হোম কবিতা আয়শা ঝর্নার দশটি কবিতা

আয়শা ঝর্নার দশটি কবিতা

আয়শা ঝর্নার দশটি কবিতা
1.31K
0

বালিয়াড়ি


আমরা অন্যের ভাষায় কথা বলি। বলি বাঘ, হরিণ, শেয়ালের গল্প।
যেন আমাদের কোনো গল্পই নেই। আমরা বলি না আমাদের চোখে গর্ত
করে কেউ চোখের মণি খুলে নিতে চেয়েছিল, চেয়েছিল জীবনটাকে
মাটিতে পুঁতে ফেলতে। আমরা বলি না কেউ আমাদের শ্বাসরোধ করতে
চেয়েছিল, মারতে মারতে নাক-মুখে রক্ত বের করে দিয়েছিল। কেউ
একজন হাত ধরে বলেছিল, ‘ওঠ, এ জীবন মার খাবার জন্য নয়।’
সেই থেকে ক্ষয়ে আসা জীবনটাকে হাতের মুঠোয় পুরে দৌড়ে বেড়িয়েছি,
সেখানে দেখতে পাই মহা মহা পণ্ডিতদের পাঠশালা—শেয়াল পণ্ডিত,
বাঘ পণ্ডিত, তারা আড় চোখে চায় আর বলে বাঘ-মাসির গল্প।
আমাদের জীবন তখন সমুদ্রের পাশে থাকা বালিয়াড়ি। ঢেউ এসে মুছে
দিয়ে যায় জীবন-চিহ্ন। ক্ষতের চিহ্নগুলি নিয়ে আমরা চেঁচাই, নিজের
ক্ষতে নিজেই হাত বুলাই আর বলি ওদের জঙ্গলের প্রতি অনেক ঘোর।
তাই ওরা আমাদের ক্ষয়ে আসা জীবনটাকে দেখতে পায় না। ওরা এক
একজন বাঘ শেয়াল, সাপ আর মুখোশের নৃত্য করে। আমাকেও বলে,
‘পরো পরো মুখোশ পরো, সব ভুলে যাবে। জন্ম-মৃত্যু সব এই এদের
সাথেই কেটে যাবে!’

 


মেপল লিফ


একটা ঝড় বইছে , একটা চাপা আতঙ্ক এ শহরে ভাইরাসের মতো
ছড়িয়ে পড়ছে, তার নাম, মৃত্যু। মৃত্যু, যেকোনো সময় তোমার ধড়
মটকাতে পারে, তুমি জানবেও না। শুধু ভাবো মৃত্যুটা সহজ হবে
নাকি বীভৎস! মৃত যারা, তারা এসে যদি বলত, কতটা সহনীয়
ছিল মৃত্যুকালীন সময়টা! সেই চাপা আতঙ্ক নিয়েই তুমি ঘুরে বেড়াও,
কাশফুল দ্যাখো, দ্যাখো শরতের আকাশ কতটা নীল! দেবীর আগমনী,
বুদ্ধের অহিংস বাণী, জেসাসের করুণ মূর্তি আমাদের আশ্বস্ত করতে
পারছে না। ভাবো, কোথাও বেরিয়ে পড়বে এই মৃত্যু-আতঙ্ক থেকে
রেহাই পেতে। কোথায় যাবে? সবখানে ওঁত পেতে আছে প্রাণঘাতী
বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দ্বন্দ্ব। তুমি মেপল লিফ দেখে মুগ্ধ হয়ে, মেপল লিফ,
মেপল লিফ, গান করো, ‘জানো না বরফ পড়বে আর কিছুদিন পরেই।
শীতের চাবুকের নিচে ঢাকা পড়বে সব সৌন্দর্য।’

 


সতীত্ব


অসংখ্য লোকের ভিড়ে কুঁকড়ে পড়ে থাকি, হাত-পা ভাঁজ করে।
এ আসে ও আসে আমার চোখ খুবলে নেয়, চক্ষুশূন্য কোটর থেকে
ঝরে রক্ত..। কেউ একজন আমার নাক খুবলে নেয় নাকছাবি খুঁজতে
যেয়ে। কেউ এসে খোঁজে আমার সতীত্ব, কেউ খোঁজে শাখাসিঁদুর।
সিঁদুর খুঁজতে যেয়ে মাথার চামড়া তুলে ফেলে। চুড়ি ভাঙলে আমার
হাতের হাড় বেরিয়ে আসে আমি তবু পাথর। কুঁকড়ে পড়ে থাকা বিন্দু।
অসংখ্য ছুরির আঁচড় খেয়ে মা আমাকে আঁকড়ে ধরে বুকে। আর বলে,
‘মেয়ে আমার, আয় এই বুকে, নেই তোকে জঠরে আবার।’ আমি তখন,
ঠিক তখনি জেগে উঠি পাথরঘুম থেকে। গুটিশুটি মেরে শুয়ে থাকি মায়ের
বুকে।
মা আমার মৃত্যুকে সহজ করতে গায় ঘুমপাড়ানিয়া গান। সে গান ছড়িয়ে
পড়ে নদীর স্বচ্ছ জলে, যেখানে টুপটাপ রক্ত ঝরে অবিরাম মৃত্যুনামধারী
গাছ থেকে।

 


থেরীগাথা


আমি যেদিন আমার ক্ষতসমেত বুদ্ধের
সম্মুখে দাড়ালাম, তিনি তার অর্ধনিমীলিত চোখ
খুলে আমার দিকে তাকালেন। অন্ধ আমার দু’চোখ
দৃষ্টি ফিরে পেল। আমার ক্ষত শুকিয়ে সেখানে জন্ম
নিল তারাজ্ঞান, মহাজীবন আর ক্ষুদ্রজীবনের মাঝে
সৃষ্টি হলো এক যোগসূত্র। উত্তরের হাওয়া এসে
ঝরাপাতাদের উড়িয়ে বাড়িয়ে নিয়ে গেল। মৃতগাছে
জন্ম নিল সবুজ-পাতা, হাহাকারের জীবনে পেলাম
দিব্যজ্ঞান। বুদ্ধ বললেন, জীবন-মৃত্যুর মাঝে যে জীবন
সে জীবন তোমাকে দিলাম।
আমি শূন্যের মাঝে যেমন ছিলাম সে শূন্যের ভেতরই
তেমনি মিলিয়ে গেলাম। যেখানে কোলাহল গেছে থেমে,
নগরবাসী তাদের অমারাত্রির স্বপ্ন বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে থাকে
জেগে উঠবে বলে কোনো রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিব্যসকালে!
পৃথিবীর সব দুঃখ একদিন লীন হবে কিংবা হবে না,
থেমে থাকে না থেরীগাথা…হাজার বছর ধরে তা বয়ে
চলে…।
খঞ্জনা হাতে বৈষ্ণবী অথবা চর্যা কাহ্নপা মীরার
দেশে জন্ম নেওয়া এক কবি আমি,
অশীতিপর বৃদ্ধাকে শুধাই, তুমি কেন কম্বল না
নিয়ে শীতে জবুথবু?’ বৃদ্ধা তার ছানিপড়া চোখে
উঁচুনিচু রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে জানায়, গেল শীত
আমার এভাবেই কেটেছে, আজ না হয় উষ্ণতার দিকে
হাত বাড়ালাম না। দেখি শীত আমায় মৃত্যু এনে দেয় কিনা!
যে মৃত্যু আসলে অনন্ত জীবনেরই আরেক নাম।

 


জীবন ও গান


যে যেখানে থাক তোমাদের ওপর বর্ষণ হোক
আলোর, অমৃতের, জীবনের।
কেননা তুমি আমি অন্য পৃথিবী, অন্য মানুষ।
শুনি শীতঝরা পাতাদের দীর্ঘশ্বাস, বাধি
দেবতার কন্ঠস্বর, টানি অর্জুনের ধনুক ছিলা।
নগ্নতা, পরচর্চা, আজ আমারও প্রাণ নাও
গাও বৃষ্টির সুর, দাও বেদনার অগ্নিদাহ,
নাও পোড়াও এই প্রাণবাটি
জ্বালো প্রেরণার ধূপকাঠি।
রঙ ঢেলে দাও উপুড় করে
চরণ ফেলো আপন মনে একবার
যে বেড়াল বার্তা পাঠায়,
আজ তার সংকট তীব্র অতি।
দূর আরও বহুদূরে শেয়ালেরা সভায় বসেছে
‘যন্তর মন্তর ফু একটান দুইটান—
খাড়ান ভাইসব,
একপাও নড়বেন না, গলা দিয়া রক্ত উটবো!”
তিনটান। কালো কাপড় আবৃত।
চকচকে ছুরি ধড় বরাবর
দেহটি নড়েচড়ে শেষ চিৎকার—
‘দ্যাখেন ভাইসব। দুইচক্ষু খুইল্ল্যা দ্যাখেন,
গলাখান আলগা হইয়া গ্যাছে
এইবার আমার কেরামতি।’
আবরণ উন্মোচিত, বালকের হাসি।
‘যে যেহানে আছেন সিকিখান ফ্যালাইয়া যান।’
জীবনের গান। অন্ধকার বেদনার।
অন্ধকার বিদায়ের। অন্ধকার প্রেরণার।

 


হাজার দুয়ারী গান


বহুকাল আগে পাথর জলের দ্বৈত
মর্মরিত সুর থেকে…
আমি জেনেছিলাম জীবন,
একটা রঙিন পাকুড়ের ঠুঁটোফল
কিংবা টিয়াঠুমির ঝালর,
কোনো নির্জন পথের ধারে
একদল সাত ভায়লার ঐকতান।
সূর্য যখন উদগ্র তাপ আর
আলো দিয়ে জ্বালায় পৃথিবী
তখনি বেরিয়ে আসে
কিছু শিশুমুখ করুণ বিষণ্ন,
ফুটপাত ধরে হাঁটছ যে তুমি সেও
তো ঐ শিশুমুখ হয়ে
ঘুমাতে চাইছে ছায়াঘন মায়ঘরে,
এরকম দিনে শহরের পথগুলো
পথ নয়, মিহি বালুকণা,
আঙরাখা পরা হাজার দুয়ারী গান।

 


প্রভাকর


প্রভাকরকে ডেকে বললাম দ্যাখো তো আমার শরীরের চিহ্নগুলি ঠিক
কতযুগ ধরে বয়ে চলেছি? প্রভাকর তার তীব্র চোখ ঝালিয়ে আমাকে
গুরুগম্ভীর জবাব দেয় যেদিন গৌতম তার প্রিয়াকে ছেড়ে এসেছিল
সমস্ত মেঘলোক কেঁদেছিল।
আর গৌতম তার ঋজুভঙ্গি ঠিক রেখেই অনমনীয় চিত্তকে করেছিল স্থির।
তপোবন থেমে থেমে বিলাপ করছিল যেন। প্রভাকর শুধু তুমি দেখেছিলে
কী ভীষণ নির্মোহ বোধ তার সারামুখে ছড়িয়ে পড়েছিল।

 


বনসাই কবিতা


তোমার জন্য নিস্তব্ধতা বড়ই প্রয়োজন। চিৎকার, রেলগাড়ির
আস্ফালন, ভিড় সবকিছু ছাড়িয়ে তুমি চলেছ এক ভুতুড়ে
বৃষ্টি-পাহাড়ে। ‍ওখানে অনেক বনসাই গাছ, বামন বৃক্ষ
আর পাকুড় গাছ। কখনো কখনো শোনা যায় উচ্ছল ঝর্নার
মিহিসুরে তান, দ্যাখো ঐ বামনদেশে বামন মানুষগুলো
কেমন নৃত্যময় ভঙ্গি নিয়ে চলেছে অরূপের সন্ধানে!
যদি পাওয়া যায় হারানো স্বপ্নকণা। দূর কোনো নভোমণ্ডল
থেকে ঝরে পড়ে প্রেম, জ্যোৎস্না রাশি রাশি…।
একদিন শেষ হয়ে আসে রুপোর আলোয় ভরা গালগপ্প
ক্ষয়াটে চাঁদের নিচে কিছু বামন মানুষ পড়ে বামন কবিতা…।

 


ময়দানের হাওয়া


ময়দানের হাওয়া থেকে জেনেছি তারা নারীভুক, হিংসাতুর,
তাদের মুখের দিকে মুখ করে বলেছি,‘আমার চোখের দিকে
চোখ রেখে দ্যাখো কতটা অসুখী আমি?’
তোমাদের আনন্দ হয় খুব, উল্লসিত হয়ে ওঠ যখন মৃত্যুকালীন সময়ে
জীবনের দিকে হাত বাড়াই। তোমরা লেখ যত নারকীয় পুরনো এথিকস।
মুষড়ে পড়ি আমিও। সেবার ধর্মশালায় ঠাকুরকে জেগে উঠতে দেখলাম,
অসম্ভব রাগী আর ক্ষয়াটে মুখ। মেট্রোতে চড়ে দেখেছি
তোমাদের বাড়ি ফেরার ক্লান্তি।
প্ল্যানিটোরিয়ামের আকাশে কলকাতার জেগে উঠা
আর বিসমিল্লার সানাই কানে বাজে।
কলকাতা বিষণ্ন, তার জেগে থাকা ক্লান্তিকর।
শান্তিনিকতনে একদিন খুব ভোরে কোপাইয়ের ধার ঘেঁষে
যেয়ে দেখেছি মানুষ অনন্ত, জেগে থাকে ছবি ছবি মুখ করে।

 


ডানাহীন শহর


হাতজোড় করে বসে আছি
বসে আছি বিষণ্ন বিকেলের পাশে,
একটা ঝকঝকে রাঙা দুপুরকে সঙ্গে নিয়ে,
কৃষ্ণচূড়ার ঝাঁঝাল রঙিন বাস্তবতায় হয়ে উঠি মুখর।
সেই কবে থেকে এ পথে চলেছি,
হাঁটছি যেন অনন্তকাল…
কবিতা তখন নতুন পথের বার্তা
আজ্ঞাবহ জীবনের চাবি ছুড়ে দিয়ে
বেরিয়ে পড়েছিলাম আমরা,
নতুন কোনো পথ খুঁজে পাব বলে।
আজ দেখি নতুন পথ বলে কিছু নেই
মরা পুরনো জীবনেরই শেকল চলেছি বয়ে,
ঘুরছি ফিরছি একই শহরে।
নতুন পথ বলে কি কখনো কিছু ছিল?
এই প্রশ্ন ছুড়ে দেই মাকে
মা আমার নিরুত্তর।
বাবাকে বলি তুমিই ঠিক হয়তোবা,
কেননা তুমিই প্রতিভূ পুরুষ-সমাজের!
বাইরে এসে বন্ধুকে বলি,
চল, নতুন পথের আলোয় ভেসে উঠি
কিংবা ডুবে যাই!
ডুবতে ডুবতে সূর্যটা সমুদ্রে…
সমুদ্র এসে বলে, এই চিরন্তন পৃথিবীতে
নতুন পথ বলে কিছু নেই আছে কেবল
ঝাড়ফুঁক, তুকতাক, মন্ত্রের বাহাদুরি!
‘এই নাও তোমায় দিলাম
নুড়িপাথর, ঝিনুক, সাতরাজার ধন।’
তাই নিয়ে চলেছি ঘোরলাগা সন্ধ্যার দিকে
যে সন্ধ্যাগুলি বিলিয়ে দিয়েছি হাওয়ায়,
তুড়ি মেরে বলেছিলাম, এ পৃথিবী পুরনো, সেকেলে।
কার্ল মার্কস আমাদের স্বপ্নবুনে দিয়েছিলেন টবে।
টবটাই গেল ভেঙে, পড়ে রইলাম আমরা
ডানাহীন এই শহরে।

আয়শা ঝর্না

আয়শা ঝর্না

জন্ম ২১ আগস্ট, ঢাকা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে এম.এ, এম.এড। পেশা : শিক্ষকতা।

প্রকাশিত বই:
কবিতা—
আঁধার যান [১৯৯৬, বাংলা একাডেমি, ঢাকা]
মাত্রমানুষ [২০০৩, বইপাড়া, শাহবাগ, ঢাকা]
উনুনের গান [২০০৫, ইত্যাদি প্রকাশনী, বাংলাবাজার, ঢাকা]
আয়না রক্ত হল্লা [২০০৭, ইত্যাদি প্রকাশনী, বাংলাবাজার, ঢাকা]
বাতাস তাড়িত শব্দ [২০১০, বাঙলায়ন, ঢাকা]
ও হাওয়া ও কবিতা [২০১৪, খড়িমাটি, চট্রগ্রাম]

গল্পসংকলন : চারকোল [২০০৮,পাঠসূত্র, ঢাকা]

প্রবন্ধ : শিল্প ও নারীসত্তা [সংবেদ, ঢাকা]

অনুবাদ—
এরিয়েল (সিলভিয়া প্লাথের কাব্যসংগ্রহ) [২০১০, ঐতিহ্য, ঢাকা]
নারীস্বর (বিশ্বের নারীকবিদের কবিতা) [২০১৫, ঐতিহ্য, ঢাকা]

ই-মেইল : aysa.jhorna@gmail.com
আয়শা ঝর্না

Latest posts by আয়শা ঝর্না (see all)