হোম কবিতা কবিতাগুচ্ছ : জীবন এক জ্ঞানভয়

কবিতাগুচ্ছ : জীবন এক জ্ঞানভয়

কবিতাগুচ্ছ : জীবন এক জ্ঞানভয়
1.64K
0

জীবন এক জ্ঞানভয়

বিষাদের গিরিপথে তুমিই এলে প্রেত, নিয়তি?

তবু আমি কথা বলে গেছি স্তব্ধতার তীক্ষ্ণ মিনার থেকে জাগা আজানে আজানে। আন্ধা হাফেজের মতো, বুলবুল ভিখারির মতো কথা বলে গেছি সেসব রাস্তায়—সিসার ঘ্রাণে বুঁদ মরা-নদী, কড়িকাঠ, টংঘর আর মেহেন্দি গাছের কাছে গচ্ছিত রেখেছি এ জানু। দ্যাখো কিভাবে পিঠের পিছে রূগ্‌ণ নদীগুলোকে লুকিয়ে রেখেছে শহর।

এ পৃথিবীতে রে, এ পৃথিবীতে—নদীর নামে আর কোনো ঠিকানা হবে না মানুষের। বোবা রোখে তাই পাথর ছুড়ে গেছি বিষাদের গিরিখাতে—এই দেশেতে রে, এই দেশেতে। দহ খুঁড়ে জল তোলার রাগে কী যে এক কাহিনি ঘনাচ্ছি আমি।

রাত্রি পেরুতে আবার এলাম তো মরুতে, গল্পগুলো গুনগুনাতে গুনগুনাতে গুনগুনাতে।

এ দিকে ট্রেন থেমে আছে ফুলছড়ি ঘাটে, ওদিকে স্রোতের ঠোঁটে তরণিও নদী নিয়ে স্থির। অনেক জনমের শুদ্ধ কাদায় এ নদী হলুদ। এপার থেকে উবে গেছে ঘর-বাড়ি, বেদে বহর, উন্মুখ বৃক্ষরাজি। খোঁড়া বৈরাগীর মতো এ নদী বইছে এক পায়ে। আরেক তীরে করমজা, নশিপুর, চন্দনবাইশা, পেত্নীতলা গ্রাম; মেঘের কাছে গচ্ছিত কত নাম।

আমারই অন্য কোনো স্বপ্ন গুঞ্জরিত হচ্ছে তাহাদের সবজিখেতে, ভোরে। বিদ্যুতের শুঙ্গছোঁয়ায় লাউয়ের মিহি রোম খাড়া হচ্ছে, পালংয়ের পাল হয়ে পড়ছে আরেকটু নাগর। সোঁতায় ভাসছে কারো শার্ট। ঈশান থেকে উড়ে পাছনৌকায় ডানা মুড়ে বসেছে কালো চাদরের পাখি।

নিমছায়া কোনো খালের বাঁকে বৃষ্টিতে অবতীর্ণ হচ্ছে এক কবি।

কবিতা লেখার মুখে আগুন দিই সিগারেটে। অনিদ্রার আগে কী করতে হয় জানা নাই, তাই লিখে রাখছি। লিখে রাখছি, কেননা কুঠার ফেলে এসেছি করতোয়ায়। এমন পদ্ধতিতে লিখে রাখছি, যেন চেতনজ্বরা তুঙ্গে ওঠে, যেন অস্তিত্বের সকল চাতাল জুড়ে বহে ঝড়, যেন নদীর উদর থেকে উঠে আসে আলোবাদ্যির তরণি। যেন হোমের আগুনে মেলাতে পারি ইঙ্গলা-পিঙ্গলার মুখ। যেন বাজ পড়ে সুরমা হয় আতর-পাহাড়।

যখন তোমার সব শেষ তখন তুমি কী করো পিতামহ?

‘দমে দমে আমি তুলে আনি সব হারানো আত্মাদের। যেভাবে শ্বাসটানে বলকায় গড়গড়ার জল, সেভাবে সত্তার সবক’টি শুঁড় আমি এক করি, তাদের মেলাই মণিমূলে— প্রথমে কষ্ট, ঘর্ষবিদ্যুৎ, মৃদু চিৎকার, জলকষ্ট; তারপর অভিশ্রাবী চুমুতে বেগে চলে রক্ত সমুদায় শিরায়।

আমি জেগে উঠি।’

জীবন এক জ্ঞানভয়। ঘুম ভেঙে তাই লিখছি।

 

প্রকৃতির প্রস্তাব

প্রকৃতির প্রস্তাবে আমিও তাহাই—মানুষ। অধিকখানি জল কিছুটা অস্থিমাটি আমাকে খুঁড়িলেও পাইবে। প্রকৃতির প্রস্তাবেই দৃষ্টি, নিদ্রা ও মৃত্যু ছাড়া আর সবই আমাকে শিক্ষা করিতে হয়। এ বাঁকপ্রধান ভঙ্গুর নদী, যার নাম জীবন, তা কত সম্পর্কের পরিখা দিয়া ঘেরা। সুবাহ–সন্ধ্যায় আমি সেসকল যথারীতি প্রদক্ষিণ করি, তাহাদের উপশিরায় প্রবাহিত করি পীতরস। যথারীতি আমি পুরুষ; প্রকৃতির প্রস্তাবে কিছুটা ধাতব—তাপ ও পীড়নে প্রসারণশীল। খরস্রোতে আমি শানিত করি ছুরি। আমার দুচোখে দুটি ছিন্ন শিমুলের কুঁড়ি। প্রকৃতির সরল প্রস্তাব হয়তো ইহাই ছিল যে, আমি লিখিব সমুদায় নীরবতা।

আমাকে তাই আর উচ্চারণ করিও না।

 

কাঠপেন্সিল

আমি একটা ইরেজারহীন কাঠপেন্সিল। নিশি ও কালো হাড়ের ফসিল। যে মুখেই কাটো, ভেতরে কয়লার শিস। ভিতরে কালো তিতিরের জমাট রক্ত; আমি তো তাহাদের দেশ থেকেই প্রেরিত! ব্লেড হাতে নিয়া আসিও, প্রখর করিও লিখিবার আগে।

আপাতকঠিন, কিন্তু যখন চাঁছা হতে থাকে পরতে পরতে‍—দেহই থাকে না। পড়িয়া থাকে বকুলের কিছু অবশেষ।

আমার ভাষা বিন্দুময়। সংগীতই আদি কারণ, যাহা আমি শুনি আর বিন্দু ফাঁপিয়া বৃত্তের জলে নামি। আমি লিখিয়া চলি অজস্র রেলধনু আঁকা এক আকাশে। অস্থি ঘষিয়া ঘষিয়া যতই লিখি পত্রে, কাষ্ঠে অথবা দেওয়ালে—ক্ষয় হই লিখন সন্ত্রাসে।

লিখিয়াই তো গিয়াছি সব, ফিরিয়া আসিলে চক্ষু শ্যেন করিয়া আসিও। যেই চোখে তিরস্কার সেইরকম দৃষ্টি পাতিয়া দেখিও; অক্ষরগুলির সিথানে সুরমার মতো যাহা পড়িয়া আছে, তাহা শোক।

জানিও, ওইগুলি আমি এখনো লিখিয়া উঠিতে পারি নাই।

 

সতত রাত্রি নামুক আমার ভাষায়

রক্তের কপাট খুলে আমি না-হয় আর না থাকি। অভঞ্জনীয় আলোয় জেগে না উঠি নগরীর মতো। আমার সত্তার সুর নিশিন্দারা, এ পাখায় মাটিডালি ও পাখায় শান্তাহার—রোদের কুচন্দন মাখা কপাল আমার। আমি এক অহেতুক বিরাজ করা নাম—আধচেতা বন। নিখিলের হাপর থেকে বয়ে আসে বায়ু, ডেকে ওঠে পাখ আমার ভেতর।

এখানে বৃক্ষ ও স্তম্ভের থিতি। সামুদ্রিক শ্বাসের শেষ বন্দর। আকাশের দিকে উন্মুখ পাহাড়ের মতো আমিও বিস্তারিত সন্ধ্যাদেশে।

অনেক বাতির বাসনায় জর্জর দেহ কি শহর? মন এক গ্রাম। শিয়রে রেখে ক্ষয়শীলা চাঁদ, ঘুমাতে পারে সে বর্ষণে ক্ষতবিক্ষত আকাশের নিচে। আমি জেগে থাকি না এ বিশ্বে; রাজধানীগুলির মতো ভয়ে ও প্রতাপে। আমি চুপচাপ ভাষার মতো অশরীরী হয়ে যাব। মান্ধাতার কোনো এক ভাষায় খুলব মূক ও বধির শ্রেণির ইস্কুল। সে ভাষার ছায়াপথে ঢেউকাঞ্চনের ফেনা। স্তরে স্তরে পোনা মাছেদের তুরন্ত ঝাঁক, হেমন্তের মেঘেদের থইথই। তার পিঠ ছুঁয়ে নেচে যায় কোনো কোনো পাখি। সে ভাষার চেতনজ্বরা বইবে বাক্যে আমার ।

ক্ষতমুখের মতো আমি আর না জেগে থাকি। এক গ্রামীণ রাত্রি নামুক আমার ভাষায়।

 

ফারুক ওয়াসিফ

ফারুক ওয়াসিফ

জন্ম ২২ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৫, বগুড়া। পেশায় সাংবাদিক।
বুদ্ধিবৃত্তিক নানা তৎপরতার সাথে যুক্ত।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
জল জবা জয়তুন [আগামী, ২০১৫]

প্রবন্ধ—
জরুরি অবস্থার আমলনামা [শুদ্ধস্বর, ২০০৯]
ইতিহাসের করুণ কঠিন ছায়াপাতের দিনে [শুদ্ধস্বর, ২০১০]
বাসনার রাজনীতি, কল্পনার সীমা [আগামী, ২০১৬]

অনুবাদ—
সাদ্দামের জবানবন্দি [প্রথমা, ২০১৩]

ই-মেইল : bagharu@gmail.com
ফারুক ওয়াসিফ