হোম কবিতা কবিতাগুচ্ছ : নিম্নকোটির বাঞ্ছাপ্রদেশ

কবিতাগুচ্ছ : নিম্নকোটির বাঞ্ছাপ্রদেশ

কবিতাগুচ্ছ : নিম্নকোটির বাঞ্ছাপ্রদেশ
1.33K
0

বাঞ্ছাপ্রদেশে উড়ছে হাপুর-হুপুর,
কেশকম্বলীর ছাই,
মঞ্জরি ডাকছে কাছে, সেই দিবে ঠাঁই!

 

এক.

নিম্নকোটির বাঞ্ছাপ্রদেশে ছাই উড়ছে, মগ্ন সুশীল ল্যাঞ্জা উঁচিয়ে হাই তুলছে। যুক্তবেণির পাশে খুলে পড়ছে টাই। তাদের কোনো অটলবিহার নাই! শরীর পুড়ছে, অট্টহাসি ছড়িয়ে পড়ছে পেট্রলবোমায়। তবু শরীরে তাঁদের ঘুমিয়ে আছেন সাঁই, বৈরাগী মালায় নাচে চৈতন্য গোঁসাই!

 

দুই.

ওই কাঁটাতারে দেখি যারে, তাঁর ঘুমন্ত অবয়বে রাত্রি মশগুল, অবোধ্য, হাওয়ায় স্ফীত লাল ফল, যেন চিনি ওই ফেঁপে ওঠা ভূগোল, ঠিক দ্বীপে ফেরা, নর্তকের প্রাণোজ্জ্বল দীপ! সেই বুঝি ফিরে ফিরে যায়, দূরে উড়ন্ত মেঘদলে।

 

তিন.

ফণীভূষণে আটকে রেখো না
জংলিপনা
এই ফাল্গুনে উড়তে শিখুক
ভোলা-মনের ভুজঙ্গনা

 

চার.

আমার কোনো কিছুই নিখুঁত নয়
তুবড়ানো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঠাট্টায় ভরা
এসব নিয়ে ভাবি
জীবনের দগদগে ঘা ভেসে ওঠে
মনে হয় নিজের খুলির ভিতর
সেঁকা মাংসের ঘ্রাণে
উড্ডীন মনুষ্য প্রণতির শ্বাস

অবিরাম জলপড়ার শব্দ ঘোরে
নাচে বিভূতিনন্দন
অভিজ্ঞতার টোপ খাওয়া রোদে
নীরবে যখনই তুমি পাশে এসে দাঁড়াও
উপচে পড়ে
ম্লান আলোর টোল পড়া গাল

প্রবল অস্বীকারের ঢেউয়ে এলেমেলো
নিজস্ব
মুখোশের দিকে তাকাই
ঝাউবনের নীরবতা চিবুক ছুঁয়ে যায়

 

পাঁচ.

ওগো পাতার ধ্বনি, কুলহারা রাতের
শাখে, বসো একটুখানি। গভীর রাতে
তোমার স্বরেই ভেসে উঠুক আমার
চিন্তামণি। তারপর উড়ে যেয়ো, হাওয়ার
পালে উড়িয়ো শতস্নিগ্ধ ডানা। নিকটে
সবুজ ঘাসে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থেকো, দূরে,
সরে যেয়ো না। যদি দূরে যাও, রেখে যেয়ো
তোমার মৃত্যুপথের ছায়াব্যঞ্জনা।

 

ছয়.

সবাই ফিরছে যে যার খোঁড়লে
জলপড়ার শব্দে পুরনো আয়নায় অনেক মেঘের সাথে
ভেসে যাওয়া মুখোশের ভিড়ে
ঝিলিক দিয়ে উঠছে টোপ খাওয়া রোদ

বক্ষভেদী ছুরির সাথে হাসছে মোনালিসা

ওষুধের দোকানে কাঁচুমাচু মুখ
মনোভুবনে
তাঁর সর্ষে ক্ষেতের হাওয়া
বদলে নিচ্ছে রিস্টওয়াচ, বেডকভারের দাগ

টুকরো হচ্ছে ব্লেডের ছায়া
হাওয়াসিন্দুক
চামড়ার তলে লুকিয়ে রাখা শোকানুভূতি
জোড়া দিচ্ছে
স্নান শেষের টোলপড়া গাল

আবারও জানালার রোদে কারো চুলের গন্ধ উড়তে উড়তে পথ ভুলে গেছে
অবদমের পাতাবাহারে
মুছে গেছে বৃষ্টির ঘ্রাণ

 

সাত.

জলের তলে একটা লাল ঝুঁটি দেখতে দেখতে
প্রতিদিন ঘৃণার ব্লেডে বেড়ে উঠছে
পদ্মদৃশ্যের ত্রিভঙ্গি মমি

তাতেই লেগে আছে নতমুখের মৃদু হাসি
খুনির চোয়াল

বৃষ্টিব্যঞ্জনে তার দিকেই তাকাই

জংলিপনা ঠেলে
দেহ ধুয়েমুছে কুয়াশামুগ্ধ আয়নায় ফেরত আসে
ফের অব্যক্ত আড়াল

দূরে বৃষ্টিতে ভিজে চলেছে অনেক ভগ্ন আলতার শিশি

 

আট.

স্বপ্নের ভেতর খেয়াঘাটে বসে থাকি, অব্যক্ত মুগ্ধতার আড়ালে নেচে যায় তরঙ্গবিক্ষুব্ধ রোদঝুঁটি, হর্ষনদে ঠাট্টার মধ্যে, কামিনী ফুলে, উপহাসে, বোবা হয়ে বসে বসে ভাবি, নৃশংসতা ভালো লাগে খুব, ভালো লাগে বাঙ্ময় অন্ধ ধূসর ছাইদানির বিহ্বলতা, ছায়াদেহ তলে হেসে ওঠে মরীচিকা।

 

নয়.

তোমাকে যেভাবে দেখি তা তো আহরিত আলো, সত্য
শূন্য পৃষ্ঠায় মৃদু হাসির টোল

ধরতে পারি না

প্রতিক্ষণে দৃষ্টিসীমায় ভাসছে তারই অহং

ভিনদেশি ফল নও, জানি
তুমি নও শৈবলিনী

সাদাকালো বৃত্তে তুমি শিহরিত লাল চিন্তামণি!

 

দশ.

সুখী দেশে অসুখী মানুষ
তাদের মুখোশের তলে লুকিয়ে রাখা তামাটে বলিরেখায়
প্রবঞ্চনার ছায়া ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই

উধাও হয়েছে আত্মমুগ্ধ
ধূলিকণা

অসুখ আর নিম্নকোটির স্নেহভরা জাহাজের দিকে ঠেলে নিচ্ছে
ক্ষীণমনুষ্য শরীর
ভালুকের মুখে লেগে থাকা রক্তের মতো ভেসে উঠছে
স্মৃতি

আজ যদি অসুখী মানুষেরা উগ্র ঘৃণায় দুলতে থাকা নিজেদের
মুখোশটা একটু উল্টিয়ে রাখে
হয়তো দেখবে ওখানে শুধুই আত্মপ্রবঞ্চচনার দাগ

সত্যিই কোনো মাধবীলতা নেই

মুক্তি মণ্ডল

মুক্তি মণ্ডল

জন্ম ২২ জুলাই ১৯৭৬, চুয়াডাঙা।

সমাজ বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
পেশা : গবেষণা।

গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বই :
ঘড়ির কাঁটায় ম্যাটিনি শো (কৌরব ২০০৮)
পুষ্পপটে ব্রাত্য মিনতি (জোনাকরোড ২০০৯)
উন্মাদ খুলির পৃষ্ঠাগুলি (আবহমান ২০১১)
ভেল্কিবাজের আনন্দধাম (এন্টিভাইরাস ২০১৫)

ই-মেইল : mukte.mandal@gmail.com
মুক্তি মণ্ডল