হোম কবিতা আজ আবার সবকিছু ভালো লাগছে

আজ আবার সবকিছু ভালো লাগছে

আজ আবার সবকিছু ভালো লাগছে
1.04K
0

আজ আবার অনেকদিন পর ভালো লাগছে, সবকিছু, এই যে ধুলায় রক্তাক্ত পড়ে আছে লাশ, তারই রঙে সেজে উঠবে আসন্ন গোধূলি, হাহাকারের শ্বাসগুলো জরির সুতোয় বুনে বুনে মালা গাঁথছে গ্রামের কিশোরী, তোমাকে যারা নগ্ন করে দিয়ে পালাচ্ছিল কী মনে হলো কে জানে ছুটে ফিরে এসে চোখের জলে ভাসতে ভাসতে তারা তোমার শরীরে জড়িয়ে দিল নীল আসমানি চাদর, দেখছি, সদ্য গজিয়ে উঠা ধানশিষ পরস্পর চুমু খেতে খেতে প্রেম রচিয়েছে জমিনে জমিন, কাস্তের ক্লান্ত সরু দাঁতগুলোতে মুক্তোর ঝিলিক ছড়িয়ে দেওয়া উদার সূর্যের মতো টিপ কপালে এঁকে কেউ দাঁড়িয়েছে প্রারম্ভপথের কোণে, নিজেকে অশ্বত্থের ডালে ঝোলাতে যাওয়া মানুষটার পায়ের তলায় সহসা সুড়সুড়ি দেয় দুষ্টু শেকড়, আঙুলে আঙুলে তার নেচে ওঠে সবুজ সবুজ ফুল, মৃত্যু তুমি আপাতত চলে যাও সাতসমুদ্র তের নদীর পাড়ে, খুব বেশি বেঁচে উঠলে আমরা নিজেরাই রুপার সাম্পান নিয়ে পাড়ি দেব তোমাকে ডেকে আনতে, আজ আর উড়বে না বলে কয়েকটি শালিক চোখের পানিতে ধুয়ে মুছে আগলে রেখেছে পালক, প্রতারিত প্রেমিকা আহা তরুণীটি হৃৎস্পন্দনের তাল বাজিয়ে গান করছে বিজন বনের কোণে, আজ একটু ঘুমিয়েই থাকুক জিহবাগুলো, ক্ষুধার আগুন নিভাতে হন্যে হয়ে কাটালো সারাজীবন, তৃষ্ণাতুর কণ্ঠগুলোকে জলেশ্বরীর স্রোতে সাঁতার কাটিয়ে আনা ভালো, আজ রোদে একলা দাঁড়িয়ে থাকব, দহনের সঙ্গে বহুকালের বোঝাপড়া বাকি, অনেক দিনের না-বলা কথাটি এবার বলবেই বুনো মহিষটা, তাকে ভাষা দিয়ো, দাড়ি কমা কোলন কিছু না থাকলেও চলবে, দুধরাজ সাপগুলোকে ডেকে ডেকে আজ আমি ভাইয়ের মতোই হিস্যা চাইব, গাভিটার ওলান থেকে কতটুকু দুধ তারা শুষে নিয়েছে, আজ ঠিক পক্ষ আর বিপক্ষের গ্রন্থি বেঁধে দিয়ে বিচারের আসনে বসে তালপাতার বাতাস খাব আমি, আজ বাতাসের পিঠে চড়ে নতুন নতুন খবর আসবে, তাদের গায়ে থাকবে রাজপুত্তুরের মতো রঙিন ঝলমলে জামা, তাদের জামার ছেঁড়া বোতামগুলো আমি সেলাই করে দেবো স্বপ্নের সুঁই দিয়ে, পলিকাদার ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা কাঁকড়াগুলোকে আজ আমি ডেকে নেব দাওয়ায়, দাঁত বসাতে আসা ইঁদুরগুলোকে তারা প্রেমের সাঁড়াশিতে জড়িয়ে রাখবে, আজ চুম্বনকাতর বিপন্ন ঠোঁটগুলো থিরথির কাঁপবে কেবল, আর তাদের মাঝখানে ফুটে থাকবে কদমের কুঁড়ি, বর্ষাতি নিয়ে বেরোনো বৃষ্টিমানুষেরা যেন পথ চলতে মেতে ওঠে গন্ধে হাসিতে, অপেক্ষায় থাকা বুড়িটার চামড়ার ভাঁজে গিয়ে লুকিয়ে পড়বে সময়, শিরশির আনন্দে বুড়ির চোখের কোণে ফুটবে জলজ কুসুম, হাড্ডিসার দেহগুলোকে আজ সুঠাম সুন্দর হাতে স্নান করাবে মোহ-ময়-ময়ীদের দল, আজ কোনো বাঁশি কেউ বাজাবে না কোথাও, তবু শ্বাসে শ্বাসে বাজবে সুর, তুমি আর ভুল করেও সরবে না কাছ থেকে, বকুলের দানা দিয়ে বানানো নূপুর পরে আজ এক কিশোরী সারাদিন নাচ করবে, তার দোলানো বেণি ধরে ধরে অদেখা অতল থেকে উঠে আসবে আমাদের যৌবন, আজ আর কলমগুলোকে সাদা সাদা নিরীহ কাগজগুলোর ওপর হামলে পড়তে দেবো না, আমার কলঙ্কের দাগ আঁকবে বরং একদিন, জমা থাক কালি, আজ নুয়ে থাকা কলাপাতাটিকে বলব সুপুরিগাছের মতো মাথা তুলে দাঁড়াতে, ডাবের ভেতর বন্দি থাকতে থাকতে সেঁদো হয়ে উঠা জলেরা বাষ্প হয়ে আকাশে উড়ুক, মেঘ হয়ে জমাট বাঁধুক, মানুষের পেটে যেন আর কেউ না যায় সহজে…

আজ আয়নার সামনেও একবার দাঁড়াব, নিজের মরে যাওয়া হাসিটাকে আবার বাঁচিয়ে তুলতে পারি, অন্য কাউকে দেখব এই ভয়ে লুকিয়ে রেখেছি আয়নাটিকেও, আজ ঘরের চৌকাঠে ঘোমটা পরে দাঁড়ানো বিস্ময়টিকে বলব ঢুকে পড়তে, প্রেমের পারফিউম মেখে আনাড়ি স্বামীর সকল কম্পন জড়ো হয়ে আছে প্রদীপের তলায়, পাড়ার সব শিশুদেরই একবার পিঠে চড়িয়ে ঘুরব, ওরা ডাকবে ঘোড়া, আর আমি ছুটব দ্বিগুণ গতিতে, খুরে খুরে নাজুক মাটির নাভি থেকে ফুটে উঠবে সোঁদাগন্ধের স্বপ্নোচ্ছ্বাস, দিঘির ঘাটে নাইতে আসা পাড়ার নতুন বৌটির নাকের নথে মানিয়ে নেয়ার দ্বিধা সংকোচ দেখে দেখে গায়ে সাবান মাখব আমি, পরকীয়ার হৃদয়েরা আজ আমাকে নুড়িপাথরের ঠোকা দিয়ে অভিশাপ দেবে, আজ অভিশপ্ত সম্পর্কগুলোকেও কেয়া-করবীর গন্ধে গন্ধে বেঁধে রাখব পৃথিবীর না-দেখা বাগানে, নাড়ি তুমি ধীরে আন্দোলিত হও, ধমনিরা শোনো, আজ যেন আমার হৃৎপিণ্ডের তিলমাত্র রক্তের স্রোতের চুম্বন থেকে বঞ্চিত না হয়…

আজ সবকিছু অনন্য হয়ে উঠবে, সাদামাটা মুখগুলো কনে-দেখা আলোর মতো ছড়িয়ে পড়বে লালাভ উচ্ছ্বাসের দশ দিগন্তে, রঙধনুর পোশাক পরে লেফট-রাইট করে যাবে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়া সৈনিকের দল, মাটির দাওয়াখানি হয়ে উঠবে চন্দনকাঠের আসন, পেরেশান প্রেম এসে গা এলিয়ে বসলে দাওয়ার কোনায় পিঞ্জরের ভেতর গুমরে মরা সুখ ডানা ঝাপ্টাবে, আজ আমি সেই অস্থিরতার তন্তু বুনে বুনে ধ্যানমগ্ন নদীজলে ভেসে বেড়াব, আজ আর একটি কথাও তুমি পৌঁছাতে পারবে না স্রোতস্বিনীদের কাছে, অথবা তোমার সব কথাই সেইখানে গিয়ে প্রস্তরফলকের ভান ধরে আছে, একটি দীর্ঘশ্বাস মসলিনের মতো জড়াবে জীবনোন্মুখ মানুষের শরীর, একটি কম্পন নাড়িয়ে দেবে জড়বৎ কামনার নড়বড়ে ভিত, একটি চোরা চাহনি শূন্যপটে খচিত করবে লাখো বসন্তের জলছবি, একটি আহবান ভেঙে ফেলবে মুখ থুবড়ে থাকা আকাঙ্ক্ষার লৌহদেয়াল, একটি সঙ্গম জন্ম দেবে শতরজনীর শয্যায় রচিত গার্হস্থ্যের সোনালি উত্তরাধিকার…

আজ চোরাগুপ্তা ছুরিগুলো জোনাকির মতো ঝলমলাবে অন্ধকারে, মৃত্যু নয় জীবনের চকমকি আগুন জ্বেলে দেবে তারা, অভিমানের ভুরুদ্বয় ধনুকের মতো কৌশলে ঠারের খেলা খেলবে আজ আমার সঙ্গে, বালুর ঢিবি বানিয়ে গেছে নদীজ শৈশব একা একা, আজ সে ঢিবিখানা মনে হবে নিতম্ব তোমার, কামনার ঢেউয়ে ঢেউয়ে চুমু খাওয়া বাসনা বুঝে নেবে মাত্র সে সাবালক হয়ে উঠল আজ, পাওয়া না-পাওয়ার সকল রক্তপাতের মানচিত্র তোমার বুকের ’পরে পাঁজরে পাঁজরে আঁকা হবে জেনো, সন্তানবৎসল অনন্ত দুগ্ধের ধারা ভাসিয়ে নেবে ভাঙনধরা জৈবজনপদের বাঁধ, হুড়মুড় ছুটে চলবে জীয়নের দুরন্ত লোহিত…

আজ আবার সব ভালো লেগে যাচ্ছে আমার, পট পট করে ভেঙে যাচ্ছে লম্বা নিষ্ঠুর নখগুলো, টিকটিকির কাটা লেজটাকে জোড়া দিতে সারাটা দুপুর কেটে যাবে, ডেকো না করুণায় অহঙ্কারী প্রজাপতিরা, আজ আমার বাহুতে রঙিন পাখনা লাগিয়েছে কল্পনা সেন, আমিও তার পায়ে আলতা মাখাতে মাখাতে ঋণশোধের অঙ্ক কষে যাব, খসে পড়া কুকুরের লোম দিয়ে বালিকাটিকে একটা ফ্রক বানাতে বলব, আমি তাকে কিনে দেবো নারকেল-খোসায় তৈরি জুতো, আজ গোপন কথার মুক্তো লুকিয়ে ঝিনুকটিও আমার সাথে ছল করবে ঘাটে, পা তুমি সাবধানে ভিজিও বৌ, অনেক রটনা আজকে নড়ে উঠবে চৌপাড়বন্দি জলের ঢেউয়ে ঢেউয়ে…

আবার সব ভালো লেগে যাচ্ছে, আজ, প্রতিটি পদছাপ ধূলির ওপর হয়ে উঠছে ধূসর নকশিকাঁথা, সময়ের সুঁই দন্তস্ফুট করে গেছে তার গায়ে পিঠে, প্রতিটি পলকের আঁচে ধরা পড়ছে প্রেমাতুর হিমশীতল অন্তর্মুখী নারী-পুরুষের দৃষ্টিচড়ুই, প্রতিটি চিৎকারের নাভি চিরে বেরিয়ে পড়ছে অতনু নীরবতার দ্রাক্ষারস, আমাকে আজ আলো আর আলেয়ার মাঝখানে পরশমণিটিকে গুঁজে দিতে দাও, স’য়ে যাওয়া আর ক্ষুব্ধ হওয়ার মাঝখানের নখ-খুটে দাঁড়ানো সংবেদনকে হীরকদ্যুতিতে জ্বলে উঠতে বলো, আজ আমারই দিন মনে হচ্ছে, দু’হাত ভ’রে ঢুকে যাবে ফল ও ফসল, মাংসল-নক্ষত্রের মতো দুটো স্তনবৃন্ত ঝিকমিক করে উঠছে ভুখা বঞ্চনার দলনপীড়নের শাঁসমাত্র জীবনের চির অন্ধকারে, শিশু হয়ে যুবা হয়ে প্রৌঢ় হয়ে মাতৃমতি পৃথিবীর রূপকুণ্ড থেকে মমতার ছলনার সব রস নিংড়ে নেব আমি,

নেব বলেই চোখ মুদেছি, শেষবার, পাপড়ির পাহারা রেখে নয়নতারা চঞ্চল অস্থির, আড়াল থেকে আড়ালতর দৃশ্যমদির ভুবন কাঁদছে, পিনপিনিয়ে, কাঁদুক, এই কান্নাও ভালো লাগছে, সবকিছুই ভালো লাগছে আজ, আবার…

শুভাশিস সিনহা

জন্ম ২৯ জানুয়ারি ১৯৭৮, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার ঘোড়ামারা গ্রামে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। বর্তমানে মণিপুরি ললিতকলা একাডেমিতে নাট্যপ্রশিক্ষক।

প্রকাশিত বই—

ডেকেছিলাম জল (কবিতা)
অক্ষর নতুন করে চিনি (কবিতা)
বেলা দ্বিপ্রহর (কবিতা)
হওয়া না-হওয়ার গান (কবিতা)
দ্বিমনদিশা (কবিতা)
আবছায়াদের রূপকথা (গল্প)
প্রতিরূপকথা (নাটক)
কুলিমানুর ঘুম (উপন্যাস)
ইঞ্জিন (উপন্যাস)
ভাষা, কবিতা ও রবীন্দ্রনাথ (প্রবন্ধ)
রবীন্দ্রনাথ : গ্রামের ছবি (গবেষণা)
মণিপুরি সাহিত্য সংগ্রহ ২খণ্ড (অনুবাদ ও সম্পাদনা)

ই-মেইল : shuvashissinha@yahoo.com