হোম অনুষ্ঠান মণিপুরি থিয়েটারের নাট্যোৎসব

মণিপুরি থিয়েটারের নাট্যোৎসব

মণিপুরি থিয়েটারের নাট্যোৎসব
443
0

২০ বছর পূর্ণ হলো মণিপুরি থিয়েটারের। এ উপলক্ষে ৫টি নাটক নিয়ে তারা আয়োজন করেছে নাট্যোৎসবের। অন্য কোনো দলের নয়, নিজেদেরই ৫টি প্রোডাকশন। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সহযোগিতায় আয়োজিত এই নাট্যোৎসব চলবে ২৪ থেকে ২৮ ডিসেম্বর। প্রদর্শনীর বিনিময়ে দর্শকরা নাটকগুলি দেখতে পাবেন প্রতিদিন সন্ধ্যা ৭টায় জাতীয় নাট্যশালার বিভিন্ন মঞ্চে। আজ ২৫ ডিসেম্বর বিকাল ৩টায় সেমিনার কক্ষে অনুষ্ঠেয় ‘আমাদের নাট্যভাষা : সংকট ও সম্ভাবনা’ শিরোনামের আলোচনা সভাটি সবার জন্য উন্মুক্ত।

গত ২৪ তারিখ এই উৎসবের উদ্বোধন করেন নৃত্যগুরু কলাবতী দেবী। প্রধান অতিথি হিশেবে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রী ও নাট্যজন আসাদুজ্জামান নূর।

আমরা পরস্পরের পাঠকদের জন্য তুলে ধরছি মণিপুরি থিয়েটারের পরিচিতি। সেই সঙ্গে এই উৎসবের ৫টি নাটক সম্পর্কে নির্দেশক শুভাশিস সিনহার বক্তব্য।


মণিপুরি থিয়েটার পরিচিতি

মণিপুরি থিয়েটারের প্রতিষ্ঠা ১৯৯৬ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর। বাংলা ও মণিপুরি (বিষ্ণুপ্রিয়া) ভাষায় এ যাবৎ ৩০টি নাটক মঞ্চে এনেছে দলটি। নাটকগুলোর চার শতাধিক মঞ্চায়ন হয়েছে। এছাড়াও ঐতিহ্যের নিরীক্ষায় মণিপুরি থিয়েটার মঞ্চে এনেছে সম্পাদিত রাসলীলা, নটপালা, ধ্রুমেল, হোলি সহ আরও নানান পরিবেশনা। গ্রামে গ্রামে ঘুরে সম্পূর্ণ নিজস্ব উদ্যোগে নাটক মঞ্চায়ন করে মণিপুরী থিয়েটার।

নাট্যচর্চার পাশাপাশি মণিপুরি থিয়েটার নিয়মিত প্রকাশ করছে রৌদ্রজলের পঙ্‌ক্তিমালা এবং মণিপুরি থিয়েটার পত্রিকা। দলটি মণিপুরিদের ঐতিহ্যবাহী বিষু পর্বটিকে নিয়ে উৎসবের আয়োজন শুরু করে ১৯৯৭ সালে। আজ-অবধি প্রতি বছর ঘোড়ামারা গ্রামের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে বর্ণাঢ্য বিষু উৎসব উদ্‌যাপিত হচ্ছে। এতে প্রতি বছর দেশের প্রথিতযশা ব্যক্তিবর্গ ভাবচিন্তার সম্মেলনে শরিক হন। মণিপুরি থিয়েটারই বাংলাদেশে প্রথম এবং একমাত্র মণিপুরি নাট্যোৎসবের আয়োজন করে ২০০১ সালে।

২০১৩ সালে মণিপুরি থিয়েটার কমলগঞ্জের ঘোড়ামারা গ্রামে নির্মাণ করেছে বাংলাদেশের একমাত্র থিয়েটার স্টুডিও ‘নটমণ্ডপ’। দলের আজন্ম পৃষ্ঠপোষক এবং শুভাশিস সিনহার পিতা প্রয়াত লালমোহন সিংহের দানকৃত ভিটের ওপর দাঁড়িয়ে আছে নটমণ্ডপ। এখানে দর্শনীর বিনিময়ে নাট্যমঞ্চায়নের ধারা চালু হয়েছে।

মণিপুরি থিয়েটার বাংলাদেশের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নাট্য-উৎসব ছাড়াও ভারত সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে আসাম ও ত্রিপুরায় ‘দেবতার গ্রাস’ এবং প্রখ্যাত দৈনিক ‘টাইমস অফ ইন্ডিয়া’র আমন্ত্রণে ‘কহে বীরাঙ্গনা’ কলকাতায় প্রদর্শন করে।

ঢাকার বাইরে সেরা নাট্যদল হিসেবে সুবচন প্রবর্তিত ‘আরজু স্মৃতি নাট্য পদক ২০০৮’ এবং থিয়েটার আর্ট ইউনিট প্রবর্তিত ‘এস এম সোলায়মান প্রণোদনা ২০১৩’ অর্জন করেছে মণিপুরি থিয়েটার।

মণিপুরি থিয়েটারের দলপ্রধান শুভাশিস সিনহা থিয়েটার প্রবর্তিত ‘জাকারিয়া স্মৃতিপদক’, নাট্যধারা প্রবর্তিত ‘তনুশ্রী পদক’, ‘আব্দুল জব্বার খান স্মৃতিপদক ২০১৪’, ‘জীবনসংকেত নাট্য সম্মাননা’ এবং ‘পৌরি সম্মাননা’ অর্জন করেন। দলের ‘কহে বীরাঙ্গনা’ নাটকের একক অভিনেত্রী জ্যোতি সিনহা লাভ করেছেন ঢাকার প্রাচ্যনাট, হবিগঞ্জের জীবনসংকেত নাট্যগোষ্ঠী ও মণিপুরি তথ্য-গবেষণা কেন্দ্র পৌরির সম্মাননা।

 

নাট্যকার ও নির্দেশকের কথা

দেবতার গ্রাস

‘দেবতার গ্রাস’ ধর্ম ও সংস্কারের অন্ধত্ব থেকে মানুষের আত্মমুক্তির ঘোষণা করে। এবং সেটা ক্লাসিক বা চিরন্তন স্বরে। সেই রাবীন্দ্রিক কাহিনিকে মণিপুরী থিয়েটার নিজেদের ভাষায় নিজেদের মতো করে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছে।

নাট্য ‘দেবতার গ্রাস’, সম্পূর্ণত নাট্যই হতে চেয়েছে। মণিপুরী চলন, ভঙ্গি, নৃত্য সবকিছুকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ভাবনাকে নিয়ে এগিয়েছি এ নাট্যের সৃষ্টিপথে। পুরো নাটকেই মানুষের ও নিয়তির মধ্যকার টানাপড়েনের সম্পর্ককে ভাষা ও সংলাপের ধরণের ধরার চেষ্টা করেছি। অভিনেতাদের দেহভঙ্গিমায় কাব্যিক অভিব্যক্তি দেবার চেষ্টাও হয়েছে প্রাণপণে। আর সঙ্গীতে রবীন্দ্রসংগীতের সাথে মণিপুরি সুরের সূক্ষ্ম মিলন।

সহজ সুন্দরের নাট্যধর্মকেই মেনে চলার চেষ্টা করেছি। অভিনেতারা অধিকাংশই একেবারেই নতুন। বয়সে খুবই তরুণ। তাদেরকে এ নাট্যর মঞ্চে দাঁড় করানোর জন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। তবু তারা বিনীত শ্রমের ঘামে স্নাত হয়েছে আনন্দেই।

সবকিছু মিলিয়ে কাজটি যদি ভিন্ন ভাষার মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের রচনাকে নতুন মাত্রায় আপনাদের সামনে হাজির করতে পারে তা হলে সার্থক মনে করব।

 

ইঙাল আঁধার পালা

‘ইঙাল আঁধার পালা’ আমার অন্যতম মৌলিক নাট্যরচনা। সংকটাপন্ন প্রান্তিক মানুষের কষ্ট ও যন্ত্রণাকে ভেতর থেকে অনুভবের চেষ্টা করেছি এ নাটকে। ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বলে নয়, আমি এই রাক্ষুসেদের দাপটের যুগে অবস্থানের দিক দিয়ে প্রান্তিক মানুষের কথা বলছি। প্রেমসিং একজন মণিপুরি মৃদঙ্গবাদক। আমার নির্মিত চরিত্র। তবে শুধু কল্পনা নয়। এই ত্রিশ বছরের জীবনে আমার জাতি, আমার সমাজ, আমার চারপাশের মানুষদেরকে যেভাবে দেখেছি, যেভাবে চিনেছি, তাদের ভেতরের কষ্টকে যেভাবে উপলব্ধি করেছি, সেখান থেকেই আমি প্রেমসিংকে দাঁড় করিয়েছি। একইভাবে থৈবী, লক্ষ্মী, কুসুমলেই, নন্দ প্রত্যেকটি চরিত্র। এদের সাথেই আমার বসবাস। আমার বোঝাপড়া। আমার অশ্রু ও হাহাকারের নিত্যসংলাপ। আখ্যানের জন্য আমি বহুরৈখিকতাকে এখানে একেবারে গুরুত্ব দেই নি। এটি আখ্যান নয়, হয়তো উপাখ্যান, তার গড়নে গঠনে, কিন্তু এর অন্তর্গত শক্তি বলে দেবে এটি আখ্যান। আমি মাত্র কয়েকটি চরিত্রকে ঘটনার ভেতর দিয়ে নয়, তাদের ভাবের অনুভূতির ভেতর দিয়ে ধরবার চেষ্টা করেছি। আমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে বর্ণনা। এটি মুলত বর্ণনারই নাটক। সম্পূর্ণ অক্ষরবৃত্ত ছন্দে এগিয়েছে বর্ণনা। নানা মাত্রাবিন্যাসে ছন্দ গেঁথেছি। গদ্যের শরীরে কবিতার সম্পূর্ণ মাত্রাপর্বিক চলন শ্রুতিতে অনেক আনন্দ দেবে। ধ্বনিবিন্যাসে অনেক মনোযোগ দিয়েছি। আমাদের নাট্যরচনায় ধ্বনিগত দুর্বলতা পীড়া দেয়। আমাদের চেষ্টা করা উচিত নাটকের সংলাপ বা বর্ণনায় ধ্বনি ও শ্রুতির বাজনাটাকে শোনানোর প্রয়াস নেয়া।

নাটকটির বর্ণনা বাংলায়, আর সংলাপ চরিত্র অনুযায়ী। নির্দেশনার ক্ষেত্রে বলতে পারি এটা প্রয়োজনের নাট্য। প্রয়োজন হৃদয়ের কাছে, উপভোগের দাবির কাছে। পদাবলী, কীর্তন, মণিপুরী নটপালা, রাস, লেরিক দেনা বা মণিপুরী পুঁথিপাঠের ধরন, গীতিকার পরিবেশনারীতি… সবকিছুই যখন যা নান্দনিকতার জন্য প্রয়োজন মনে হয়েছে তখন তাই এসেছে। তবে সবকিছু শিল্পেরই রসসিদ্ধির জন্য। কিভাবে বললে বাক্যটি সুন্দর হয়, কেমন ভঙ্গি হলে বাক্যের শারীরিক বিভা প্রকাশ পায়, কখন কিভাবে এগিয়ে যাবে আখ্যান… সবকিছুই নির্মাণ করেছে এ নাটকের আঙ্গিক। স্ক্রিপ্ট নিয়ে যেমন কাঁটাছেঁড়া চলেছে, তেমনি ফর্ম নিয়েও। নাটকটাই বাদ দেবার কথা ছিল। একদিন সন্ধ্যায় তো হতাশার পাহাড়, আর তার চাপে পিষ্ট সকলে। কান্নাই পাচ্ছিল। প্রথমে শুধু বর্ণনা ছিল, গান বা ত্রিপদী পয়ার কিছুই ছিল না। পরে নানাভাবে ভাগ করে নিয়েছি স্ক্রিপ্টটাকে। অনেক বড় পাণ্ডুলিপি ছিল। ওটাকে ছোট করে নিয়েছি। নাটকটি প্রথমবার মঞ্চে এসেছিল ২০০৮ সালে। তখন একাধিক প্রদর্শনী হয়েছে। গ্রামে গ্রামে মণ্ডপে মণ্ডপে নাটকটির সফল মঞ্চায়ন হয়েছে। নতুন করে, নতুন অবয়বে নির্মিত হলো ‘ইঙাল আঁধার পালা’। কেমন হলো, তার বিচারের ভার আপনাদের হাতে, হে শিল্পসুধীজন।

15696652_10211444382883768_1550540233_o

কহে বীরাঙ্গনা

কবিতা,—একেবারেই দুরূহ আপাত অনধিগম্য শব্দবর্মপরিহিত কবিতাকে দীর্ঘসময় ধরে একই অভিনেতার মধ্য দিয়ে নাট্য করে তোলার প্রক্রিয়াটি আসলেই কষ্টসাধ্য, প্রথম প্রথম অসম্ভব মনে হয়েছিল, ক্রমে দুঃসম্ভব, আর এখন মনে হয় খানিকটা হলেও সম্ভব হয়েছে সেই কাজ। তাও সন্দেহ থেকে যায় বলে শিরতিলক পরিয়ে দেয়া হলো—’নাট্যকাব্য’।

অর্থাৎ কাব্যনাট্য নয়, নাট্যকাব্য। নাট্যকে আশ্রয় করে এটি শেষতক একটি কাব্যই হলো-বা। আদতে সে চেষ্টাও করেছি। অজস্র উপমা উৎপ্রেক্ষা রূপক অলংকারে বিপর্যস্ত সুন্দর অনুপম পঙ্‌ক্তি ঘুরে বেড়াক-না মঞ্চে, একজন মাত্র শিল্পীর বচনে! সেই স্বপ্ন নিয়ে শুরু করে অবশেষে সেখানে আর আটকে থাকতে পারি নি। শেষাবধি আমরা তো থিয়েটারই করি।

এখন কাজ দাঁড়ালো কবিতার দৃশ্যরূপের সমস্ত ক্রিয়াকলাপের সাথে তার নাট্য-অঙ্গ নির্মাণের প্রয়াস। দ্বিতীয় দফায় সে কাজ হয়েছে। প্রতিটি শব্দ ধরে এগিয়েছি আমরা। শব্দ থেকে শব্দবন্ধে তা থেকে বাক্যে তা থেকে আবার চরণে স্তবকে এবং আরও বিস্তৃত পরিসরে। এভাবেই কাজটাকে ভেঙে ভেঙে করার চেষ্টা হয়েছে।

একজন শিল্পী তাঁর শিল্পক্ষেত্রে যতটুকু শ্রমসময়মেধাপ্রেম খরচ করতে পারে, তার সবটুকুই করেছে জ্যোতি সিনহা। প্রথম পক্ষকাল জুড়ে ছিল পাঠ-অর্থ ব্যঞ্জনা, ধ্বনি ও শব্দের শ্রুতিবিশিষ্টতার ও স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র রূপের দিকে আলোকপাতের পর্ব সম্পন্ন হয়েছে। এরপর মধ্যম পর্যায়ে কাব্যের নাট্যায়নের বিন্দু বিন্দু ভাষার সূত্র তৈরির চেষ্টা। অঙ্গে, বচনে ও অভিব্যক্তিতে।

টানা তিন মাস বিভিন্ন পর্যায়ে নাটকটি নিয়ে কাজ করেছি। নাটকের কোনো টেক্সটকে বা পাঠকে যদি ধার্মিকের ধর্মগ্রন্থের মতোই সমান মর্যাদা দিয়ে কর্মে ব্রতী হওয়ার কথা থাকে এই নাটকের ক্ষেত্রে আমরা তেমনটিই করার চেষ্টা করেছি।

তারপরও ত্রুটির সীমা থাকবে না। আক্ষেপের শেষ থাকবে না। অসম্পূর্ণতারও অনেক কিছু রয়ে যাবে। বাস্তব নানা প্রতিকূল রোধক তো আছেই। আমাদের এই শিখরস্পর্শী আকাঙ্ক্ষাকে প্রান্তিক কিছু শিল্পপ্রাণ মানুষের স্পর্ধিত স্বপ্ন হিসেবে দেখবেন, সেই দৃষ্টিতে সবকিছু বিবেচনা করবেন, এ-ই প্রার্থনা।

 

লেইমা

ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা (১৮৯৮—১৯৩৬) একাধারে কবি, নাট্যকার, অভিনেতা, গায়ক, বাদক, সংগঠক। স্পেনের ফ্যাসিস্ট শাসক ফ্রান্সিসকো ফ্রাংকোর বাহিনী দ্বারা নির্মমভাবে নিহত হন মাত্র ৩৮ বছর বয়সে। তার দুই বছর আগে লেখা হয় ইয়ের্মা। মৃত্যুচিন্তায় আচ্ছন্ন লোরকার এ নাটকেও মৃত্যু আছে—নায়িকার হাতে নায়কের মৃত্যু। কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে এক অনাগত শিশুর জন্য ব্যাকুল আকাঙ্ক্ষা নাটকটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জীবনেরই জয়গান গেয়েছে। প্রকাশিত সব চরিত্রের আড়ালে কাঙ্ক্ষিত একটি নবজাতকই যেন হয়ে ওঠে এ-নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র।

আদতে স্প্যানিশ ইয়ের্মা (লেইমা) শব্দের অর্থ হলো নিষ্ফলা বা বন্ধ্যা। ইয়ের্মার সন্তান হয় না। একটি শিশুর তৃষ্ণায় তার প্রাণ ব্যাকুল। সে কল্পনায় তার শিশুটির সাথে কথা বলে, তাকে আদর করে। কিন্তু তার স্বামী হুয়ানের (জয়) এ নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। তার মনে শুধু টাকা-পয়সার চিন্তা। কিভাবে আরও বেশি রোজগার করা যায়, সঞ্চয় করা যায়, জীবন স্বাচ্ছন্দ্যে কাটানো যায়। হুয়ানের বন্ধু ভিক্তর (ব্রজ)। ভিক্তর ইয়ের্মার পুরাতন প্রেমিক। ছোটবেলায় তাদের মধুর সম্পর্ক ছিল। কিন্তু ভিক্তর নিতান্ত এক গরিবঘরের ছেলে বলে ইয়ের্মার বাপ তার সঙ্গে বিয়ে দেন নি। এখনও ভিক্তরের সঙ্গে দুঃখিনী কাঙালিনী ইয়ের্মার ইশারায় ভাব বিনিময় হয়। হুয়ান এ নিয়ে দুজনকেই অপমান করে। একদিন ভিক্তর বাধ্য হয়ে এই এলাকা ছেড়ে দিয়ে অন্য কোথাও চলে যায়। ইয়ের্মা একটি শিশুর আকাঙ্ক্ষায় দিন-দিন মরিয়া হয়ে ওঠে। একদিন ইয়ের্মা নিজের স্বামী হুয়ানকে হত্যা করে নিজেকে মাতৃত্বের দায় থেকে চিরতরে মুক্ত করে দেয়।

কাব্যিকতায় ঋদ্ধ, ভাবাবেগে পূর্ণ, নারী মনস্তত্ত্বের অতলের ইশারায় চমকিত ইয়ের্মা বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে প্রকৃত অর্থেই এক অসাধারণ নাট্যকল্প।

শিল্পে আমার অভিযান বরাবরই হৃদয়ের অতলসন্ধানে। খুব অল্প আয়োজনে ছোট্ট ক্যানভাসে বড় একটা ভাবনাকে ধরতে পারাটাকেই চেখভের মতো আমিও শিল্পের সার মনে করি। সে লক্ষে এক বছর ধরে এই ইয়ের্মার লেইমা-রূপান্তরে তৎপর থেকেছি। আমার এক বছরের নাট্যসংসার লেইমার সঙ্গেই। জানি না কেমন হলো!

বাবার মৃত্যুর পর আমি, আমার থিয়েটার অভিভাবকশূন্য যেন! অনন্ত বেদনাভার… তবু আমার মা আমাকে অভয় দিয়ে চলেছেন আপনাশ্রু আড়াল করে। এই লেইমা তাঁরও অশ্রুআদরিণী। নির্দেশক হিসেবে লেইমা আমার চিরপ্রেরণা বাবার স্মৃতির প্রতি উৎসর্গ করলাম।

সময়টা রক্তক্ষরণের, অগ্নিদহনের। তবু প্রত্যক্ষ কোনো রাজনৈতিক দায় থেকে দূরে সরে আপাত অর্থে একেবারেই অন্যরকম এক কাহিনি নির্বাচন করলাম। মহৎ সাহিত্যের ভেতরকার অনুরণন শেষ পর্যন্ত সবকিছুকেই নাড়াতে পারে, এই বিশ্বাসে। আর এও মনে করি, একটি শিশুর জন্য ইয়ের্মা তথা লেইমার অস্বাভাবিক আগ্রাসী আকাঙ্ক্ষা একটি নতুন কালের আবির্ভাবকে প্রতীকায়িত করে। নয়তো লোরকা তা লিখতেনও না।

জয় হোক মানুষের, জীবনের এবং শিল্পের।

 

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন

মধ্যযুগের অনন্য কবি ও পালাকার বড়ু চণ্ডীদাসের এক মহৎ সৃষ্টি শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। বিভিন্ন পুরাণ ও ধর্মশাস্ত্র থেকে কৃষ্ণ চরিত্রের দৈব গুণাবলি নিয়ে তার সাথে লোকজৈবনিক এক সাধারণ গ্রাম্য তরুণের সংশ্লেষ ঘটিয়েছেন চণ্ডীদাস, সৃষ্টি করেছেন প্রেমের নারীপ্রতীক—রাধা। রাধা ও কৃষ্ণের প্রেম-বিরহ-মান-অভিমান নিয়ে বিশালাকার এ কাব্যটি গ্রন্থিত, বিভিন্ন উপকাহিনির সংযোজন এর নাট্যমর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। মণিপুরি থিয়েটার বাংলা ভাষার এ বিশাল পালাকাব্যকে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষায় অনুবাদ করেছে, করেছে যথাযথ সম্পাদনা, দিয়েছে আধুনিক মঞ্চ-পরিবেশনার আলোকে নবনাট্যরূপ। মূলে সমগ্র কাব্যটি পয়ারে লিখিত হলেও বৈচিত্র্যের প্রয়োজনে অনুবাদে স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্ত ছন্দ ব্যবহৃত হয়েছে, মাঝেমধ্যে গদ্য বর্ণনাও। প্রয়োগিক মণিপুরী শিল্পআঙ্গিকের থিয়েট্রিক্যাল নিরীক্ষা, সঙ্গীত, পোশাক, বাদ্য ও বৈষ্ণব ধর্মাশ্রিত মণিপুরীদের শিল্পচরিত্রের নম্রতা ও কমনীয়তার দিকে লক্ষ্য রেখে প্রযোজনাটির প্রক্ষেপণ, গতিবিন্যাস, ঐকতান বাঙালির শ্রীকৃষ্ণকীর্তনকে করে তুলেছে মণিপুরীদের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন। প্রায় দেড় বছর ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে মহড়া, সংযোজন-বিয়োজন ও পরিমার্জনে নাটকটি নতুন নতুন বাঁক নিয়েছে। প্রথমে ত্রিশ জন অভিনেতা-অভিনেত্রী নিয়ে অসংখ্য মূল চরিত্রের অক্ষুণ্ন উপস্থাপনে প্রায় তিন ঘণ্টার দৈর্ঘ্য দেয়া হয়েছিল নাটকটিকে। তার বেশ কয়েকটি প্রদর্শনীও হয়। বর্তমানে এর ব্যাপ্তি মাত্র দেড় ঘণ্টা, এবং অভিনয়শিল্পীর সংখ্যা সাত। তারা সবাই মেয়ে। কৃষ্ণের ভূমিকাতেও একটি মেয়েই অভিনয় করেছে। থিয়েটারের অভিনয়মাত্র একটি যদিকে আশ্রয় করে এগিয়ে যায়, ধরার ভেতর দিয়ে অধরাকে পেতে চায় বলে সেখানে নারী-পুরুষের অভিনয়শ্রেণিগত বিভাজনটা গুরুত্ববহ নয়,—এ বিশ্বাস রেখে, আমাদের ঐতিহ্যের উদাহরণকে সম্বল করে এবং সর্বোপরি একটি স্বরগত সুষমা রক্ষার জন্য এ কাজটি করা হয়েছে। বর্ণনাত্মকতা ও চরিত্রাভিনয় রীতির একটি সমন্বয়ও রক্ষা করা হয়েছে এ প্রযোজনায়।
আমাদের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন-এ বড়ু চণ্ডীদাসের তের খণ্ডের কাব্য থেকে সাতটি খণ্ডের কাহিনি রাখা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যেই বাকি খণ্ডগুলোর ভাবগত সংযোজন আছে। কৃষ্ণ-রাধার রূপবর্ণনা, রাধাকে পাওয়ার জন্য কৃষ্ণের তৎপরতা, রাধার সহচরী বড়ায়িকে দূতী হিসেবে চালনা করা, রাধার প্রত্যাখ্যান, কৃষ্ণের জোরপূর্বক মিলন, রাধাকে বশীকরণে কৃষ্ণের মদনবাণ নিক্ষেপ এবং নিজের অন্তর্ধান, রাধার প্রেমকারতা, কৃষ্ণদর্শনের তীব্র আকুতি, আত্মভর্ৎসনা, কৃষ্ণের পুনরাগমন, মিলন এবং কর্মকর্তব্যের অজুহাতে আবার প্রস্থান, এবং পরিশেষে চিরপরিত্যক্তা রাধার দুঃসহ বেদনা… এসব কাহিনির মধ্য দিয়ে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ভেতর থেকে দুর্ভাগা নারীজীবনের প্রতীক হয়ে উঠে আসা রাধার যন্ত্রণাকে বড়ু চণ্ডীদাসেরই ভাবনাসূত্র ধরে অধুনার দর্শনে গেঁথে তোলা হয়েছে এ নাটকে। কৃষ্ণ-রাধার ইহ-পরমের তত্ত্ব নয়, মধ্যযুগের এ কাব্যটি একেবারেই লোকমানসের ভেতর থেকে উৎসারিত পুরাণভাবনার নবায়ন, সেখানেই বড়ু চণ্ডীদাস উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। আমরা মণিপুরী মুদ্রা ও ভাষার ভেতর দিয়ে সে বিরল ব্যক্তিত্বকে ধরতে চেষ্টা করেছি।

অভিনয়শিল্পীরা একেবারেই তরুণ, শিক্ষানবিশ; নির্দেশক হিসেবে মৎ-ও, নাট্যযাত্রার পথভ্রান্তিগুলোকে তাই ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন এবং নতুন নতুন দিকের অঙ্গুলিনির্দেশ করবেন, নাট্যগুণীজনের প্রতি এ-ই নিবেদন।