হোম কবিতা এই শ্বাসরোধী সৌন্দর্য হইতে আজ মুক্তি চায় বাক্য

এই শ্বাসরোধী সৌন্দর্য হইতে আজ মুক্তি চায় বাক্য

এই শ্বাসরোধী সৌন্দর্য হইতে আজ মুক্তি চায় বাক্য
148
0

ভয় এক সংস্কার, নহিলে নক্ষত্রমণ্ডলই যথেষ্ট শুশ্রূষা, দ্বীপপুঞ্জের অগ্নিকুণ্ডগুলি
এখনও আধো-জাগরূক, থাকিয়া থাকিয়াই উগরাইয়া দেয় লাভা, ছাই আর
ধোঁয়ায় ঢাকিয়া যায় আকাশ, অন্ধত্ব আরও সাধনার বিষয়, আরও ক্রন্দনের
দুই চোখ ঠাসিয়া-ধরা ভাঁজ হইতে উঠিয়া আসে লবণের ঘ্রাণ, ঝড়ের শব্দ
যাহা শুনা যায় না অথচ বহমান, টিক টক টিক টক লাফাইয়া চলিয়াছে রক্ত
তবু ঘড়ির কাঁটার কোনও প্রভু নাই, সময় এক কাল্পনিক ধারণামাত্র, সকল
কল্পনা ধারণ করিয়া রাখিয়াছে তুচ্ছ এই শরীর, যেখানে কেবলই বিদ্যুতের
মৃত্যু, কেবলই সকল শৃঙ্খল উধাও, লম্বা লম্বা নলে ফুৎকার দিয়া নানারকম
ধ্বনি বার করিতেছে মুণ্ডিত-মাথার বালকেরা, পদ্ম আর বজ্রের রহস্য বুঝিবার
জন্য তাহাদের এত প্রণিপাত

লম্বা পথ আঁকিয়া বাঁকিয়া  কখনও নামিয়া গিয়াছে জলে, কণামাত্র ঘ্রাণে ভর
করিয়া আগাইয়া যায় মহাপ্রাণী, উফ্‌ কী বিমূর্ত, তবু কী নির্ভুল! একটি সামান্য
ফুলের ভিতর দিয়া কোন্‌ বার্তা আসে? ফুল নয় হে, ফুলের সেই আদিম গন্ধের
কথা বলা হইতেছে, পাখি নয়, বলা হইতেছে পাখির পালকের কথা, কোনও
কোনও মৃত্যু যে পাখির পালক হইতেও হালকা, সেই কথা, চাঁদ নয়, বলা
হইতেছে তাহার এবড়ো খেবড়ো চামড়ার কথা, গভীর ভয়াবহ সব গহ্বরের কথা
কথার কোনও মূল্য নাই, কথার ভিতরেই তবু পাহাড়ে-ঘেরা আরাফাত ময়দান
কথার ভিতরেই নৈমিষারণ্য, বারণাবতের চুল্লি, নিষাদ রমণী আর তাহার পাঁচ
ছেলে ঘুমাইয়া কাদা, ঘুমের আগুনে জ্বলিয়া উঠিল ঘর

সত্য কি ওইটুকু জায়গায় লুকানো থাকে, না কি তাহা মায়া? মায়া কি ওইটুকু
জায়গায় বন্দি থাকে, না কি তাহা কল্পনা? কল্পনাই, তাহার লিপিগুলি ওই যে
পড়িয়া আছে ইতস্তত, শুকনো মড়মড়ে কাগজ কয়েক খণ্ড, গ্রীষ্মবাতাসের ধুলায়
যাহা উড়িয়া যাইবে দিগন্তের আড়ালে, তবু সভ্যতাকে এতদূর পর্যন্ত লইয়া আসিল
কে, ওই বন্য কুসুমটুকু যদি না রহিত? বাকিটা তো শুধুই রক্তপাত আর রিরংসার
কাহিনি, শুধু লুণ্ঠন আর জবরদখলের কাহিনি, সভ্যতার পক্ষ হইতে তাহাকে একটি
গার্ড অব অনার দেওয়া যাক তাহা হইলে, কিন্তু কোনও বন্দুকের শব্দ নয়, শুধু
কুচকাওয়াজ আর অভিবাদন, তাহাও মনে মনে, একা, সকল প্রণামের ভাষাই তো
একাকী, নক্ষত্রের সাথে যাহা কিছু কথোপকথন, নদীর তরঙ্গমালার সাথে যাহা কিছু
সব ফিসফিস, অস্ফুট, সমস্ত চিৎকার আজ অর্থহীন, সমস্ত অঙ্গভঙ্গি, ক্যারিকেচার—
অর্থহীন, আজ শুধু মাথা নিচু, শুধু কদমবুসি

সম্পূর্ণ এক না-এর সামনে দাঁড়াইয়া এই পাহাড়ের টঙ, তাহার মাথায় চড়িয়া
এক নকিব ঘোষণা দিতেছে কেহ শুনিবে-না জানিয়াও, কেউ ভালোবাসিবে-না
জানিয়াও যেভাবে বাঁশিতে সুর তুলে একাকী মেষপালক, সুর হারাইয়া যায়
এই মুহূর্তের, সুর হারাইয়া যায় চিরকালের, সকাল বিকাল রাত্রি, সকাল
বিকাল রাত্রি, পৃথিবী ঘুরিতেই থাকে, সমস্ত যাত্রাই কি তবে শেষ যাত্রা?
তুমুল বালিঝড়ের ঝাপটা আসিয়া লাগিতেছে কেবলই, মাথা নিচু করিয়া
চলিতেছে মরিয়া উট, মাথা নিচু করিয়া চলিতেছে তাহার একগুঁয়ে সওয়ার
এই দহনের ভিতর দিয়া কোথায় গিয়া পৌঁছাইবে তাহারা, উষ্ণতার ঘোর
তবু ভুলাইয়া দেয় জন্ম মৃত্যুর গাথা, সমস্ত যাত্রাই বুঝি শেষ যাত্রা, তবু যাইতে
হয় বারবার, ঝরিয়া-পড়া মাংস আর গলিয়া-যাওয়া হাড্ডি হাতে লইয়া, অর্ঘ্যের
মতো, কাঁপিতে-থাকা মোমবাতির মতো, যাইতে যাইতে সম্পূর্ণ ধ্বংস হইয়া
যাইবে – এই কথা জানিয়া, ওই যে লাফাইয়া উঠিতেছে সিন্ধুনুন ফেনা, ওই
যে আছড়াইয়া পড়িতেছে ঢেউ ফসফরাস, এক ধ্বংস হইতে আরেক ধ্বংসের
দিকে, এক পিঞ্জর ভাঙিয়া ফেলিয়া আরেক পিঞ্জরের দিকে, মাঝের এই উদ্দাম
উড়াল, এই অপ্রতিহত উড়াল

কিছুই সামান্য নয়, বাক্যমধ্যে যেমন একটি ছোট্ট অর্ধযতি, অন্ধকারের ভিতর
দিয়া ভাসিয়া-আসা একটি সান্দ্র প্রস্বর, অপলক একটি পলক, অস্ফুট একটি
অতিশয়োক্তি, সকলই অসামান্য, বিশাল অন্ধকার মহাশূন্যে এই খুকি গ্রহটি
কত সামান্য, বিশাল অন্ধকার মহাশূন্যে এই খুকি গ্রহটি কত অসামান্য, বৃষ্টির
আগের বৃষ্টির সময়ের আর বৃষ্টির পরের ঘ্রাণে কত তারতম্য, যখন বৃষ্টি থাকে
না, এই ঘ্রাণগুলি কই যায়, তাহারা কি ভূগর্ভেই লুকাইয়া থাকে, না স্মৃতির
অগম পারে? তাহার পর দেশ দেশান্তর হইতে মেঘ ভাসিয়া আসে একদিন
এলোমেলো বাতাস ভাসিয়া আসে উপকূল হইতে, ভাসিয়া আসে ঘ্রাণ, ভাসিয়া
আসে স্মৃতি, কিছুই সামান্য নয়

মাকড়সার জাল কি একটি আবাসন, না একটি ফাঁদ, না কি দুইই একসাথে? সে
যাহাই হউক, তাহার একটি জ্যামিতি রহিয়াছে, একটা সৌকর্য রহিয়াছে, তাহা
হইলে জ্যামিতির সহিত নিষ্ঠুরতার কোনও বিরোধ নাই! ভয়ঙ্কর এক কেন্দ্র হইতে
পরিচালিত ব্যবস্থাপনার সহিত সৌন্দর্যের কোনও বিরোধ নাই! এই শ্বাসরোধী
সৌন্দর্য হইতে আজ মুক্তি খুঁজিয়া লইতে চায় বাক্য, সমস্ত পরিকল্পনা ও
জ্যামিতির বাহিরে, সমস্ত কেন্দ্র ও রাষ্ট্রের বাহিরে মুক্তি, আজ বন্দিদের মুক্তি
চাই, সকল বাক্যের চিন্তার প্রেমের মনীষার মুক্তি চাই, ঘ্রাণের মুক্তি চাই, উফ্‌
সেই ঘ্রাণ, সেই সামান্য ঘ্রাণ, যাহা ছুটিয়া আসিতেছে সিরিয়ার রান্নাঘর হইতে
গাজার গানের ইস্কুল হইতে, কাশ্মীরের আপেলবাগান হইতে, সুদান কঙ্গো
এমন কি পারি বা লস এঞ্জেলস হইতে, ফুলে ফুলে ভরিয়া গিয়াছে চারিদিকের
বাতাস, ফুলের জ্যোৎস্নায় ঢাকিয়া গিয়াছে চারিদিকের রাত্রি, এ এক গ্রহান্তরের
মাটি, গ্রহান্তরের মাটিতে পথ হাঁটিতেছে একাকী পথিক, প্রতিটি পথই ভয়ঙ্কর
প্রতিটি পথই আবিষ্কারের জন্য পড়িয়া আছে

.
১৬-১৮।০৫।১৮

ঈদসংখ্যা ২০১৮

গৌতম চৌধুরী

জন্ম ১৮ ফাল্গুন ১৩৫৮, ২ মার্চ ১৯৫২, কানপুর, উত্তর প্রদেশ, ভারত। শিক্ষা : উচ্চ মাধ্যমিক। পেশা : লেখালেখি।

প্রকাশিত বই :

কবিতা—
কলম্বাসের জাহাজ [১৯৭৭, উলুখড়, হাওড়া]
হননমেরু [১৯৮০, উলুখড়, হাওড়া]
পৌত্তলিক [১৯৮৩, উলুখড়, হাওড়া]
অমর সার্কাস [১৯৮৯, আপেক্ষিক, হাওড়া]
চক্রব্যূহ [১৯৯১, আপেক্ষিক, হাওড়া]
নদীকথা [১৯৯৭, যুক্তাক্ষর, হাওড়া]
আমি আলো অন্ধকার [১৯৯৯, অফবিট, কলকাতা]
সাঁঝের আটচালা [২০০২, কীর্তিনাশা, কলকাতা]
আধপোড়া ইতিহাস [২০০৪, কীর্তিনাশা, পুরুলিয়া]
অক্ষর শরীরে মহামাত্রা পাব বলে [২০০৬, কীর্তিনাশা, পুরুলিয়া]
নির্বাচিত কবিতা [২০১০, সংবেদ, ঢাকা]
আখেরি তামাশা [২০১৩, ছোঁয়া, কলকাতা]
ঐতরেয় [২০১৩, রূপকথা, ক্যানিং]
উজানি কবিতা [২০১৪, মনফকিরা, কলকাতা]
ধ্যানী ও রঙ্গিলা [২০১৫, চৈতন্য, সিলেট]
কলম্বাসের জাহাজ (২য় সং) [২০১৬, রাবণ, কলকাতা]
বনপর্ব [২০১৬, সংবেদ, ঢাকা]
কে বলে ঈশ্বর গুপ্ত? [ধানসিড়ি, কলকাতা, ২০১৬]
বাক্যের সামান্য মায়া [ভাষালিপি, কলকাতা, ২০১৭]
রাক্ষসের গান [চৈতন্য, সিলেট, ২০১৭]
কবিতাসংগ্রহ [প্রথম খণ্ড, রাবণ, কলকাতা, ২০১৭]।
ইতস্তত কয়েক কদম [কাগজের ঠোঙা, কলকাতা, ২০১৮]
বাজিকর আর চাঁদবেণে [পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি., ঢাকা, ২০১৮]

গদ্য—
গরুররচনা (বৈ-বই বা ই-বুক) [২০১২, www.boierdokan.com]
খেয়া: এক রহস্যময় বিপরীতবিহারের ঝটিকালিপি [কুবোপাখি, কলকাতা, ২০১৭]
বহুবচন, একবচন [বইতরণী, কলকাতা, ২০১৮]
সময়পরিধি ছুঁয়ে [ঐহিক, কলকাতা, ২০১৮

নাটক—
হননমেরু [মঞ্চায়ন: ১৯৮৬]

অনুবাদ—
আষাঢ়ের এক দিন [মোহন রাকেশের হিন্দি নাটক, শূদ্রক নাট্যপত্র, ১৯৮৪]

যৌথ সম্পাদনা—
অভিমান (১৯৭৪-৯০), যুক্তাক্ষর (১৯৯২-৯৬), কীর্তিনাশা (২০০২-০৫)

ই-মেইল : gc16332@gmail.com