হোম কবিতা চি‎হ্ন‎হীন দিনের ডায়েরি

চি‎হ্ন‎হীন দিনের ডায়েরি

চি‎হ্ন‎হীন দিনের ডায়েরি
344
0

এবারের বইমেলায় বেরুলো শুভাশিস সিনহার ৬ষ্ঠ কবিতার বই চিহ্নহীন দিনের ডায়েরি। প্রকাশক : চৈতন্য। প্রচ্ছদ : তৌহিন হাসান। এই কবিতার বইয়ে তিনটি পর্ব রয়েছে:
১. চি‎হ্ন‎হীন দিনের ডায়েরি  ২. জলটলমল শব্দতরল  ৩. অশ্রুসংহিতা।

 কয়েকটি কবিতা মুদ্রিত হলো পরস্পরের পাঠকদের জন্য…

 


চি‎হ্ন‎হীন দিনের ডায়েরি  থেকে



নিশানা তো ঠিক থাকছে, শেষাবধি চোখের পলক শুধু  জেগে থাকলে হয়…

সারারাত শানানো তীরের ঝলকানি অন্ধকার চিরে চিরে বিদ্যুৎরেখার মতো ক্ষেপে
নুয়ে থাকা কলার পাতাকে খোঁচা দিয়ে উপরে তুলেছি, পর্বতের চূড়ায় ওঠানো সর্বনাশ
আগামী বর্ষার জল হয়ে নেমে পড়তে পারে, তারও আগে রচিত হবে এ অনর্থকাহন

নিশানা এখনও ঠিক, সংবেদন ঘুমিয়ে পড়েছে স্নায়ুমায়ের বাৎসল্য ছলনে ভুলনে
থরে থরে মাংসের পসরা সাজানো নষ্টভ্রষ্ট জীবনের আমূল ভেতরে যাবে তীর, ঘুমিও না আজ…


নয়নতারার কাছে এক বিন্দু হেলায় ফেলানো আলো আছে, তারই জন্য
রাত্রিবেলা শিশু কাঁদে, বলে, নয়নতারাকে আনো, ঘরে অন্ধকার, আসলেই কৃষ্ণপক্ষ শেষে
প্রেমের প্রদীপগুলো জলে ডুবে গেলে অন্ধ হয় হৃদয়ের বাসনাকাঞ্চন
নয়ন নক্ষত্র হয়ে ওঠে, নীল নভোমায়া চিরে দৃশ্যফোয়ারায় দেয় ভাসিয়ে আকাশ

ঘরে তো অভাগী অন্ধকারিনী ফোঁপায়, তাকে দেখে বিড়াল পালায়, কুকুরেরা
দূর থেকে ঘেউ ঘেউ করে, যেন তারা বলে ওঠে,
আনো আনো নয়নতারাকে আনো, তার কাছে আলো আছে,
চির-অন্ধ যামিনীর আঁচলে লুকানো আলো সে তো নয়, ভুলেও সে নয়!


জল থেকে অবশেষে আগুনই ছড়িয়ে গেল দিক-দিগন্তরে, ঢেউয়ে ঢেউয়ে
বাড়ছে শিখা তার, তটে তটে ফুলকির উৎসব, জলের ওপরে অনিচ্ছায় ঘাই-মারা
বৈঠার ফ্যাকাসে মুখে অস্তগামী সূর্য লালরঙ ঢেলে দিল
জোয়ারের তলে ঘুমন্ত বালির দানায় দানায় তর্ক বাঁধে, আঁটোসাঁটো নদীটির
দেহ থেকে শতেক কুমারী মেয়ে কাঁখে কলসি নিয়ে নেচে নেচে চলে,
অবশেষে জলের মৌনতা থেকে শুরু হলো শব্দের মিছিল
বাষ্পাতুর আকাশের নিচে ভস্ম-ওড়া সমাপ্তির শেষবিন্দু থেকে।


হাতে যা ধরেছি অনিমেষে, তা আসলে ধরেছে আমাকে, টেনে টেনে
নিজের নিকটে নিয়ে গোপনে হাজির করে শত শত বিষপোকা, ফিসফিসিয়ে
বলেছে, ধরো তো ধরো, জীবন ক্ষয়েছে হুলে হুলে, শত হুলস্থুলে, তবু হাতে
ধরতে গিয়েছি অবিরত ক্ষত-বিক্ষত জীবন, হাসির বকুল ফুলে শাদা শাদা গন্ধ বরিষণ
ভিজে সারা অঙ্গ ভঙ্গ, শরীরের রন্ধ্র ছিঁড়ে থোকা থোকা করবীর মুখ
ছুঁয়ে দেখি, সে আসলে আমাকে ছুঁয়েছে, জানে বলে, মৃত্যু সরল সহজ
কাঁটাঝোপে অথবা ডাঁটায়, গন্ধে গন্ধে, পরশনে পরশনে ভাসে, ডুবে যায়…


জন্ম হয়েছিল, তবু পায় নি জীবন
রক্তের ক্লেদের মাঝে হাতড়াতে হাতড়াতে
সন্ধ্যা এসে তার
মধুর সে-সূর্যালোক গ্রাস করে নিল

অন্ধকার-নাড়ির মায়ায় জড়াতে জড়াতে নিজ দেহ
তলিয়ে গিয়েছে ঘুমে, তবু সে ভেবেছে এ-ই জাগরণ

শুধু কিছু কণ্ঠমরা-পাখি কানের কুহরে ঢালে বিষ
পালকের নকশায় দেখা অন্য কোনো জগতের দাগরেখাগুলো
অবশেষে তাকে যেন ফাঁদে টেনে নেয়
এই ভেবে চন্দ্র আর নক্ষত্রের প্রেতিনি আগুন এসে
বাস্তুসুন্দরীর সব হাড়মাংস খেল

জন্ম হয়েছিল, তবু জীবনের পেল না সন্ধান ।

 


জলটলমল শব্দতরল  থেকে


জলকন্যা

‘জলকে চল’ বলে জলেই ডুবে গেলে
তখন আশ্বিন ভাদ্র,
ঋতুর মীমাংসা রোদে ও কাশফুলে
খানিক শুষ্ক বা আর্দ্র।

ওপরে ঢেউ নাচে, নিচে কে সাঁতরায়
মৎস্যদেশে গেলে সজনী,
আলোতে ভাসা এই অন্ধ নদীতীর
ফোটালো কালশাখে রজনী।

তারায় কে হারায় নয়নতারা দুই
কে আছো টেনে নাও বুকে,
কত যে ডাকাডাকি, শ্রুতিও পিচ্ছিল
লুকালো ইথারের সুখে।

‘জলকে চল’ বলে জলেই ডুবে গেলে
আমার হাতে ধুলো-মাটি,
হলুদ ঘোরে যাও সাঁতার, আমি এই
শূন্যে বিছালাম পাটি।

 

বেগ ও আবেগ

এই যে ঘাটের কাছে জল
নাও তুলে হাতে যত ধরে,
পা রেখেছ গভীর অতল
হৃদি-ওড়া ধু ধু বালুচরে।

এই যে তোমার কাছে যেতে
গতির বাতাসে কানা ঘোড়া
পশমে পশমে প্রেমে মেতে
ওঠে, দেখো, নীলাকাশ-খোঁড়া।

আকাশের বুকচেরা পানি
তোমারই চোখের পরে ঝরে,
বরষায় সহসা উজানি
ভালোবাসা ভাসে থরে থরে।

এইভাবে কিছু হলো, কিছু
না-হওয়া কালের পেটে ঢোকে,
ভাষা ছোটে না-পাওয়ার পিছু
কে আছে তাহার পথ রোখে!

 

কাহিনী ও কথক

আমি যে গল্প বলি তুমি তার শেষ জেনে ফেল, তাই
মাঝখানে শুধু থামাও, কেবল অন্য গল্প চাও
একটি বয়ান হাওয়ায় উড়িয়ে অন্য বয়ানে যাই
তুমি থরথর একটি হাত বাড়াও।

গল্পের মাঝে ভগ্ন বাঁকের কাছে
চমক দেখানো নোলক ঘুমিয়ে থাকে,
ঠোকরায় কত জোঁকে কাঁকড়ায় মাছে
‘শুরু হোক, শুরু’ হাঁকে।

আমি যে কান্না-হাসির জোয়ারে ভাসতে ভাসতে ডুবি
তার ভাষা-তরী তোমাকেই নেয় কোলে,
যতি ঝঞ্ঝায়, ছেদও গর্জায়, প্লট নড়বড়ে খুবই
দুধে ও রক্তে কাহিনীও পথ ভোলে।

 

দুয়ারে দুয়ারে

দুয়ারে দুয়ারে গিয়েও কেবল চৌকাঠ পেরোনোর
ভয়ে দাঁড়িয়েছি, ভেতরে তখন জলসা চলেছে মহা
নদীনীল থেকে জলস্রোতা কোনোকালে
অঙ্গের বিভাবরী সর্বংসহা।

আমাকে ডাকল একটি আঙুল নাচের মুদ্রা ভেঙে
গাড়িয়াল কেন সেই বাঁকে থামল না
মেঘ হয়েছিল ভাদ্র-আঁতুর তবু
মাটির শরীর একটুও ঘামল না।

দুয়ারে দুয়ারে চৌকাঠ এক ঘোমটার মতো ঘেরে
ভেতরে মেরেছে উঁকি সূর্যের সোনা
হৃৎপিণ্ডের চলনের পথে নিকষ অন্ধকার
জোনাকিতে জোনাকিতে হলো জাদুটোনা।

কত জলসায় মোহিনী ভরতে কত্থকে বাঁকা ভঙ্গি
আমাকে ডাকল একটি আঙুল ভুলে
চৌকাঠে থামা পায়ের পাতায় জল ঢেলে দেয়া চোখ
সাজালো শয্যা মৃত্যুপাপড়িফুলে।

 

শরৎ-অভিসার

গোপনে শাদা এক শিউলি ঝরে গেল
আলোক-নিভানিয়া দিনে,
অকালে কালোমেঘ গর্জে ধেয়ে এল
পতনমুহূর্ত চিনে।

পতিত সুন্দর গন্ধে বিবসনে
বিস্তারিত করে আলো,
সুতোয় গেঁথে নেবে শুভ্রকাম মনে
এমনই বাসা হবে ভালো।

ভালো তো বেসেছিল রাতুল ও-চরণ
ধ্বনিতে ধমণিতে বাজে,
ধবল শরীরের রন্ধ্রে হা-মরণ
গন্ধমাধুরীতে সাজে।

সেজেও কুরূপা সে, ভাঙলো সাজঘর
গোপন সব হলো রাঙা,
শিউলি ভাষাহীন অ-চিন অক্ষর
বাজলো বাঁশি খেলাভাঙা।

 


অশ্রুসংহিতা  থেকে



নিশীথ নিশীথ !

শুনল না কেউ,
নিশীথ বাড়িতে নেই
অন্ধ বন্ধ মনের ভিতর
মন্ত্রে মন্ত্রে যাত্রাপথ খুলে
বাঁশপাতি সাপের মতো সে ঢুকে গেছে
মহাগোধূলির ঘরে

ঘরে তোর বউ বাচ্চা
মাটিতে লুটিয়ে কাঁদে
আলোর সোনার ফুল গাছে গাছে
কামনা জাগায়

ঘোর হতে চাওয়া তিথি
পায়ের ঘুঙুর খুলে
ফাঁস নেবে,
দাঁড়াল গাছের নিচে

ঝাঁকে ঝাঁকে দুরন্ত তারকা
আসছে মিছিল করে
তোর চুলে
মুখের রেখায়
হাতের মুঠোয় ঢুকে যাবে হড়হড়

নিশীথ নিশীথ !

হা-নিশীথ কোথায় উধাও।

শুভাশিস সিনহা

জন্ম ২৯ জানুয়ারি ১৯৭৮, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার ঘোড়ামারা গ্রামে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। বর্তমানে মণিপুরি ললিতকলা একাডেমিতে নাট্যপ্রশিক্ষক।

প্রকাশিত বই :
ডেকেছিলাম জল (কবিতা)
অক্ষর নতুন করে চিনি (কবিতা)
বেলা দ্বিপ্রহর (কবিতা)
হওয়া না-হওয়ার গান (কবিতা)
দ্বিমনদিশা (কবিতা)
আবছায়াদের রূপকথা (গল্প)
প্রতিরূপকথা (নাটক)
কুলিমানুর ঘুম (উপন্যাস)
ইঞ্জিন (উপন্যাস)
ভাষা, কবিতা ও রবীন্দ্রনাথ (প্রবন্ধ)
রবীন্দ্রনাথ : গ্রামের ছবি (গবেষণা)
মণিপুরি সাহিত্য সংগ্রহ ২খণ্ড (অনুবাদ ও সম্পাদনা)

ই-মেইল : shuvashissinha@yahoo.com