হোম কবিতা অপ্রেম ও ঘৃণার কবিতা

অপ্রেম ও ঘৃণার কবিতা

অপ্রেম ও ঘৃণার কবিতা
1.21K
0

ডলি
❑❑

ডলি আমার প্রেমিকা ছিল, ঘোড়ার দিকে তাকিয়ে থাকত। একটা আর্ট এগজিবিশনে গিয়ে দশটা ধাববান ঘোড়ার ছবি দেখে ডলি খুশি হয়েছিল। সত্যি কথা কি ঘোড়ার সঙ্গে আমিই তার ছবি তুলে দিয়েছি। দশটা ঘোড়া যেন দৌড়ে যাচ্ছিল তার তুলতুলে যোনির দিকে। বহুদিন আমি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে খুঁজেছি কোথায় উজ্জ্বল লাল ঘোড়া? ডলি একটা লাল ঘোড়ার জন্য মূর্ছা যায়। মতিঝিলে একটা বেলুনের ঘোড়া দেখে সে হঠাৎ নির্লজ্জের মতো খিলখিল হেসেছিল।

আমি বলেছিলাম এক জোড়া ঘোড়া পালবো, পপি ফুলের মতো লাল শরীর। ডলির ঘোড়াপ্রীতি দেখে আমার অস্তিত্ব-মোহন-ভুবন কেঁপে ওঠে। সে একটি লাল ঘোড়ার মতো উজ্জ্বল প্রেমিক চেয়েছিল। ঘোড়ার জন্য তাই এত প্রেম এত অভিমান। আমার আদিম ইচ্ছায় তখন জ্যান্ত ঘোড়ার শৈশবকাল, ডলি একদিন আমাকে ঘোড়া বলে ডেকেছিল। আমি প্রতিদিন ঘোড়া হই। আয়নার কাছে দাঁড়িয়ে দেখি সত্যিই ঘোড়া ছুঁলো নাকি আমাকে!

 

ফুল
❑❑

ছোটবেলায় এক ফুলগাছ কিনেছিলাম। বারান্দার টবের কাছে চেয়ার পেতে সারাদিন বসেছিলাম কখন ফুটবে ফুল! কখন! মা-বোনরা হাসাহাসি করেছিল। কিন্তু ফুল আর ফুটে না দেখে গাছটাকে নার্সারির লোকটার কাছে ফেরত দিয়ে এসেছিলাম। লোকটা হেসে ফেলে একদিন কত না ফুলের প্রেরণা থেকে মানুষের মনোযোগে টবটা ফেরত নিয়েছিল। আমার এখন অবসর নেই ফুল ফোটার প্রতীক্ষায় থাকার। একটা চিনির দানার কাছে তার একাগ্র রসকুসুমে একসারি পিঁপড়াকে বহুদূর ঘুরে হেঁটে যেতে দেখে এই সেদিন জানলাম, নক্ষত্রের দূরত্বে আজ আমার অবস্থান। কোনো অপেক্ষা ফুলের অধিকারে নেই, এমন কেউ নেই এই ছলনা-আকীর্ণ শহরে নিষ্ক্রমণপ্রিয় নারী আর বন্ধু শুধু। ফুল ফোটে না আজও মানবিক তৃষ্ণার ওপর। তোমরা যাকে উৎস করো, যাকে সুলভ শুভেচ্ছার প্রার্থী করো, সুহৃদ শুভার্থী ফুল ছোঁবে না কখনও। ফুলগাছ ফুল না দিয়ে কি সহজে ফিরে গেছে নিজস্ব বাগানে।

 

যুগলমূর্তি
❑❑

জাদুঘরে দেখেছিলাম এই যুগলমূর্তি। উঠতি বয়সী ছেলেরা তাদের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে। মূর্তিগুলো পরস্পরের স্নেহের কোমরে হাত রেখে দেহে পাথরের ভার বয়ে গৌরবের যুগ থেকে যুগ কত পুরুষ পার হয়ে, আজ তাদের একটুও লজ্জা নেই ভক্তদের কাছে। শরীরে কাপড় নেই, ভাঁজে ভাঁজে বিশ্রামের ক্ষত নিয়ে পাশাপাশি নিতম্ব বাঁকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জাদুঘরে, দুটি মূর্তি নিশ্চিত হাসির। ওরা কাঁদতে চায়, ওরা কথা বলতে চায়, আমরা একে অন্যকে প্রচুর ভালোবাসি। যৌবন তাদের ধাওয়া করে নিয়ে গেছে, আমি আরও মনোযোগে দেখলাম—পুরুষটির হাত নারীর স্তনে আমার সামনেই আরও শক্ত করে ধরে। আরও জোরে নারী পেতে দিয়ে রাখে সর্বাজ্ঞের রূপাঘাত। ওরা এসেছে, কিন্তু প্রাণ পড়ে আছে রাজগিরের পিঠে। জাদুঘরে, আমি তাদের সঙ্গ দেই। কিংবা সবার অলক্ষ্যে খুব ধীরে খুব আস্তে গান গেয়ে উঠি—এবার তোমরা একটা বাচ্চা নাও না কেন?

 

কিন্ডারগার্টেন
❑❑

আমাকে উপভোগ করো। এবার কাপড় খুলে বাতাসের দিকে হেলেছি, কত আর কাপড়ের ভাঁজে লুকাব ঘৃণা! প্রসাধনী থেকে, সেলুন থেকে, টেইলার্স থেকে আমার শরীরটার মুক্তি চাই আমি। খুলি এসব, ছুঁড়ে ফেলি। আমাকে সবুর করো, দখলে নাও, উপভোগ করো। সারারাত বগলে নিয়ে কাঁদো, ঘাম মুছে দাও। আমার ভেতর চমৎকার ঘোড়া, ঘাসে ঘাসে মুখ দিয়ে চলে উপায় সবুজে। পাথর ছুঁড়ে আমাকে আহত করো, রক্তের নুনে চিবুক ভেজাও। দ্যাখো, যে কোনো শিল্পের চাইতে এই অস্তির কত দাম। ব্যর্থ মানুষ! এইদিকে আসো। আমার উরুতে তোমার মাছগুলো ছেড়ে দাও। দেখো, আমার নাভি থেকে চমৎকার চড়ুইটা ফুড়ুৎ করে উড়ে গেল। ধরো, ওটাকে ধরো।

তোমার পেটে একটা গরিলা, ওটাকে পয়দা করো। দোহাই ওটাকে নষ্ট করো না। কুকুরটাকে আমার পায়ের একটু মাংস দাও। ছুরিটা নাও। আমার গলায় আটকে থাকা আপেলের টুকরাটা বের করো। এক্ষুণি, এই খুনি! প্রেমিকাকে শসা দাও। জীবনানন্দকে ঢাকার একটা ম্যাপ কিনে দাও। থামো থামো, কমোডের তেলাপোকাগুলো তোমাকে তেলে ভেজে দেই। তোমার চোখ লাল কেন, গাঁজা খাও! পত্রিকাটার পাতাটা ছিঁড়ে দাও, হাত মুছি। ওটাকে ধরো। ধরো ধরো টানো। রক্তের ফোঁটাগুলো ফুলের পাপড়ির মতো মেঝেতে ছড়িয়ে আছে। ফুসফুসে একটা শ্যালো মেশিন ঘুরছে, বিদ্যুৎ নেই।

 

মধ্যরাতের ডিম
❑❑

ঠিক নেই কোথায় যাব, তবু হাঁটতে ভালো লাগে। রাতের বিষণ্ন রেণু ঝরে যায়, সরে যায় কারও জন্মঘোষণা প্রত্যহ। উদরে ভেসে ওঠে কাল সুচির মেয়ে বলে, আমি আসবো? এসো, আশা তোমার কেমন বোন, বারবার ডাকো! ঠিক নেই কার কাছে যাব, তবু দরজা খুলে দাঁড়াতে ভালো লাগে। রাতের আসন ছেড়ে চিরকালের ঋজু এই ঘর, শরীরে তীব্র রোগ নিয়ে মৃত্যুকে ভাই ডেকে আমি সঠিক অনায়াস অথর্ব সব পথের ইটপাথর পায়ে ঘষে চলে যাব। ঠিক নেই কেন যাব, প্রশ্নের মীমাংসা হয়, তবু কেউ জানালা খোলা রেখে যায়। ঠিক নেই বালিশ, চাদর, ঘুম নেই হেঁটে যাব।

রাতের ত্বক ছিন্ন করে উজ্জ্বল ডানা ছড়িয়ে দিবসের দিকে যাব। দ্যাখো, মধ্য আকাশের ডিম নিরাওয়াজ তরল ফুঁড়ে শাবকেরা পাখায় রোদ নিয়ে উড়ে যায়, সূর্যের সাক্ষাতে যে কোনো বাড়ির ছাদ থেকে আসন্নপ্রসবা নীল রাত হলো তবে। রাত একটি একা বাড়ি, সাম্প্রতিক আঘাত-উত্থিত ভেদের স্বভাব। দেখলাম, দেখলাম উঁচুতে উড়ে গেল উপেক্ষার পাথর থেকে শুশ্রূষার গুণের ভেতর। রাতের উদর তুলে শুভ্র ডানা তুলে হরিণার ক্ষুর হয়ে দৌড়ে যাব, বয়সিনী তারার উজ্জ্বল বিন্দু ঘিরে সারারাত ছুঁবো আগ্রহের যোনি। পেছন থেকে ডাকব, ডাকব নিজেরই তুমুল শ্বাসে ঘৃণার হাত রেখে অপ্রেমে।

মাজহার সরকার

মাজহার সরকার

জন্ম ৮ ডিসেম্বর ১৯৮৬, কুমিল্লা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশা : লেখালেখি।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
সোনেলা রোদের সাঁকো [পার্ল ২০১২]
শরতের বাস টার্মিনাল [বিদ্যাপ্রকাশ ২০১৩]
শূন্য সত্য একমাত্র [বিদ্যাপ্রকাশ ২০১৩]
গণপ্রজাতন্ত্রী নিঃসঙ্গতা [দিব্য প্রকাশ ২০১৫]
প্রেরিত পুরুষ [প্লাটফর্ম ২০১৬]

গল্প—
আগ্নেয় আশ্বিনের তামুক [দিব্য প্রকাশ ২০১৫]

উপন্যাস—
রাজনীতি [প্লাটফর্ম ২০১৬]

ই-মেইল : mazhar54968@rocketmail.com
মাজহার সরকার