হোম কবিতা অনিরুদ্ধ দিলওয়ারের দশটি কবিতা

অনিরুদ্ধ দিলওয়ারের দশটি কবিতা

অনিরুদ্ধ দিলওয়ারের দশটি কবিতা
452
0

উত্তরের হাওয়ায়…
❑❑

এ ঝরনা-অত্রস্থ পুষ্পাগ্নি। জলের উপর মাঠ। চতুষ্পদী ভাবনা ছড়িয়ে আছে রোদে। হাঙরের হৃৎপিণ্ড থেকে ক্রমশ নেমে পড়ে পিঙ্গল দাবানল। বাতাসে ভাসে মিহিঘ্রাণ। প্রবুদ্ধ মেঘের ছায়ায় বাহারি ঘুঙুর। নেচে ওঠে অক্ষর বৃত্তের শাড়িপরা ভৈরবী পাহাড়। জন্মান্ধ কুয়াশার কণ্ঠে শুনি শ্যামাসংগীত। মাঝ রাতের ট্রেন থেমে গেছে অপেক্ষার আগে। নগ্নস্তন বুঝে অ্যালজেব্রা। আমরা তখনও উত্তরের হাওয়ায় কয়েকজন অচেনা যাত্রী।


বউতন্ত্রের ইশতেহার- ১০
❑❑

আমি আদ্য কোনো চিত্রকর নই। তুবও নদী আঁকতে যেয়ে ডুবে যাচ্ছি। বউ হাতটা টেনে ধরে বলে—ভাগ্যিস সুমদ্রে পড় নি। সমুদ্র, বন, হাওড়, আর সরীসৃপের ছায়া নিযে যায় জাদুর স্লেটে—লাল ঘোড়ার খুরের আওয়াজ পৌঁছে যাই মস্তিষ্কবাড়ি। ভাড়াটিয়া চোখ ডুবে থাকে যোনিতরঙ্গে। প্রসব বেদনায় জেগে থাকে রাত। স্তন চুষার অভ্যাসটা বুঝে যায় বউ। অসভ্যের লাল টিয়া চুমুর খাতিরে জেঁকে আসে বর্ষার গ্রামে। যেখানে বউ আমার আঁচল তলে পান করায় গরম জল। সাঁতার কাটতে কাটতে একদিন বুকের লোম বড় হয়। যুবক হয়েছি বলে—অদ্ভুত দৃশ্যগুলো জমা রাখি স্মৃতির ফ্রেমে।


বউতন্ত্রের ইশতেহার- ১১
❑❑

ঘুম ভাঙলে মনে হয় পুনর্জন্ম—হাত নেড়ে অভিবাদন হে পৃথিবী। মায়ের তুলতুলে গালে মুখঘষি—বউ আমার চুলে বিলি কেটে বলে—দুঃস্বপ্ন দেখেছ? আমি তখন চন্দ্রালয়ে খেলা করি। কে যেন ঘুম পাড়ানির গল্প বলে—চাঁদের বুড়ি চরকা কাটে—চরকায় আমার পা জড়ায়ে যায়। দূর থেকে ভেসে আসে শো শো কান্না। উঠোনে বড় আপা হারিকেন হাতে দাঁড়িয়ে। দাদি আয়াতুল কুরসি পড়ছে—বাবা সিজদারত। মা নাড়ি ছিন্ন হওয়ার গুমোট যন্ত্রণায় দাঁত কামড়ে থাকে। দাইমা দরজা খুলে জানায় ছেলে হয়েছে; আজান দেন। আমার হাত নড়তে থাকে—বউ কপালে চুমু খেয়ে বলে দুষ্টুকোথাকার।


আমার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী
❑❑

বাহু বেয়ে নেমে যায় অজগর
উহু করার দুঃসাহস নেই আমার
অনুধাবন করলাম শীতল উষ্ণতা

প্রাগৈতিহাসিক চিন্তাগুলো ফেঁপে ওঠে প্রতিরাতে
প্রতিমাগুলো শুয়ে পড়ে জড়াজড়ি করে
আমাকেও মনে হয় তাদের একজন
প্রত্নতত্ত্ব ভেবে সরকার উঠিয়ে নেয় জাদুঘরে
লোকদের কাছে আমি মুগ্ধতা, বিস্ময়কর…
কিছুক্ষণ আগে ছবি তুলল যারা—তাদের কাছে
সবচেয়ে প্রাচীন ব্যক্তিটি আমি

সোৎসাহে উদ্‌যাপন করতে যাচ্ছি
আমার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী।


ঈশ্বর ও ময়ূরী
❑❑

এতটা প্রস্তুতির পরও ভিজে যায় প্রস্তাবিত রোদ। সান্ধ্য আইনে যে বিষণ্নময়ূর ছুটি নিয়ে ছিল সেও বুঝে গেল কারাবাস। বিপত্নীক রাতও একদিন অ্যালার্জির শরীরে  মেখে নেয় স্তনমেঘ। জ্যোৎস্নার আলোয় যে কিশোরী ঈশ্বরের বুকে এঁকে দেয় সঞ্চিত ভ্রূণ—তাকেও পাওয়া যায় পরিত্যক্ত ধর্মশালায়। অবশেষে ঈশ্বর অজ্ঞাতনাম।

কী অবলীলায় শ্বেত পাপড়ির ডানায় ফিরে আসে তীব্রঘ্রাণ। থৈথৈ সমুদ্রের সফেদ ফেনায় কারারুদ্ধ ময়ূরীও মেতে ওঠে অর্গাজমে। পিচ্ছিল সু-রঙের বসতভিটায় আদিপিতার উল্লাস। দীপ্র দীপ্র লৌ লৌ অকিঞ্চিতকর ইতিহাস।


মাংসের স্বরধ্বনি
❑❑

এখন সর্বত্র নষ্ট সময়। স্নায়ুর চাপ বেড়ে ওঠে। ক্রমশ বিকারগ্রস্ত চিন্তাগুলো প্রসারিত হয়। মেয়াদোত্তীর্ণ মৃত্যুরা কাম-ক্রোধ উন্মদনা ফেরি করে ফেসবুকে। কবি শব্দচিন্তায় মস্তিষ্কের কোষ হতে নেমে পরে শূন্যতায়। বিকেলের রোদ লেগে থাকে কিশোরীর সেলোয়ারে। চটপটি ফুচকার উদ্যম হাওয়ায় নিশ্চিন্তে খুন হয় মেসের বালক। মাংস মাংস গন্ধে একদিন কুকুরও মাতাল হয়। জেগে ওঠে স্বরধ্বনি। তনুর চিৎকার কেউ শুনে না। সক্রেটিসের আওয়াজ বাতাসে ভাসে। শীতলক্ষার বুকে ঢেউয়ে ঢেউয়ে গুঞ্জনরত আর্তনাদ মূর্ছা যায়। প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টারও ভুলে যায় সাতের নামতা। যোজন বিয়োজনের সূত্রাবলি গাঁথা থাকে দেয়ালে। নতুন কোনো রেস্তোরাঁ উদ্বোধন হওয়ার আগেই সমবেদনা তুলে রাখি সংগীতে। ভূরিভোজ শেষে ডাস্টবিনগুলো ঘুঙুর পা-য়  নৃত্য করে সারারাত। বেশ্যার শরীরও বিনামূল্যে বিতরণ হয় মাজারে। কুঁচকানো গিরগিটিটা ঢুকে পরে মাংসের শহরে।


নগরচিত্রের একাংশ
❑❑

রাস্তার বুকে শুয়ে আছে জল; রাজহাঁসের নরম পালক আটকে থাকে ট্রাফিকজ্যামে। ধূসর জলে মিশে যায় পাউরুটি—ক্রমশ বেড়ে ওঠে অস্ট্রেলিয়ান মাগুর। কাগজের নিচ্ছিদ্র ভেলায় দোলে একদল পিঁপড়ে—প্রেমিকার ফেলে দেয়া ঝালমুড়ির লোভে সাঁতার কাটে আহত ফড়িং। কিংকর্তব্যবিমূঢ় নগরপুলিশ। পরিবেশবাদীর শোভাযাত্রা দেখে ধুলোমিশ্রিত বুদ্বুদ ডুব দেয় অতলে। সোডিয়াম বাল্ব জ্বালার আগেই পোহাতে হয় লোডশেডিং। এই সুযোগে রিকশার হুড নেমে পড়ে নিচ থেকে আরো নিচে। সেলোয়ারে লেগে থাকে পিছল ছোপ; দুলাভাই বাড়ি ফেরে নি গত তিনদিন অথচ কী স্বাভাবিক নগরচিত্র!


পৃথিবী বৃক্ষ হয়ে যায়
❑❑

শহরে এখন আর কোনো ফুটপাত নেই। ফ্লাইওভার যেভাবে নেমে পড়ে সূর্য ডোবার দেশে। সিএনজি চালিত অটো ড্রাইভারও বেঁকে থাকে চন্দ্রালয়ে। নাতিশীতোষ্ণ বিড়ালটা উঁকি দেয় মাঝ নদীতে। যেখানে একদিন সাঁতার কাটতে কাটতে আমিও বুঝেছিলাম রাত। সে রাতে জন্ম নেয় আদিপিতা। নৈঃশব্দ্যের দেয়াল টপকে এক খাবলা রোদ আশ্রয় নেয় হিমসাগরে। আমরা আতশি কাচে দেখি ঈশ্বরের ছায়া। পালকের চিহ্ন দেখে দেখে কবিও হেঁটে যায় অচিনপুর। প্রাগৈতিহাসিক ধ্যানও একদিন ভেঙে যায়। রহস্য উন্মোচিত হওয়ার আগেই পৃথিবী হয়ে যায় বৃক্ষ।


শহরটা একদিন মাঠ হবে
❑❑

শহরটা একদিন মাঠ হবে জেনে কবিরা হেঁটে যায়
নগরবাসীর ঘুম নেই দুঃচিন্তায় নেমে আসে রাস্তায়

অসুস্থ রাস্তা শুয়ে থাকে যেন মাঠের স্বপ্নে আপ্লুত
এক চক্ষু হরিণ নেচে ওঠে প্রতিবাদী লিফটম্যান কর্মচ্যুত

নগরমেয়রের জরুরি সভা গুজবে কান দিবেন না
শহরটা মাঠ হবে জেনে দেয়ালে কাক বসে না

মাঠের খবর রটেছে সর্বত্র কৃষক জোগায় লাঙল জোয়াল
নদীও হবে নিশ্চয় জেলের স্বপ্ন উঁকি দেয় বড় বোয়াল

শহরটা মাঠ হবে অতঃপর শহর
উড়ে উড়ে আসে শ্বেত কপোত পড়ে স্বপ্নের পায়ে কহর


সংশয়
❑❑

মানুষগুলো এখন আর ঘুমায় না
চোখ বন্ধ করে স্বপ্নের মধ্যে জেগে থাকে

মানুষগুলো জেগে থাকে বেঁচে থাকে
শব্দ, কোলাহল, রোমাঞ্চ কিছুই থাকে না
অস্থিমজ্জায় শুধু কয়েক ফোঁটা রক্ত

মানুষগুলো তারপরও ঘুমায় না
সম্বল কয়েক ফোঁটা রক্ত হারাবার সংশয়
মায়া হয় যন্ত্রণা হয়
মানুষগুলোকে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
খামছে ধরে শ্বাস-প্রশ্বাসে
নিঃশব্দে রটে যায়—ঘটে যায়—কিছুই দেখে না
মানুষগুলো কাঁদতে চেয়েও পারে না
কবরের পাশে হাঁটলেও সংশয়
মানুষগুলোর সংশয় মানুষগুলোকে

অনিরুদ্ধ দিলওয়ার

জন্ম ৪ জানুয়ারি ১৯৮১; ঢাকা। শিক্ষা বিএসএস। পেশায় ব্যবসায়ী।

প্রকাশিত বই :
মেঘ জমেছে আকাশে [উপন্যাস, ২০১০]
প্রবুদ্ধ মেঘের ঘুঙ্গুর [কবিতা, ২০১৭]

ই-মেইল : aniruddodilwar@gmail.com

Latest posts by অনিরুদ্ধ দিলওয়ার (see all)