হোম কবিতা তীব্র ৩০ : কুমার চক্রবর্তীর বাছাই কবিতা

তীব্র ৩০ : কুমার চক্রবর্তীর বাছাই কবিতা

তীব্র ৩০ : কুমার চক্রবর্তীর বাছাই কবিতা
1.13K
0

কুমার চক্রবর্তী বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। দার্শনিক প্রমা তাঁর কবিতায় অনেকটা নিঃশব্দ স্বরলিপির মতো ফুটে থাকে। এ যাবৎ তাঁর প্রকাশিত কবিতার বই ৬টি।

কবির ৫২-তম জন্মদিনে পরস্পরের পক্ষ থেকে আন্তরিক শুভেচ্ছা…


স্যানাটোরিয়াম


যে অশ্রুবিন্দুগুলো ঝরে, তার যোগফলগুলোকে একত্র করে আমি রেখা বানাতে চাই। রেখা বানাতে চাই, আর তারপর রেখাকে তোমার পোর্ট্রটে আঁকতে চাই। রেখার শরীর থাকে না, থাকে শুধু উপস্থিতি ও সময়। সময় দিয়েই আমি যাপনের মুগ্ধ অবাস্তবতাকে আঁকতে চাই। তারপরই ঠিক স্যানাটোরিয়ামে চলে যাব।

দেখতে দেখতে জীবন কেমন হয়ে গেল! যখন ছিলাম উত্তরায়ণে, তখন মৃত্যু এসে রং ছাপিয়ে দিত সমস্ত শরীরে—গোপনে। যখন আছি দক্ষিণায়নে তখনও সে নরম সবুজ স্পঞ্জ দিয়ে লেপে যাওয়া রংগুলোকে মুছে নিতে শুরু করল। এই ছাপাছাপি আর মোছামুছির মধ্যে আমি আছি দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিতে—অন্তর্ঘাতময় ও ভাবলেশহীন। অর্ধনারীশ্বর হয়ে জেগে জেগে রাত কাটাই আর স্যানাটোরিয়ামে যাওয়ার প্রস্তুতিস্বরূপ ব্যক্তিগত লিরিক লিখে রেখে যাই সীমাহীন পথরেখায়।

স্যানাটোরিয়ামে সুখ আছে। যে-মানুষেরা জগৎছাড়া, যে-মানুষেরা প্রতিবন্ধীদের মতো জীবনকে পর পর ভাবে, তারা এখানে শেকড় খুঁজে পায়। তারা আকুলিবিকুলি করে। স্যানাটোরিয়াম—যেখানে আলোরা আলেয়া হয়ে ওঠে, যেখানে হিমাঙ্ক ও স্ফুটনাঙ্ক মিলে তৈরি হয় জীবনের অন্য এক উপস্থাপনা। উপস্থাপনা, কেননা একদিন আকাশে সব তারা এক হয়ে যায়, আর  মিলেমিশে আগুনের নির্জনতা তৈরি হয়ে যায়।

সব স্যানাটোরিয়ামগুলোই দাভোসের অভিব্যক্তিময় জাদুপাহাড়ে। যখন বিস্তারিত আকাশ অদৃশ্যভাবে পৃথিবীতে শেকড় ছড়ায়, যখন অনুষঙ্গপ্রধান পাহাড়গুলো খুব মৃদুভাবে ওড়াউড়ি শুরু করে—তখন সরলতাগুলো ফরফর করে আমার চারপাশে শব্দ করতে থাকে। আমি জাদুবাস্তবতাগ্রস্ত হয়ে পড়ি। এবং মনোভাবনার সন্ধিগুলোকে ব্যাপ্তার্থে সাদামাটা করে রাখতে সচেষ্ট হই আরবার।

বৃক্ষরা একদিন মানুষ ছিল, মানুষেরা একদিন বৃক্ষ ছিল—এ জাতীয় উৎকেন্দ্রিক ভাবনায় স্যানাটোরিয়ামে এক বছর শুয়ে থাকব আর অধিকতর মনোযোগ দিয়ে আঁকব সময়ের ত্রিমাত্রিক ডানার কাঁপন। কমপ্লিমেন্টারি রং দিয়ে আরও আঁকতে পারি অজানা হৃদয়ের ছবি, যেখানে ধরা দেবে রহস্য চিরন্তন। এভাবেই নির্জনতা ও নৈঃশব্দ্যের পরিসর বেড়ে যায়। এইভাবে রক্তের ক্লোরোফিলগুলো হলুদ হয় অতঃপর। জানালা খুলে দেখি, বাতাসের ফিসফিসানি। যে নির্জন হলুদ পাহাড়ে কেটেছে ঈশ্বরের শৈশব, তার দৃশ্যাবয়বও দেখি। প্রতিধ্বনিরা আসছে দিগন্তের প্রতীকগুলোকে নিয়ে। এ বছর অসুখ থেকে আরোগ্যলাভ করব। বুক-পকেটে পুরব উড়ন্ত প্রতীক, সাদা প্রজাপতিরা বসবে চুলগুলোর ডগায়। তারপর খালি পায়ে হেঁটে বেড়াব পুরো একটি দিন। সকালে পাতাগুলো ঝরে পড়বে শরীরে,  বিকেলে নিট্‌শে আর বিনয় মজুমদারের দুটো বিশাল পোর্ট্রেট নিয়ে ফিরে আসব আবার তোমাদের স্তন্যপায়ী জীবনে! আর টাঙিয়ে দেবো বৃক্ষদের হ্যাঙারে। এ-ই আমার গাছপাথর মনোবাসনা।

কখনো কখনো হলুদ বনের ভেতর আমি এক সাদা কাঠের গুঁড়ি। কুঠারের ধ্বনিগুলো আমাকে শাসন করে দীর্ঘকাল। অদ্ভুত নির্জনতার ভেতরে আমি পড়ে থাকি, গায়ে জমে আছে মন্ত্রকুশল শ্যাওলা। যখন রাত বাড়ে, আমি গড়াই, শ্যাওলারা চিৎকার করে ওঠে ব্যথায়। আমি গড়িয়ে পাথরের চাঁইয়ের ওপর পড়ি আর রক্তাক্ত হই। এইভাবে মনোজগতের রহস্য বেড়ে গেল। ব্যথারা পাহাড় হলো। এইভাবে জীবনের গভীরতর কৃষ্ণগহ্বরেরও জন্ম হলো।

জন্মের ভেতর বেঁচে থাকা মানে ঠাসাঠাসি করে থাকা—ছায়ার পিঠে ছায়া, জীবনের সাথে লেপ্টে থাকা জীবন। এভাবে গ্রীষ্ম চলে যায়, এভাবে শীত এসে যায়, আর রক্তগাছের ছায়ায় জমে ওঠে ধ্রুপদি বিষণ্নতা। পাখিরা বড় হলে বাসা ছাড়ে কিন্তু বৃক্ষ ছাড়ে না। ব্যাধিরাও দেহ ছাড়ে কিন্তু জীবন ছাড়ে না। এভাবেই জন্মসূত্র, এভাবেই ব্যক্তিবৃত্তগুলো ভেঙে টারানটেলা। ব্যথাদের রং থাকে, ব্যথাদের দিশেহারাবোধ থাকে। এই-যা। আমার মন উত্তর-আকাশে টিমটিমে নক্ষত্রের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে।

স্যানাটোরিয়ামে এক মুঠো ঘুমের বড়ি আমি খাব এবার। তারপর মোমের পাখা নিয়ে উড়ব ঘুমেদের দেশে। উড়ব আর উড়ব, আর ধ্বনিবিপর্যয় রোধ করে বৃক্ষ আর পাখিগণের সাথে আলাপ চালিয়ে যাব মৃত্যুপর্যন্ত, জন্মপর্যন্ত।

 


লিথোগ্রাফ


ব্যাধিগ্রস্ত হলে একজন তোমার প্রকৃত বন্ধু হয়ে ওঠে, তোমার ফুসফুস ভরে যায় অমল শুদ্ধতায় আর নিজের সময় ভেঙে ভেঙে সে শোধন করে আধিব্যাধিময় শারীরভূমি।

জ্ঞানভারে যখন তুমি চিন্তাগ্রস্ত আর মনোভারে স্কিট্‌সোফ্রেনিক, তখন এভাবেই এসে দাঁড়াবে, দেখবে—বিস্তারিত মহিমা রচনা করবে চিন্তা ও অচিন্তার সমাধিলব্ধি। তুমি সুস্থ হতে থাকবে যেভাবে পাখিরা নিমিষ নীলিমার দিকে তাকিয়ে গৌরবান্বিত করে নিজ আত্মার সকাল।

বৃক্ষদের নামগুলো এক—তারা সবাই সবুজ। তুমিও নিজেকে ভাবো এক ভ্রাম্যমাণ বৃক্ষ, যার শিকড় প্রোথিত আকাশের অনন্তে—গভীরতার বিচিত্র বিন্যাসে। ভাবনা থেকে মুক্ত হও তুমি। প্রস্থানের পথ চেয়ে হাহাকার করো না, কেননা তোমার প্রয়োজন দ্রাঘিমা ও উচ্চতার।

চোখ দিয়ে যা কিছু দেখেছ তা দৃষ্টিগত, ত্বক দিয়ে যা কিছুই ছুঁয়েছ তা স্পর্শগত। চিন্তা ও অনুশীলনের মাঝখানে যা ছিল—সব ধ্বনিগত সমগ্রতাবোধ; দীর্ঘশ্বাস ও অশ্রুর মাঝখানে যা ছিল সবই হারাকিরি বিস্ময়বোধ। যেখানে মানবিক কেন্দ্রের মুখে তুমি, সেখানেই অবসাদ ও সমর্পণের অনুসন্ধিৎসায় ভরপুর হয়ে ওঠে জীবন সরল ফুলপাখির রীতিমুগ্ধতায়।

সুস্থ হও তুমি, সুস্থ হও। যখন বাহুল্যে ভরে ওঠে ফুলের মন, যখন অভিজাত বেদনারা খুঁজে পায় দর্পণের নীরবতা, ঠিক তখনই তুমি সুস্থ হয়ে ওঠো। কেননা সমর্পিত জীবনে তুমি রচনা করেছ এই লিথোগ্রাফ, মেঘশরীরের মতো যা অস্পষ্ট অথচ অনিবার্য।

তোমার তো রয়েছে সেই মন ও মুহূর্ত যাকে নিয়ে তুমি সকল জীবিত ও মৃতদের রহস্যকে ভেদ করতে পার দীর্ঘ সীমারেখায়।

 


সূত্র


ও জীবন, পরাজিত হয়ে আছি দীর্ঘকাল, দীর্ঘ
অবসরে; সেই কবে গোপন হেমন্ত এসে দিয়ে গেল
একরাশ বিষণ্নতা, ঘোচাতে পারি নি আমি অবলুপ্ত
কুয়াশার কাল—পরাভূত ঋতুবিপর্যয়ে।

সকালবেলার ভেজা রোদ সময়কে করেছে মোহনিয়া
আমিও ছিলাম তার সন্নিকটে সাদা প্রজাপ্রতিটির মতো—
সহৃদয়-হৃদয়-সংবাদী; অপেক্ষা করেছি দীর্ঘকাল,
ফ্রুয়েলিঙে আনন্দে মেতেছি, আত্মভারে
ক্লান্তও হয়েছি বারবার।

সব বেদনার চেয়ে বড় ছিল জড়বাদী ছায়া,
সমস্ত দিনের চেয়ে দীর্ঘ ছিল কালপুরুষের
রহস্যাশ্রিত আপ্ত কায়া। মানুষের ভিড়ে অন্তর্গত
যারাই হয়েছে—তাদের জীবনে ঘটে অক্ষাংশের
শৃঙ্খল স্বাক্ষর!

ভ্রমাত্মক মোহনীয়তায় তাড়িত হয়েছি আমি, মেতেছিও
অতিদ্রুত, আবর্তনশীল চিন্তাঘোরে। বিভ্রম এবং
অমূলপ্রত্যক্ষণে ক্লান্তিহীন রচনা করেছি সৌর-অকারণ,
মনো-ম্যানিয়াক আমি আলোকিত অন্ধকারে
দেখেছি স্বপ্নের ভোজবাজি; অভীপ্সার চোরাটানে
উন্মোচিত অর্থহীনতায় রয়েছি দৃশ্যের বাইরে
অন্তর্গত জগতের প্রযোজিত গোলকধাঁধায়।
উদ্বেগ ও অতৃপ্তি ছিল সুনির্দিষ্ট, জীবনকে ভেবেছি
মৃত্যু, মৃত্যুকে জীবন; নান্দনিক হতাশায় বিমুগ্ধ থেকেছি
পরিশুদ্ধ আনন্দের মাঝে,—তবুও এসেছে ক্লান্তি ক্লান্তি
হতাশার হাত ধরে ধরে। ব্যাখ্যা নেই কোনোকিছু, শুধু
দূরাগত অনুভূতি আছে বৈচিত্র্যের নানামুখিতায়,
নির্জনতা সম্ভাষণ পেয়ে সাড়া দিয়েছিল—ঢুকেছিল
বুদ্ধের মতন আমাদের স্নায়ুপ্রসারণে, স্মৃতির ছায়ায়।

অনির্ণীত এই রোগ—কারণহীন পরিণতি টানে,
দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবন অভ্যন্তরে একাকার হলে
বস্তুসমাহিত এই উৎকেন্দ্রিক অবিন্যস্ততায়
এঁকে গেছি—স্টিললাইফ, জেনে গেছি আত্মা মরে
শরীরের আগে;—জীবন তো সেই কবে হেরে গেছে
জড়দেহসমর্পিত বস্তু-অভিভাবে, আর দেহ
সময়ে বিলীন, ইশারা এসেছে মস্তিষ্কে ও মেধায়—
দূর সুনীলতা থেকে, যেখানে বস্তুত ভেঙে গেছে
আকাশ—ভেঙেছে নিস্তব্ধ হৃদয়ের সব রেখা। আমি খুব
অবচেতনের ঘোরে খুঁজেছি ভাঙা আকশের নীরবতা—
খণ্ড খণ্ড পড়ে থাকা আয়ুহীন অবয়বহীন—নীলের নৃতত্ত্ব।

নিজেকে অদৃশ্য করতে কে না চায়? দৃশ্যমানতার থাকে
সারাদিন—একান্ত জ্যামিতি। ভাসমান ক্লান্তিভারে লুপ্ত
এ দেহবোধ, চৈতন্যকে বলেছি—পরিব্যাপ্ত হও
দৃশ্যান্তরালে; মস্তিষ্কের করোটির গভীর গভীরে
দুর্বোধ্য সংকেতবার্তা,—অর্থোদ্ধারে হয়েছি বারিত,
বোঝে না কথনবিশ্ব, বোঝে শুধু পরাবাস্তবতা—
নৈঃশব্দ্যের আত্মপরিসর। এভাবেই অধিজগতের কাছে
উৎসপাঠ নিয়েছে তুমুল, অনেকার্থ বেদনা নিহিত ছিল
আরও ছিল অজানা এলাকা, চেতনশৃঙ্খলে ছিল
নির্জ্ঞানতা, গাণিতিক ঐক্যগুলো ভেঙে গেছে তার
মাধ্যাকর্ষণে, ফলে আমি প্রতীকের নিশ্চেতনা নিয়ে
যত্রতত্র ছোটাছুটি করি, চিন্তাক্রিয়া স্বতঃসিদ্ধ করে
বুঝেছি সমগ্রের অবসাদ, সত্যভ্রম নয় শুধু , প্রতিভাস
আমাকে করেছে সম্মোহিত। প্রয়োজন ছিল না তো জীবনের
যেমন অপ্রয়োজনীয় মৃত্যুও;—এই দুই বহির্ভূত আগাছায়
ভরেছে এ দেহকাল।

এভাবেই চলে যাই, দর্পণে বিধৃত প্রতিচ্ছবি করে না তো
হাহাকার, নার্সিসাস দিয়েছিল এই রং—এ বোধের
ছদ্মবাস্তবতা। পিলসুজের আগুনে পুড়ছে যে অন্ধকার
টের পাই তার পোড়া গন্ধ, কেননা দৃশ্যবাস্তবতা থেকে
মুক্ত হব আমি—হাইকুকে সাথে নিয়ে
হারাকিরি রাতে। আকস্মিক ভিন্নতায়
আমি যে বিলীন—দেখেছি প্রত্যহ
চলমান মুহূর্তের অবাস্তব ছায়া—
স্মরণ আর সন্ধ্যার ছায়ালোকে
চলে গেছে

চলে
    গেছে
        দূরে

 


ঈশ্বর



একটি ঘুড়ি আমি বানাব হলুদ কাগজের
যে জানবে অদৃশ্য হতে
হাওয়াই ঘুড়িটি আমি ওড়াব এই হেমন্ত-সন্ধ্যায়
লাটাই থাকবে আমার হাতে
সুতা যাবে যতদূর সে চায়

তারপর যখন উড়তে উড়তে ওপরে উঠে
হবে অদৃশ্য, চক্ষু-অগোচর
তুমি তখন তার গায়ে দস্তখত করে দিয়ো মহান ঈশ্বর


ব্ল্যাকহোলগুলো পিঠে নিয়ে আমি হাঁটি
সময়ের সারাটি বিকেল
যেখানে জীবন ছিল সেইসব দিন এসে
রাত্রির ভেতরে চলে যায়
লাল ডাকবাক্সের পেটে আঁধার চাপানো স্থানে
চিঠি থাকে মহাশূন্যতায়

কেউ কখনো পড়বে না জানি তবু
ভারী হয়ে থাকে বেদনার ছলে
আপনার সূত্র ও সমাধানে

প্রতিস্তব্ধতায়

 


আমি কোথাও নেই


প্রতিটি মুহূর্তের মাঝে আমি আছি কালপুরুষ
এমনকি জন্মমৃত্যুর দুটি দাঁড়ির মাঝেও একাকী মেরুজ্যোতি, যখন ভাবনার পরিপন্থি হয়ে
হেঁটে যাই বেশ্যাপাড়ার নিস্তব্ধ কোলাহলের অবকাশে, তখনও…

ফুটিফাটা রৌদ্রের ভেতর, ছায়াবিছানো কোনো বৃক্ষের ভেতর,
প্রতারণার কোনো অন্ধকার মৌচাকের ভেতর, অথবা ধরো অরণ্যের বৈঠকখানায়
জড়ো হওয়া যাবতীয় স্টিললাইফ রহস্যের ভেতর
জমানো জীবনগুলোকে যখন পেরিয়ে যাই তখন প্রশ্ন আসে—
ফুল না শেকড়, কে অধিক গুরুত্বপূর্ণ!

ভাবি নি বস্তুর অবস্থান ও গুরুত্ব, যা কিছু
পূর্বনির্ধারিত তার প্রায়ান্ধকার থেকে অভিযানে বের হয়ে আসা
আত্মচেতনা আমাকে ক্লান্ত করে, কেননা
জীবনের পাশ দিয়ে যারা হেঁটে যায় তাদের পদচিহ্ন
ভারী হয়ে সেঁটে আছে প্রশ্নতোলা মনের অন্তরালে।

বেঁকে যাওয়া দুপুর, ছায়াবৃত্তগুলো অধিক গোল হয়ে ওঠে
আর দেহের ভেতর বন্দি ছায়াশরীর ক্রমাগত নিশ্বাস ছাড়ে,
নিগূঢ় ছদ্মবেশে বরফমাছের মতো
এখন ভালো লাগে না মরশুমি পাখিদের রংবাজি।
আমি হব না কবি কেননা চিলেকোঠায় থাকতে পারি নি আমি,
ছন্দের ভেতর গাঁথতে পারি নি শব্দ ভাঙার গান।

দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে এখন পা থেকে শিকড় ছড়াচ্ছে, হে ভূমি
শুয়ে থাকতে থাকতে এখন পিঠ থেকে পিরামিড গজাচ্ছে, হে পাথর
রক্তের ভেতর জন্ম নিচ্ছে হলুদ শৈবাল, হে সমুদ্র

তোমরা বলো তোমরা জানো না
কিন্তু আমি জানি আমি আছি, কেননা
আমি যে কোথাও নেই !

 


রহস্য


প্রতিটি মানুষের কিছু নিস্তব্ধ রহস্য থাকে
নিদ্রাঘোরে রহস্যরা তাকে ঘিরে বৃত্ত রচনা করে।

দ্যাখো, জানাশোনার বাইরে তোমাদের বাগানের মুক্তাঝুরি
আর জীবন থেকে ঝরে পড়া দু-চারটি রহস্যপাতার গান—
করোটিজুড়ে স্তব্ধ ক্ষতচিহ্নের ওপর রেখে যায় আগুনের সংকেত
আর বিচলিত নিদাঘের প্রাণ।
বন্দরের দিকে আদলহীন তুমি অকস্মাৎ বায়ু আক্রমণে
হয়েছিলে জীবনতাড়িত, তোমার বিকেল আর অন্তর্বৃত সকালেরা
খেয়ালের মতো দীর্ঘ হতে থাকে
ভরে ওঠে ডাকাবুকো রেশমখেলায়। এইবেলা

সংগীতহীনের গান, শব্দনিয়ন্ত্রিত এই জলীয় সন্ত্রাস
এইসব জেনেশুনে
ভুল দিকে চলে গেছে সাদা নাবিকের দল
মেসমারিজম, আমরাও পতঙ্গের অনুকূলে সংঘবদ্ধ
জাহাজের গতি দেখে দেখে, বুঝি রহস্য-অতল।

প্রতিটি মানুষের এক চান্দ্ররহস্য থাকে
মৃত্যু হলে রহস্যরা
বিবাগি জাহাজের মতো পোতাশ্রয় ছেড়ে চলে যায়
তোমাকে যাত্রীর মতো একা রেখে
অবেলায়…

 


মেমেন্তো মোউরি


‘মনে রেখো, মৃত্যুই নিয়তি,’ দিয়োনিসুস,
শীতকাল জুড়ে জমা হওয়া মদ শেষ হলে
মনে রেখ, যা তোমাকে ঘিরে রাখে―
তার অর্ধেক বিস্ময় আর বাকিটা নৈঃশব্দ্য।
হাহাকার ফুটেছিল তোমার আয়নায়, লীলা, লাস্য,
চিরবিশ্রামের পথে ক্ষীণ ছিল সমগ্রের ছায়া, ছিল
মারাত্মক বেসুভিয়ুস, আর শৈল্যবিদের গান
তোমার স্মৃতির হাত ধরে―যে চেয়েছে
স্পর্শের সৌন্দর্য, কোনো কিছু বাড়াবাড়ি নয়
তোমাকে তো ঘিরে আছে শুকনো কাঠের ঋজুরেখা।

ঘোড়াগুলো উচ্চৈঃস্বরে করে গেল আত্মপ্রতারণা
কেবল তারাই পারে চিনে নিতে পথের নির্লিপ্তি
চরিতার্থতার কথা তুমি জানো, দিয়োনিসুস,
কেননা তুমিই বলো পুনরুদ্ধারের কথা: অমরত্ব
আর অন্ধবিশ্বাস, মানুষ নিজের কাছে নিজেই অচেনা
আরও সে অচেনা তার সর্বস্বের কাছে
তারা তো জানে না, নিষ্পন্ন বাস্তব আজ এইদিকে
রেখে গেছে বিপর্যস্ত যাপনের সিগনেট,
জেনো দিয়োনিসুস, জীবন অস্পষ্ট এক স্মৃতিশাস্ত্র
রাত শেষ হলে তার নিঃশব্দ করোটি, একা,
অন্তর্মুখে গেয়ে ওঠে হননের গান।

 


কোনো হাঁটাই শেষপর্যন্ত পাখিদের কাছে পৌঁছে না


কোনো হাঁটাই অবশেষে পাখিদের কাছে পৌঁছে না।
হেমন্তের মফস্বলগুলোর কাছে এসে আমি ছিলাম নীরব
ছিলাম ভঙ্গিসর্বস্বও।
ধাঁধা মিশে ছিল আমার চোখে, আমার পথগুলোর বাঁকে,
দিবাবসানের দায়িত্ব হলো রাত্রির চিহ্নগুলোকে যুক্ত করা,
যে পথে আসছি, আসতে হয়, সে পথ ছিল আয়না বিছানো,
আমি দেখি, পাতাগুলো বড় হয়ে উঠছে
বড় হয়ে উঠছে অশ্রুকাতরতাগুলো
কুয়াশার ভারে বিছুটিঝোপের প্রগাঢ়তা আরও বেড়ে যাচ্ছে
বেড়ে যাচ্ছে নিঃসীম ভ্রমণকালের গৌরবগাথা।
জীবন হলো দুর্বোধ্য কিছু নীরবতা, যা
রাত আর দিনের মাঝে থরেবিথরে থাকে পড়ে
বাজতে থাকে সারঙ্গি মিড়ের মতো,
জানি না কোনো ভারসাম্যহীনতা
কোনো অনুরণনের সারিগান
কেননা নৌকাগুলো আজ আবিষ্কার করে
ইচ্ছামতো গন্তব্যের ঢালু জলরেখা যা ধরে সে তলদেশে যায়,
আমার ভঙ্গি আর ভাঙচুর, জমাট বাঁধে অবহেলায়
আর অসংলগ্ন অস্তিত্বের ছায়াটানে,
পালক উড়ছে রক্তের সৌগন্ধ নিয়ে
যখন পাতা খসায় স্মৃতি, যখন জন্মদাগ বিশ্বস্ত হয়ে উঠছে
জাগরণহীনতার উড়ে যাওয়া নৈকট্যে।
অতএব কাছাকাছি থেকে অনুমোদন করো শিহরন
কেননা কম-কথা-বলা-সময় তার ঠাটগুলোকে আজ
অপস্রিয়মাণতা দেয়
কারণ এইসব বাচকতা জানে
কোনো গন্তব্যই শেষপর্যন্ত পাখিদের কাছে পৌঁছে না।

k1


সমস্ত বন্ধুকে বলি


সমস্ত বন্ধুকে বলি, হে,  জাগো,
জেগে থাকো মারাত্মক চিহ্নের ভেতর
থাকো, অনিরুদ্ধে, অববাহিকায়
সমস্ত মৃত্যুর চোখ এইদিকে যায়
ক্বচিৎকথিত।
আমাদের ছিল রং, লাভা ছিল একান্ত সম্মত
বারুদের সুপ্ত অগ্নি
দ্বিধাকণ্টকিত।
তবে তুমি রক্ত দিয়ে শিখা করেছ নির্মাণ
শৃঙ্গার উঠেছে জেগে নড়ে-ওঠে পতঙ্গের প্রাণ
উদ্ভাবনময়।
ঋতুবিপর্যয়ে থাকো, থাকো তুমি স্পর্শরূপ ধরে
ডাহুক একাকী স্বরে হাঁক ছাড়ে, অনুগামী অন্দরে অন্দরে
মেঘধ্বনি হয়।
তবে বোঝো জীবনসন্ধিৎসা, অধোগত দেহবন্দিভার
পিপাসার্ত এই বোধ এই মন বক্ষোরুহ
গৌরবাশ্রিত
কাঁদে একা তমসায় আথালিপাথালি, বিপ্রতীপে
অবিরত।
ভেঙে গেছি আমি আজ, জলদগম্ভীর মন সার
বলি আমি হে বন্ধুরা, শোন, কোনো বন্ধু নেই তো আমার।

 


ইউলিসিস আর আমি


ইউলিসিস যে জাহাজের নাবিক
সেই জাহাজে চড়ে আমি বেড়াতে চাই দশটি বছর
ইলিয়াম থেকে ইথাকা―
আমার ভ্রমণের দৈর্ঘ্য পরিমাপ করে আমার স্মৃতি,
আমারই স্বপ্নের দর্পণ।
আমার ভেতরে সমুদ্র, বাইরেও সমুদ্র
ধমনিগুলোতে প্রবাহমান বেদনার লিথি,
উড়ন্ত চুলগুলো মেঘে-ছাওয়া,
বৃষ্টি এলে ভেঙে পড়ে সমুদ্রে
চিহ্নহীন, পরিবর্তনীয়তায়।

জানি আমি, অমরতা হলো ট্রয়ের ঘোড়া
যে অনেককে নিয়ে হয়ে যায় একা,
প্রতীক্ষার প্রহরগুলো ইউলিসিসের অশ্রুরাশি
যে ঝরে একা, জলহীন
আর সমুদ্রের তলদেশ হলো তার বুক
যা সে বিছিয়ে দেয় অজানা সংকেতের দুরাশায়।

ইউলিসিস জানত প্রতিটি সমুদ্রের সীমা এবং সীমাহীনতা,
জানত তার সীমান্তগুলোর রহস্য
যেখানে মেঘেদের পাহারা বস্তুত জাহাজডুবির কথা মনে করিয়ে দেয়,
জানত—জীবন হলো অলীক উপস্থিতি,
এক অসম্ভব প্রত্যাবর্তন, যা সমুদ্রের আলগুলো ধরে
অনন্তের দিকে পথ করে নেয়

আর নিজেকে আবারও একা করে তোলে।

 


আমাকে বলেছ তুমি


আমাকে বলেছ তুমি, এই জল অপসৃত
গভীরে রয়েছে ছায়া তার, অশ্রুপতনের দাগ
আমি ভেবে উদাসীন, তোমারই দিকে আজ
ঘুরিয়ে নিয়েছি ডানা, এইদিকে দীর্ঘ রেলপথ
অতীত মুগ্ধতা নিয়ে সরে যায়, যায় সে তো যায়
অন্তহীন বাদুড়ের গান, চলে যায় জীবনের দল
স্তরভেদে এখানে এসেছে গুল্ম, কালস্রোতে
আমি তার ক্লোরোফিলে ধুয়ে নিই দেহ
নার্সিসাস বৃক্ষগুলো ঢুকে যায় মাথার কোটরে
আমাকে বলেছ তুমি―এইদিকে যাও কোনো
অনন্ততৃষ্ণায়… তোমার ঋতুর কাছে
…স্মৃতিহীনতায়, মৃত্যুফাঁদ রয়েছে বিছায়ে

 


শূন্যপ্রতীক্ষার ওতপ্রোতে আছি আমি, আছে ইউলিসিস


বিকেলের নরম আলোয় ভরে থাকে তোমার প্রার্থনা, তোমার গান।
মূলত লিথির জল খেয়ে ফিরে এসেছে পাখিরা
যখন বৃক্ষ জড়িয়ে ধরে মেঘের রহস্য, আর আমি ও ইউলিসিস
সময়ের প্রস্থানের দিকে মুখ করে থাকি।

সম্ভবত স্মৃতি তোমাকে জীবনের গলুইয়ের ওপর বসিয়ে রেখে যায়, কিন্তু
আমি আছি সমুদ্রের বাইরে। আমাকে ঘিরে রাখে নিঃসঙ্গতার মন্দাক্রান্তা;
সময়ের চলে যাওয়া রেখে যায় না কোনো স্বস্তি। বেদনাপ্রবাহ সেখানে রয়েছে, কিন্তু
তুমি ফিরিয়ে দাও না সেই দুপুর যখন পাতার পাখিরা গেয়ে উঠেছিল
আকাশের গান!

কিন্তু নীরবতার ভেতর প্রতিধ্বনিত সেই নদী
যাকে অনুসরণ করেছিল বস্তুসকল আর প্রহেলিকা।
আলো নিভে গেলে মনে পড়ে বিনিময়,
চলে যাওয়া, অনির্বচনীয় প্রকাশরীতি, কবিতার ভেতর
খোদাই করা ভ্রান্তি আর অবান্তর স্বপ্নমুখ
যে ট্রয়ের থেকে একা ঘরে ফিরে।
এভাবেই আমাদের ভেতর সমুদ্র এসে যায়, ডাকে,
আঙুলের ভেতর ঢুকিয়ে দেয় পিথাগোরাসের অধিবিদ্যা…

আমরা স্মরণ করতে পারি না সেই নদীটিকে যে একবার সমুদ্রের দিকে গিয়ে
সূর্যের সোনালি বুনুনের ভেতর ঘুমিয়ে পড়েছিল
আর তার সূচনাময় চরের গভীরে ছড়ানো তাসের মতো
প্রকাশিত ছিল পাখিদের হৃদয়।
সবকিছুই মৃত্তিকা আর অববাহিকা, তার শূন্যপ্রতীক্ষার
ওতপ্রোতে আছি আমি, আছে ইউলিসিস…

যখন তোমার কপাল থেকে উঠে এসেছিল নদী
যখন তোমার চোখ থেকে জেগে উঠেছিল মেঘ

 


ভালোবাসা


ভালোবাসতে গেলে প্রয়োজন সিঁড়ির। অথবা
একটি ছাদ যেখানে আকাশের ছায়া এসে দাঁড়াবে আর
তোমাকে দিবে কতিপয় রঙিন উদ্ভাস।

জানালার ফাঁক দিয়ে নরম বিকেল এসে পড়ে।
অনবদ্য এচিং এবং কাঠখোদাইয়ের জীবন, হায়
যে নদী ধীরে ধীরে সাজায় তার গোপন শব্দরাশি।

মোমবাতিগুলি লুকিয়ে রাখি পরবর্তী আলোর জন্য যারা
আমাকে দেবে স্বস্তি, দেবে সবুজ দর্পণের অহঙ্কার।
একটি স্থিরচিত্র অথবা পোর্ট্রেট যে তাকিয়ে থাকে নিজস্ব মানুষটির দিকে
যখন ভাসমান বস্তুসকলের প্রতি তার পক্ষপাত দ্বিধাহীন।
ভালোবাসতে গেলে প্রয়োজন
                        একটি জীবন
            অথবা
                        দুটো শরীর

 


আমাদের গাওয়াল জীবন


সৃষ্টিতত্ত্ব ছেড়ে মেঘ চেয়েছিল চৈতন্যের দিকে
এই ছিল তার প্রাণরসায়ন, আমাদের শনাক্তকরণ মহড়া,
ঠিকভাবেই আমরা চেয়েছিলাম নক্ষত্রের পানে
কুমারী বোন একে-একে জ্বেলে দিয়ে গেল সবকটি পিদিম,
এক-একটি রাত আমাদের কতিপয় তরলতাকে উজ্জ্বল করে তুলল,
মাঝে মাঝে মাছের চারা গজানোর মতো সংকেতপ্রবণ ছিল জ্যোতিষ্ক-শরীর:
গভীর ব্যুৎপত্তি আর অঙ্গরাগ অস্থির করে তুলছিল আমাদের।
মনের ভেতর থলের মতো পরিপূর্ণ প্রসন্নতা—
আমাদের ঘরবাড়ি নেই, আছে এক হৃদয়াশ্রিত ঠিকানা
তারি ভেতর গলে গলে পড়ছে চাঁদের মদনমোহন হাসি।

শুধু অপেক্ষা আমাদের দিয়েছিল জলের সততা,
এই দৃশ্যগ্রহণ, এই হু-হু করা স্তব্ধতা, আর
স্তব্ধতার ভেতর জেগে থাকা দেবতা আমার
চতুর্দিকে ঋতুর ভেতর জেগে ছিল খামালের মতো
বিশাল জোনাকির স্তন

এই রাত্রির খামার দেখে-দেখেই ধন্য হলো আমাদের গাওয়াল জীবন।

 


রৌদ্রমঙ্গল


বাক্যহীন পলায়ন
এই উদ্ভিদপ্রাণ ঋতুউৎসবে
আজ লৌকিক প্রহেলিকা থেকে
তোমাকে দিলাম রৌদ্রমঙ্গলের
জটিল বসন্তদিন
তুমি বিলুপ্তির চিহ্ন গোপন করে
আমাকে পাঠালে
সম্ভাবনাময় অতীন্দ্রিয় কায়াবোধ,
গূঢ় উদ্ভাবনে আমরা সার্থক
তবু এই মুদ্রাতাড়িত পরিপ্রেক্ষিতে
গতিবিদ্যায় পারদর্শী মৌমাছিরা
                                আজ
সাংকেতিক বার্তা রেখে চলে যায়
ফুলের পুর্বাপর স্তব্ধতায়।

 


গ্রামের খিড়কি


নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে, কিন্তু
খুঁজে পাই না রাতের রহস্যময় ডানা
ফলে গ্রামীণ জলবায়ুর দিকে চলে যাই
দেখি জলপিপির সবুজ আত্মার অহঙ্কার
মার্তৃময় জলের বঙ্কিম উল্লাসে ধলাবকের সহৃদয় উপস্থাপনা।

অজস্র জলপতনের ভেতর বাতাসের ভারী নিঃশাসের গন্ধ
পোয়াতি মেঘের শরীরে বৈষ্ণবীয় ভাব-উন্মাদনা,
ফলে আমি শালিখদের যৌথ খামারজীবন দেখি, দেখি
তাদের তদ্ভব আচরণ,
দেখি বিকেলের বন্ধকি ছায়া
আর সাদা প্রজাপ্রতিদের ছিপখান দৌড়।

এদিকে সপ্রতিভ পাটকিলে হাসি নিয়ে হাজির হয়ে যায়
নিখিলের বউ বুলবুলি
তার গালের টোলে আসন্ন নিদ্রার আভাস আর
চোখে থানকুনির আয়ুর্বেদিক সুস্বাস্থ্য।

ভাওয়ালগড়ের সত্যমাস্টার আমাকে স্কুলের ছাদে নিয়ে যান
দেখান দিগন্ত রেখার পাল্লা, বৃক্ষদের অক্সিজেন রেঞ্জ
আর স্থিরচিত্রময় দুটি সমাসবদ্ধ লিলিফুল,
আকাশের ভেসে যাওয়া পাখি-পরিবারকে তিনি বলেন
দৃশ্যমান সমান্তরাল দেহবোধ।

নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে গিয়ে আমি
খুঁজে পাই না কোনো ইথার মন্ত্রণা
শুধু অশোকপাতার নিচে দাঁড়িয়ে
একবার চোখ মেলে তাকাই আর
ভার্টিক্যাল বেদনাবোধে রক্তিম হয়ে উঠি!

 


আত্মজীবনী


পাহাড়ের সানুদেশে বেড়ে ওঠা আমাদের জীবন মায়ামমতার চাষ
করে, আর বিকেল হলে মেঘেদের ঘর-সংসার হতে কুহকি আলো
এসে অন্তর্দেশ তরল করে দেয়। মাঝেমাঝে রাত বেশি হলে পাহাড়গুলো
মাটি ছেড়ে কোথায় যেন উড়ে চলে যায়, তার জায়গায় জমা
হতে থাকে চাঁদের থাল-থাল সোনারুপা। তখন আমরা যূথবদ্ধভাবে
বের হয়ে পড়ি, ঘুরে বেড়াই, হাওয়াই গান করি, আর ভাঙা আকাশের
টুকরো কুড়োই। কখনো জোছনাগুলো বুকে ভরে নিজেদের চেহারা গোপন করে ফেলি।

প্রভু আমাদের ছবি তুলতে বারণ করেন, তার তো নিষেধ তা-ই, তবু
স্বাধীনতা স্বাধীনতা বলে মানচিত্র ভর্তি ছবি আমরা ছড়িয়ে দিই জলের
নিকটে প্রতিবিম্বে।

আমাদের এই স্বয়ংপ্রভ কাজে তার আপত্তি ঘোর। তিনি আমাদের শাস্তি দিতে পেনাল কোড
প্রবর্তন করেন এবং নক্ষত্রদের জুরি করে আদালতি কাজকারবার শুরু করে দেন।
আমরা বিশ্বস্ত নভোদাস, একবার গ্রহদেশে অপরাধ করি তো অন্যবার
আলোকবর্ষে বেকসুর খালাস পেয়ে যাই।
শুধু এই দাদামেঘ আমাদের শীতল ছায়ায় সমর্পণ করে রাখে রাতদিন।
তবু দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামির মতো একটি মেঘের পরজন্ম দেখে আমরা
                            ভাববাদী হয়ে উঠি বারবার।

k2


হেমন্তের সন্নিকটে আমার কথাগুলো


কখনো যদি মনে হয় ভেবে দেখো এই
বৃক্ষকেন্দ্রিক আত্মীয়তাবোধ, মনে রেখ
যেভাবে হারিয়ে গিয়েছে আমাদের
নিরালা জীবনের ছবি, তার ভাঁজকরা
অবহেলাটুকুর সকাশে আমি আজ
অস্থিরতাবিমুখ এক পাখি।

একদিন আকাশ তো নেমে এসে কথা বলেছিল
আর আমি হয়ে পড়েছিলাম জীবনীমুক্ত।
যেভাবে গেয়েছিল গান পাখি আত্মপ্রতিবিম্বের সম্মোহনে
সেরকমই অহঙ্কারহীন ভাবনায়
চলে গেল শ্রাবণ আর আমি ভেজা চুল নিয়ে
আজো বসে আছি কবে আসবে শীত,
আমি চলে যাব নতুন উষ্ণতার পৃথিবীতে—
দেখব ছায়াময় প্রাসাদের স্তব্ধতা, স্থিরমানুষের
কিছু বিন্দুবিসর্গতা।

বস্তুত সবাই যায়, প্রকৃতই যায়। সমুদ্রকে
নিয়ে উদ্বেল হয় ঝাউমন। কবিতাও ভাষা
ছেড়ে হয়ে পড়ে অবাঙ্‌মানসগোচর। রীতিমুগ্ধ
এই আসা-যাওয়া।

অতএব ক্রমশ অস্পষ্ট হচ্ছি। তাই তো ডাকছি ঢুলোঢুলো—
ও হেমন্ত, এবার বিস্মৃতদিনে
আমি হব তোমার অতিথি!

 


কবির জন্যে


কবিতার জন্যে অপেক্ষা করে অনেক কিছু:
প্রজাপতিঋতু, শুভেচ্ছাপ্রধান মেঘ
অথবা বৃক্ষের প্রণালিময় বলবিদ্যা

অপেক্ষা করে বৃষ্টিভেজা রংধনু
মেঘাবৃত স্টেশন
সবুজের চান্ট… ঘুমবিন্দু থেকে
গড়ানো স্বপন, বিষাদের কূপ
মৃত্যুর নিমগ্ন কারণ, বা ভরসন্ধ্যায়
পাখিদের ঘুমস্থবিরতা…

কিন্তু কবির জন্যে অপেক্ষা করে না কোনো কিছু
একখণ্ড নীরবতা ছাড়া…

 


অলীক বাতিঘর


মৃত্যুবীজ নিয়ে আমি ঘুরে বেড়িয়েছি
দীর্ঘকাল:
সোহাগপুর থেকে মনখালি,
নদী থেকে সমুদ্র অবধি।

জোছনা গায়ে মেখে
আত্মলীন হয়ে থাকতাম আর
পুরোনো চৌখুপি ক্যামেরায়
সময়কে জন্মাতে দেখতাম।

অদৃশ্য অঙ্কুরোদ্‌গমকে মানুষ টের পায় না
কিন্তু নৈশভোজ সেরে সে ঘুম যায়।

মাথার ভেতর অন্ধকার আর
গাঙচিলের উদ্দেশ্যহীনতাকে নিয়ে
হেঁটে যেতাম আমি—দেখতাম
জলের অ্যালবাম, এবং কিছুটা
শূন্যতার দিকে সরে-যাওয়া
অলীক বাতিঘর।

বোধ হয় জীবন সুদীর্ঘতর
তবু তা এক সময় হয় অলীক বাতিঘর!

 


কবি


অভীপ্সা প্রবল ছিল, জিজ্ঞাসিত, কবি হতে
কাটিয়েছি অর্ধেক-জীবন, মুছেছি সীমানা
মুঠোভর্তি নিস্তব্ধতা নিয়ে, কষ্ট শুধু
কষ্ট বাড়ে, যে পথে নদীরা একা যায়
সেই পথে হেঁটে যেতে ঘুমিয়েছি দীর্ঘকাল
কালসূত্র গোপনীয় রেখে—স্বপ্নের ভেতর,
আমার গন্তব্য বলে কিছু নেই, কোনোকিছু নেই
সমুদ্রতাড়িত এই বাতিঘর ছাড়া, যেখানে মিশেছে
অলীকরহস্য আর জীবন-কুড়ানো কিছু মহৎ বিস্ময়

স্বপ্নের ভেতর হাঁটি অনন্তর রংহীন
নৃত্যরত মেঘ ডেকে নিয়ে যাবে বলে
প্রস্তুত হয়েছি—রক্তে ও ডানায়, আমি তো বস্তুত
মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত, গোপনীয় নশ্বরতা নিয়ে
ভরে আছে দেহবোধ, পাখিদের অনুসরণীয়,

মৃত্যু-পরোয়ানা শোনানো হয়েছে—এখন নিদানকাল
শুধু স্থগিত রয়েছে সাজা ব্যক্তিগত অসুস্থতাহেতু

 


মধু ও রেশম


তোমার পিয়ানো হতে ঝরে পড়া মুগ্ধতা আমার
তবে এসো নার্সিসাস, এসো ভ্রমণেতে যাই অতিমাত্র
পাতার রহস্য নিয়ে, যাই জীবনের অবকাশে ধমনির
মধ্য দিয়ে প্রতিটি ফুলের সেই অলৌকিক বোধ, তবে
এসো আকাশভ্রমণে উড়ি, উপলব্ধি করি—মেঘ
তার ওপরে মেঘ, তার ওপরে মেঘের শূন্যতা: লুব্ধকেন্দ্র
তাকে ডাকে, কেবলি উঠেছে জেগে পিয়ানোর
সুরধারাজলে। রঙিন পাখিরা এভাবেই রেখে যায়
মুগ্ধতাবোধের দৃশ্য: বৃক্ষে বৃক্ষে ফুলের প্রথায়,
ফলত মাতাল একা কোথাও রাখে না দৈন্য প্রথমত
মর্মদেশভরা, সামর্থ্যইে ভরপুর মেয়েদের সংগ্রহশালা
ভরে ওঠে জল আর জ্যোৎস্নায়, ব্যক্তিগত জটিল স্বরূপে
রাখে প্রণয়কৌশল, গোপনদৃশ্যরা থাকে মগ্ন
ভাষায় ও কাব্যে, দৃশ্যমান দ্বন্দ্বসূত্রে পরস্পর মধু ও রেশমে

 


জার্নাল : ১৪১৮


বেলাশেষের আলপথ ধরে চলতে শুরু করলে আর ফিরে আসার ইচ্ছে হয় না। অন্তহীন পথ, অনন্তকাল ধরে হাঁটার মোহটান। তবে চারপাশে ঘাপটি-মেরে-থাকা  নির্জনতা চাই যেন হাঁটতে হাঁটতে সে স্পর্শ করবে আমাকে, আমিও ছোঁব তার শীতল স্নায়ুলতা।

কতকাল হলো শব্দদের রেখে অর্থরা চলে গেছে নির্জনে। আজ তাদের সাথে দেখা হতে পারে।  দেখা হতে পারে ঝরাপাতাদের সাথে। পাতাদের ভাষা আমি শিখেছি নিঃসঙ্গ পাকুড়ের কাছে। কতকাল নগ্ন পায়ে ঘাসেদের কাছে যাওয়া হয় নি। জলমগ্ন হিজলের কাছে গিয়ে ঘটাতে পারি নি আত্মজীবনের নিমজ্জন।

হাঁটছি আমি উড়ে ও জোরে, বাতাসে ভর করে। খুলে দিয়েছি সঙ্গোপনে-রাখা প্রেমের সুগন্ধি বয়ামগুলো। প্রেম, টানেলে আমাদের শেষ দেখাদেখি, তারপর সুড়ঙ্গ ধরে অন্তর্হিত হওয়ার আনচান। প্রেম শিখিয়েছে, নগ্ন হলে নিজের শরীর আয়না হয়ে ওঠে, গোপন সমুদ্ররা শঙ্খের বেদনাকে প্রকাশ করে চলে। বিচ্ছিন্ন হতে গেলে একত্র হতে হয়, রেখে যেতে হয় ম্যাটাডোরের স্বপ্ন। পুনশ্চ প্রেমের কথা হতেই মনে পড়ল বেহাগ রাগে সেই বন্দিশটির কথা: ‘লাটা উলঝি সুলাঝা যারে বালমা।’ কেন যেন আরও মনে পড়ল বেন জনসনের সেই গান: ড্রিঙ্ক টু মি ওনলি উইথ দাইন আইস।

এসে গেছি বনপ্রান্তের সন্ধিমাহাত্ম্যে। গোধূলির তোরঙ্গে দেখব অন্ধকারের থইথই ভাব। আহা গোধূলি, আমাদের ত্রিকালধন্য যৌথ মনোভার! দেহের লুকোনো অন্ধকারেরা এখন বেদনাময় হবে, রং ফলাবে অন্য জীবনের।

এখন নভশ্চর আমি, যাচ্ছি আকাশের উড়ালপ্রান্তিকে। কতকাল ওড়াউড়ি হয় নি। দেখা হয় নি নৈঃশব্দ্যের সাথে, অন্ধকার রাতে। আজ উড়ব পাখা ছেড়ে দিয়ে, মন খুলে দিয়ে। আর যে-নক্ষত্রদের হারিয়ে ফেলেছিলাম অযুত বছর আগে, তাঁদের সাথে দেখা হবে আজ, কথাও হবে আকাশভাষার অবকাশে।

 


প্রস্থান


অইখানে নিয়ে যাও,  আস্তে করে শুইয়ে দাও
যেন
মাটিও না পায় টের,
মেঘগুলো সবেমাত্র অদৃশ্য হতে শুরু করেছে

পা-তা-রা-ও ঝরছে

 


তোমার শরীর


তোমার শরীর যেন স্তব্ধ স্বরলিপি, আমি এলে গান হয়ে ওঠে।
অন্ধ বাঁশি যে সুর লাগায়, তার বাটে জেগে ওঠে রহস্যজ্যামিতি
আমি তার কেন্দ্র খুঁজি, আর খুঁজি জোড়বিন্দুগুলি
যেন আমি ভূতগ্রস্ত হই
পরিধির দিকে―ছুটে যাই মাতালের মতো
চাই দেখতে কতটা ইঙ্গিতে
বনের কুসুমজ্যোৎস্না মর্মরিয়া আমাকে হারায়।

স্নিগ্ধ বাতাসে আজি কোরকের ভরুভুরু গন্ধ ভেসে আসে
ঝরে পড়ে মেঘ, অবসরে বিজন আবেগে
নিস্তব্ধ জ্যোৎস্নায় আজ শরীরের কথাকলি ছায়াময় গান হয়ে যায়
কেঁপে ওঠে অজানার, অর্থ-ইশারায়।

তোমার শরীর যেন অন্ধ স্বরলিপি
বাজে সুর বিহ্বল রাগে,
আমি এলে লাগে তান, হয় গান,
আমি এলে শরীরের গন্ধ হেসে ওঠে!

 


খনন


সঞ্চয় থাকে না কিছু
জমে আর গলে, আর
ঝরে পড়ে যায়।

বিকেল হলেই আমি দীর্ঘ হতে থাকি,
ভাবি―নির্জন হব
তোমার গোপন ছোঁব;
ভাবি―কবিতা লিখতে গিয়ে
কতকাল একা হয়ে রবো!

প্রবণতা জেগে ওঠে জীবনের
সংঘবদ্ধতায়। নিস্তব্ধ প্রদেশে এসে
স্থির হয়ে রই, ভাবি অস্তচাঁদ
কী ভূমিকা রেখে গেছে, একা,
অরণ্যের ঠিকানায়?

আমার ভেতরে কে-এক নৈঃশব্দ্য এসে
অবশেষে খনন চালায়?

 


শরীর না মন!


অনেক জীবন ঘুরে, খাল হয়ে, নদী হয়ে, সমুদ্রে এসেছি
বহমানতার কথা ভুলেছি এখন, মনে পড়ে
সঙ্গমস্নিগ্ধ দ্বিপ্রহর, শরীরের স্রোতে বিকেল গড়িয়ে গেল
তোমার পর্বতশৃঙ্গে, ভাবছি কখনো, ভাবছি কি
উড়ে উড়ে সঙ্গমের কথা, অথবা কি ডুবে, গভীর সলিলে
যেমন মাছেরা মাতে অতিন্দ্রীয় জলজ সংযোগে,
শরীরে অগুরুগন্ধ, মাতাল পবন।

একটাই মনে রাখি, প্রশ্ন জাগে, রমণে কে গুরুত্ববহ
শরীর, না মন?

রেখা ভাঙে অবিরত
কখনো শরীর ভাঙে নিজস্ব খেয়ালে, একটি পৃথিবী
অবশেষে ক্লান্ত হয়, হয় দ্বিখণ্ডিত, এই ভেবে―

রমণে কে বার্তাবহ?
শরীর, না মন!

 


অধিবিদ্যা


অস্তিত্বহীন এমন কিছু রয়েছে যা অধিকার করে রাখে আমাদের। গতরাতে নদীদের গতিপথ খুঁজতে গিয়ে দেখা পেলাম সেই গাছপালাদের যারা সময়ের বাইরে বাস করে অনন্তের অধিবিদ্যার কথা বলে গেল আমাদের।

অজানার উদ্দেশে এখানে রয়েছে এক মন্দির যেখানে প্রার্থনা করে পাখিরা। ছায়ার পৃথিবী এ কথাই প্রমাণ করে যে মানুষ আর প্রকৃতির মাঝে বিরাজ করছে এক টলোমলো ঐক্য, সুতরাং প্রথম কাজ হলো যা কিছু অস্তিত্বময়, তার ক্ষণভঙ্গুরত্বকে প্রতিষ্ঠা করা।

বৃক্ষদের অধিবিদ্যা হলো নিজ জন্মমৃত্যুর ক্ষণকে অনিশ্চিত করা, পাখিদের অধিবিদ্যা হলো নিজেদেরকে প্রকৃতির প্রতীক করে রাখা। আর মানুষের অধিবিদ্যা হলো মৃত্যুর পর জীবনের কথা বলা।

মনে রেখ, অস্তিত্বহীন আমি চর্চা করি অস্তিত্ববিদ্যার, যা তোমাদের অসোয়াস্তিতে ফেলে। আমার ভুলগুলো হলো আমার বিম্ব ও প্রতিবিস্ব, আর শুদ্ধগুলো হলো তোমার  স্নায়ুসন্ধির সৌন্দর্য।

আরও মনে রেখ, যা অসীম তার কোনো অস্তিত্ব থাকে না।

 


দীর্ঘ গাছের নিচে


দীর্ঘ গাছের নিচে হাঁটতে ভালোবাসি আমি। এখানে বৃক্ষপত্রালির অগোচরে কী এক গোপন ধরে রাখে তার অন্তর্মহিমা। ভালোলাগে আমার আকাশ আর পাতালের দিকে চলে যাওয়া দীর্ঘ গাছগুলো, যারা দৃশ্য থেকে দৃশ্যহীনতায় নিয়ে গেছে তাদের রূপ আর রূপান্তরকে।

আমার ভালো লাগে, ভালো লাগে আমার, লাগে আমার ভালো এই গাছের নিচে হাঁটতে, যেন আমি তাদের দীর্ঘত্ব থেকে চুপচাপ কিছু গ্রহণ করতে পারি, পারি সোজা আর সরল হয়ে উঠতে, পারি তাদেরই মতন স্থির এবং উদ্ভিন্ন হয়ে উঠতে। চিরটাকাল বামনদের সাথে থাকতে থাকতে কশেরুকা বেঁকে গেছে আমার, হারিয়েছি শস্যক্ষেত্রের ভাষাও। ছোট হয়ে যাওয়াতে পাখিরাও ছেড়ে গেছে আমায়। এখন হাড় আর স্নায়ুর মাঝখানে কী এক বাতাস এসে স্তব্ধ হয়ে থাকে। টের পাই আমি, ঠিক টের পাই।

আজ এই দীর্ঘ গাছের নিচে এসে জীবন আমার খুলে দিয়েছে সব গুহারহস্যের দ্বার। আমার আত্মা এখানে বের হয়ে বন্ধুরই মতো আমার পাশে পাশে হাঁটে আর সপ্রতিভ গগনচারিতা দেখায়।

ভালো লাগছে আমার, এখানে, গাছের নিচে হাঁটতে, কেননা এই উল্লম্বতা গূঢ়ার্থব্যঞ্জক, আমাকে  মুহূর্তেই দার্শনিক করে তোলে।

 


নিজের পথ


জীবন ফুরিয়ে যাচ্ছে বলে তাড়াহুড়া বাধিয়ে দিয়েছিলে তোমরা। বোঝো নি, তাড়াহুড়ায় জীবন আরও দ্রুত ফুরিয়ে যায়।

বস্তুর রহস্য আর রূপকার্থ নিয়ে তোমরা উদ্বেল হয়ে উঠেছিলে, আর নিজেকে বানিয়ে ফেলেছিলে এক একজন আসঙ্গলিপ্সু রহস্যবাদী। কেউবা জ্ঞেয় আর অজ্ঞেয়বাদের পর্বতারোহণে গিয়ে বরফ হয়ে ফিরে এলে। বোঝো নি, শীত আর গ্রীষ্ম তোমার ভেতরেই রয়েছে যা সময়সুযোগ মতো একে অন্যকে সুবিধা দেয়, আর তোমাকে দেয় ঋতুচক্রের নিশ্চয়তা।

সুতরাং হয়ো না নস্টিক, মিস্টিক, স্টোয়িক বা কাবালিস্ট। হয়ো না সোফিস্ট, নিউপ্লেটনিস্ট। তুমি হও যা হয় নি অন্যরা।

মনো রেখ, বাঁচার জন্য সবচেয়ে উত্তম হলো নিজের পথ, যেভাবে বাঁচে—ফুল, পাখি, মেঘ আর মেরুতুষার। যখনই অন্যের পথে যাবে, তখনই মৃত্যুর দিকে চলে যাবে তুমি, যেমন যায় তোমার আর বন্ধুসকল।

কুমার চক্রবর্তী

কুমার চক্রবর্তী

কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক। জন্ম ২ চৈত্র ১৩৭১ বঙ্গাব্দ, কুমিল্লা, বাংলাদেশ।

প্রকাশিত গ্রন্থ:
কবিতা: লগপুস্তকের পাতা (১৯৯৮), আয়না ও প্রতিবিম্ব ( ২০০৩), সমুদ্র, বিষণ্নতা ও অলীক বাতিঘর (২০০৭), পাখিদের নির্মিত সাঁকো (২০১০), হারানো ফোনোগ্রাফের গান (২০১২), তবে এসো, হে হাওয়া হে হর্ষনাদ (২০১৪);

প্রবন্ধ: ভাবনাবিন্দু (২০০২), ভাবনা ও নির্মিতি (২০০৪), মাত্রামানব ও ইচ্ছামৃত্যুর কথকতা (২০০৫/২০০৬), অস্তিত্ব ও আত্মহত্যা (২০১২), শূন্যপ্রতীক্ষার ওতপ্রোতে আছি আমি, আছে ইউলিসিস (২০০৯),মৃতদের সমান অভিজ্ঞ (২০০৯), কবিতার অন্ধনন্দন (২০১০), নির্বাচিত প্রবন্ধ (২০১৫);

অনুবাদ: আমি শূন্য নই, আমি উন্মুক্ত: টোমাস ট্রান্সট্যোমারের কবিতা (১৯৯৬/২০০২/২০১২), নির্বাচিত কবিতা: ইহুদা আমিচাই (২০০৫/২০১৩), মেঘ বৃক্ষ আর নৈঃশব্দ্যের কবিতা: চেসোয়াভ মিউশ (২০১৪)।

ই-মেইল : kumar.4585@yahoo.com
কুমার চক্রবর্তী