হোম কবিতা তিনটি দীর্ঘশ্বাস
তিনটি দীর্ঘশ্বাস

তিনটি দীর্ঘশ্বাস

315
0

জফির সেতু

মায়ানমার, গো ফাক ইয়োরসেল্ফ উইথ ইয়োর ব্লাডি আর্মি

.
মাথা-ভরতি মেঘ নিয়ে, এই ঢিলে জামা আর
জ্বরে-আক্রান্ত শরীরে টলমল পায়ে, আমি আর কী বলতে পারি!
এখন বৃষ্টি ঝরছে, আমি দাঁড়িয়ে আছি আমার স্ত্রীর বাগানে,
চারতলার বিস্তৃত ঝুলবারান্দায়;
বৃষ্টিতে ভিজছে সুপোরি গাছ আর দুইটি মাঝবয়েসি পাঁতিকাক—
এরা পরস্পর ভালোবাসা বিনিময় করছে!
এখন বিশ্ব নেতারা কী বলবেন?—
আসামের জঙ্গলের গণ্ডারগুলো ভালোবাসতে চাইছে মানুষকে
আফ্রিকার চিতারা চেটে দিচ্ছে আদিবাসী শিশুদের নরম গাল
আর, তুমি বুদ্ধের ভেক ধরে,
মায়ানমার, গাঁড় মারাচ্ছ নিজের আর্মি দিয়ে নিজেকেই!
আর আমি জবুথবু দাঁড়িয়ে আছি বাগানে আর ঈষৎ কাঁপছি জ্বরে
এদিকে গলার ব্যথায় আমার কণ্ঠস্বরও রুদ্ধ হয়ে আসছে কেমন
আর এখানকার একটি ফুলের নামও আমি জানি না, এদের চিনি না
অথচ এরা পৃথিবীকে সৌন্দর্যে অপার্থিব করে তুলেছে—
কিন্তু আমি দিব্যি অনেকগুলো নাম এই মুহূর্তে উচ্চারণ করতে পারি!
আমি হিটলারের নাম বলতে পারি
আমি মুসোলিনির নাম বলতে পারি
আমি স্লাবোদান মিলোসোভিচের নাম বলতে পারি
আমি পলপটের নাম বলতে পারি
আমি ক্লিমেন্ট কাইজমার নাম বলতে পারি
আমি পিনোশের নাম বলতে পারি
আমি ইয়াহিয়ার নাম বলতে পারি
এবং আমি আজ আং সাং সুকির নামও বলতে পারি!
অথচ এরা প্রত্যেকেই এক একটা রক্তপিপাসু, ঘাতক ও বাস্টার্ড!
এদের প্রত্যেকেরই হাত রক্তে ভেজা; এদের জিহ্বায় ও ঠোঁটে রক্ত
এরা প্রত্যেকেই ক্রুর দানব, মানব-বিদ্বেষী ও ঘৃণ্য সাম্প্রদায়িক!

এবং তাই রোহিঙ্গাদের অনায়াসেই হত্যা করা চলে
রোহিঙ্গা নারীদের অনায়াসেই চার রাস্তার মোড়ে ধর্ষণ করা যায়
শিশুদেরও ডুবিয়ে দেওয়া যায় সাগরের নোনা পানিতে
বৃদ্ধদের মাঠের সবুজ ঘাসে পেট্রোল ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া যায়
কেননা রোহিঙ্গারা মানুষ নয়—এরা রোহিঙ্গা!
কুর্দিরাও মানুষ নয়—এরা কুর্দি!
হুটুসরা মানুষ নয়—এরা হুটুস!
ফিলিস্তিনিরাও মানুষ নয়—এরা ফিলিস্তিনি!
আর এটা মোটেও নতুন কিছু নয়, এটা একটা চলমান বৈকালিক খেলা—
আর বিশ্ববিবেক (!) জাতিসংঘ হচ্ছে ভাঁড়-সদৃশ এক অাম্পায়ার মাত্র!
আর আমেরিকা ও জাতিসংঘের ফ্যাক্টরিতেই একে একে উৎপাদিত হচ্ছে
ধর্মকেন্দ্রিক ভিন্ন ভিন্ন প্রোডাক্ট : শিবসেনা, তালেবান, আইএস…
আর তারা পৃথিবীতে একে একে ঘটাচ্ছে মানব-হত্যার এক-একটা ভয়াল তাণ্ডব!
শুধু মানুষকেই হত্যা করা হচ্ছে, শুধুই মানুষকে; জন্তুকে নয়!
বলা চলে একে-৪৭ কিংবা মর্টার নয়, মানুষ মারার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর
অস্ত্র হচ্ছে খোদ মানুষই অথবা ধর্ম, রাষ্ট্র ও রাজনীতি!
আমি তাহলে কী আর বলতে পারি?
বিশ্বনেতারাই-বা কী বলবেন আজ?
মিস্টার ডোনাল্ড ট্রাম্প
মিস্টার ভ্লাদিমির পুতিন
মিস্টার এনজেলা মারকেল
মিস্টার ইমানুয়েল মারকন
মিস্টার টেরেসা মে
মিস্টার জি জিনপিং
মিস্টার সানজো অ্যাবে
মিস্টার মন জে-ইন
এবং মিস্টার নরেন্দ্র মোদী
কী হবে তবে আজ আপনাদের পররাষ্ট্রনীতি!
আপনারা আরো কুশলী হওয়ার চেষ্টায় আছেন।
আমি জানি—মানুষ নয়, আপনাদের দরকার প্রবৃদ্ধির উচ্চমাত্রা!
মানুষ চুলোয় যাক—এটা এমন কিছু নয়!
মানুষকে প্রয়োজনে হত্যা করা যায়; নারীকেও বলাৎকার করা যায়
মানুষের তাজা রক্ত দিয়ে তবে তৈরি হোক উৎসবের লাল মদ
আর নোবেল শান্তি পুরস্কারে সুকিকে আবারও ভূষিত করা হোক
আমিও নিশ্চয় এটা চাইছি!
কেননা আপনাদের মতো আমিও মানুষ নই—একটা দাঁতাল শুয়োর মাত্র!
দেখছেন না কেমন নির্বিকার কাঁদায় গুজে আছি মুখ!
আর এখন চারদিকে তো শুধুই শুয়োরের গোঁ গোঁ আওয়াজ
আর আবর্জনার স্তূপে আটকে আছে সবাই, ভাষাহীন, অন্ধ!
কিন্তু আমার মাথা-ভরতি মেঘ—বাতাসে উড়ছে লম্বমান লালচে চুল
কী আশ্চর্য, আমিও একদা নারীর চিবুক ভালোবাসতাম!
আর এখন চুপ করে আছি, ঘাপটি মেরে বসে আছি অন্ধকার গুহায়;
আর এই বৃষ্টির সকালে চারতলার বাগানে দাঁড়িয়ে আছি, ঢিলে জামায়;
যখন একটি কাক আরেকটি কাককে চুম্বনে-আদরে ভাসিয়ে দিচ্ছে!
আর আমি তীব্র জ্বরের ঘোরে টলমল পায়ে কী-ই-বা বলতে পারি :
মায়ানমার, গো ফাক ইয়োরসেল্ফ উইথ ইয়োর ব্লাাডি আর্মি ম্যান্স!


আলী প্রয়াস

নাফ পেরিয়ে, জলোগন্ধ বুকে

.
মেয়েটি পার হয়ে এল নাফ, জলোগন্ধ বুকে—
তার চকোলেট রঙের ঠোঁট বিষণ্ন
প্রভাতের পেয়ালায় আর আজ নেই
যেন তাকে তাড়া করে ফিরছে মৌমাছির ঝাঁক
মেয়েটির জ্বালাধরা স্কন্ধদেশ
সে ছুটছে মেঘের পেছনে, মেঘের মতো মুখ
ভুলে গেছে গৃহস্থালি ভাষা, ভালোবাসার শেষ উচ্চারণ…
হয়তো তার নুয়ে পড়া স্তনযুগলে মৌমাছির ডাকঘর।

রেঙ্গুনের গান আর তার মাঝে নেই
স্মৃতি আছে, আছে পাহাড়ের ডাক
হলুদ ত্বকের নিকোটিনে গন্ধের গরিমা…
বদলে যাচ্ছে তার মুহূর্তের ভাষা
নিংড়ে নিচ্ছে তাকে যাপন-মাড়াইয়ের কল।
তার ভাষা রস হয়ে হাসছে শরীরে
তার ঠোঁট থেকে জন্ম নিচ্ছে রানি-মৌমাছি…

যে মেয়ে নাফ পাড়ি দেয়
মিয়ানমারের গোপনতা নিয়ে আসে বাংলার দিকে
তার বুকে কান্না ঘুমায়
তার থামি-চুলির মুছে যাওয়া সাতরঙ
আবার রঙধনু ফোটাতে চায়
তার নগ্নতা আবার ভালোবাসা হতে চায়
সে আবারও শোনে পাখির কূজন
সে শোনে, তার বুকে বাসা বেঁধে আছে নদীর কলধ্বনি
পাহাড়ের প্রার্থনা
সে শোনে, তার ভেতরে ফুঁপিয়ে উঠছে
অন্তর্ভেদী রক্তিম পিপাসা

তার লাবণ্যময় দেহে স্মৃতির করাত থাকে
তাতে বাস করে যে রাক্ষস
সে তাকে চেনে না
পরিচয়ও খুব একটা নেই।
শুধু জানে জীবনের মধ্যস্তবকে ঘটে গেছে বালির ঘূর্ণিঝড়,
সেখানে কোনো ফেরদৌসী গান গায় না
সেখানে নায়িকাদের বাহারি গুঞ্জন নেই
শুধু যাপনমীমাংসা

তার বুকে তবু লেগে থাকে যে জলোগন্ধ
সেটা কতটা পোড়া, কতটা হরিণীর ডাক মেশানো
সেই ডাকে কখনো কাঁপে বাঙালির বুক!
পঙ্গপালের মতো মৃত্যু বুকে নিয়ে ডাকে কোনো তুখোড় যুবক!
মেয়েটি দেখে শুধু মিথ্যেবাদী গ্রাম, প্রকৃতির মাংস
সে দেখে মায়ার তিরস্কার, মৃত্যুর আরেক নাম জলপুষ্প!

তারও ঊরুতে আছে বিদুৎচমক
তারও বুকেতে আছে পশুদের পথ
শ্বাপদারণ্যের পাশেই পড়ে আছে এক দীর্ঘ নদী
সেও বর্শা দিয়ে গাঁথা
সুন্দরী পাতার ফাঁকে সেও আকাশ দেখে
ঝিঁঝির শিস শুনে সেও কান পাতে
কিন্তু জলোগন্ধের বুকে কেউ যেন পানসি বেঁধে রাখে
বেঁধে রাখে দণ্ড আর দাঁড়
সেই দাঁড় বেয়ে যাওয়া যায় রক্তমাংসের গ্রামে
যাওয়া যায় ক্ষতের প্রাণপুঞ্জে।

সে বলল, চেয়ে দেখো—
পেছনে ফেলে এসেছি বাঘের পায়ের ছাপ, অকাট্য পথগুলি
চেয়ে দেখো, পেছনে ফেলে এসেছি পেশি আর পায়ের কান্না।
অনার্দ্র অখিল কান্নাগুলো তবু তিরস্কার করে
কোথায় শান্তির দেবী নিবিড়ে ঘুমায়! তার দিকে চেয়ে থাকা
এইসব চোখগুলো দুর্গন্ধে ভরে যায়
তার দিকে চেয়ে থাকা এইসব মনগুলো অস্ত্র হয়ে যায়!

এই মেয়েটিরও আছে সবগুলো ঋতু, হাসাহাসি
আছে অস্থির বিদ্রূপ…
আজ ধ্বংসস্তূপের চূড়ায় শেষ ধর্মগ্রন্থও কাঁদে
দুলে ওঠে আর্তস্বর,
তার ভেতরে জন্ম নেয় এক ক্ষয়িষ্ণু দেয়াল
জন্ম দেয় ইচ্ছেছেঁড়ার গান
আর যারা শোনে চারদিক থেকে ভেসে আসছে ইট-লোহার গোঙানি,
দেখে না, নেই কোনো নুহের নৌকা
নেই কোনো জলমেয়েদের তেজস্ক্রিয়তা ধরে রাখার সম্ভবপাত্র।

কোনো ইস্পাতভেদী গামারশ্মি আজ ছুটে যাচ্ছে প্রাণস্পন্দনের দিকে
আজ জীবনের ভূমিকম্পে নিদ্রিত হচ্ছে মায়া
এক বিনাশপ্রাপ্ত নগরী যেন মাথা তুলছে নিস্তব্ধ কবরখানায়

যারা আসে, নাফ পেরিয়ে রাত্রির বরণ ফেলে
কোনো মেয়ে মেনে নেয় তীব্র নিয়তিরে!

চারিদিকে অদ্ভুত, কান পাতলাম নাফ আর জলের চিৎকারে!


মোহাম্মদ লোকমান

উদ্বাস্তু

.
আমরা দৌড়াতে দৌড়াতে এসে পৌছলাম পাহাড়ে;

আমরা দৌড়াতে দৌড়াতে এসে পৌছলাম পাহাড়ে।
পাহাড়টি আমাদের অতি পরিচিত—তবু,
এখন নাম মনে নেই—না ,মনেও পড়ছে না।
আমরা দৌড়াতে দৌড়াতে এসে পৌছলাম পাহাড়ে।

আমি এবং আমরা বহুজন
বৃদ্ধা-যুবা, নারী-পুরুষ এবং শিশুরা,
আমার পোষা বিড়াল ছানাটিও।
আমার পিতা-মাতা, পিতামহ-মাতামহ
এবং আমার সদ্য জন্মানো বোনটি
যার নাভিটা বাঁধা হয় নি এখনও!
আমি সকলের মুখে দেখি শঙ্কা-ভয়!
হতাশার নির্মম ছাপ!

শুধু
আমার নবজাতক বোনটি—যার নাম রাখা হয় নি
এখনও
ও হাসছে, হাত-পাগুলো নাড়ছে অনবরত।
“হাসিস না পোড়ামুখী”—ফিসফিসিয়ে বলল আমার মাতামহ;
আমরা হাসছি না ; লুকিয়ে পড়ি একটি গুহায়-গর্তে
ক্রমশ অন্ধকার নামে
আকাশে আকাশে, বৃক্ষের মাথা—উড়ন্ত চিলের ডানায়
পাহাড়ে-গুহায়!
আমরা দৌড়াতে দৌড়াতে এসে পৌছলাম পাহাড়ে।

ওমা, দুটো কালো কালো মস্ত বড় সাপ!
একদম ফোঁসফোঁস নেই,
মনে হচ্ছে, ওরাও বেদম-ভীতু!
প্রাণ বাঁচাতেই দুর্গম পাহাড়ে;
আমরা দৌড়াতে দৌড়াতে এসে পৌছলাম পাহাড়ে।

আমি এবং আমরা
আর, মস্ত বড় কালো দুটি সাপ
একই গুহায় আমাদের সহাবস্হান;
দ্বেষহীন পরম আত্মীয়ের মত।
একই শঙ্কা একই ভয় আমাদের প্রাণে!
আমরা দৌড়াতে দৌড়াতে এসে পৌছলাম পাহাড়ে।

আমাদের আকাশে তখনও উড়ছে লেলিহান দানব!
তার কী ভয়ানক শব্দ!
আমার বুক ঢিপ ঢিপ করছে!

আমাদের বাড়ি-বাসস্হান,
আমার পড়ার ঘর, বই-পত্র, আমার রং পেন্সিল-খাতা,
আমার প্রিয় কবি খৈয়ামের কবিতার বই,
আমার পোষা বিড়াল ছানার দুধের বাটি
সব পুড়ে গেছে রাক্ষুসের নীল থাবায়!

আমার চাঁপা ফুলের বাগান,
নতুন কলমগুলো অঙ্কুর দিয়েছে কেবল—
খুব মনে পড়ছে তোমাকে।

আমার প্রাণ-বন্ধু রাকিব বিন সাদেম
তোমায় খুব বেশী মনে পড়ছে…
আমাদের বাজিধরা খেলাটা আর হবে না বোধহয়!
আমরা উদ্বাস্তু এখন—পাহাড়ের আশ্রিত।

আমরা সবাই মূক;
হতাশা, ত্রাস আর ক্লান্তি ডাকে অলস-তন্দ্রা।
শুধু
আমার নবজাতক বোনটি
যে এখনও মায়ের জঠরের মতো—পাহাড়ের অন্ধকারে,
স্তন্যপানেও অনীহা তার;
ক্ষণে ক্ষণে চিৎকার দিচ্ছে
আর কচি-কোমল হাত-পা ছুড়ছে এলোমেলো
মায়ের বুকে—কী নির্ভীক অক্লান্ত!
হয়তো তার ‘আলো চাই—নতুন আলো।’

আমরা পাহাড়ের গুহায় অন্ধকারে—
পাহাড়ের আশ্রিত, আত্মীয়।
বাইরের আকাশে অসংখ্য লেলিহান শিখা
আমাদের উদ্বাস্তু হওয়ার আনন্দে নাচে!
আমরা অন্ধকারে;

বারংবার
আমার বোনের চিৎকারে তন্দ্রা-ভঙ্গ;
আমরা ভীতু—কাঁপছি, ঘামছি,
প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত-তৃষ্ণার্ত-ক্লান্ত।

এবং
আমার বোনটি ক্রমাগত চিৎকার করছে ।