হোম কবিতা ট্রাভেলব্যাগ ও বিবিধ হাওয়া 

ট্রাভেলব্যাগ ও বিবিধ হাওয়া 

ট্রাভেলব্যাগ ও বিবিধ হাওয়া 
922
0
১.
সমুদ্রের সামনে মানুষ হতবিহ্বল বসে পড়ে। তারা কী ভাবে তখন? পুরনো প্রেম, জলাকাশের বক্ষবন্ধন, নাকি নিজের ক্ষুদ্রতা; মৃত্যুচেতনা? বলা হয়: একবার সমুদ্রে নামলে সেই মানুষ আর বাড়ি ফেরে না, অস্থিচর্ম-কেশ-কাঠামোতে ফেরে অন্য কেউ। বুকসমান পানিতে ডুবে প্রেমিকাকে চুমু খেলে সেও একটা জলকন্যা হয়ে যায়, অনেক খুঁজেঢুঁড়ে তাকে যদিবা ফেরানো যায় তবু ওর ত্বকে খেলা করে লবণ ও লাবণ্যের রহস্য। কেন যায় মানুষ সমুদ্রে? কোন অলত প্রাসাদ, হৈহৈ বিয়ার, হাওয়াই চপ্পল? তারপর কেনই বা বসে পড়ে? দ্যাখে তৃষ্ণার পেছনে ছোটা কত বর্ণাঢ্য ছিল, অথচ ঢেউ কত সরল, গাম্ভীর্যময়, তৃষ্ণা মেটানোর দায় তার নেই। আজীবন জলের পানে ছোটা মানুষ তাই সমুদ্রের সামনে বিহ্বল বসে পড়ে, প্রথমবারের মতো তাকায় নিজেরই পানে


২.
নিয়ত ঝাউসরণি, ক্রমশ গর্জন হে—তোমার জানা উচিত
ছুটিদিনেরা জগতে সবচাইতে বিলুপ্তপ্রায়। হিলসভিউ রুমে
জেগে ওঠা মধ্যরাত। প্রকাশিত সাগরমন্থন, সঙ্গম—
ফের পাঠ করো চলোর্মি, তোমার বাঁকে ভেসে আসা ঝিনুক—
                                           কুড়াও, লুকাও, লীন হও অক্লেশে
মুক্তা—সংগুপ্ত উজ্জ্বল অসুখ আমার, শুয়ে আছি বালিতে
                                           মুঠি গলে ঝুরঝুর—ভেজা বিশুষ্ক
ভালো থেকো নিয়ত ঝাউসরণি, ক্রমশ ক্ষীণগম্বুজ ঢেউ
ভালো থেকো বিলুপ্তপ্রায় ছুটিদিন, ক্রমশ গর্জন হে—
একদিন বৃষ্টিমগ্ন পাহাড় থেকে বের করে আনব
                                           আমাদের চিরকালীন সন্ধিস্মারক


৩.
পাহাড়ে কি চুম্বক থাকে লুকানো, নাকি স্মৃতিলেখ মেঘমক্তব? অসম গীত থেকে পালিয়ে পালিয়ে বাঁচা? কেন এই পাহাড়যাপন, নিশিলগ্ন হাওয়াই শার্ট—হাতে শাদা ছড়ি, মায়োপিয়া নিয়ে মায়াপিদিম বরাবর ছেঁচড়ে-পাঁচড়ে চলা? কী আছে ওতে? যখন জানা—দূরত্বই সৌন্দর্যের আত্মা, কাছে গেলে ফুটে ওঠে সকল দীনতা—আমাদের কদাকার মুখ, ব্রণের দাগ, ষষ্ঠপ্রহরে ঝগড়াতুমুল। তাহলে কেন ধরি মুঠিতে প্রাণ? উঠি পাহাড়ে? অর্জন বলতে, খুব ভালো নীল মাখা হলো ক’দিন, নিয়ম ভেঙে সেক্স হলো খাড়িকাদায়, উঁচু থেকে চরাচরে পাঠানো গেল ঝাপসা হাতনাড়া। আর আমি, দেখলাম, চেনা মানুষীর ভেতরে কেমন রয়ে গেছে চির-অচেনা পাহাড়; বেগুনি উপত্যকায় মুচকি হাসছে চির-অধরা ফুল…


৪.
গমের শিষের পেছনে ডুবে যায় সূর্য। নদী তখনও ওয়াই আকৃতি নিয়ে বহমান। বিচ্ছিন্ন হলো; তিন মাইল ভাঁটিতে মিলিত হলো আবার, সে কি সিংড়া ফরেস্টকে আলিঙ্গনের নিমিত্তে? পাতকুয়ার পাড়ে উদোম স্নান হলো ঢের, জানা গেল মেঘবল্লর। সূর্যাস্তেই কেন চেপে বসে প্রস্থানভাবনা? তীব্রতর হয় শালপুষ্পঘ্রাণ? বলা হয় : এমন আলোয় জীবন বদল করা যায়। দিগন্ত ছোঁয়ার সাধ্য নেই মানুষের, দৃষ্টি খানিক পারে; সেই অন্যজীবনে কোথায় যায় মানুষ? দিনান্তে একলা হিজল-করবী, রাতে শসীকলা, জোনাকরঙ্গন—তবু সূর্যাস্তে বিমর্ষ, বিপন্ন ও স্থৈর্য বোধ করে সে। কারণ ততদিনে তার জানা হয়ে যায়: খরগোশ বা কচ্ছপ যেই হোক না কেন, প্রকৃত গন্তব্যে পৌঁছানোর সাধ্য কারো নেই। শুধু গমের শিষের পেছনে ডুবে যায় সূর্য…


৫.

যেখানে দাবানলের শেষ সেখান থেকেই প্রকৃত বনস্থলি

সখা হেএসো সাতভাইঘুম-পদ্মঝিরি। এই চিরহরিতে বুনো পুষ্পই একমাত্র আইন, গন্ধ তার গন্ধমের অধিক। এসো মানুষসংসারী, ক্লান্ত ও সাধুদ্যাখো ঝিলিমগাঁওঝরনার কোমর, পাতার মিহি কটাক্ষ, স্মৃতির মচমচ। এমন আলোরহস্য যেন আগুন ও লাবণ্য, পাশাপাশি বসে আছে স্থির ও যৌবন। এসো চিরপ্রতারিত মানুষবন্ধু/বান্ধবী নিয়ে, শ্যালিকা/জ্যাঠাস নিয়ে, অথবা একাসাথে ট্রাভেল বই আর গা-ঢাকা দেয়ার সরঞ্জাম। এইখানে কৈশোর পায় বনমোরগের উচ্ছ্লতা, যুবতী পায় অনন্য ভাঁটফুল, বুড়োভামও লাভ করে আরক যৌবন।

যৌবনসেও এক ভীষণ বনাঞ্চল, প্রান্তবিন্দু ঘেঁষা দাবানল, চিরহরিতের মুকুট…

মাজুল হাসান
মাজুল হাসান

মাজুল হাসান

কবি ও গল্পকার
জন্ম : ২৯ জুলাই ১৯৮০, দিনাজপুর।
পড়াশুনা করেছেন দিনাজপুর জিলা স্কুল, নটরডেম কলেজ
ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অর্নাস।।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ:
বাতাসের বাইনোকুলার ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১০।
মালিনী মধুমক্ষিকাগণ ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১৪।
ইরাশা ভাষার জলমুক ● চৈতন্য, ২০১৬।

প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ:
টিয়ামন্ত্র ● ভাষাচিত্র প্রকাশনী, ২০০৯।
নাগর ও নাগলিঙ্গম ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১২।

অনুবাদগ্রন্থ:
টানাগদ্যের গডফাদার, রাসেল এডসনের কবিতা ● চৈতন্য, ২০১৬।

মাজুল হাসান পেশায় সাংবাদিক। বর্তমানে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে বার্তা বিভাগে কর্মরত।
মাজুল হাসান
মাজুল হাসান