হোম কবিতা তন্ময় ধরের শিলালিপি

তন্ময় ধরের শিলালিপি

তন্ময় ধরের শিলালিপি
319
0

শিলালিপি- ১
❑❑

তখন অনেকটা বরফ থেকে আমি বাতিল হয়েছি। শিকার করে আনা পাখির মাংসে তুমি আরেকটু ফর্সা হয়েছ। অন্য একটা আলো থেকে অসময়ে ভিজে উঠল চুল। কৃষ্ণসারের চোখে ছায়া নিচু হয়ে গেল।

খনিজ রঙের প্রস্তুতির খুব কাছে লার্ভা তখন বদলে যাচ্ছে। তোমার সাথে আমার কথা শুরু হতেই শাদা এক সুবিশাল বোল্ডার গড়িয়ে এল। অসতর্কতায় আমরা হেসে উঠলাম। তারপরে এক বৃষ্টিলব্ধ কৈশোরের দিকে আমরা হাঁটতে থাকলাম।

এখানে অস্বাভাবিক ট্যুরিস্ট ক্যামেরায় জুম করছেন। আর আমরা এক প্রাগৈতিহাসিক নক্ষত্রের স্বাদের ভেতর ঢুকে যেতে যেতে আঁকড়ে ধরছি পাথর। এরপরেও জ্যামিতিক জল থাকতে পারে। আমাদের রক্তের ঠিক নিচে ঝগড়া শুরু হয়ে গেল।


শিলালিপি- ২
❑❑

অন্ধকার ফুলে ওঠে, লেখে। তুমি আর আমি সেই প্রাচীন পদ্ধতিতেই বয়স কমাতে থাকি মাতার নাভিতন্তুতে। পিতার শাসনে থেকে ঘষা-পাথরে শিকার শিখি। রক্তবর্ণ কুয়াশার মতো ভাসতে থাকে সংসার।

আমাদের অনাবিষ্কৃত কথার গন্ধের উপর জড়ো হয় পাখিদের খেলাধুলা ও পিঁপড়ের দল। আমাদের খিদের ছায়ায় উড়তে থাকে মাছি। তবুও কিছুটা তাজা জ্বালানি বাকি রয়ে যায়। চির-গাছের পাতায় জড়িয়ে পড়ে শৈত্যপ্রবাহের রঙ।

এসব ভেদ করে তুমি উড়ে যাও। রঙচটা শিলালিপির হাতের গন্ধ মেখে তুমি উড়ে যাও। আমার আঙুল ময়লা করতে থাকে অবাধ্য ট্যুরিস্টের দল। চেঁচাতে পারি না; আমার জীবাশ্মের জিভে ভাষা ফোটেই নি কখনো।


শিলালিপি- ৩
❑❑

একটা অন্ধকার পাথরের অপেক্ষা থেকে আমার ছদ্মবেশ তোমায় দেখছে। রাসায়নিক পুনর্জন্মের গাঢ় জিওলজিক্যাল চাপ চূর্ণ করে দিচ্ছে সামান্য হীরের টুকরোয় প্রতিসৃত আলো, জল, শাকভাত। সময় সরিয়ে আরেকটু দ্যাখো এই চিবুক, মৃত তিল, অঙ্গ ও জীবাশ্মের দীর্ঘশ্বাস। কত হিমযুগান্ত ধরে এত খিদে নিয়ে আমি উঠে আসছি নিওলিথ সূর্যের ঘামে।

সে ঘাম সামান্য মৃত। ঘষা পাথরের ছুরি বড় নিঃশব্দে ঘুরছে জৈব রঙে, জায়ফলে, দেবদারুপাতায়। পায়ের দিকে মেঘ বড্ড বেশি হয়ে গেল। ছদ্মবেশের ভেতর আরেকটা ছদ্মবেশে আমি স্নান করি। শরীরেই স্নানের জল শুকায়।

তোমার ভেজা পায়ের ছাপ আমার দিকে তাকিয়ে অভিনয় শুরু করে। সন্তান, নক্ষত্র ও শস্যকাল আঁকতে আঁকতে বাউলরঙা এক অন্ধকারে কতবার বেঁচে উঠি। চির-গাছের পাতা চুঁইয়ে আলো পড়ে আমাদের অর্ধেক জীবাশ্মে।


শিলালিপি- ৪
❑❑

সামান্য দূরে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে সেই কাকজ্যোৎস্না। ঘুম ভাঙানো উচিত নয়। আঁকতে পারি নি বলে’ ভেব না, আমি শিল্পী নই। আমার রঙের ভিতরেই আমার দারিদ্র্য জ্বলছে। পৃথিবীর শেষ আগুনের উত্তাপ আমার চোখে আটকে আছে তোমার ঘুম হয়ে। শিসঠোঁট নেমে আসছে তোমার বয়সী আলোয়।

ঘুমে ভেজা সেই ওষ্ঠবর্ণে আমি আবার জলের শব্দ উচ্চারণ করি। সরে যাওয়া স্রোতের শব্দ ও সময় ভিজে যায় অনভ্যাসে। ভোর হচ্ছে। নিঃসন্তান এক ঘুম ভেঙে ডেকে উঠছে সবুজ পাখি।

প্রাগৈতিহাস বৃষ্টির গন্ধে মাখা অবুঝ এক ব্রেকফাস্টে আমি তোমার জিভ ছুঁয়ে দিলাম। আলজিভ, কণ্ঠ, নাভি—সতের হাজার বছর ধরে একই রঙ ধরে রাখা সহজ নয়।


শিলালিপি- ৫
❑❑

তীব্র শীত সেই ভ্রূণের শরীরে। আমি এঁটো হয়ে তোমার কাছে এলাম। নির্ধারিত রক্তচন্দনের আলোর পরিবর্তে পাথরে কোথাও অভ্যাস, ছায়া, দ্বিধা, আলো, ক্ষুধা এঁকে দিতে হবে। আমি সতর্ক হওয়ার আগেই জন্মান্ধ হরিণের দল পেরিয়ে গেল তৃণভূমির ইতিহাস।

আমাদের ছোঁয়াছুঁয়ি ভেতর দাঁড়িয়ে পড়ে পূর্ণ এক হেমন্তকাল। পাখিদের খেলাধুলা থেকে জুড়ে জুড়ে আবার সেই ছায়াশস্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মৃত সন্তানের রঙ ও লার্ভা নিয়ে আরেকটু ঘুমিয়ে পড়ে আমাদের প্রেম।

মুছে ফেলা সেই যন্ত্রণার সামনে আমার নিঃসরণ হয়। আমিই হেসে উঠি প্রাচীনতম রুমালচোরের মতো। একবার মিলোঁ হমসে হাম শ’বার মিলেঙ্গে/ হাম অ্যায়সে কাহাঁ তুমকো তলবগার মিলেঙ্গে…

তন্ময় ধর

জন্ম ২১ নভেম্বর, ১৯৮০; দেরুদান, ভারত।

শিক্ষা : ডক্টরাল গবেষণারত (আবহবিদ্যা এবং নভোবিদ্যা)
M.Tech in Atmospheric Science (Pune Central University)

পেশা : বৈজ্ঞানিক (বিশ্ব ব্যাংক), কর্মস্থল দেরাদুন।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ—

পুনর্জন্মান্ধ ৎ সংখ্যায়ন [এখন, ২০১১]
ভূর্জপত্রে নিরীশ্বর আঙুল [জার্নি, ২০১৩]
রুরু হরিণীর জন্য [উষ্ণিক, ২০১৪]
কথা সরীসৃপ [উষ্ণিক, ২০১৫]

আকাশগঙ্গার কথা [জ্যোতির্বিজ্ঞান, উষ্ণিক, ২০১৫]

সম্পাদনা—

উষ্ণিক ব্লগজিন (কবিতা)- http://kaboshnik.blogspot.in/
উষ্ণিক ব্লগজিন (অনুবাদ কবিতা)- ushnik.weebly.com

নিয়মিত কবিতা লিখছেন দেশ, সানন্দা, কবিসম্মেলন, কৌরব, নতুন কবিতা, ভিন্নমুখ ইত্যাদি পত্রিকায়।

ই-মেইল : tstorm.tanmay@gmail.com

Latest posts by তন্ময় ধর (see all)