হোম কবিতা আসমা অধরার কবিতাগুচ্ছ

আসমা অধরার কবিতাগুচ্ছ

আসমা অধরার কবিতাগুচ্ছ
396
0

দ্বাদশ এবং অতঃপর

দ্বাদশ রাতে পূর্ণ ভরাট বা ক্ষয়ের একটা গল্প ছিল।
যে প্রস্তর ক্ষয় হয়েছে কাঠঠোকরা চঞ্চু আরো ক্ষুরধার
করার কাজে, সে অধ্যায়ে কাস্তে প্রধান হতে পারে না।

তারপরও দ্বাদশ চাঁদ যতখানি ভাসে বা ভাসায়

প্রাচীন ত্রিফলার সাথে যতটুকু নিদ্রৌষধি ভারি
করে রাখে পল্লব, তার সাথে বেসামাল বিসদৃশ ইনসমনিয়াক।

দ্বাদশ রাতে জন্ম নেয়া কিছু অশুভ অক্ষাংশ জুড়ে পোড়ায় মিথ।

নরুনের ডগায় তুলে নেয়া অপবিত্র জল ফোঁটা ফোঁটা
ঝরে পড়ে ধর্মগ্রন্থের পৃষ্ঠা জুড়ে, ধাবমান ইস্রাফিল এবং বাঁশি।

দ্বাদশের গল্পে যোগ হতে পারে আরও কিছু অতিপ্রাকৃত বর্ণনা…

 

বলয়

বলয়—বলয়, ঈষৎ চেপে যাও পৃথিবীর মতো, ভাঙো বৃত্তাকারের অভিযোগ
দু’হাতে জড়ো করে ধরা আঁজল পানিতে কেবল নীল সদৃশ ছায়া পড়ে।

আঁধার গাঢ় হলে এতেক্বাফে বসে শুশুক, পুদিনা আর কৃষ্ণচূড়ার পাতা—
হিম তক্তপোশে—উত্তাপ ছড়ায় তাদের ভাসমান রুহ, জোছনা ভরা মাঠে।

মীনের মতো ঠোঁট গোল করে ডাকে আযানের ধ্বনি, আরশ ঢেকে যায় বীজমন্ত্রে
ডাকে জন্মের আগুন, অন্ধ রোশনাই, ডাহুকের পদচ্ছাপ, কুয়াশার চাদর।

ঐ যে ধারার মতো করুণা চুইয়ে আসে, আলোর আভাস গোথিক গির্জার চূড়ায়
সেখানে কোনোদিন দেখা যায় নি অলীক কোনো যিশুশরীর, নিশ্চিন্তে বা ভ্রমে।

ব্রহ্মচারী ডলফিন, নেচে ওঠো নির্মেদ ময়ূরী নর্তকীর মতো;
আকাশ কালো হলে ভয়ে ভয়ে স্মরণ করো নুহের নৌকো।

হে চতুর্থ আসমান—সপ্তম আরশের ছায়া—শুভ্র ঝিল্লি; ঠাঁই দাও ঠাঁই দাও
এক মেহগনি রঙের কফিন আজ আপাদমস্তক মেপে গেছে উচ্চতা।

 

ফড়িংপাখনা

চোরাবালি আর দরজা সমার্থক অর্থে; কোনো কোনো ঘর আর জগৎ। যেমন জল আর নিশ্বাস, কেন্দ্রীয় জরুরি আবর্তন বিশেষ। সুউচ্চ মিনার, স্টেথো ঝুলিয়ে চেপে ধরো নাড়িস্পন্দন। দলিল লেখক কি জানে সময়ের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র হিসেব?

দিনমান উচ্চাঙ্গে গাইতে থাকা জলের স্রোতে বর্জ্য মেলানো বিধৌত জনপদে সত্যিকারের সুরের ঈশ্বর পা রাখে নি। মানব অচ্ছুতের দেশে উড়ন্ত অপ্সরার বুকে চুমুকের মতো বাণ ছুড়ে মারে দেওপাহাড়।

‘কথা কও’, ‘কথা কও’, বলে যামিনী ছুটে যায় আকাশের পানে; সেই সুযোগে মেঘদূত থেকে ঝরে গেছে কালিদাস। শীতলক্ষ্যার নাভিমূলে কম্পনাঙ্ক বিলীন, রোদের মিটার ফাঁকি দেয় টহলরত হলুদের দল। কর্নিয়ার কোনে স্যাফায়ার জড়ো হলে পোষা বেড়াল অহেতুক ভীত হয়, পালায় নখরসর্বস্ব বরফ—আগুনের ভয়ে।

উর্বর তৃণের দিকে তাকিয়ে থেকে থেকে রাত ঘুমিয়ে যাবার পর কুমারীত্ব হারায় সবুজ, ফোটে অপূর্ব ঘাসফুল। উড়ন্ত সঙ্গমে পৃথিবী ভরে যায়, বিচ্ছুরিত রশ্মি মেখে থাকে কিছু লালনীল ফড়িংপাখনা।

 

নহলি সেতার

এ নগরের হিমঝরা বৃক্ষেরা জানে, প্রণয়াতুর অগণিত রাত অপেক্ষায় থাকার পর কোমল অথচ কঠিন ভাবে ‘নহলি’ বলে ডাকতেই, গলে গেল এক নহলা তামাটে সেতার।

উজাড় যমুনার মতো,
বিসমিল্লাহ খাঁ’র সানাইয়ের মতো,
প্রাচীন সমুদ্রে ঝড়ের মতো—বেজেই যাচ্ছে তারও অধিক কতকিছু।

পাইনের মৃদু সুগন্ধ হতে, শ্বাসের ভেতর বয়ে গেলে দুরন্ত দেবধেনু বাতাস, কদাচিত্‍ দৈবিক মুসকানেরা কিছু হিরের দ্যুতি বয়ে আনে!

নন্দিত নাদ শেখে স্পর্শের কিছু আকুলতা, ভরাট কণ্ঠ জানে ডেকে নেয়া স্বর, যতখানি শীতল উত্তরীয় বেয়ে নেমে আসে হিম, কিংবা একটি একরোখা বসন্তপ্রবণ দিন।

এসো নাদ!
আরো ডাকো নিগূঢ়,
ডাকো কৃপাহীন নিদাঘের ন্যায়
ডাকো নিরূপিত সংজ্ঞায়।

এক নহলি তৃষ্ণায়, ঝংকারে বেজে যাবার আকুতি। ব্রহ্মাস্ত্রের মতো ছুড়ে দাও কণ্ঠবীণা, এসো বজ্র আর বিদ্যুতের অসুরীয় কায়দায়।


অসমাপ্ত; দেয়াল ও জীবন

শহরে মুছে যায় নৃত্যের হলফনামা। পড়ন্তবেলায় পৃথিবী পশ্চিমে নত হলে, মাধবীলতার গায়ে ভাসে পরাবাস্তব ছায়া। বৃষরাশির জাতিকার আয়তাকার চোখে ঘুমগন্ধে ভরে যায় শূন্যতারা। অথচ সেদিনও বটঘ্রাণ ছড়িয়ে নামতার ঝুলি কাঁধে ন্যুব্জ শিক্ষক হেঁটে গেছেন বৃদ্ধ মেঘের ছায়ায়; নক্ষত্রের আলতো আলোয়।

রাইকিশোরী জানে না জাফরান বনের সুগন্ধ

তেজী কিশোরের হাত কাটে নি ভায়োলিনের তারে,

ধনুকের নকশাও জানে না আলখেল্লাধারী আগন্তুক

রঙ করা জাহাজ থেকে কেটে আনা করাতের টুকরো অম্লতরলে ভেজানোর পরে লাইফটাইম তীক্ষ্ণতায় ঋণী হয় ডাবের খোল। নিজের ছায়া জলে দেখেই শিউরে ওঠে জোছনা, তার নিমগ্ন চোখে ব্যাপক বর্ষা-বিভ্রাট। পরবর্তী শালবনের মাঝামাঝি ভুল করে বেড়ে ওঠা একমাত্র ডালিম গাছে লুকোনো থাকে সমস্ত গোপন বন্দনা।

সিঁদুর খুলতে যেতেই ফ্যাকাশে হয় সিঁথি প্রকৃত আয়নায়,

তপ্ত দুপুরে গরাদের ফাঁকে তাই কপোতীর শ্রাবণ পুড়ে যায়,

তবুও চিত্রা হরিণের পেট বেয়ে খ্রিষ্টীয়-রাত্রিরা নামে নিয়মিত বায়নায়।

আসমা অধরা

জন্ম ১৪ মে, ঢাকা। শিক্ষা : স্নাতক। ম্যানেজিং এডিটর, ভিন্নচোখ।

প্রকাশিত বই :
একদিন ঠিক হেঁটে যাবো [কবিতা; প্রকাশ একাত্তর, ২০১৩]

ই-মেইল : odho14@gmail.com

Latest posts by আসমা অধরা (see all)