হোম কবিতা ছায়ার সঙ্গে বাক্যালাপ

ছায়ার সঙ্গে বাক্যালাপ

ছায়ার সঙ্গে বাক্যালাপ
583
0

প্রিয় ছত্রিশ

আজ সকালে তুমিও নিরাকার—আমিও

যে কথা ঘাসের ডগায় জলবিন্দু হয়ে ফুটে থাকে
তাকে কখনোই ছুঁয়ে দেখি নাই, শুধু পার্বণের দিকে
একবার নিস্তরঙ্গ বসে থাকা দেখে ভাবতে চেয়েছিলাম
জোড়া-শালিকের পায়ে পায়ে লিখে দেবো প্রাকৃত অক্ষর

অমোঘ ডানায় কী এমন উদ্ভাস, সত্যাসত্য উঁকি দিয়েছিল
কেউ জানতে পারে নাই; বুঝেও না—বোঝার কুয়াশায়
পুনরায় জ্ঞান পাব, আশ্চর্য আলোর দিকে পাব অধিকার
নিরাকার, বলো নি তো!

এই সকালে আকার-আকৃতিহীন তুমিও, আমিও


সংবাদ

আজ রাতে মৃত্যু হলে কোনো ভোরে, কতদিন পরে
তোমার দুয়ারে সেই সংবাদ পৌঁছাবে কখনোই জানব না
তবুও রাত্রির খাসখামে আঁধার জমিয়ে রাখি
বন্ধ ডাকঘর ছুঁয়ে ছুঁয়ে বলি, ভালো থেকো, তরুলতা

শুনেছি বাবুই পাখি মৃত জোনাকির আলো নিতে জানে
প্রেম আর প্রতিপদ একসাথে বুনতে জানে ঘরের দেয়ালে

আমাদের শুধু দাও, দাও, শূন্য করতল, কপালের বলিরেখা
ভাঁজ, ভাঁজ, কথার কোলাজ—

আজ রাতে মৃত্যু হলে কোনো ভোরে, কতদিন পরে
তোমার দুয়ারে সেই সংবাদ পৌঁছাবে কখনোই জানব না আমি


ক্রসরোড

ক্রসরোডে দেখা হলে কথা বলতে নেই
আয়নার বিদ্যালয় থেকে এটুকু শিক্ষাও নিতে পারলে না

জেনেছ শব্দের আগে কে থাকেন, কী থাকেন
বলে দিচ্ছি, লিখে রাখ নোটবুকে, তাও না থাকলে
টিএক্সটি ফাইলে, অভিমান ভরা আছে চোখের পাতায়

শব্দের পেছনে থাকে নীরবতা
শব্দের আগেও থাকে নীরবতা

আমি তুমি বুঝতে শিখি নি
শিখেছে পারুলগাছ, তাই দেখো
শব্দহীন টেনে নেয় বিষ

ক্রসরোডে দেখা হলে কথা বলতে নেই
পারুলের গাছ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় কিছুক্ষণ

তারপর যে যাহার নির্বাসনে একা


বিজ্ঞান-ম্যাডাম

তারকাবহুল রাতে মনে পড়ে বিজ্ঞান ম্যাডামের কথা
তিনি আলোকবর্ষের হিশাব জানতেন
জানতেন সপ্তর্ষীমণ্ডলের তারাগুলোর নাম
আরও জানতেন—গোলার্ধের কোন দেশে একবার রাত হলে
প্রভাতের জন্য অপেক্ষায় থাকতে হয় ছয় মাস

আমাদের কানে কি আর তত কথা থাকে

তিনি কি জানতেন, আয়নার ভেতরে কোথাও
নক্ষত্রমণ্ডল আছে! বায়ুবিশ্বের সীমানা ছাড়িয়ে
সেখানে সূর্যাস্ত হচ্ছে ক্রমাগত আর আমরাও
বোকা দর্শকের দল, বিষুববলয় ছেড়ে উড়ে যেতে চাইছি
সেই চিরস্থায়ী গোলার্ধের দিকে, মধ্যরাতের নাচের দিকে
সমুদ্র থেকে তুলে নিতে চাইছি নুন, জল, ফেনা

বিজ্ঞান-ম্যাডাম বলতেন তিনি সমুদ্র ভালোবাসেন না
তবে আমরা জানতাম, দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি
একদিন তিনিও সমুদ্র হয়ে যাবেন, বরফের মমি

আমাদের মধ্যে এক সাহসী নাবিক বড়ই তৃষ্ণার্ত ছিল


তৃণভাষা

১.
তৃণভাষা শেষ হয়ে এল
ভাঙা আঙুলের খাঁজে কী এমন রেখেছ অপার
বাদ্যবাজনা ছাড়াই সুরের লহরি ওঠে

২.
তোমাদের একাশিয়া গাছগুলো দেখতে দারুণ
যদি কাছে যাই, বাকলে রাখি হাত, মনে হয়
অন্যান্য গাছের মতোই তো, শুধু দুই বেলা
নাম ধরে ডেকে নিতে জানে—
উড়ে এসে ডালে বসো, প্রিয়তম গোধূলি আমার

৩.
কেন যে অকস্মাৎ ভুলে যাই
কোনোদিন কোনো নাম ছিল, এখন অবশ্য নেই
যেন এক বিষণ্ন গ্রন্থের পাতাপ্যাপিরাস
ভেঙেচুরে কবেই হারিয়ে গেছে

৪.
অথবা পৃষ্ঠাও নয়, মলাট নয়
গোপনে সন্ধান করি হারানো অক্ষরগুলোর
সেই সকাল থেকে মধ্যরাতঅব্দি কী তাদের উড়াউড়ি
কী আত্মপ্রত্যয়, ভাষাবন্ধনের সেতু গড়ে তোলা
ভাঙনের দিকে বিরতিহীন উড়াল

৫.
তখনও বলেছিলাম, এখনও বলছি
প্রতিটি মুহূর্তে জাদুকর নিজের ছায়াকে পেতে চায়
অপরকে লক্ষ করে বাক্যের পর বাক্য ছুঁড়ে দেয়
সামান্য এগুতে চায় বলে নিজের কেন্দ্রের দিকে

৬.
তৃণভাষা শেষ হয়ে গেলে
নিজের জলায় তুমি ডুব দিও আরেকবার
দেখো, ভিজে যাবে সমস্ত শরীর

কিন্তু স্নান—সে কখনো সমাপ্ত হবার নয়


ছায়ার সঙ্গে বাক্যালাপ

কেমন আছো স্বপ্নপাড়ের পাখি, তোমার জন্য সকল ডাকাডাকি
স্তব্ধ করে বসে আছি একা, হাতদুটোতে স্বর্ণখাঁচা রাখা
জলের সেতার ভাঙল বলে ধ্রুপদ খেয়াল এক করানোর ছলে
সন্ধ্যাতীরে আমিও মৃতপ্রায়, কণ্ঠপ্রীতি লুপ্ত হলো যৌথ তামাশায়

কিভাবে আজ রাত্রি কাটে অন্ধকারের ঢেউদোলানো খাটে
তুমিও জানো আমিও জানি ভালো, ঝড়ের গাছে সামান্যতার আলো
আমরা জ্বালাই চক্ষু খোলা রেখে, অরূপ তোমায় একলা ডেকে ডেকে
সরোদ বাজায় আমরা শুনি বিষণ্নতার শ্লোক, পায়ের কাছে রক্তচোষা জোঁক

দুই ভুবনের ভার বয়ে যাই এক ভুবনের লোক, তোমার জন্য শোক
কিচ্ছুটি নেই দেবার মতো কেবলই সন্তাপ, নাও টেনে নাও গহন থেকে স্বপ্নভরা পাপ


ক্ষত

হৃদয়ে তোমার ক্ষত—চিরস্থায়ী দুখ
ছুঁয়ে তাকে দেখি নাই কোনো মধ্যযামে

কেবল ছুঁয়েছি চুল—হাওয়ার মাস্তুল
দেখেছি ঝড়ের বুকে আরও একটা ঝড়
গোপনে জন্মায়, বড় হয়, সমর্পিত হতে ভালোবাসে

তাকে তুমি অশ্রু নামে ডেকো, নীলপদ্ম,
খুব সুখে গড়িয়ে পড়লে
আমি ছুঁয়ে দেবো

তোমার লুকানো মধ্যযাম


সাক্ষাৎকার

পৃথিবী তখন ঘুরছিল
কেন্দ্র ঠিকঠাক রেখে
সূর্যের কেন্দ্রের চারপাশে

সূর্যও তখন ঘুরছিল
অজ্ঞাত কেন্দ্রের চারপাশে

এরই মাঝে হয়ে গেল
অশেষ দেখাসাক্ষাৎ

সূর্য বা পৃথিবী কোনোটাই একটুও থামল না
বলল না, ভালো থাকিস প্রিয় বিদায়রেখা
রক্ত ঝরানোর পালা শেষ হোক তোদের এবার

এ-থেকেই বোঝা যায় পর্বতের আনুগত্য মূষিকের দিকে নয়


মহাশ্মশান

তার কাছে যাচ্ছি না
তার মানে এই নয়
কখনো যাব না

আর কেউ না-জানুক
নিজে তো অন্তত জানি
সে-ই আমার শেষ গন্তব্য

অনন্তে বিলীন হবার


সমাজতন্ত্র

মুখে তো বলি নি কখনোই

সমান দু’ভাগে তবু ভাগ হয়ে গেছে
বেদনাও। উপজীব্য বাক্যের আশ্রয়
অসংখ্যবার নিয়েও নিজের কাছেই
আমরা থেকে যাই অর্ধ-পরিচিত

এদিকে বেদনা ভাগ হয়ে যায়
সমান দু’ভাগে

 

মানস সান্যাল

কবি ও কথাসাহিত্যিক। জন্ম ৩০ ডিসেম্বর, ১৯৮২; ঈশ্বরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, বাংলাদেশ। আনন্দমোহন কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ করেছেন। পেশায় ব্যাংকার।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ—

আহত জামার জন্য শোকপ্রস্তাব [শুদ্ধস্বর, ২০১৪]
তারার আলোয় কোনো ছায়া হয় না [মেঘ প্রকাশন, ২০১৬]

ই-মেইল : manashks@gmail.com

Latest posts by মানস সান্যাল (see all)