
একসময় সূর্য আলো ফিরিয়ে নিলেন, মনে হলো
অবিমিশ্র হাহাকারের কাল, ঘাস থেকে মাঠ,
মাঠ থেকে বালকের দল, তাদের উল্লাসের
উপর দিয়ে হাহাকার বয়ে চলে, আকাশের বিরুদ্ধাচারী
রাশি-রাশি ছুটন্ত হাত, একটি ঘুড়ি আজকের ভোজন।

 


অন্নপূর্ণা ও শুভকাল
∏ ৭ ∏
.

আর নয়, অন্ধ-বিক্রেতার থেকে ধূপ কেনার সুযোগ নষ্ট হয়েছে
একে চন্দ্র, দুয়ে পক্ষ, তিনে নেত্র, অন্তরীক্ষ-পাশায় খাটে
তৃতীয়টি অধুনা যষ্টির পরচুলায়, দিন আনে, খায়,
মাঝির সংসার দুলে চলেছে।
নদীর চাহনির আশায় স্থলের মানুষ বলে
তাকাও, তাকাও, অন্তত কোনও ইঙ্গিত
আমরা অগ্নিপুত্র, ক্ষণিক—অবিকল এইভাবে
উড়োজাহাজের উদ্দেশে বন্যার্ত আবাদ থেকে হাহাকার উঠেছে।
শিকল দেখে আবার মনে পড়ল শব্দের কথা
শিকল রূপান্তরিত জল, সব দর্শক যখন অতীত
তখনও অনেক ভূমিকা থেকে যাবে
এই জল প্রকৃত শ্মশানবন্ধু, এই জল রামপ্রসাদ সেন।

 


অন্নপূর্ণা ও শুভকাল
∏ ১০ ∏
.

কিছু ভয় বৃষ্টির রাতের জন্য সঞ্চিত থাকত
ঝড়ের যন্ত্র যখন অবিরাম প্রসবিনী, কিছু ভয় অনাথ;
শব্দও একপ্রকার অন্ধকার, যার উদ্দেশে কান পাতা রয়েছে
যার ভিতর, তমসা তাদের পথের কাঁটা, অহর্নিশ
জল বিতরণ করে, বৃক্ষের কুহক; আর এমন
নিদ্রার শোভা কেউ দেখেছে, কেউ দেখে নি
শূন্যতা থেকে আলোর ফাঁস ঝোলে, প্রথম রহস্য
অথবা সব রহস্যের শেষ, মাতার বঁটিতে সন্তানের মাথা।

 


অন্নপূর্ণা ও শুভকাল
∏ ২২ ∏
.

এমন হলো তাদের পাপ দ্বারে-দ্বারে ফেরে
যেখানে যায় অশ্রুর লোহা প’ড়ে আছে, অন্যের অশ্রু
মানুষ স্তব্ধতার ব্যবহার জানে।
আবার ভাতের থালা তুলে ধরো, এই বর্ম
স্বহস্তে খোলার জন্য নয়, যখন সময় হবে
সকলেরই হয়, সেদিন ওই দায় ভাগ্যহীন সন্তানের।
যে জানে শেষাংশ কিভাবে গীত হবে, সেই জন সমাপ্তির রাজা
সেই বিদ্যা একমাত্র বিদ্যা, আমি মূঢ়
আমার সঙ্গে বলো, অন্নপূর্ণা ও শুভকাল।

 


অতিশয় তৃণাঙ্কুর পথে  থেকে
[প্রথম প্রকাশ ১৩৯৮ / ১৯৯১]

বিশ্রামতলা
.

তার কাছে বৃষ্টির মতো ফিরে আসি
আমার দুইকূল তার চোখের কালি, জলভারে
বেঁকে নীল হয়, জ্যোৎস্নায় আবার স্ফীত, উতলা হয়ে ওঠে;
নক্ষত্রের নশ্বর দৃষ্টিপাত, নশ্বর আমার পদধূলি,
চন্দ্রকিরণতলে যেদিকে চাই, দেখি,
আলোর কলস চূর্ণ, শঙ্খধ্বনির ভিতর
এই পথ, মাঠ, কৃষ্ণকায় বৃক্ষগুলি জেগে আছে।
সে কোথায়, কোথায় তার সুরমাখা কঙ্কণ, শূন্যতা ছুঁয়ে আছি
এ-শূন্যতায় বুকের আলো বুকে নিভে যায়।

 


স্কুল রোড
.

অন্ধকার স্বর্গে মিশে থাকা পাখির একটি ডাক,
বলো, ওই ঘনতমসায় তার অন্তিমকাল কোথায় চিত্রিত,
খেয়াঘাটে কুপি জ্বলে, জলের ’পরে ভাঙাছেঁড়া আলো
সঙ্কেতবহনে ব্যর্থকাম, কাঁপে, স্থির হয়, শব্দহীন আবার দুলে ওঠে।
মহীরুহের ভিতর নিশ্চল ওই রাত্রি পিছনে ফেলে
যেথা যাও, ঊর্ধ্বে, মেঘস্থপতির দেশে
সেথা বিদ্যুতে, গার্হস্থে বিতরণ কোরো সেই আজ্ঞাবহের প্রাণ
আকাশে খই ও মুদ্রা প’ড়ে থাকে, রুক্ষ হাওয়ায় গড়ায়
নক্ষত্রের বালির ভিতর কোনও দানা তার, কোনওটি পাতকীর।

 


গঙ্গানারায়ণপুর
.

অবশেষে, কোনও এক মধ্যাহ্নে
বাঁশবনের ধারে, যদি কেউ ললাট স্পর্শ করে
ধীরে, অতিধীরে, তাকে দিও, আমার বিরহ।

 


রসাতল  থেকে
[প্রথমপ্রকাশ১৪০৮ / ২০০১]

ঝরাপাতা
.

পথ থেকে একটি হলুদ পাতা কুড়িয়ে নিয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করি, ‘এটি কি জীবনের প্রতীক, না মৃত্যুর?’
‘জ্ঞানের, পরাজয়ের’।
আত্মমগ্ন পথের বাতাস বয়ে চলে। জগতে, এই অখণ্ড নীরবতায় হাওয়া বয়; বৃক্ষশাখার ভিতর দিয়ে, জনপদ ও মানুষের ভাষার উপর দিয়ে, কখনও উদাসীন ও অবসন্ন, উন্মত্ত কখনও-কখনও, এই পর্যন্ত। মাঝে-মাঝে হাওয়া যখন থেমে আসে, মনে হয়, অজানা কোনও এক গভীর শ্বাস গোপনে অঙ্কুরিত হয়ে, ক্রমে সঞ্চারিত হচ্ছে পাতায়-পাতায়, বনপথে, অন্তরীক্ষে।

সবুজ, উচ্ছল, মুখর পাতাগুলি হলুদ হয়ে, রক্তবর্ণ হয়ে নেমে আসে মাটিতে, যেভাবে শান্তি নামে, শতকোটি বছরের স্মৃতির আকাশভাঙা রূপ যেভাবে অন্ধকারে সহসা কেঁদে ওঠে, মানুষ নতমস্তকে পরাজয় স্বীকার করে যেভাবে।

 


গল্প
.

অসুরদের উপদ্রবে স্বর্গলোক যখন বিপন্ন, সেই সুদূর অতীতকালে দেবতারা অনেকেই পৃথিবীতে নেমে এসেছিলেন। স্বর্গের রাত্রি কেমন আমরা জানি না, কল্পনা করি, অন্ধকারই হবে। কোনও এক ঘোর কৃষ্ণবর্ণ রাতে, অতিসাধারণ বেশে দেবী নৌকায় উঠে বসলেন সবার অগোচরে, সঙ্গে দু’তিনজন বিশ্বস্ত ভৃত্য। সাতরাত সাতদিন অবিরাম নৌকাচালনার পর মাঝিরা নির্বল, এক সাঁঝের বেলায় নৌকার গলুই এসে ঠেকল এই পোড়া বাংলাদেশের শীর্ণ এক নদীর পাড়ে।

রাজরাজেশ্বরী রয়ে গেলেন এই গ্রামে। পৃথিবীর শাড়ি, পৃথিবীর গয়নায় নতুন ক’রে সাজানো হলো তাঁকে, মন্দির স্থাপিত হলো। গ্রীষ্মের দুপুরে সেই মন্দিরের ঠাকুরদালানে ব’সে কেউ-কেউ ইষ্টনাম জপতেন, মাথায় হাত রেখে শীতল মেঝেতে ঘুমিয়ে পড়তেন কেউ-কেউ, দু’একটা কুকুর মন্দিরপ্রাঙ্গণে নিঃশব্দে ঘোরাফেরা করত। দেবী কথা বলতেন না, তাই স্বর্গে তাঁর ঐশ্বর্যের কথা গ্রামবাসীগণ জানতে পারেন নি, তবু তাঁরা সাধ্যমতো রাজরাজেশ্বরীর সেবা করতেন। যে-বছর ফসল ভালো হতো, সেই বছরে নতুন গয়না গড়িয়ে দিতেন কোনও সম্পন্ন গৃহস্থ, দুরারোগ্য ব্যাধি সারিয়ে দিয়ে দেবী একবার পেয়ে গেলেন শিকল পরানো, ধাতুর পাতে মোড়া, লাল অক্ষরে ভক্তের নাম লেখা, প্রণামীর নতুন বাক্স। খুব জাঁকজমকের সঙ্গে সন্ধ্যারতি সারা হতো, ধূপধুনো চামরের পিছনে দেবীর নিশ্চল, প্রসন্ন মূর্তির দিকে চেয়ে-চেয়ে ঘোর লেগে যেত, মনে হতো সত্যই স্বর্গীয় ভাবের অধিকারিণী দেবী রাজরাজেশ্বরী। কখনও কি স্বর্গে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা জাগত তাঁর? দেবী কথা বলতেন না।

কালের পরিবর্তনের সঙ্গে-সঙ্গে ভাগ্যও রূপান্তরিত হয়; নদীর কোল ঘেঁষা অভাবদীর্ণ, নিস্তরঙ্গ সেই গ্রাম্যজীবনে এক দুঃসময় অতর্কিতে এসে আছড়ে পড়ল। অকারণে জ্বালিয়ে দেওয়া হলো ঘরদুয়ার, কাছারি ও ধানের গোলা; বহুপূর্বে দেবী যেমন স্বর্গরাজ্য পিছনে ফেলে এসেছিলেন, প্রায় তেমনভাবেই রাতের অন্ধকারে, নৌকায়, গরুর গাড়িতে, ছেলে কাঁধে ও ঘটিবাটি মাথায় নিয়ে, পায়ে হেঁটে, মানুষ পালাতে লাগল।

রাজরাজেশ্বরী ত্যাগ করতে পারলেন না সেই পুড়ে-যাওয়া গ্রাম, প্রবাসের বিষণ্ন মৃত্তিকা।


অনিঃশেষ
.

পৃথিবীর বুক থেকে এই হাওয়ার রাত যদি-বা মুছে যায়, ক্ষয় নেই জাগরণের। হৃদয়ের, সুবৃহৎ অন্ধকারের সমাপ্তিরেখা নেই, কভু শেষ হবে না মধ্যরাত। জেগে আছ তারাদলপতি গভীরতম নীলে, বলো, আমি কিভাবে বাড়ি ফিরে যাই? পায়ের তল থেকে কারা যেন পথ সরিয়ে নিয়ে গেছে, যেদিকেই ঘুরে দাঁড়াই, ক্ষমাহীন, ক্ষমাহীন দামোদর নদ। আকাশ নেমে এসে ছিঁড়ে ফেলেছে আমার জীবন, হাড়ের সংসার, তবু ক্ষতচিহ্ন নেই, তবু ক্লান্তি জানে না বৃষ্টিপাত। গাও বৈষ্ণবী গাও, মনের কোণে এসে দাঁড়াও, মোবিলের টিন হাতে বিষণ্ণ, তোমার কন্যাসন্তানটিরে দেখি।


এবাজুদ্দিন লস্কর
.

যতবার পার হয়েছি এবাজুদ্দিনের বাড়ি, দেখেছি, বাঁশের কঞ্চির গেটটি নারকল দড়ি দিয়ে বেড়ার সঙ্গে বাঁধা, কেউ নেই এদিকে-ওদিকে। জায়গাটা নির্জন; পুবদিক থেকে বেঁকে-আসা কাঁচা রাস্তার পাশে কয়েকটা উঁচু ডাবগাছ, তারই কোল ঘেঁষে ভাঙা-ছেঁড়া ছায়ায় দাঁড়িয়ে রয়েছে তাঁর ভিটে। এদিকে আর কোনও বসতি নেই, রাস্তার ওধারের জমি বসবাস অথবা ফলচাষের অযোগ্য, অসমতল, তাই কাঁটাঝোপ আর আগাছায় ভরা; ঘন সবুজের ভিতর কয়েকটি ছাগল চরছে। ভাঙা ডাল, শুকনো পাতা মাড়াবার শব্দ আর নানা পাখির ডাক—এক প্রগাঢ় শান্তির ভিতর এবাজুদ্দিনের বাড়ি ডুবে আছে। কখন ফিরবেন এবাজুদ্দিন? গাছের পাতার ফাঁকে কয়েকটা ঘর দেখা যাচ্ছে খানিক দূরে। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম ডাব গাছের ছায়ায়, পাখির ডাক ভেসে আসছে, শুনতে পাচ্ছি ভাঙা ডাল আর শুকনো পাতা মাড়িয়ে চলার শব্দ। যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখান থেকে এবাজুদ্দিনের বাড়ি স্পষ্ট দেখা যায়; উঠোনে ধান বিছানো নেই, রেডিও বাজছে না, দাওয়ায় একটা ছেঁড়া গামছা মেলা আছে।

এর কয়েক মাস পর, অকস্মাৎ একদিন এবাজুদ্দিনের দেখা পেলাম। এক কামরায় ভিক্ষা করবার পর, ট্রেন থামার সঙ্গে-সঙ্গে পরের কামরায় দ্রুত চ’লে যাবার আগে যে সামান্য অবসর থাকে, তারই এক ফাঁকে আমাদের প্রথম সাক্ষাৎ। যে-ছেলেটি তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দেয়, তার গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘তোরাই তো আমার চোখ’। তাঁর সঙ্গে আমার আর কথা হয় নি বিশেষ, কিন্তু আমি তাঁকে অনুসরণ করতাম। ভিক্ষার শেষে তিনি লাঠি ঘষে-ঘষে দরজার পাশে এসে দাঁড়াতেন, মাঝে-মাঝে আমি নিঃশব্দে এসে দাঁড়াতাম তাঁর সামনে; মানুষের উপস্থিতি টের পেয়ে প্রথমে সতর্ক হয়ে উঠলেও পরে তিনি সহজ হয়ে যেতেন। বিপুল হাওয়ায় চুলদাড়ি উড়ছে, মাথা উঁচু; গোধূলিবেলায় সেই নিশ্চল মূর্তির সম্মুখে চোখ বুজে দাঁড়িয়ে থেকেছি, এক আলোকময় সিংহদ্বারের দুই জন্মান্ধ প্রহরী।

12941114_1118185628226557_1936266700_o


শ্রাবণ
.

অন্ধকার কেঁপে-কেঁপে উঠছে বিদ্যুতের প্রহারে, নিমেষের জন্য তাঁর নতমুখের এক পাশ প্রকাশিত হয়, আবার ঘন তমসা। এক ভীষণ বিস্ফোরণের অপেক্ষায় কয়েক মুহূর্ত বয়ে যায়। মেঘের পাতায়-পাতায় বৃষ্টি অস্থির, পায়ের নিচে গড়িয়ে চলে আকাশের জল; আমরা পারব কি নির্বিঘ্নে আরও একটি বজ্রপাত পেরিয়ে যেতে? ক্ষয়ে-আসা, ভেঙে-পড়া আয়ুর প্রান্তে তপ্ত পাথরফলকের মতো এই দাঁড়িয়ে-থাকা, অদৃশ্য নতমুখ তাঁর, ধুয়ে যায়। ধুয়ে যায় আমাদের কথার ফাঁকে-ফাঁকে এতদিন পড়ে-থাকা দীর্ঘ বিরতিগুলি, নক্ষত্রগণনার কাজ। অকস্মাৎ, আরও একবার আলোর পর্বত মাথার উপর ভেঙে পড়ে; দৃষ্টিশক্তি লুপ্ত হবার পর তিনি স্পর্শ করেন আমায়, দেখি, নিচে, বহু নিচে, ওই রসাতল। সুয্যি দত্ত লেনের দাবার রোয়াক থেকে আমি ডেকে উঠছি, ‘বিভুতিদা, বৃষ্টিআসছে!’ আঁচলের খুঁটে মাথা ঢেকে টুকুমাসি ছুটে-ছুটে ছাত থেকে শুকনো কাপড় তুলছে, রাজেনদের পায়রার ঝাঁক এক সাথে তীরবেগে নেমে যাচ্ছে অজানা পৃথিবীর দিকে।


নদীর বক্ষদেশ
.

জলের চেয়েও ক্লান্ত তার দেহের ’পরে ভোরের আলো এসে পড়েছে। জল তার দেহের চেয়েও ক্লান্ত, তাকে বহন করে, বহন করে সহস্র কণায় চূর্ণ হয়ে-যাওয়া সূর্যালোক; জল নিজেকে বহন করে। ঘুম ফুরিয়ে গেছে বেহুলার, ঘুম তবু শুয়ে রয়েছে তার কোলে, ঘুমের দুয়ারে আলো এসে পড়েছে।

নদীর পাড়ে যে জীবন সে ফেলে এসেছে, তাকেও স্পর্শ করো রশ্মিসকল, সমস্তই অস্পষ্ট এই ভোরে; ঘাটের সিঁড়িগুলি একে-একে উঠে গেছে কুয়াশার দিকে, সিঁড়ির ফাটলে হাওয়ায় কাঁপছে একটি চারাগাছ, সমস্তই স্বর্গের মতো নীরব। দুঃখিনী আমাদের এই মেয়ে আর কোনওদিন এসে দাঁড়াবে না পেয়ারাতলায়, হাঁটবে না ভিজে ঘাসে, যেখানে পাড়-ভাঙার শব্দ ডুবে যায় নদীতে, সেই কুয়াশায় গচ্ছিত রইল তার এই পৃথিবী।

সম্মুখে দেখা যায় সমুদ্রের মতো নদী, আকাশের মতো সমুদ্র, ব্রহ্মাণ্ডের মতো আকাশ।


নয়নপথগামী  থেকে
[প্রথমপ্রকাশ ১৪১৪ / ২০০৭]

সৈকত
.

একটি সবুজ পাতার মুখে শোনা গোপন কথাগুলি
হারিয়েছি, বিপদকালে হারিয়ে ফেলে, সূর্যাস্তের ন্যায়
কেঁদেছি, ডুবেছি, আসমুদ্র ছড়িয়ে পড়েছি, যবনিকা।
আরও দূরে মিশে যায় শেষতম মশালের আর্তনাদ,
নিজের পদচিহ্নদের নিয়ে ধুলোয় ফিরে যেতে চাই,
চাই কুশাসন, ওই ছায়াপথ ভেঙে পড়েছে মাথায়।
চোখের মণি অবধি উঠে-আসা পাপ, ডাকে, আমি শুনি
রসুল, রসুল।

 


অমৃতসভা

But the light’s source is a secret
.                                আনা আখ্‌মাতোভা, জুলাই ১৯৫৯, লেনিনগ্রাদ
.

আমাদের জাগরণ, ক্রন্দসী-পথচারিণি,
শেষ হয়ে আসে, সমস্ত নীরব কথাগুলি
কার কণ্ঠে তুলে দেব, আদেশ করো এবার;
হীনবল আমি, সহসা খড়্গের দেহ পাই
আসন ফেলে উঠে দাঁড়াই, ঊর্ধ্বে চাই, ঊর্ধ্বে,
দেখি, দূরের ওই অমৃতসভা ভেঙে যাচ্ছে;
তমসায় ফুটে উঠছে ধূসর পুষ্পরাশি
প্রশান্তি অন্ধকারে, প্রশান্তি আসন্ন আলোয়;
খর্বকায় আমার এ-মরদেহের শিয়রে
কে এসে দাঁড়ালেন? কে আপনি, দিন না রাত্রি?

 


আনন্দগান

শ্রীমতী কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়-কে নিবেদিত
.

ধ্বংসের পায়ের তলা আর প্রকাণ্ড সূর্যাস্ত
আমার প্রতীক্ষাটুকু মাটিতে পেতে দিলাম;
বন্ধুর পথ অজানা, বন্ধুর ঘর জানি না
ধ্বংসের পায়ের তলা আর প্রকাণ্ড সূর্যাস্ত
আমাদের আয়ুষ্কাল মাটিতে পেতে দিলাম;
হলো না সত্যদর্শন, ভেঙে গেছে হোলিখেলা
ধ্বংসের পায়ের তলা আর প্রকাণ্ড সূর্যাস্ত
আমাদের প্রেমকথা মাটিতে পেতে দিলাম।

 


মীরা দাসী
.

পাথরের জমির উপর সব প’ড়ে থাক
একজোড়া ঘুঙুর, সামান্য এই কবিজন্ম,
আমার প্রেম, স্বামি, অর্গল খুলে মধ্যাহ্নের
আকাশপথে মিশেছে, সুর হয়ে ঘিরে আছে
তোমার ওই ঘন নীল, উদাসীন বিগ্রহ।


বিসমিল্লা
.

এমন সুখের অনুভব এমন যে ব্যথা
এমন অশ্রুর বনে নেমে-আসা দৈব আলো
অমল সে দুঃখরাতে তুমি আত্মহারা মেঘ
এমন যে মরণকালের তরণী, রসুল।

 


স্বর্ণগরুড়চূড়া  থেকে
[প্রথমপ্রকাশ ১৪২০ / ২০১৩]

বস্ত্র
.

একটি সুতো আলোর, অন্যটি ছায়ার
একটি সুতো শরীর ছিঁড়ে টেনে আনা,
অন্য সুতো ধুলোর গরবে গরবিনী।
আমি বলি নি কিছু, বলছেন কবীর
যে-সুতোটি চিতার চেয়েও কালো,
তাকে সাজাও, সাজো চিরফাগুনের আভায়।

 


কদম্ববন
.

প্রলয়ের বোঝা পিঠে নিয়ে আমি যখন হেঁটে আসছিলাম
তখন রাত নেমেছে গভীর, আমার কপালে বিদ্যুতলতা
বুকে কৃষ্ণমেঘের অশান্ত মালা। পথের আলোকস্তম্ভগুলি
সভয়ে পিছিয়ে যেতে চাইছে, বেশ বুঝতে পারছি, তথাপি
আমি নিরুপায়, প্রবোধ দেবার আর কোনও অবসর নেই
কারণ আমার পিঠে প্রলয়ের বোঝা। যার হাসির ভিতরে
বজ্রনির্ঘোষ, এই অকালে তাকে কেই-বা বিশ্বাস করবেন।

কদম্ববন পার হবার সময় অনুভব করলাম যে
আশ্রমকন্যারা ঘন তমসা থেকে একে-একে বেরিয়ে এসে
হাঁটুজলে আমার জন্য দাঁড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘ প্রতীক্ষায়।
আমার রূপে মুগ্ধ কদম্ববন, বারবার ঝলসে উঠছে
তাণ্ডবনৃত্য, আহা মরণের সুগন্ধ, আহা আশ্রমকন্যারা
এত এত কবিতার বাতাস আমি যে আর সইতে পারি না।

 


৺কালী দাশগুপ্ত
.

আমার বাবার মতো আপনি হাতওয়ালা গেঞ্জি পরতেন।
আজকাল, আপনাকে মনে পড়ে খুব
কিন্তু কী নামে আপনাকে সম্বোধন করতাম, তা
আর মনে পড়ে না, যেমন মনে পড়ে না আপনার মৃত্যুদিবস,
লোকে বলে আপনি প্রয়াত, দীর্ঘদিন। হবেও-বা।
সুতীব্র ভর্ৎসনাগুচ্ছ আপনার, পবিত্র ওই ক্রোধ,বুক-ফাটা হতাশা
আমার উপর যখন বর্ষিত হতো
তখন আমি শুনেছি সব, দেখতে পাই নি কিছু
এখনও শুনতে পাই, এবং আশ্চর্যের কথা, কিছু-কিছু দেখতেও পাই।
দেখতে পাই ওগো পাতা কুড়ানী, গান কুড়ানী, ভাষা কুড়ানী,
সুখ কুড়ানী, দুখ কুড়ানী, কাদা-পায়ের পাগল।

দুগ্‌গা পুজোর সকালে ছেলের দল লরীতে প্রতিমা চাপিয়ে
আকাশ-বাতাস মুখরিত ক’রে জয় ঢাক বাজাতে-বাজাতে যাচ্ছে,
আপনি দোতলার জানালায় এসে দাঁড়ালেন, পিছনে আমি,
ম্লান হাসলেন, আঙুল দিয়ে আমায় সেই ছেলেটিকে দেখালেন
যে দেবীর সমস্ত নিষ্ফল অস্ত্রশস্ত্র বয়ে নিয়ে যাচ্ছে,
ক্রমে ঢাকের শব্দ দূরে মিলিয়ে গেল, আমরাও জানালা থেকে সরে এলাম।
ওগো পাতা কুড়ানী, গান কুড়ানী, ভাষা কুড়ানী পাগল,
আজকাল, পাতলা টিনের পত্‌-পতে খড়্গ দিয়ে কবিতা লেখার কথা ভাবি।

 


হোলিখেলা
.

বসুধাকে বলো, আমি পুনরায় উঠে দাঁড়িয়েছি
দুই হাতে ফাগ, আলো কম্পমান, বসুধাকে বলো
আমার সাদা সিঁথির ’পরে নেমে এল প্রেম,বজ্র,
লঙ্গরখানার মতো সদাচঞ্চল নয়নে আমি
তোমার পথ চেয়ে থাকি সতত, বসুধাকে বলো
সব কথা ব্যথার, তার মাঝে জ্বলছে ভূমণ্ডল।

12948353_1121047481273705_454778288_o


নেতাজী কেবিন
.

গৌরবগাথা, এত ক্ষত, এত ক্ষতির দাগ
অঙ্গে শোভা পায়, সেই উপকূল থেকে আমি
এক আঁজলা রণভূমি তুলে এনেছিলাম
তোমায় খুঁড়ে তুলে এনেছিলাম, দাবানল;
দিবাস্বপ্নের বাঁশবনে, শীতলতম দিনে,
আমার শান্ত ঘুমঘোর চাদর মুড়ি দিয়ে
প্রেতের মতো কুয়াশায় এসে দাঁড়িয়ে আছে
অস্পষ্ট, অভুক্ত তোমার আমার পথশোক।
স্থান নেই গৌরবগাথায়, স্থান পেলাম না
পতিগৃহে, বুক-ফাটা বালুকারাশির মতো
ছড়িয়ে পড়েছি ফল্গুনদীর শয়নকক্ষে,
গর্ভদেশ থেকে বাতাসের ন্যায় জেগে উঠে
হতে পারি নি পরম, বায়ু; হাওয়ার অলিন্দ
থেকে ঝুঁকে প’ড়ে মেলতে পারি নি দুই ডানা,
আমার ভিতরের ঘরে আগুন বাড়ছে, হে।

 


বইয়ের ধুলো ঝাড়ার সময় লেখা
.

দুখের বাঁশিটি যেন অবিরাম বেজে চলে
কিছু শুনি, কিছু নাই শুনি, দুখের বাঁশিটি,
রক্ষা পেল জীবন, জীবন কি রক্ষা পাবে না
বারেবার ঘোর প্রশ্ন ঘুরে-ঘুরে উঠে আসে
শুনি এবং শুনি নাই দুখের বাঁশির বোল।

অখণ্ড একটি শোকদিবসের কিনারায়
গলায় শ্রীখোল প’রে দাঁড়িয়েছিলাম ব’লে
কেউ-কেউ তীব্র হেসে উঠেছিল, আমি জানি।
আমি জানি, ধুলোর মতন প’ড়ে থাকা যায়
কিন্তু ধুলো হয়ে-ওঠা ততটা সহজ নয়।

নীরব দৈত্যকুলের হে অবশেষ, প্রণাম!

 


‘শ্রীরাধারক্রমবিকাশ’
.

জননীজঠরে শয়নের মতো পুরনো কথায় ফিরে আসি
একদা আমি ভেবে বসেছিলাম প্রেমার্তি ও প্রদীপশিখায়
সম্পর্ক নেই কোনও, ভুলের ভীষণ রক্তে ভেসে-ভেসে এসেছি,
এইখানে এসে দেখি শ্রীরাধিকা পতঙ্গের রূপ ধরেছেন।
অন্ধকার, আপনি কি সম্মুখে এসে দাঁড়াবার জন্য প্রস্তুত?
আপনার আচরণে কোপিত আমি, হতে পারি সামান্য জীব
হাড় আর পাঁজরা বের-করা আলোর প্রদেশের অধিবাসী,
তবু জানাই, আমি শ্রীরাধার নুন খাই, আর ঘুরে বেড়াই
রোদে-পোড়া, পক্ষীবিষ্ঠা ছড়ানো সন্ধ্যাকালের ঠাকুরদালানে,
এভাবেই, ভিক্ষাগ্রহণ, ইহজন্ম দু’পাশ দিয়ে বয়ে যায়।
সুমধুর বাতাস বইছে এখন, স্পষ্ট অনুভব করছি
ক্রোধানল স্তিমিত, চন্দ্রালোকের কথা ভাবতে ভালো লাগছে,
ইচ্ছে করছে, এই কল্পলোকে, কলঙ্কভোগের বিছানা পেতে
শিয়রের কাছে এক ঘটি শীতল জল রেখে, ঘুমিয়ে পড়ি।

 


কলতলার জন্য একটি
.

বসন্তবালারা ফিরে চলেছে, তখনও আমি
নিষ্ঠাভরে ব’সে রয়েছি ঠান্ডা কলতলায়
ঘষে-ঘষে মনের সমস্ত রঙ তুলে ফেলছি;
কেউ নেই পাশে, কেবলমাত্র গানের কলি,
একটি গানের কলি দিয়ে মনের সমস্ত
রঙ, বারুদ ঘষে-ঘষে চিরতরে তুলে ফেলি।
বসন্তবেলা, আমি জানি, আমি সব জেনেছি,
তোমার অতুল গৌরবব্যথা, তোমার দান
ক্ষুরধার রুধির-ঝরা ভীষণতা তোমার,
বসন্তবেলা, আমার রক্ত জল হয়ে যাচ্ছে।

 


কবিতাসংগ্রহ  থেকে অগ্রন্থিত কবিতা
[প্রথম প্রকাশ ১৪২১ / ২০১৫]


 

বসন্তদিন আসবার আগে লেখা
.

আত্মবিস্মৃত হয়ে বৃক্ষশাখার পানে দীর্ঘক্ষণ চেয়ে থাকি
বসন্তদিন আসে না,
আত্মবিস্মৃত হয়ে ভাবি, এখন নিভৃতির খুব প্রয়োজন।
এত অস্থিরতা কিসের, বৃক্ষশাখাকে বলি, এবার ঘুমিয়ে পড়ো
এই বলে, মির্জা আসাদুল্লার দু’টি পদ মনে জড়িয়ে নিয়ে চোখ বুজলাম।
অনুভব করলাম অন্ধকার, কে যেন অবিরাম ডানা ঝাপটাচ্ছে,
কেঁদে বললাম, নন্দদুলাল, কেন এমন হলো
একে তো নররক্ত আর কাদা, হাহাকারের মধ্যে
ল্যাংটো পাগলের মতো নিরুদ্বেগে ঘুরি,
তার উপরে শূন্য এই বৃক্ষশাখা, প্রাণ আর কত সইবে?
আত্মবিস্মৃত হয়ে বৃক্ষশাখার নিচে প’ড়ে রইলাম।
ও দখিন হাওয়া, ও পলাশবন, হায় মালতীলতা

 


রিসালা
.

যখন সে-রাতগুলি তোমার জানালার সমুখ দিয়ে
বয়ে গিয়েছিল, যখন এতসব অঘটন কিছুই ঘটে নি,
আনন্দে, আমি পাথরকুচির মতো সরব হয়ে উঠতে চেয়েছিলাম।
গান থেমে গেছে, বাইরে এসে দাঁড়িয়েছি, দেখছি
রাগিণী ও অামির খুসরউ কয়েকটি কথা সেরে নিচ্ছেন;
মন বললে, তুমি সামান্য মানবসন্তান, পা বাড়িও না ওদিকে,
কিন্তু জেনো, ওঁরাও দুঃখ-দুর্দশার সুর বিনিময় করেন।
গান থেমে গেছে বাইরে এসে দাঁড়িয়েছি, এবার
কোন রচনাশৈলীর সঙ্গে দেখা হতে পারে, ভাবি,
থেমে-যাওয়া গান, বাকরুদ্ধ বসন্তপ্রহর, ওই শোনো করুণাধারা
শীতলাতলা পার হয়ে, মোহনবাঁশি এগিয়ে আসছে
পুরু কাচের শার্শির পিছনে আমি যেন একা দাঁড়িয়ে, অবিরাম
হস্তপদ চালনা ক’রে, কত না ইঙ্গিতে, কাতর নৃত্যভঙ্গিমায়
জানাতে চাই, আজ কেমন ক’রে গাইছে আকাশ।

 


পাটনা-র মতিচন্দ্‌
.

নরকদর্শনপর্ব চলছে, আমার চটির একটা ফিতে ছিঁড়ে গেল,
খালি পায়ে হাঁটবার কোনওরকম অসুবিধা হবার কথা নয়, তবু
প্যাড-পরা বল্লেবাজের মতো হাঁটু মুড়ে ব’সে পড়লাম, বিরতি চাই।
বিরতি চাই, বিরতি চাই, আমার দু’চোখের অনড় দাবী যমদূত
লক্ষ করলেন, ভ্রূযুগল কুঞ্চিত ক’রে জানালেন মেয়াদ বৃদ্ধি হবে,
আমি কি প্রস্তুত? এইভাবে মূক আবেদন, মূক অনুমোদনের ফাঁকে
বিরতির পুষ্প ফুটে উঠল, মধুক্ষরা বাতাস বইছে, আমরা শান্ত।
আকাশপাতাল ভাবলাম, আকাশের কথা কম, পাতালের কথা বেশি,
যমদূত গান ধরলেন মৃদু সুরে, আঈলন হো রামজী অয়োধ্যা মেঁ
পাটনা-র মোতিচন্দের জন্য প্রাণখানা একেবারে হু হু ক’রে উঠল,
মাটি থরথর কেঁপে উঠছে, দৈত্যের মুণ্ডুর আকারের পাথর সব
ধুপধাপ শব্দে পুনরায় পড়তে শুরু করল চারদিকে, রক্ষা নেই
বুঝলাম, আর রক্ষা নেই আগুনের হল্কা থেকে। গান গাও যমদূত,
অসংখ্য হাত, দেহ, সরীসৃপের মতো পায়ের কাছে কিলবিল করছে,
দু’টো হাত এগিয়ে এসে আমার দু’পা মুছিয়ে দিয়ে চটি পরিয়ে দিল।
এতক্ষণে বোধোদয় হলো, উচ্চস্বরে গান গাইবার সময় এসেছে
গানের কলির পানে তাকালাম, যেভাবে সর্বপ্রথম নরকের সঙ্গে
দেখা হয়েছিল কুয়োতলায়, ফিরে এসেছে হাড় হিম-করা প্রতিধ্বনি,
উঠুন, উঠুন তবে ক্লান্ত দেবদূত, আঈলন হো রামজী অয়োধ্যা মেঁ।

 


আখতারী বাঈ
.

শেষ বাক্যে পৌঁছবার আগেই আপনি কণ্ঠস্বর থামিয়ে দিলেন,
আপনি জানেন, পশ্চাতে কেউ আছেন রুদ্ধ সুর কুড়িয়ে নেবার;
আর তখন, সুন্দর, ত্রিভুবনে অতুল হাহারব ছড়িয়ে পড়ে।
যা-কিছু বলতে পারি নি, তা যেন কত শত রূপে ব’লে রাখলাম
যা-কিছু ব’লে রেখেছি, আশা জাগে, রাতের প্যাঁচারা দ্রুত নেমে এসে
সেইসব অতিতুচ্ছ তপ্তদেহ উদ্ধার ক’রে নিয়ে যাবে পবনে।
যা-কিছু হারালো সমাপ্তির আগেই, তা যেন জন্মায়, মরে, জন্মায়
যা-কিছু লাভ করেছি, তা যেন হারাতে পারি।

গৌতম বসু

গৌতম বসু

জন্ম ১৩ মে, ১৯৫৫ / ২৯ বৈশাখ ১৩৬২, দার্জিলিং, পশ্চিমবঙ্গ।

প্রকাশিত বই :
১. অন্নপূর্ণা ও শুভকাল [১৩৮৮/১৯৮১, লেখক কর্তৃক প্রকাশিত]
২. অতিশয় তৃণাঙ্কুর পথে [১৩৯৮/১৯৯১, মহঃ রফিক, ‘বাক্‌চর্চা’, বর্ধমান]
৩. রসাতল [১৪০৮/২০০১, ইন্দ্রাণী অনির্বাণ, ‘অনুবর্তন’, কলকাতা]
৪. নয়নপথগামী [১৪১৪/২০০৭, গৌতম মণ্ডল, ‘আদম’, কৃষ্ণনগর, নদীয়া]
৫. কবিতা সমগ্র [১৪১৪/২০০৮, সুবীর মণ্ডল, ‘কবীর’, কলকাতা]
৬. স্বর্ণগরুড়চূড়া [১৪২০/২০১৩, স্বাতী রায়চৌধুরী, ‘সপ্তর্ষি প্রকাশন’, কলকাতা]
৭. কবিতাসংগ্রহ [১৪২১/২০১৫, গৌতম মণ্ডল, ‘আদম’, কৃষ্ণনগর, নদীয়া]

গ্রন্থ-সম্পাদনা :
১. শ্রেষ্ঠ কবিতা দেবদাস আচার্য [২০০৮, গৌতম মণ্ডল, ‘আদম’, কৃষ্ণনগর, নদীয়া]
২. সঞ্জয় ভট্টাচার্যের কবিতা (যৌথ সম্পাদনা, ভূমেন্দ্র গুহ-এর সঙ্গে) [২০১৩, অণিমা বিশ্বাস,‘গাঙচিল’, কলকাতা]

পুরস্কার (কবির অনিচ্ছাসত্ত্বেও এ তথ্য সন্নিবেশিত হলো) :
১. বীরেন্দ্র পুরস্কার ২০০৩—'রসাতল'-এর জন্য (এটি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় স্মরণ কমিটি কর্তৃক প্রদত্ত একটি বার্ষিক পুরস্কার)
২. রবীন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার ২০১৫—'স্বর্ণগরুড়চূড়া'-এর জন্য (পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত বার্ষিক পুরস্কার)

ই-মেইল : 96gautam@gmail.com
গৌতম বসু