হোম কবিতা অরণ্য-র দশটি কবিতা

অরণ্য-র দশটি কবিতা

অরণ্য-র দশটি কবিতা
1.24K
0

যে বেলুনগুলো রংহীন

মৃত্যুযন্ত্রণা থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে যাচ্ছে মায়াবী বেলুন
যারা আজ তুলেছে সুর কুঠারের ঐ ঝড়ের বাগানে
আমি তাদের বলছি সৈনিক
বিদঘুটে উল্কি ভালোবেসেও হেসেছে
কোথা থেকে উড়ে আসে এইসব অসংখ্য নীলমাছি
যে তুমি হাত বাড়ালেই এখনও নেমে আসে আকাশের সিঁড়ি
সে তুমি জানো না কিভাবে নিজেরই লাশ কাঁধে
দাঁড়িয়ে থাকে মূর্তির শরীর
বোবা-উল্কি সেও কেঁদে ওঠে ত্বকের গভীরে
তোমাকে শুধু এই বলতে পারি আজ
পোষা বেড়ালটা এখন ইঁদুর মারতে শিখেছে
আমি তাকে কিনে দিয়েছি জাদুর দাঁত, অলৌকিক ছুরি
রাত কত উজ্জ্বল হয়ে হেসে ওঠে ওর চোখের তারায়
আর আমি কারও অচেনা নিশ্বাসের পাশে শুয়ে থেকে
হয়ে উঠি বিরাট অজগর সাপ

 

 

যুদ্ধক্ষেত্র থেকে

পাতা উল্টানোর পর শীত বোধ হলো
যেনবা এইখানে ঋতুরা পাল্টে গেছে অনাবশ্যক, দ্রুত
যেসব নারীরা উষ্ণতা ভালোবাসে
তাদের মুখগুলো নিশ্চয় বরফের মতো সাদা
শুভ্রতা আমাকে কী দেয়
তার ঈষৎ খোলা ঠোঁটের মাঝে একগুচ্ছ দাঁত

সন্ধ্যার পর পৃথিবীতে মৃত্যুচিন্তাগুলো ধীরে ধীরে নেমে এলে
আমি গভীর রাতের পার্কে গিয়ে বসি
শঙ্কিত উদ্ভিদ ও আমি
আশ্চর্য সেখানে তুমি কখনও চাঁদ হয়ে আসো না
অথচ পুণ্যবতী একটা মুখ
বস্তুত, গর্ভ ব্যাপারটায় পাপ নেই কোনো

তোমায় বলছি শোনো
তুমি কি জানো
আজকাল অধিকাংশ সময় আমি কী চিন্তা করি
যুদ্ধ শেষের গ্রাম, কয়েকটি শকুন
তোমার মাংস নিয়ে করছে টানাটানি

আহ, আলো জ্বেলো না
আমিও নৃসংশভাবে মানুষ খুন করতে পারি
এবং আমার এই রক্তমাখা পাতাগুলো শুকিয়ে এলে জানবে
যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দেখা প্রতিটি মানুষের মুখ-ই
কী ভীষণ বিকৃত

 

 

তোমার চোখ থেকে ঝরে পড়া আলোয়

কেমন ফিকে আর শান্ত বাদামি হয়ে উঠেছে তোমার চোখ
যেন তা থেকে ঝরে পড়া আলোয় দূর হবে
পৃথিবীর সমস্ত রোগ
যদি আমরা বাস করতাম মহামারীর ভেতর
তবে কি ভুলে যেতাম সেইসব সোনালি সকাল
যা আমরা বাক্স থেকে বের করি নি কখনও
জানি, এমন শব্দেই কেঁপে ওঠে বুক
আর শহরতলি থেকে মফস্বলের দিকে ধীরে ধীরে
সরে যায় রোদ
আমাদের গলির কুকুরটা এখনও রোজ
কোথা থেকে এক খণ্ড হাড় কুড়িয়ে এনে সামনে রেখে
সারাদিন শুয়ে থাকে চুপচাপ
এইসব শব্দ এভাবে বললেই নতুন হয়ে ওঠে আরও
আর তোমাকে দেখতে পাই জানালার পাশে ফুল
এই শহরের মানুষেরা প্রায়শ খুঁজে মরে সমুদ্র, ঢেউ
আর প্রতিদিন আমি খুঁজে ফিরি বিষণ্ন কারও চোখ
যা দিয়ে সে দিনের পর দিন দেখে গেছে
পৃথিবীর গোপন রোগ

 

 

আমার সঙ্গী-পাখিটি যেভাবে ওড়ে

এখন আমি নিরাপদ, ক্ষুধার্ত রাত শেষ হয়ে গেছে
আয়ু ক্ষয় না করেই উড়তে পারি আকাশে
গাছের ডালে বসে পোকাদের সাথে কথোপকথনে কেটে যায় দিন
আমার সঙ্গী-পাখিটি বাতাসের ভাষাও বোঝে
সবুজ ফলের দেশ সে বহুবার দেখেছে
আমি তাকে জিজ্ঞেস করি খনি-শ্রমিকের কথা
স্বপ্নের মাঝে নুয়ে পড়া তালগাছের কথা
উত্তরে বলে, পুরোনো রোদের সাথে সখ্যতা নেই তার
কাগজের নৌকা ডুবে গেছে জলে
আমার সঙ্গী-পাখিটি আমাকে এইসব বলে
উড়ে চলে যায় হলুদ ঘাসের দেশে
সেখানে নাকি এখন সে দিনভর
নীলফল চাষ করে

 

 

নীলপিয়ন

খামে ভরে সে রেখে গেছে প্রেম
বলেছে, এবারের বসন্তটা তোমায় দিলাম কেবল
রেখে দিয়ো বুকে
আমি আসব কৃষ্ণচূড়ার মরণ শেষে
আসব নতুন বসন্ত ফিরিয়ে

খামে ভরে সে রেখে গেছে আকাশ, বৃষ্টি, জল
বলেছে, পান করো
প্রলম্বিত খরায় বর্ষা আসতে দেরি হলে ভয় নেই কোনো

খামে ভরে সে রেখে গেছে তার মন
বলেছে, এই দ্যাখো আমি নিকট কিংবা হৃদয়ে
ভাবছ যতটা দূর, তা মাপবে কী দিয়ে

খামে ভরে সে রেখে গেছে তার চোখ
বলেছে, দৃষ্টিসীমায় দিগন্ত নেই কোনো, তুমি অরণ্য
আমার সবখানি পরিসীমা সবুজ হয়ে আছে

খাম ভরে সে রেখে গেছে স্পর্শ, মমতা, ভালোবাসা
কিছুই বলে নি সে
শুধু নিশ্চিন্তে ছুঁয়ে আছে এক-সমুদ্র শূন্যতা
আমার অব্যক্ত পঠন বারবার উপড়ে ফেলছে খাম
আর দরজা খুলে অপলক চেয়ে আছি
কখন ডাকবে নীলপিয়ন

 

 

পাথর পুরাণ

এমনও তো ঘটে
উৎকীর্ণ হয়ে, নিজেরই শব্দ শুনি নিজের ভেতরে
ক্রমশ ফিরে আসা হৃদয়ের রাত
প্রতিটি দীর্ঘ অমাবস্যা শেষে
তোমাকে মনে হয় মেধাবী ফুল
ফুটে আছ উজ্জ্বল রাতের দুদিকে

এমন তির করো না নিক্ষেপ নিজের শরীরে
ব্যথা ভুলে কাঁদবে তুমি পাখিদের শোকে
দুএকটি কথা যদি ফিরে আসে তীরে
নিজেকে দেখো তুমি মূর্তি শরীরে
নিজেকে শোনাও তুমি মাছের বয়ান

আহা, এমনও তো ঘটে
বিষাক্ত হয়ে উঠি নিশ্বাসে, বিশ্বাসে
আধোঘুমে চুপচাপ পাথরের প্রাণ
যতবার আঙুল ঠেকে নিজের আঙুলে
চমকে উঠে সরে যাই শরীরের দূরে

 

 

বনমোরগ

তুমিও কি এমন ফুল ফেলে দিয়ে
ধুয়ে নেবে হাতের ক্ষীণ রেখা
চির-স্থির কুয়াশার জলে
এত যে নিঃসংশয় ফিরে আসো তীরে
নিজেকে মনে হয় উন্মুক্ত খাঁচা
ভুলে যাই কোন পথ দিয়ে গেলে
মৃত ফুল উঠবে বেঁচে মৃতের শরীরে

প্রতিদিন ফেরিওয়ালা চলে গেলে
কিছু ধ্বনি বর্ণমালার মতো
হুটহাট ঢুকে পড়ে মাছের জীবনে

এ কেমন ফ্যাকাশে আকাশ পাখির পৃথিবীতে
এ কেমন শুদ্ধ বাতাস বিষাক্ত শরীরে
নিজের কাছে আটকে পড়া বহুবিধ ছায়া
আমূল কাতর হয় মোরগ অসুখে
স্বাস্থ্যহীন ফুলের সংলাপে

আহা, তুমিও ফিরে এসো রোদে, বিদ্যুতে
একটি মৃত হাত এঁকে দিই তোমার কপালে
লাল ঝুটি হারালে রং ছায়ার বহুরূপে
আমাকে ভেবে নিয়ো মাংসপিণ্ড থেকে দূরে
ছুটছি উর্ধ্বশ্বাস শিকারির ভয়ে
স্বাস্থ্যবান মোরগের রুগ্‌ণ শরীরে

 

 

মন্ত্রবিদ্যার মতো এইসব শোক

এই রূপ ফিরে পেলে তুমিও হয়ে যাও পাখি
এত দূরদেশে মেঘেরা আসে না বলে
মাঝে মাঝে প্রলম্বিত কামনা-অসুখে
একটি লোভনীয় ফলের দিকে
ছুড়ে দিই রুগ্‌ণ পুরুষের হাসি

চারিদিক থেকে ধেয়ে আসে লক্ষ্যভ্রষ্ট তির
ভয় নয়, আহত হবার লোভে
অগভীর সব রাত্রির মাঝে
একটি অলীক তির শরীর ভেদ করে গেলে
নিষ্ঠুর কোনো জীবন-খোরের মতো
নিজেকে খেতে খেতে বাঁচি…

জাদু নয়, নিতান্তই আলো থেকে দূরে
ফুলের গন্ধে মৃত প্রজাপ্রতিরা জাগে
ভুল ভ্রূণ, ভুল সঙ্গমে
একটি পুরুষ যদি রূপক আয়না থেকে
ক্রমশ সরে আসে শরীরের দিকে
তুমি কি তখন উর্বর নারীর মতো
মাটিতে রেখে যাবে পাখিদের রাত

অতি উচ্চ দৃষ্টিরেখা থেকে
কে কাকে অধিক স্পষ্ট দেখে
যত ক্ষীণই হয়ে আসুক না কেন আয়ুর আকার
তোমাকে চিরকাল ছুঁয়ে যাবে প্রকৃত পুরুষের পাপ

 

 

ঘুম ও ছায়া বিভ্রাট

প্রতিদিন চুপচাপ নিজের আড়ালে
আমি নই পাখি এক নিজের ভেতরে
একটানা উড়ে চলে ছায়াপথ ধরে
পৃথিবী নয় এমন কোনো পৃথিবীর দিকে

একটি একটি পালক ঝরে ঝরে পড়ে
চারিদিকে শুনসান নিঃস্তব্ধতা জুড়ে
অজানা ভয় আর ডানার শব্দ ছাপিয়ে
এ কোন তুমি কাঁদতে থাকো মানুষের বুকে

আমচকা ঢুকে পড়া আঁধারের পথে
দুএকটি প্রিয় ঋতু হঠাৎ বদলে গেলে
সন্দিগ্ধ হৃদয় হতে সুষম দূরে
একটি বিশাল ছায়া ক্ষীণ হতে হতে
কেমন মিশে যায় করুণ আকাশে

প্রতিদিন এভাবে নিঃস্ব হতে হতে
নিজেকে যায় না শোনা অতি নিকটে
ডানার শব্দে বিভোর অনন্ত আকাশ
অনেকটা নেমে আসে বুকের ভেতরে

নিজের শরীর হতে ভিন্ন শরীরে
হয়ত মানুষ বাঁচে পাখির প্রকারে
নিজস্ব ঘুম আর ছায়াসুখ ভুলে
একটি বিবর্ণ পাখি হঠাৎ ফিরে এলে
মানুষ চমকে উঠে পাখির শরীরে

 

 

আমি ও মুদ্রালোভী প্রতিপালক

প্রতিটি অদ্ভুত স্বপ্ন আমাকে আরেকটু এগিয়ে নিয়ে যায় সকালের দিকে
যা কিনা অনাহূতের মতো সামনে এসে দাঁড়ায়, আর আমি
শিশুর মতো আয়নার সামনে অভিভূত, নির্বাক
এমন তো প্রায়শই ঘটে
ঘুম ভেঙে যায়, আর রাত দীর্ঘ হতে হতে বাড়িয়ে তোলে মুদ্রার লোভ
এও কি স্বপ্ন নয় এক, যা আমি দেখে চলেছি জীবনের মতোই
হয়ত যুক্তির কাছে হেরে যাব শেষ অব্দি
এবং খাঁচাবন্দি পাখির মতো হয়ে পড়ব অসহায়, উত্তরহীন
আলো, যা কিনা নির্দিষ্ট পরিক্রমা শেষে ফিরে ফিরে আসে এবং উদার হয়
তবে কেন রাতের ব্যাপ্তি নিয়ে কথা বলব না
কেন মহিমান্বিত হবে না সমস্ত অন্ধকার
যা আমাদের ঘুম দেয়, আর লুকিয়ে রাখে ভয়

প্রকৃতির নিকট আমাদের অস্তিত্ব সবচেয়ে কুৎসিত এবং সুন্দর
আমি মূক অভিনেতার সামনে বসে থাকি
একটি নাটকের সমস্ত পাঠ মুখস্থ করতে করতে হেসে উঠি আনমনে
যেনবা প্রিয়তমা তার প্রিয়কে সুখি করে তুলেছে হঠাৎ
একাকী এগিয়ে এসো, জিজ্ঞেস করো, আমি বলব
বিছানার সাথে সন্ধি করে করে ক্লান্ত, এবার মাটির স্পর্শ প্রয়োজন
এত অসহ্য হয়ে উঠেছে এবারের ঋতু
প্রকৃত তুষারপাতের চেয়ে সুন্দর কিছুই দেখা যায় না সচরাচর
সুতোর প্রাপ্ত ধরে এগিয়ে যাবার মানে একটাই
আমার গাঁথুনি ভেঙে যাচ্ছে অধিক, নির্মম

এই যে রাত আর ক্ষীণ হয়ে আসা হৃদয়ের স্পন্দন
রক্তের স্বাদ কম বেশি সব জিভ-ই জেনেছে কারণ-অকারণ
ফলত ঈশ্বর অথবা শয়তান যে কোনো এক পক্ষে আমাদের পতাকা উড়ুক
এই তবে সত্যিকার স্বাধীনতা, যা কিনা বোধ দিয়ে পেলাম আবার বোধেই বিসর্জিত
এত প্রশস্ত দেয়ালের এপাশ থেকে শোনা যায় না
এত মোটা পর্দার আড়াল থেকে স্পষ্ট দেখা যায় না মানুষের মুখ
ভিন্ন সূর্যের বন্দনায় যদি পুনরায় মারা যায় গাছ
তবে ঘর থেকে বেরিয়ে ঘরেই ফিরে আসতে হবে আবার
ঋতু ও ঋণ আমাদের মজ্জার মাঝে গেঁথে রয়েছে একসাথে
যে কোনো অজুহাত তাই বিষাক্ত সাপের মতো ফণা মেলে উঠে বারবার

মুগ্ধ হবার আগে পুনরায় ভেবে নিই ম্যাজিকের নীতিমালা
সার্কাস-তাঁবু ও মঞ্চের পার্থক্য নিরূপণ করে দেয় জোকারের হাসি
ভুল ভেঙে যাবার পর মানুষ সবসময়-ই নিরীহ
আর পুনরায় ভুল করার পর পূর্বের চেয়ে হিংস্র
এসব নিজেরই অন্তরালে ঘটে
যেমন প্রতিনিয়ত শরীরের অগোচরে ঘটে যায় শরীরের অবমাননা
আহা, প্রাণের বিপরীতে আমার সমস্ত সুন্দর
লোকচক্ষু দিয়ে বাইরে তাকিয়ো না
প্রতিটি মেঘখণ্ড অভিশাপ বহন করে এগিয়ে চলেছে আগুনের নেশায়
আর শহরে যে বৃষ্টিপাত নেমে আসে কোনো কোনো সন্ধ্যায়
আমার সব ঘর ভিজে যায় জল ও নেশায়
সিক্ত মেঝেয় সাবধানে পা ফেলে এগিয়ে যাই মায়ায়
এমন তো হতে পারত
কেউ আসবে জেনে আলো জ্বালাতে চাইলাম অথচ বাতাস বয়ে নিয়ে এল ভয়

এভাবে কতবার নিজেকে শাসন করে বলা যায়, ‘শান্ত হও, লুকিয়ে রাখো ক্ষয়’
ঘুমের উছিলায় যারা ফিরে আসে, ফিরে যায়
আমি বরং ছায়া গুনে রাখি, হিসেব করে রাখি ভেতর-বাহির আনাগোনা
অবশেষে দীর্ঘ পথের উল্টো দিকে হাঁটা শুরু হয়
আর চারপাশে গাঢ় বাতাবিলেবুর ঘ্রাণ
একটু একটু পতনে নিক্ষেপিত হতে থাকে শরীরের ভার
নিজেরই ভুলে যাওয়া কণ্ঠস্বর
যত চাবুকই নেমে আসুক না কেন বিছানায়
সমস্ত ছায়া ও নিঃশব্দের মাঝে কেউ না থাকলেও জানি
নিভে যাওয়া আলো আর জাপটে ধরা আঁধারের সীমানায়
এমন অদ্ভুত স্বপ্ন আমি ছাড়া কেউ দেখে না আর

অরণ্য

অরণ্য

জন্ম ১৯৮১, রাজশাহী। এইচ. আর.-এ এমবিএ। পেশা : ম্যানেজার, এইচ. আর.।

প্রকাশিত বই :
যে বেলুনগুলো রংহীন [কবিতা]
কাক সিরিজ [কবিতা]
এখন আমি নিরাপদ [ছোট গল্প]

ই-মেইল : mail.aronno@gmail.com
অরণ্য