হোম কবিতা আজমাঈন তূর হকের কবিতাগুচ্ছ

আজমাঈন তূর হকের কবিতাগুচ্ছ

আজমাঈন তূর হকের কবিতাগুচ্ছ
2.16K
0

শব্দ-আলেয়া থেকে



পৃথিবীর বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ডে ফলের দোকান অবস্থান করে। দূর থেকে কুয়াশা কেটে আসা ঢাকাগামী বাস থামে। মানুষ ফল কিনে ফল খায়—গরিব আর কুকুর চারদিকে ঘোরাঘুরি করে। একটা আপেল গড়িয়ে গেলে হুলস্থুল ঘটে। হেডলাইটের সামনে মানুষের চোখে একটু ভয় খেলা করে, কিন্তু তারপরও যথেষ্ট আপেল হয়ে ওঠা তো লোভনীয় নিঃসন্দেহে।


প্রাগৈতিহাসিক পৃথিবীর পছন্দের কোনো শব্দ আমাদের জানালায় দেখি না। এখন শুধু ঢেউ আসে, আর আসে ভিনগ্রহী সত্যসন্ধান। এসবকিছু মিলিয়ে বর্ষাপ্রেমলালালো সান্ত্বনা। একটা ছেলে নতুন গিটার কিনে সাইন্সল্যাব থেকে বাসে উঠলে গুরুজনেরা জিজ্ঞাসেন— ‘স্টিভ ভাই তোমার কেমনতর ভাই, খোকা?’


বাংলাদেশের মফস্বলে দুই প্রকার দালানঘর লক্ষ করা যাবে। একপ্রকারের কাজ নারকেলপাতা মাথায় ধারণ করে স্কুলফেরতা প্রেমিকের হাতে প্রয়োজনীয় নীলখামটি তুলে দেয়া। অন্য প্রকারটি ঝড়ের রাত দেখে গৃহত্যাগ করবে। এবং নীলখামটি অসতর্কতায় উড়ে গেল কিনা তার সন্ধানে বের হবে।

অন্যদিকে শহুরে বিল্ডিং মফস্বলীয় স্মার্ট হতে চায় বলে মনে করা হয়। তারা সাধারণত বাঁকা হয়ে হাঁটে।


প্রেম, শহরতলি


হলুদ এমন রঙ, যাতে অনিবার্যতা ঢেলে পাতা ভোরের দিকেই শীতার্ত ঝরে পড়ে। উচ্চকণ্ঠের দিন শেষ করে আসো। তখন গভীর ধানক্ষেতের বাঁক, ভেজা পাখির যাতায়াত; আত্মহত্যার ক্ষুদ্রতম ঘুম। ব্যাঙের পিঠের মতো ছায়াধরা পাতার নিচে আয়তসুর কোনো বাদ্য শোনা যাচ্ছে। সূর্যের সমাপ্তি, নিয়ন্ত্রণরহিত। কে তুমি পুরাতন পার হয়ে পাশ-ফেরা বারান্দায় বাজাও মেঘদূত, আর আমাদের মতো গণিত-অন্ধ কালিদাসের মুখের উপর অমন হেসে ফেলো?

এই শহরের রাতে যখন একটা খরগোশ-ও চোখে পড়ে না, তখন তোমার জানালার ফাঁকে চুম্বনকাতরতার তুমুল শব্দ পাঠালাম।


জঙ্গলের গান



ভাবো, তোমার খেলনা ঘরের পাশে এক স্মৃতি আর ছায়ার জঙ্গল। রোদ পড়ে গেলে অচিন ডানার পাখির মতো ব্যালকনি থেকে দেখা যাবে, পাতার আড়াল—পাতাল। নেকড়েদলের বিভ্রান্ত ভ্রমণ, তাদের পশমের ফাঁকে তরল জ্যোৎস্নাবিন্দু—এসব সহ নৈঃশব্দ্য মতো বসে আছো। পশ্চিম থেকে সূর্যের ডাক—দলচ্যুত হলো এক ঘোড়া। তুমি খেলতে নামো যত্নের পরিখা পার হয়ে। পতনশীল পানির শব্দের কাছাকাছি, পত্রালির ছাদ পার হয়ে আসা শেষবেলার আলো তোমার মন ভালো করেছে। এসবই ভাবো তুমি স্পর্শের আলুলায়িত দূরত্ব থেকে…

তখন ভেবেছি তোমার ঘরের পাশে দৃষ্টি কেমন নোনা হয়ে আসবে।


মেঘের তুলা ভরে, ধুতুরা বিষ মেখে
ঘরের দরজায় যাদের ধরে রাখো
পাহারা, কবুতর—উড়তে যদি পারে
তাদের সম্মতি ব্যর্থ জেনে নাও।

ব্যর্থ নিয়তির শ্রবণে জল ঢালা
ডানার গোপনীয় শান্ত চোরাবালি
শিকারে রাত্রির আহত আলো দেখে
তোমার বন্দুক-ও মিথ্যা হয়ে যাবে।

বরফে ক্রেমলিন-অস্ত, ডুবে আছে
পানিতে রানীঘাট; অসহ ভ্রান্তির
নেকড়ে ভুল বুঝে তোমার ঘর কাছে
গোলাপ পাপড়িকে ভাবছে শান্তির।

রঙের অবসাদে—পাহাড়ে প্রজাপতি
যখন উড়ে গেল পানিতে ছায়া ফেলে
ডুবছে জোৎস্নাও—ডানার চোরাবালি
নিয়ত সাধারণ ভ্রান্তি অন্ধের!


যাত্রা


পাতা ভোরের শাদা মেঘের
থেকে চমকে গিয়ে রাতে
বৃষ্টি—মেলাঙ্কোলি ধরা
কাঁপা চাঁদের পাশে
অহংবোধে কাঁদে।

তখন আত্মমুগ্ধ চাদর
ঢেকে বেগানা সওদাগর
হাঁটছে হৃত, বাতাসলব্ধ
মশলাবাগান দিয়ে।

ভাঙো চমক, শহর তোমার
কোন ট্রেনের বাঁশি শুনে
পদ্মাপারের ধুনে।

এখন সন্ন্যাস জাগে—কার
রেখে ছায়াময় সংসার

একটা কান্না জাগে শুধু
ঘুমের আদিম পাতা থেকে
অনাগরিক সান্ধ্য-ইমন মেখে…


আনাতোলিয়া


নদীমধ্যের অচেনা ঝড়ের
এখনো ভাঙছে স্মৃতি
যখন আলোয় হিলহিলে রাত
ধীর লয়ে উঠে আসে।

বাতাসের দিন মেঘসবে ডুব
আরো ধীর কোনো মুখে
দৃশ্যজটিল আড়ালে তখন
ব্যালকনি যায় দেখা!

আনাতোলিয়ার
দূর কোনো মুখ ভেজা ভেজা ঘড়ি
একুশ তলায় নীলে সিগ্রেটে
ধুলা চকোলেট রাঙা।

গাঢ় পানি ঢাকা ভুল কোনো রাত
বিকাল চমকে আসে
নক্ষত্রের হাতে কার হাত;
বুটের শব্দসহ—
নিকট সন্ধ্যা, ভিজে যায় শুধু

কাঁপা কাঁপা অন্ধকার
রাজার
শহর ভিন্ন আর কোনো শীত
তোমার হয় নি দেখা।

তখন সন্ধ্যাহীনতায় ঢাকা
নিয়তির মেঘমালা
গিটারের রাত—নদীমধ্যের
নিয়মিত স্তব্ধতা

দূর থেকে যায় শোনা।


<      >


আমাদের একাকিত্বের স্থান
খুব সহজ কোনো টেবিল
আততায়ী ফার্মগেটে
হঠাৎ বৃষ্টির মুখে
ঢুকে পড়া বিকাল, আলাপ।

রোদের আড়াল কত সংকীর্ণ
বস্তুপৃথিবীর সেলফি-তোলা হাহাহিহি
বোধ থেকে অন্ধকারে—
সমুদ্রের বাতাসে ক্লান্ত

‘কথাবলোকথাবলোপাগলকিছুতোবলো’

বিরল মুখোমুখি বসে থাকা
দৃষ্টি লুকায়ে ফেলা—
গোপনে,
কোমল ওয়াই-ফাই জোনে


আলকেমিস্ট


টেবিলের ধুলার উপর ইতস্তত বৃত্ত দেখে
ভাবলাম বৃষ্টি হয়েছিল;

অনতিদূরে ভেড়াগুলো চড়ছে জুনিপার
ঘাসের গভীরে, সকালের ভিজে আসা রোদে।

বিচ্ছিন্ন কোলাহল, গ্লাসের শব্দ, গিটার
তামাক আর চর্বির দহনে বাতাস ভারি হয়ে আছে
রুমাল ওড়ে সমুদ্রবাতাসে,
সান্তিয়াগো

নিকটে গেলে এক বোতল দেখায়, চিঠিভরা
বোতলের গায়ে লবণ লবণ…
মৃত চিঠি, অচেনা ভাষায় আঙুল নাড়ায়
সান্তিয়াগো
নিজেকে সে লিখেছে শৈশবে

আজমাঈন তূর হক

জন্ম ১৯৯৭, কুষ্টিয়া।

turbookebook@gmail.com.

Latest posts by আজমাঈন তূর হক (see all)