হোম কবিতা জুয়েইরিযাহ মউ-এর কবিতাগুচ্ছ

জুয়েইরিযাহ মউ-এর কবিতাগুচ্ছ

জুয়েইরিযাহ মউ-এর কবিতাগুচ্ছ
454
0

প্রযত্নে : মাছের দালান

পথে হাঁটলে শিশুদের চোখ দেখি, বিরক্ত-হাসিখুশি-কান্না। থেমে থাকা ফাঁকা বাসটিকে মাছেদের ঘর মনে হয়। সমুদ্র কিংবা অ্যাকুরিয়ামে আটকে পড়া। মাছ আসে, মাছ ভাসে, ভাঙা লোহা, খুলি-মাংস-মানুষ-শরীর।

গোল চোখ গড়িয়ে যায়। রাস্তায়-বাসে-রিক্সায়-টেবিলে। পিরানহা মাছেরা মিথ থেকে উঠে আসে খাবারে। এর মাঝেই দু’তিনটে মশলার নাম বদলে যায়, শহরে পাঁচ-দশটা নতুন খাবার চলে আসে।

প্রযত্নে : সুন্দরবন

কাছিমে একটা ঘোর আছে আমার। খোলস আর ধীরতায় কাছিমকে মৃত্যু আর বেদনা মনে হয়। মাছকে কানকা, সাপকে বিষ আর ডলফিনকে ঝাঁপ ভাবতো স্বর্ণা বৌদি। গুঁইসাপ নিয়ে অবশ্য কখনও ভাবে নি…

চকচকে কালোর মাঝে এ-সমস্ত ইতিহাস। বস্তুত স্বর্ণা বৌদি কোনদিন গুঁইসাপ দেখেনি, ডলফিন তো না-ই। একদিন ডলফিন দেখার লোভে বের হয়ে গিয়েছিল ফল খরিদ্দারের সাথে। এগুলো পাড়ার দোকানে-দোকানে লেখা থাকে। নতুন মানুষেরা সব ভুলে-টুলে গেলে স্বর্ণা বৌদি কাছিম কোলে করে ঘরে ফিরে। আর একটা গুঁইসাপ বহুকাল ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে ছিল তেলতেলে কালো গায়ে মেখে।

প্রযত্নে : পরগ্রামচর্চা

গল্প বলতে বলতে ডান দিকে হেলে পড়ে সিমেন্টের থাম। রাখতে পারো তখন অসংখ্য সংখ্যা আর চিত্র আঁকা সাদা জমিনে হাত।

আপনার মেয়েটাকে দেখেছেন? চুল উড়ছে, চোখের নিচে দাগ। কালো নয় নীলচে। ফড়িং ধরতে ধরতে তেলাপোকা ধরে মুখে পুরে নেয় শিশুরা। সিঁড়ি ভেঙে উঠে যাওয়ার সময় এসমস্ত আমি দেখি।

আধেক স্তন আঢাকা রেখে ততক্ষণে রান্নাঘরে পৌঁছে গেল স্বর্না বৌদি। শিশু হয়ে গেলে পরে কোনো কোনো নারী ভীষণ অবসাদে ভোগে।

গল্প বলতে বলতে পাথর পিছলে পড়ে যাচ্ছিলাম আমি। পাথরেও অসংখ্য আঁক, অনেক নামের পরে যোগ চিহ্ন দিয়ে একই নামের বেশ ক’টি প্রেমিকা।

প্রযত্নে : যূথপত্র

খুঁটি চিনতে চিনতে আমি আর পুষ্প যে জায়গায় এসে দাঁড়ালাম তার চারপাশে ইঁদুরেরা কেটে রেখে গেল ঘটনাদের। একটা ঘটনা তখন মিশে যাচ্ছিলো আরেকটা ঘটনার গায়, আর দেখ্‌, পুষ্প ফ্ল্যাটবাড়িগুলো কেমন জাহাজ হয়ে উঠতে চাইছে আজকাল।

সূর্যাস্তের আগে যে অভিন্ন দৃশ্য দুটোকে আলাদা করা গেল না কিছুতে, তার একটায় বাবার পাশে অন্য নারী।

আমি কেবল জানতাম সমুদ্রের নেশার পাশে কোথাও নিশ্চয় থাকে রেস্ট্রিকটেড জোন। তবু পা ঘষে ঘষে সেবার কাঁকড়াদের ঘর খুঁজছিলাম।

দাঁড়িপাল্লায় তখনও বাটখারা তুলছে মাইমলেরা। আর একটা আঁশটে গন্ধের ভেতর দেয়ালটা হুট করে চোখে পড়ল। কয়েকটা যৌন-কথা, এক দু’টা ফোন নাম্বার আর গুটিকতক ঝাপসা গ্রাফিতিও। এইসব পেরিয়ে যদি যেতে পারিস তবে দেখিস সমুদ্র বিশাল দাঁড় করানো সারি সারি জাহাজের পরেও…

প্রযত্নে : প্লাস্টিকের মাছ

বাঘ-সিংহ-মাছ-তিমি বয়ে বেড়ানো মানুষকে অদৃশ্য মনে হতে থাকে। জলজ্যান্ত প্লাস্টিক বাতাসে ভাসে। ঠিক সেসময়টায় শহর সমুদ্রের তলে ঢুকে পড়ে আচমকা।

সন্তের আক্ষেপসহ আক্যুরিয়ামের পাশে নির্বিকার পড়ে থাকে বিড়াল-ছানা। রঙিন মাছেরা সম্ভবত জানে মাছ-বাজার আর মাছের দোকান এক না।

গন্ধ চেনা যায় না বলে পাশ ফেরে যে চোখ, আমি তার আশে পাশে ঘুরতে ঘুরতে দেখি দুই বছরের মেয়েকে কুকুরটা চেটে খাচ্ছে খুব। সব বুকমার্ক হারিয়ে গেলে তাস দিয়ে বুক মার্কড করে রাখি। তাসেরা হাসে নিশ্চয়!

জুয়েইরিযাহ মউ

জন্ম ১৯৮৮, ঢাকা।

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে ‘২য় চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রশিক্ষণ’-এ স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা কোর্সে অধ্যয়নরত।

প্রকাশিত বই :

তাসেরা বুকমার্ক (প্রকাশক—মিতাক্ষরা, ফেব্রুয়ারি ২০১৬)

nirjola_zuairijah@yahoo.com