হোম কবিতা আরো বারো : আবদুল মান্নান সৈয়দের কবিতাগুচ্ছ

আরো বারো : আবদুল মান্নান সৈয়দের কবিতাগুচ্ছ

আরো বারো : আবদুল মান্নান সৈয়দের কবিতাগুচ্ছ
1.49K
0
তীব্র ৩০-এ আবদুল মান্নান সৈয়দের বাছাই কবিতা ছাপা হবার পর, কেউ কেউ জানিয়েছিলেন তাদের পছন্দের কিছু কবিতা বাদ পড়েছে। কবি-পাঠকের সেই রুচির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়েই
আরও ১২টি কবিতা ছাপানোর উদ্যোগ নিতে হলো।
.
এবারের এ নির্বাচনে বিশেষভাবে সহযোগিতা করেছেন তরুণ কবি ও অলংকরণ-শিল্পী সারাজাত সৌম।
তার প্রতি আমাদের অফুরন্ত ভালোবাসা।

জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ
প্রকাশকাল : ১৯৬৭


বেগানা সেরেনাদ-২


‘চন্দ্রমল্লিকার অগ্নি কেটে দিচ্ছে রাতের বাতাস, ধ্যানের ঢেউয়ে চড়ে এল জাহাজের মতো বড়ো হাঁস, তারই নাম বস্তুগ্রাস;’ বলে শবে-বরাতের মোমবাতিগুলি চলে গেল লক্ষ বছরের পথ সারে-সারে অর্ন্তগত রক্তপাতে তৃপ্তিহীন নীলকান্ত প্রশ্ন জ্বেলে : ‘কোনোদিন পাবো কি তোমারে? কোনোদিনই পাবো না তোমারে?—

হ’তে পারতাম যদি তোমার হাতের কররেখা, তোমার পিঠের সেই তিলখানি, গ্রীবার বঙ্কিম ভাঁজ, তাহলে কি এড়াতে পারতে, শম্পা?

তোমার চোখের হ্রদে চুরি করে চলে যাব রাজহাঁস, তোমার বাড়ির সুমুখে ফুটপাতে ঝরব মুহূর্তে, তোমার বুকের চাঁদ দেখে মেঘের ভিতর দিয়ে বজ্র চলে যাব—করে দাও মিল্টনের মতো অন্ধ, বেটোফেনের মতো বধির ॥

 


অভাব


কাঁচা মাংসের ভূতে লুকানো একটি আলপিন জ্যোৎস্নার মতো বিঁধে ফেলল আমাকে, আর আমি নারীর নর্দমা থেকে কুমারের মতো জেগে উঠে বানাতে বসলাম নিজেকে সারল্য আর ভালোবাসা আর আমার আল্লাহর বিন্যাসে।

মনিক ফেলে কানাকড়ি কুড়োতে দাও আমাকে, আমারি চতুর্দশী হৃদয় স্বর্গের চাবির গুচ্ছ কিনা এরকম অমাবস্যার ভিতরে দাও আমাকে সমুদ্র থেকে চশমা-পরা জ্ঞান তুলে আনতে, দাও আমাকে শিল্প থেকে আলাদা হওয়ার শ্রী-রুচি-সাহস : ঝমঝম বেজে উঠলো চারিদিকে, সে-ই আমার হাজারদুয়ারী মহল ॥

 


জীবন, আমার বোন


চাঁদের মুখে ঐ ধুলো ছুড়ে মারল পৃথিবী, আর আকাশের ব্রিজ ঝনঝনা তুলে ফের স্থির হয়ে যায় নক্ষত্রের ঢেউয়ের উপর; কেবলি নির্দেশ দিচ্ছে তারা চোখ পিটপিট করে : ‘দুপুর নিবিয়ে, ফুল মেখে নাও কৈশোরবেলায়।’

ফুটো-করা চৈতন্যের বাঁকা খেজুর-গাছের দেহ থেকে মাধুরী ঝরে পড়ছে স্বরূপের অচেনা কলসে, কথা হয় রামধনুর ভিতর হু-হু টেলিগ্রাফে শৈশবের পিঁড়ির উপর বসে পড়ে : ‘কোলে করে প্লাবন ঠেকাচ্ছি।’ পদ্মার, নাকি শিল্পের?

রান্নাঘরে মোড়ার উপর বসে পল্প করতে-করতে আত্মীয়ের দিন চলে গেল খিড়কিদুয়ার খুলে : বাগান থেকে পাখি, কালো দড়ির ভিতরকার ফেটে-পড়া হাসির মতো সরোবর থেকে লাল-নীল-সবুজ মাছ—তাকে জেনো আমার যৌবন—কাচের ভিতর জলে আঁশ ঝেড়ে ফেলে জ্বলতে-জ্বলতে চলে যায় তৎপর মাছের ঝাঁক।

বাকি আছে ভবিষ্যৎব্যাপী কয়েকটি চোখের ভিতরকার মেহগনির পালঙ্কে শুয়ে থাকা, বিশুদ্ধ ব্যয়ের বিনিময়ে চেনা-অচেনা হাত রাখা; বাকি আছে সিঁড়ি টপকে-টপকে সাধারণ্যের হাটে জমে যাওয়া; তারপর তোমাদের চোখের পারুলের মধ্য দিয়ে চুরি করে চলে যাব অনন্তের ঘাটে-বাঁধা সাশ্রু বাতি-জ্বলা মৌল আমার নৌকোয় ॥

 


জ্যোৎস্না-রৌদ্রের চিকিৎসা
প্রকাশকাল : ১৯৬৯


তুমি : ১


সান্দ্র সন্ধ্যা গগনে ছড়ায় অমা।
তুমি কি এখন অশোকাভ কোনো ঘরে
অন্যমনস্ক গান গাও মৃদু স্বরে?
সোনালি তীরের মতো ছুটে যাও, রানি,
জানালায়, যবে আতীব্রক্রেংকার
কোনো যান থামে; রঙা ঝিলিমিলি-তোলা
সেই জানালায় তোমার যুগল পাণি
আমার ক্লান্ত মনীষা যেখানে খোলা
সেখানে রেখেছে স্পর্শ বারংবার।
রটিয়ে চাঁদের রুপালি ঘণ্টা তুমি
হয়েছ আমার আপূর্ণ পটভূমি।
জীবনের ঋণ শুধে যাই একদিকে,
প্রতিসাম্যের রঙিন বিপ্রতীকে
তোমাকে, দয়িতা, তোমাকে রেখেছি জমা ॥

 


উড়ন্ত অনুভূতি-৬


হ্যাঁ, একটি বাঁধাকপি, খুলছে তার পাতাগুলি, ঝরে পড়ছে যুগের পর যুগ, শূন্যে খশে বাতিল পালক, নীল শূন্যে রাঙা রামধনু হানলো কে, হানলো কে চাকরি আর মাছরাঙা আর তরমুজ আর চৈত্রসন্ধ্যা আর এই পালা—পত্রমোচনের

কে খুলে নিচ্ছে, চামড়া ছাড়িয়ে নিচ্ছে, খুলছে ভাঁজের পর ভাঁজ। পোশাক একটা বাধা : তাই চাই নগ্নতা; কিন্তু শূন্যতা মেলে : শূন্যতা নয়, নগ্নতা চাই—নগ্নতা আর নগ্নতা আর নগ্নতা

চোখে আমার পৃথিবীর দীর্ঘতম আলপিনের মতো এসে বিঁধল আলো, কাতর দেখলাম :  পরিবর্তমান, সমস্ত পরিবর্তমান—কিন্তু শূন্যের দিকে

জেরিনাকে বললাম, ‘দেখা হবে পৃথিবীর ঘুরন্ত ফাল্গুনে,’ নিশ্চিত কোনোদিন আসবে না জেনে

হানলো রজনীগন্ধা কে আমার সন্ধ্যা ভরে
আনলো গেলাশ-ভরা নারী

রাত্রি তার অস্বীকার-কার মুখের ভিতর ডেকে নিল, দিনের যোনির ব্যাদান, ধূ-ধূ পড়ে থাকে খোলা দরোজা, হা-হা করতে থাকে বাতাস, ফুঁপিয়ে ওঠে নদীপারের ডাকনাম-ধরে-ডাকা বেদনা, মাথা খুঁড়তে থাকে চরাচর ব্যেপে, বেদনা অস্ত যায়, ফের উঠে আসে, অস্ত যায়

আমি চিৎকারের মধ্য দিয়ে ছুড়ে দিলাম তার নাম : ‘জেরিন!’ প্রহত বাতাস বিচ্ছুরিত হ’য়ে বললো আহত হরিণের মতো মুখ ফিরিয়ে : ‘মে-লে-না!’

 


ও সংবদেন ও জলতরঙ্গ
প্রকাশকাল : ১৯৭৪


শহরে, অচেনা মাছ


তোমাদের শহরে এসেছি একটি অচেনা মাছ

দেবদারু-গাছের সবুজ ছায়া-পড়া স্বপ্নাভ-নীল জলের ভিতর দিয়ে
পাখির সীবন-করা রৌদ্রে-বাতাসে-হেমন্তে-সোনায়-বানানো চাদরের
                                                                          ভিতর দিয়ে
রামধনু-দিয়ে-তৈরি ব্রিজের তলা দিয়ে
আরো-ছোট শহরের পাথর-আর-মৃত্যু-বাঁধানো করিডোরের মধ্য দিয়ে
বাংলার পাড়াগাঁর শ্যাওলা-রঙ হৃদয়ের মধ্য দিয়ে

এসেছি সোনার টুকরোর মতো চকচকে মাছ তোমার রুপালি স্রোতে
ভুলে-যাওয়া কোনো নগরের হারানো চাবির মতো তোমার বিদেশি জলে
মনে ভাবছি কোথায় আমার প্রধান দরোজা
সময়ে হারিয়ে-যাওয়া শহরের প্রধান দরোজা
লুপ্ত শহরের প্রধান দরোজা

আমি এসেছি
কারখানা-আর মরণ-আর রেলরাইন-বসানো শহরতলির পাশ দিয়ে
এসেছি
ছোট্ট মভ-রঙের প্রপেলার আতীব্র ঘুরিয়ে
এসেছি
শহরে নতুন একটা চাষার মতো

ছিলাম পৃথিবীর শেষ-সুন্দরীর মাথার ভিতরে সোনালি মাছ
পৃথিবীর শেষ-সুন্দরীর চোখের ভিতর থেকে দু’টি নদী বেরিয়ে এসেছে
স্রোতের বিরুদ্ধে বয়ে এসেছি তার ভিতর দিয়ে
ছোট্ট সী-প্লেনের রেপ্লিকার মতো

সুখ
তোমার বিদেশি ব্যবহারে রোজ নিজেকে মনে হয় শহরে নতুন চাষার মতো
নারি
তোমার অবগাহন থেকে আমাকে দূরে রাখলে ঘূর্ণিজলের মতো
উষা
আমাকে কাঁদালে তোমার সৌন্দর্য শব্দে-ধারণে-অক্ষম কবির মতো

আমি অচেনা মাছ
তোমাদের এই বিশাল শহরে
শাহরিক জলে

ঐ কঞ্চির উপর মাছরাঙার ছদ্মবেশ পরে বসে আছে সুন্দর
ঝলমলে সর্বনাশ আমার

সুখ আমার কেউ নয়
নারী কেউ নয়
উষা নয়
আমি সুখকে দেখি জলজ লতাজালে জড়িয়ে আছে
পাড়াগাঁর কোন বৌ-এর জলমগ্ন গয়না-ভরা রুপোর বাকশোর মতো
নারী জলতলে শুয়ে আছে দ্বিতীয় চাঁদের মতো
নগ্ন মৃত অলৌকিক
উষার প্রথম রশ্মি আমার ভ্রমণজলের উপরে এসে পড়ে
কিন্তু রেখে যায় না কোনো চিহ্ন
আমি অচেনা মাছ
তোমাদের এই বিশাল শহরে
তোমাদের কাউকে ধরে রাখতে পারি না
জীবনের জলের সচলতা ছাড়া আর-কাউকে ধরে রাখতে পারি না

ও গাঙচিল
স্টিমারের ডেক-এ পৈঠায় মাস্তুলে তুমি বসো
উড়ে-উড়ে বসো
জলের সচল যাতনার অংশী নও তুমি
আমি যদি গাঙচিল হতাম

সূর্যকে দুটুকরো করে স্বপ্নের এরোপ্লেন চলে যায়
ফের সূর্য স্থির সুগোল নিটোল হাস্যরৌদ্রচ্ছুরিত

নিশীথরাত্রি আমাকে জন্ম দিয়েছে
আমি চলেছি ক্রমাগত ভোরের উদ্দেশে
চলেছি ক্রমাগত বিরুদ্ধে
মোহিনী ঘূর্ণিজলের যৌনাবেদন উপেক্ষা ক’রে
আমার দুপাশ দিয়ে ক্রমাগত বিরুদ্ধতা চলে যায়
চলেছি ক্রমাগত কাচের মতন জল-বিরুদ্ধতা কেটে
হিরের ছুরির মতো মাছ
তোমাদের অচেনা শহরে

আমি সমুদ্রে চলেছি।

 


রাত-শহরের তুমি


শোক-আর-সোনা-পরা শহর এখন জ্বলছে
বিশাল বাঘের মতো

আমার বেদনা আর আনন্দ উঠছে নামছে ছুটন্ত হরিণের চার পায়ে

শস্তা রেস্তোরাঁর ঝাঁপি খুলে আশ্চর্য পোশাক-পরা বাদশার মতো
ময়লা মেঘের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসে চমৎকার চাঁদ

রাত্রি-আমি চলেছি ভোর-তোমার উদ্দেশে

রাত্রির ভিতর তুমি আমার একমাত্র জ্বলা নিদ্রাহীন সোনালি জানালা
ভুল সূর্য

রাত্রির ভিতর দিয়ে ঝরনা আমি চলেছি
তুমি প্রত্যেকটি পাথর

আমি হয়ে উঠি জ্বলন্ত দহমান রাত-শহর
তুমি চাঁদের মতো নিতম্বে নক্ষত্রের মতো স্তন-চূড়ায় নিশীথনীলিমা

খুব মধ্যরাতে
মাথার উপরে চাঁদ দেখে
হঠাৎ শাহবাগের মৃত ফোয়ারা শতধারে উচ্ছ্রিত-উৎসারিত হয়ে ওঠে

টেলিফোন-তারের ভিতর দিয়ে স্পন্দমান সুসংবাদ আমি
                                                           চলেছি তোমার উদ্দেশে

মধ্যরাতে
ঘুমন্ত ট্যাক্সি চঞ্চল খরগোশ শাহরিক শান্ত জটিল
                                       জ্যামিতির মধ্যে লাফিয়ে বেড়ায়
ডি.আই.টি. বিল্ডিং-এর চূড়া দীর্ঘ দুষ্টুমি করে
                                       একবার চাঁদকে ছুঁয়ে ফ্যালে

সারা রাত্রি আকাশে চলে নক্ষত্রের টাইপ-রাইটার
হঠাৎ বেজে ওঠে টুং
কণ্ঠে সোনার মার্বেল-বেঁধা ঘুঘুর ডাকে

রাত্রির ভিতর দিয়ে ঝরনা-আমি চলেছি তোমার উদ্দেশে

আমার জলে
শহরের শেষ গোলাপজামগাছ থেকে আহত একটি পাপিয়া
                                                    ঝরে পড়ছে

তাকে আমি বয়ে নিয়ে চলেছি
আমি চলেছি
ভিতরে পাপিয়া

ঊর্ধ্বে চাঁদ
তুমি

ময়লা আলো নিয়ে আমি দাঁড়িয়ে থাকি শহরতলির প্রান্তিক লাইটপোস্ট

সারা রাত্রি ফ্রিজ-এ বাজে ঝিঁঝির ক্রেঙ্কার

আমার রোদন চুরি করে কেঁদে চলেছে ও।

 


ঘুমের ভিতরে নিদ্রাহীন
প্রকাশকাল : …


ইমেজ


একটা বিড়াল দেখেছিলাম
হিরে জ্বলছে তার এক-চোখে
এক-চোখে রুপো
আমাকে দেখলে যেত পালিয়ে
ছিলাম আমি ওর দর্পণ
এক-চোখে বাস্তব আমার
কল্পনা এক-চোখে
যে-দিকে তাকাই আমার চোখের ভিতরকার স্বপ্ন মেখে যায়

ট্রেনগাড়িতে দেখেছিলাম একবার
সোনালি-লাল বিশাল বল-এর মতো
ভোরবেলার সূর্য লাফিয়ে-লাফিয়ে আসছে
পুব-দিগন্তের দেয়ালের উপর দিয়ে
ট্রেনগাড়ির সঙ্গে দারুণ পাল্লা দিয়ে
ভোরবেলার সূর্য গড়িয়ে আসছে
একটা অতিকায় আরব শক্ত-কোমল ডিমের মতো
সেই ভোরবেলার সূর্য যেন
পূর্ব-রজনীর রেলগাড়িতে ঘুমঘোরে-শোনা ভিখিরি-গায়কের
       সুমধুর কণ্ঠস্বর থেকে বেরিয়ে এসেছে

টেবিল-ফ্যান-এর ঘূর্ণনে
আমি দেখি গলায় দড়ি-বাঁধা হরিণের ক্রমচক্কর

একবার দেখেছি আমাকে ছাড়াই স্যান্ডেল চলতে শুরু করেছে

দয়িতার ব্রা খুলে গেলে
স্তনমঞ্জরী হয়ে ওঠে দীপ্যমান বাল্‌ব
তার আলো একটি নীলাভ-কালো গোলাপের পাপড়ির উপর পড়ে থাকে

আমার ঘরের সবুজ ডিসটেম্পার-করা দেয়াল দেখে মনে হয়
আমি দোতালা অরণ্যনিবিড়ে আছি
তানপুরা দেখে আমার মনে পড়ে যায়
এক কামিনীর বিশাল নিতম্বদেশ

সারারাত্রি ফ্রিজ-এর আওয়াজ
আমাকে নিয়ে যায় গ্রামপ্রান্তে
যেখানে বাজছে অফুরান ঝিঁঝি

আমার সারাজীবন একটি দীঘল স্বপ্ন
স্বপ্নমহল থেকে স্বপ্নমহলে প্রবেশ
সেই স্বপ্নের ভিতর বসে আমি আর-এক স্বপ্ন বুনি কবিতার
ছেলেবেলায় সেলুন-এ যেমন দেখতাম অবাক বিস্ময়ে
দুই মুখোমুখি দর্পণের মধ্যেকার
       এক-আমি’র প্রতিফলনের পর প্রতিফলন ॥

 


স্বপ্নবিদ্ধ


ঘুম এসে কোলে করে নিয়ে গেছে যতবার,
ততবার স্বপ্নের দংশন;
জাগ্রত আমার
মন থেকে মনে কোন অফুরন্ত গোলাপ ছুটেছে।

রৌদ্রস্নাত চরাচরে এক-ফোঁটা বৃষ্টি পড়ে আমারই মাথায়;
আমিই সে জন, ভুল যে করেছে বারবার ঘুঘুকে উড্ডীন ফুল ভেবে;
—অঝোর বৃষ্টির মধ্যে আমার স্বপ্নের দৃঢ় ল্যাম্পোস্ট তন্দ্রঘোরে জ্বলে—
আধো-খোলা গোল ঠোঁটে আমি দেখি গভীর দ্যুতির সুন্দরতা।

তারাদের তহবিল-তসরুপ করেছি আমিই;
আমারই পা লেগে বারেবারে ছিঁড়ে গেছে অদৃশ্য মসৃণ মসলিন;
আমি রহিম মিয়ার মটরশুঁটির খেতে নেমে গিয়ে
                            ছিঁড়েছি সবুজ পুঁতি রাশ-রাশ;
বৃষ্টিপ্লাবী রাত্তিরের আলো-জ্বলা পিচ-পথ থেকে আমি
                            তুলে আনি গাঁঠ-গাঁঠ সিল্কের কাপড়;
তাকিয়ে আমারি ঘুমন্ত মুখের প্রতি মায়ের মমতায়
                            আমি সারারাত্রি জেগে থাকি;
চাঁদের টমটম আজ ছেঁড়াখোঁড়া মেঘ ভেঙে চলেছে রাত্তিরে,
পৃথিবীর ছোট এক ঘরে বসে স্পষ্ট শুনি তার চমৎকার ঘন্টার আওয়াজ।
ঘুম এসে কোলে করে নিয়ে গেছে যতোবার আমার শরীর,
ততবার স্বপ্নের দংশন;
জাগ্রত আমার
মন থেকে মনে অফুরন্ত গোলাপ ছুটেছে।

নীলিমায় পুঁতে দিও আমার কফিন ॥

 


পার্ক স্ট্রিটে এক রাত্রি
প্রকাশকাল : ১৯৮৩


আমার কবিতার শবে-বরাত


একটি জ্বলন্ত পঙ্‌ক্তি থেকে সারি-সারি শাদা
        রক্তহীন ইন্দ্রিয়বিহীন পঙ্‌ক্তি জ্বালিয়ে নিয়েছি।
বিদ্যুতের চেয়ে উৎসাহে ঘরে-বাইরে ছুটেছি দুদ্দাড়।
ইলেকট্রিসিটি নয়—আমার নিজের তৈরি অগ্নি জ্বলে
        ঘরে-ঘরে, বারান্দায়, করিডোরে,
        রেলিঙে, কার্নিশে, জানালার পাটাতনে, ছাদে
        গাছের ফোকরে—বাড়িময়।
এক-হাজার ঝলমলে পায়রা এসে বসেছে এখানে—
        ওরা কোন জাদুদণ্ডে স্থির থেকে আশ্চর্য উড়ছে।
দুঘণ্টার জন্য আমি পৃথিবী কিনেছি।
ফিরে আসবে তারপর বাল্বে আলো—গরিব, ময়লা;
        বৃত্তে কাজ—চিরন্তন।
শুধু দীর্ঘ রাত্রি জেগে বসে থাকবে একটি বালক
        আত্মার জানালা এই চক্ষুদ্বয় নিষ্পলক জ্বেলে।
অন্য সব ধ্যান-জ্ঞান লুপ্ত তার। দেখবে সে সমস্ত গাছের
        সেই এক-লহমার সিজদা দেওয়া মাটিতে লুটিয়ে,
        সমস্ত শব্দের সেই গাঢ়তম আত্মনিবেদন ॥

 


মাছ সরিজি
প্রকাশকাল : ১৯৮৪


শব্দ


‘স্তন’ শব্দ উচ্চারিত হওয়া মাত্র যেন
নারীর যৌবন শব্দ করে।
‘নিতম্ব’ শব্দটি যেন সোনার কলসির মতো ঠিক
নারীর পিছন তুলে ধরে।

এমন লাবণ্য শব্দে? প্রেমিকের মতো ওর পায়ে পড়ে
যাচ্ঞা করি ঐ দীপ্র যৌবন, চুম্বন।
‘শব্দ’ শব্দে এত জাদু? এমন মোহন মায়া?
ওর জন্যে শিখব আমি চৌষট্টি আসন ॥

 


এক ঋতু


রোজ কিছু-কিছু চুল খশে যায় মহার্ঘ সোনা-দানা।
উড়ন্ত পরী পৃখিবীতে এসে ছিঁড়ে ফ্যালে তার ডানা।

রূপসী নারীর সোনার অঙ্গে রোজ ঘষে যায় তামা।
ওয়ার্ডরোবেরও নিশ্চিত থেকে ছিঁড়ে সিল্কের জামা।

তরুণতম যে-কবি জ্বলছিল সূর্যের মতো তেজে
একটি দিনেই তুবড়ির মতো জ্বলে নিভে যায় সে যে।

জীবনোচ্ছল দৃপ্ত মাগীর ঘোটকীর মতো পাছা
চুপশিয়ে যায় এক ঋতুতেই;—তারপর শুধু বাঁচা।

অপাপ কিশোর খেলছিল এই নিশ্চিত ধুলোবালি;
এক রাত্রেই দুচোখের নিচে লেপ্টানো তার কালি।

কোথাও এসব জমা হয় নাকি, শূন্যের সিন্দুকে?
চোখে এক-ফোঁটা জল নিয়ে ভাবি, ঝড়ের ঘূর্ণি বুকে ॥

 


আরও পড়ুন :  তীব্র ৩০ : আবদুল মান্নান সৈয়দের বাছাই কবিতা