হোম কবিতা অহম ও অশ্রুমঞ্জরি : কিছু কথা, কিছু কবিতা

অহম ও অশ্রুমঞ্জরি : কিছু কথা, কিছু কবিতা

অহম ও অশ্রুমঞ্জরি : কিছু কথা, কিছু কবিতা
1.05K
0

অনুপম মণ্ডলের কবিতা এর আগে এদিক-সেদিক দুএকবার নজরে পড়লেও ভালো করে খেয়াল করা হয় নি। পুরস্কার কমিটির বিচারকদের একজন হিশেবে অন্যসব পাণ্ডুলিপির সাথে অনুপম-এর ‘অহম ও অশ্রুমঞ্জরি’ পড়ে রীতিমতো চমকে উঠেছিলাম। এতই পরিণত আর কাব্যকুশলতায় দীপ্ত এক মনের ঐশ্বর্যে মোড়ানো কবির নিহিত অহম আর অবরুদ্ধ অশ্রুমঞ্জরি যে তা পাঠককে বাকরুদ্ধ করে রাখে। আমাদের খিন্ন জীবনের সুবর্ণ সংকেতগুলো এক অনুপম পরিমণ্ডল হয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়েছে অহম আর অশ্রুর আড়ালে। খণ্ডিত সংবেদগুলো আইসবার্গের মতো আমাদের কাছে যোজকের ভূমিকায় ইষৎ আভাসিত হয়ে জানিয়ে দিচ্ছে এর অদৃশ্য আয়তন সম্পর্কে। ঘুমের কিনার থেকে অনুপম আমাদেরকে এক হিরন্ময় জাগরণ পৌঁছে দিয়ে পুরস্কৃত করেছে এই কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে। ফলে তাকে পুরস্কৃত করতে গিয়ে উল্টো আমরাই পুরস্কৃত হয়েছি।

রাজু আলাউদ্দিন


অনুপম মণ্ডলের পাণ্ডুলিপি ‘অহম ও অশ্রুমঞ্জরি’র কবিতাগুলো পড়ে যে ধারণাটি শুরুতে জেগে ওঠে, তা হলো, নগরজীবনের বাইরেই তিনি ব্যবস্থিত। এরপর মনে হয়, তিনি বিশ্বপ্রকৃতির অংশ হিশেবে মানবসত্তার পর্যবেক্ষক। তৃতীয়ত, তিনি প্রকাশ করতে চান জীবনের বিলীয়মানতার রূপ। চতুর্থত, জগতের মন্থরতা দেখানো এই পাণ্ডুলিপির প্রধান একটি লক্ষ্য, জীবনানন্দ দাশের কবিতায় যা পরিস্ফুট; কিন্তু ভাব বা বিষয়চূর্ণ নির্বাচন ও প্রকাশভঙ্গিতে স্বাতন্ত্র্য সৃষ্টির অভিপ্রায় এতে দুর্লক্ষ্য নয়। এবং এটা কৌতূহলকর যে, এই পাণ্ডুলিপির কবিতাগুলো নগরজীবনের বাস্তবতায় জড়িত না হয়েও পাঠককে আকর্ষণ করছে আধুনিক চেতনা বা সংবেদনশীলতায়, যাতে জ্ঞাতব্য হয়ে ওঠে মানুষের বিপর্যয়, বিচ্ছিন্নতা; জটিল ও অনির্ণেয় জীবন। প্রকৃতির মন্থরতার মধ্যেই তিনি তা দেখাতে চান। যা আমাদের নিয়ে যেতে চায় উপস্থিতি থেকে অনুপস্থিতির দিকে এবং নিয়ে যাওয়াই এর কাজ, পৌঁছে দেয়া নয়। এই উপসংহারহীনতা তার কবিতায় সঞ্চার করেছে আপেক্ষিক ভাবনার এক জগৎ; পরিণত কবির রচনায় লক্ষণটি লক্ষ করা যায়।

চঞ্চল আশরাফ


গত একশ বছরের বাংলাকবিতার স্বভাবের মধ্যে থেকেও কেউ নতুন কবিতা লিখলে তা চোখে পড়ে সহজে ও আলাদাভাবে। শতবর্ষী কবিতার পুরনো শব্দের চিরহরিৎ অরণ্যের মধ্যে নতুন ধ্বনিকল্প, অর্থকল্প ও চিত্রকল্পের এক অভিনব ও অসমাপ্ত কল্পলোক ‘অহম ও অশ্রুমঞ্জরি’। হাটের ভিড়ে রাজ্যের কৌতূহল নিয়ে ঘুরতে থাকা কিশোরের মতো অপূর্ণ, অবিকশিত কিন্তু মাসুম। পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল দুহাতে আকাশ ধরার আকুলতায় চিরাচরিত বাতাসে দুলছে ঘোরগ্রস্ত এক তরুণ তৃণ।

ষড়ৈশ্বর্য মুহম্মদ


এই এক ভাষা অনুপম সতর্কভাবে তৈরি করে চলেছেন যেখানে সুরও পঙ্‌ক্তিতে অর্থারোপ করতে চায়। শব্দ যেমন নিজে দ্যোতনা দেয় তেমনি এর অন্তর্গত ধ্বনিকে পরের শব্দটির ধ্বনির কাছে পৌঁছে দিতে পারেন তিনি। আমরা পাঠকেরা, ফলে, ধ্বনি আর দ্যোতনামিশ্রিত এক জগতে প্রবেশ করি, যা হয়তো ফর্ম হিশাবে নতুন নয়, কিন্তু প্রত্যেক শৈলীসম্পন্ন কবির মতোই, অনুপম ধীরস্থিরভাবে তা নির্মাণ করে চলেছেন। অনুপমের কবিতা ভালো লাগার আরেকটা কারণ তাকে কষ্ট করে কবিতা লিখতে হয় না, স্বতোৎসারিত তার প্রবাহ। এর সাথে যুক্ত হয়েছে নানান মুডে নিজের কল্পনা, স্ট্রাগল আর ভাষাকে বুঝে নেয়ার প্রবণতা। সুর তৈরির যে পারঙ্গমতা, বিশেষ করে তার স্লোনেস, এক কথায় মর্মভেদী। এই তরুণ কবির অনুধাবন আরো বিস্তার লাভ করুক, তার জয় হোক।

তারিক টুকু


বি তা


অপরাহ্ণের ভেতরে

ধ্বনির পৃষ্ঠদেশ থেকে নেমে সে মেঘেরা, আরো আস্তে, অশোকের ডালপালায় মুড়িয়ে গিয়েছে। ক্ষীয়মাণ, কোন সন্ধ্যারাগরক্তের বিভা পড়েছে জলে।

আর একটা অনাবৃত শিলাখণ্ড, প্রান্তরের সুকঠিন নিস্তব্ধতা ভেঙে, আধো অন্ধকারে আকাশে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে। যেন কোথাও বিস্মৃতিলোকের দিকে, আমাদের আওড়ানো গানগুলো, অপরিমেয় এক নিঃসঙ্গতার ভেতর দিয়ে যেতে যেতে আরো ভারি হয়ে উঠছে।

*

দূর, দিকচক্রবালের ওপর, অস্পষ্ট কল্লোলধ্বনি, ও কার? একটা অভ্রকণা মেঘাচ্ছন্ন বাদামবনে, আলাপে, ক্রমশ ঘন হয়ে নামছে।

ফলে, সে গুল্ম ও তৃণদল, হীনকুলোদ্ভব, কোনো পতনই ধারণ করতে পারছে না শিরীষের শাখার ফাঁক দিয়ে, তারাটি, শুধু ভোরের বাতাসে কাঁপছে আর কাঁপছে।


দীর্ঘ ঝাউয়ের মাথা

সূর্যাস্তের দিকে পাশ ফিরে, যে ইঙ্গিত ছুড়ে দিচ্ছে জলপাই গাছটি, তার থেকে ছিটকে আসা নৈঃশব্দ্যটুকু গেঁথে নাও। আর দ্যাখো, তিনি পুনরায় বজ্রের বোঝা মাটিতে নামিয়ে রেখেছেন।

একটা কোঁকড়ানো গমক থেকে কোনো আর্তনাদ, তার বসন বদলে চলেছে। ফলে অদূরে বাতাস বইছে, আর ঊর্ধ্বে, সান্ধ্য স্তব্ধতা ভেঙে যে সুরটি অধোমুখে ঝুলছে, তার পেছনে ধোঁয়ার মতো আভাটাকে দেখা য়ায়।


নিদ্রার আয়োজন থেকে

ঐ দূর নক্ষত্রের ইঙ্গিত থেকে দু’একটি সুর ভেসে ওঠে। যেন, কারো হিম সুষুপ্তির তলে, তখন, হরিৎ কোনো আলোকের আভাস। যে সন্ধ্যা একদিন দুর্বোধ্য ছিল জীবনে, আরেকবার ভাষাহীনতার মধ্যে পেলাম তাকে। নিদ্রার আয়োজন থেকে কিছু দূরে। শূন্য পথের প’রে ঝরে-পড়া মর্মরিত পাতার মতো।


সন্ধ্যার কিছু আগে

একটানা ঝিঁঝিঁ ডাকছে।
কোথায়, কোন বনপ্রান্ত, ভ’রে আছে শন-শন শব্দে।

মাঠের এই শীর্ণ পথ ধ’রে যারা ফিরেছে সন্ধ্যার কিছু আগে,
তাদের মাথার উপর আশ্রয়হীন খড়ের ঘরখানি।

একটা সুর, ঘনায়মান নির্জনতার মধ্যেও,
অন্ধকারে জড়িয়ে ধরেছে আমাকে, ঝিঁঝিঁকে, পথকে!


ঐ একটি মাত্র পদ

নক্ষত্র সংকেত থেকে দেখি যেন তার
ছিন্ন ভিন্ন দেহ, ঘনঘোর গর্জন করে চলেছে।
শান্ত ললাট আর রুদ্ধপ্রায় প্রাণবায়ু, ঐ বসুধার কোলে শায়িত।
যেন একে একে আয়নার ভেতর দুলে উঠছে যত অবিমৃশ্যকারিতা
একটা ভূলুণ্ঠিত নিরীহ কণ্ঠস্বর শুধু উদ্ভিন্ন কূটাভাস লক্ষ্য করে এগিয়ে চলেছে।


তার অন্তিম কালের স্বর

তার অন্তিম কালের স্বর; দু’একটি কথা, বুঝিবা কোথাও ধ্বনিত হচ্ছে। সে আছে, জড়সড়। অগ্নি যেন, আপন রুধিরস্রোত এমন রেখেছে ঢেকে। মেঘগম্ভীর ধ্বনিমধ্যে অকাতরে নিদ্রা যাচ্ছে সমস্ত অতীত।

আর অতীত, তার আয়নাসহ আছড়ে পড়ছে আগুনে, সকাতরে।


চরণ

আরো নিভৃতে, সে শ্লোকের চরণটি এসে পাশে দাঁড়ায়
আর দেখা যায়, তখন, নৈঃশব্দ্যের ওপর আছড়ে পড়ছে জলপাই গাছগুলো
গারদ নাকি? প্রাচীরের গা থেকে, কুঁজো হয়ে, এই রকম বহু প্রশ্ন ভেসে আসে
পাতার ফাঁক ঠেলে, ঝড়ের দমক, একটা আলোর অস্পষ্ট ইঙ্গিত ভারি হয়ে ওঠে