হোম কবিতা উবাইদুল্লাহ রাফীর কবিতা

উবাইদুল্লাহ রাফীর কবিতা

উবাইদুল্লাহ রাফীর কবিতা
378
0

পাথর

(সাইয়েদ জামিল’কে)

সে পাথর—এই জ্ঞানের পরও বহু কিছু থাকে। আমরা দেখি নাই—কোনো দিকে তার পর্দা উঠে যায়।

…সে পাথর—এই পরিজ্ঞানের পর আরো কিছু থাকে।

যে শুষ্ক পাতা আকর্ষণ হারিয়ে ঝরে গেল; অনেক পায়ের তলায় হয়ে গেল গুঁড়—
তার ভাঙা অংশ, ফেলে এসে দূরে,
কেউ কি জেনেছে, কখন, পুরুষ কিরূপ কাঁদে?

…আমরা দেখি নাই, শুভ্র এক দেহের উন্মেষ;
জানি নাই, কান্নার চেয়ে বিশুদ্ধ রক্ত জমাট রয়েছে কোথাও।
দেখেছিল কোনো এক ঈসা, জেনেছিল প্রভু কোনো এক,—
পুষে রেখে হণ্টন, তার হাঁটুগুলো কোথায় ভেঙে যায় কেন!

 


রাতের কুকুর


ভোরবাহী এই বিদ্যুৎ; মেঘ-ঘর্ষণ,  কুহকের মতো মৃদু এই ঝড়; নাই হয়ে এই থাকা ঝড়, তার তলে রাতের কুকুর তুমি, খোলাচোখ শয়নেই রহিয়াছ শুধু। ক্ষণের ভোরের তলে রাতের কুকুর, ঘেউ ঘেউ ঘেউ বলে, পুকুরের কাছেই মাছের, আরো কাছের ডেরায়, কিসের বিকর্ষণে যাও নাই ফিরে?

পানিতে মাছের হঠাৎ ঘাই মারা ডাক, শুনেছ প্রচুর তুলে সচকিত কান,
বালিপানিমাখা চিবুক লয়ে,
কঙ্কর ও কাদায় চিবুক গেঁথে তবু গেছে।
মীনের তরঙ্গ তো ক্ষীণ হয়ে গেল, তুমি তো সেখানে যেন কেন্দ্র; গুটানো।

গুটানো বিন্দু তুমি মিশিবে কবে, রেখা সব ক্ষীণ করে বৃত্ত হতে?
গুটায়ে নিজেরে ঝড়ে সব ঢেউ হতে, মিশিবে কেন্দ্রে কবে, আপন ডেরাতে?

ডেকে ডেকে দীর্ঘ ঘেউ সহসা রাতে,
না দেখে রাত্র-আকাশে মেঘভোর, কবে,
নিজের ব্যথা ও ঝড় পাথর হইতে,
আলগিয়ে ছুড়ে দেবে ইথার-পাথারে?
পাথারে তাদের শুধু ছুঁড়েই দেবে,
বেহালা বেহাগ নয়, তবু বেজে যাবে।
নিজপ্রাণে, নিজদেহে, কিন্তু দেহ নয়,
শোনাবে ভোরে ঢেউয়ে মাছেদের লয়।

 


পার্সিভ্যাল হিল ও সন্ধ্যা


জনতা ও জনতার অন্তস্থ বহু তরঙ্গ নিয়ে থাকে চকবাজার। কিছুদূর ডানে বঙ্কিম রাস্তা ধরে গভীরে যুদ্ধসমাধি; মৃত লোকেদের এই মসজিদ দাঁড়ায়ে আছে সেখানে বিস্তীর্ণ বছর।
অন্যপাশে কোচিং,— ছেলে ও মেয়েরা সন্ধ্যায় এখানে বেরোয়; জমায় আড্ডা।
আমি জানি, উচ্ছ্বাসরূপ হারাতে, বামে চলে যেতে তাদের কত ক্ষণ আর। তারা কবে শুনবে স্বীয় স্তব্ধতার ভেতর, যূথ ভেঙে, ঝিঁঝিঁ ও ক্লান্ত এক বিশেষ কাকের ডাক, এবং কেন, আমি জানি।

নিজেকে এসবে নয়, আমি জড়িয়েছি পাহাড়ের গায়ে; জীবন ও মৃত্যুর বহির্বিশ্ব নিয়ে যে আছে দাঁড়ায়ে। পতন ও উড়নরহিত মানুষেরা আসে এইখানে। তবু জীবন ও মৃত্যুর স্মৃতি ও ব্যথা তাদের, ব্যথা ও স্মৃতি আমার আছে, বিশ্বের পরিবেশে পাওয়া।

অন্তরে অঙ্গার, কিভাবে, কী রহস্যে, যেন অঙ্গারই আলো, মুখে মানুষের দীপ্ত করেছে হাসি! ছায়া যদিও দেখায় শ্রান্তি; মাটির দিকে ঢলে পড়ে যাওয়া রূপ,—
তারা উঠে গেছে পাহাড়ের দিকে।
ঢেকে অঙ্গার ও ছায়া, হাসি নিয়ে মানুষ ডেকেছে চূড়ায় উঠে, দূর থেকে হাত নেড়ে, আত্মা ও আত্মীয়দের। এরাই পাহাড়; বহুভাবে মানুষ আহত হয়েছে যেথা, কাছে যেতে গিয়ে, এবং পেরিয়েছে তারা তবু পাহাড় ও পাহাড়।

…যে স্থান আছে পার্সিভ্যাল হিল নামে, শান্তি কি সে?
এই পাহাড় ও আত্মা ব্যতীত, পেরুনোর আর কোনো ঢিবিও আমার নেই। এই উঁচা থেকে, আমার স্মৃতি ও বেদনা থেকে ভার, ধীরে ছুড়ে দেই নিচে, পৃথিবীর গায়ে।
অতঃপর আমার আত্মা ও থেকে যাওয়া যা কিছু, হিল রোড দিয়ে নেমে আসে নিচে, নেমে আসা পানিদের সাথে, ঢলে পড়া ছায়া সাথে সাথে নিয়ে।

ক্রমশ হর্নের শব্দে ধরণী ক্ষীণ হয়ে যায়, ক্রমশ হলুদ হয়ে যায়;
রাস্তায় দেখি, ব্যথা আর হর্ষের সংঘাতে ধরণী হতে চেয়ে কালো অন্ধকার, যেন আর পারে নাই।

 


স্বরমধ্য


ঐ ঘড়ঘড় করে, কে সেই স্বর? ঢেউয়ের ভেতর ঢেউয়ের ভেতর ঐ ঢেউয়ের ভেতর যেই ঢেউ, কী সেই স্বর? বেলাভূমিতে কেন সে ঘনঘন ফেলে যায় শঙ্খ, গুপ্ত খনির থেকে ছুড়ে?

ক্রমশ উঁচুমান যেইসব ধ্বনি জাতহীন এইসব শঙ্খের থেকে, কার থেকে সেইসব তাহারা নিয়েছে ধার?—আমার আছে জ্ঞানে অধিকার, আমার আছে তার প্রেমে অধিকার।

শঙ্খ যেসব, ভেতরে আমার, কান্না তুলে যায় ক্লান্ত মেশিনের, তাদের গলায় রয়েছ কে, তাদের ধ্বনির কৃষিতে কে,—
সাগর শোনার শূন্য আমাতে দাও,

সাগর তোলার তৈল তাদের দাও।
দাও পরিচয়।
আমি তো জেনেছি, যে তুমি শূন্য, তৈল সে তুমি, সে তুমি সাগর; গলায় কাতর।
রয়েছ সে তুমি, রয়েছ সে তুমি, বয়েছ সে তুমি গলায় কাতর; মৃদু উঁচু রয়ে করে ঘড়ঘড়, বিকল মেশিন ওখানে যে স্বর।

 


পাহাড়


অনেকভাবেই তো দাঁড়ায়ে থাকে পাহাড়। কতভাবে ভেঙে গেছে তারা, তবু তো দাঁড়ায়ে থেকে, দেখে গেছে—
খসে পড়া টুকরার সাথে ধসে যাওয়া ঝুপড়ি; উড়ে এসে জুড়ে বসে, পাহাড়ের এক হয়ে যাওয়া প্রাণ। তথাপি তো তারা বাড়ায় নি হাত, হয় নাই আনত; কাতর—যেন তারা হয় নাই কাতর।
আমরা, অনেকভাবেই তো দেখেছি, দাঁড়ায়ে থাকে পাহাড়—যদিও অনেকভাবেই যায় ধসে,—তবু তো পাহাড়ে পর্যটক; অল্পের অতিথিরা যায়;
তাদের পাহাড় বলে ডাকে, তাদের নাম দেয়; বহুবর্ণিল নাম।
পাহাড়ে ঘুরেটুরে শ্রান্ত তারা ঝর্নার মুখে যায়, স্বীয় বোতলে ভরে পান করে পানি, বসে ঝর্নার মুখে, পানি গলায় তারা বলে, পাহাড় পৃথিবীর পেরেক।

উবাইদুল্লাহ রাফী

জন্ম ৫ই মে, ১৯৯৮; চট্টগ্রাম। শিক্ষা : উচ্চমাধ্যমিক।

ই-মেইল : eyeovcat@gmail.com

Latest posts by উবাইদুল্লাহ রাফী (see all)