হোম অনুষ্ঠান ডিফারেন্ট রোমিও ও জুলিয়েট

ডিফারেন্ট রোমিও ও জুলিয়েট

ডিফারেন্ট রোমিও ও জুলিয়েট
241
0

ঢাকার মঞ্চে এই প্রথম। শেক্সপিয়ারকে নিয়ে ঢাকা থিয়েটারের এক ভিন্ন আয়োজন।
যারা সমাজে ‘প্রতিবন্ধী’ বলে পরিচিত, নাসির উদ্দীন ইউসুফের ভাষায় ‘ভিন্নভাবে সক্ষম’—
তাদেরই মঞ্চ-পরিবেশনা ‘ডিফারেন্ট রোমিও ও জুলিয়েট’।

মঞ্চস্থ হবে আজ ও কাল—২৮ ও ২৯ মার্চ ২০১৬, সন্ধ্যা সাড়ে ছটায়,
শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায়।

এ বিষয়ে প্রযোজকের বক্তব্য আমরা তুলে ধরছি পরস্পরের পাঠকদের জন্য…


শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন। অনেক আনন্দের সাথে আপনাদের স্বাগত জানাই আজকের এই সংবাদ-সম্মেলনে। সম্মেলনের বিষয়ে আপনাদের অবহিত করার পূর্বে আমি নাসির উদ্দীন ইউসুফ সম্মেলনে উপস্থিত ৪ জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মানুষের সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিতে চাই, তারা হলেন ইংল্যান্ডের প্রখ্যাত পরিচালক জেনি সিউলি, জেনি ড্রপার, ঈষিতা আজাদ এবং এশা ইউসুফ।

আজকের এই সংবাদ-সম্মেলনে আমরা আমাদের নাট্যচর্চার ইতিহাসে এবং সামাজিক ইতিহাসের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং গৌরবের ঘটনা উপস্থাপন করতে যাচ্ছি।

স্বাধীনতার ৪৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আমরা ঢাকা থিয়েটার এবং লন্ডনের গ্রেআই থিয়েটার যৌথভাবে আগামী ২৮ এবং ২৯ মার্চ ২০১৬, ব্রিটিশ কাউন্সিলের আয়োজনে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় দেশের প্রতিবন্ধী মানুষদের অভিনয়সমৃদ্ধ উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের অমর প্রেমের নাটক ‘রোমিও ও জুলিয়েট’ মঞ্চায়ন করতে যাচ্ছি। এই প্রথম প্রতিবন্ধী তরুণ-তরুণীরা শেক্সপিয়ারের কোনো নাটকে অভিনয় করছে। নাটকটির অনুবাদ করেছেন প্রবাদপ্রতিম সাহিত্যিক দেবেশ রায়। আর এই দুঃসাধ্য কর্মটি সম্ভব হচ্ছে ব্রিটিশ কাউন্সিলের সর্বাত্মক কর্মোদ্যোগের কারণে। তবে সবচেয়ে বেশি কৃতিত্ব যাকে দিতে হবে তিনি হচ্ছেন ব্রিটিশ পরিচালক জেনি সিউলি। তাঁর পরিশ্রম ও অভিনব কৌশল আমাদের প্রতিবন্ধীদের অভিনেতা হিসেবে গড়ে উঠতে মূল ভূমিকা পালন করেছে। আমরা এতদিন তাদের বলেছি প্রতিবন্ধী। কিন্তু না এখন আমরা তাদের বলি ‘ডিফারেন্টলি অ্যাবল পিপল অথবা ভিন্নভাবে সক্ষম ব্যক্তি’। প্রকৃতির বিচিত্র খেয়ালে যারা আমাদের থেকে একটু ভিন্নতা নিয়ে জন্মেছেন, তারা তো আমাদের মতোই মানুষ। তাঁরা অক্ষম নন। তারা অন্যভাবে বা ভিন্নভাবে সক্ষম, এ কথা তো আমাদের মানতেই হবে। জেনি লন্ডনের গ্রেআই থিয়েটারের আর্টিস্টিক পরিচালক এবং লন্ডন প্যারা অলিম্পিক ২০১২’র আর্টিস্টিক ডিরেক্টর। গ্রেআই থিয়েটার বিশেষ ভাবে সক্ষম মানুষের থিয়েটার কোম্পানি। তারা নিয়মিত নাটক মঞ্চায়ন ও উৎসব করে থাকে।

একটু পেছনে ফিরে যাই। কিভাবে শুরু হলো আমাদের এই অভিনব নাট্য পরিকল্পনা। ২০১২ সালের লন্ডনের শেক্সপিয়ারের গ্লোব থিয়েটারের আয়োজনে শেক্সপিয়ারের ৪৫০তম জয়ন্তী ও লন্ডন অলিম্পিকের অংশ হিসেবে নাট্যঅলিম্পিক অনুষ্ঠিত হয়। ঐতিহাসিক সেই উৎসবের কথা আপনাদের স্মরণে আছে নিশ্চয়। ঢাকা থিয়েটার সেই উৎসবে আমন্ত্রিত হয়ে আমার নির্দেশনায় ‘দ্য টেম্পেস্ট’ নাটকটি গ্লোব থিয়েটারে মঞ্চস্থ করে। ওই প্রথম গ্লোব থিয়েটারে বাংলাভাষার কোনো নাটক মঞ্চায়ন হয়। আর প্রযোজনাটি ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল। এই গৌরব বাংলাদেশের সকল নাট্যকর্মীর।

এ সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ব্রিটিশ কাউন্সিল আমাকে আবার ২০১৬ সালে শেক্সপিয়ারের মৃত্যুর ৪০০ বছর পালন উপলক্ষে একটি নাটক করার জন্য অনুরোধ জানায়। বলতে দ্বিধা নেই যে প্রথমে আমি একটু গড়িমসি করি। কেননা মাত্র শেক্সপিয়ারের একটি নাটক করেছি। মাথায় নতুন কিছু নেই। কী করব? ব্রিটিশ কাউন্সিলে তখন রবিন ডেভিস নামে একজন প্রোগ্রাম ডিরেক্টর ছিলেন। তিনি নাছোড়বান্দা। তিনি আমার পেছনে লেগে থাকলেন। তখন একদিন হঠাৎ করে মাথায় একটি চিন্তা এল। আচ্ছা ২০১৬ সালের ২৬ মার্চ আমাদের মহান স্বাধীনতার ৪৫ বছর পূর্তি। যদি সেই দিবসে আমাদের দেশের অবহেলিত প্রতিবন্ধীদের নিয়ে শেক্সপিয়ারের মৃত্যুর ৪০০ বছর স্মারক প্রযোজনা ‘রোমিও ও জুলিয়েট’ মঞ্চায়ন করি তবে তা স্মরণীয় একটি কাজ হবে। ভাবতে তো অসুবিধা নেই। কিন্তু বাস্তবায়ন হবে কী করে?

রবিন ডেভিস উত্তেজিত এই ভাবনা শুনে। এর মাঝে ঈষিতা আজাদ পুনরায় যোগ দিয়েছে ব্রিটিশ কাউন্সিলে। সদা-হাস্যোজ্জ্বল ঈষিতা খুবই কর্মতৎপর। তার উত্তেজনা দ্বিগুণ। সে প্রতিবন্ধী থিয়েটার দেখেছে লন্ডনে। কিন্তু করব কী করে?

বিশেষভাবে পারঙ্গম মানুষগুলোর শিল্পভাষা তো আমার জানা নেই। বাংলাদেশের প্রতিবন্ধীরা সরাসরি থিয়েটার কর্মের সাথেও সেভাবে জড়িত নয়। তো ঢাকা থিয়েটারের ক’জন তরুণ এশা, ওয়াসিম, দোলাকে দায়িত্ব দেয়া হলো সম্ভাবনাময় কিছু তরুণ প্রতিবন্ধীদের খোঁজ করে বের করার। ব্রিটিশ কাউন্সিলের রবিন ও ঈষিতার তৎপরতায় জেনি সেউলিকে জোগাড় করা গেল। ২০১৩ সালে ভয়াবহ হিংসাত্মক রাজনৈতিক বিশৃংখলার কালে মহাউদ্যমে কাজ শুরু হলো। আমরা মহাসমরোহে এ স্বপ্নযাত্রার নামকরণ করলাম ‘ডিফারেন্ট শেক্সপিয়ার’ ‘ডিফারেন্ট রোমিও ও জুলিয়েট’। শুরু হলো কর্মশালার মধ্যদিয়ে শিল্পী নির্বাচন। এ এক কঠিন প্রক্রিয়া। ঢাকা থিয়েটারের এশা, দোলা, ওয়াসিম, সৌদ ও শিমূল ইউসুফের সাথে ইশরাত নিশাত এবং ব্রিটিশ কাউন্সিলের নাহিন ইদ্রিস ও তারিক সার্বক্ষণিকভাবে সংযুক্ত হয়ে প্রায় অসম্ভব কাজটি এগিয়ে নিয়ে গেলেন। সিআরপি, ব্র্যাক, সুইড ও গ্রাম থিয়েটারসহ অনেক প্রতিবন্ধী সহায়তা প্রতিষ্ঠানে যোগাযোগ করে কিছু সম্ভাবনাময় তরুণ-তরুণীকে নির্বাচিত করা হলো। কিন্তু শেক্সপিয়রকে মঞ্চে অভিনয় করা তো এদের পক্ষে অসম্ভব প্রায়। কিন্তু জেনি, এশা, দোলা, ওয়াসিমদের পরিশ্রম ঢাকা থিয়েটার ও অন্যান্য দলের সহযোগিতায় কাজ এগোতে থাকল। কখনো উল্লসিত, কখনো হতাশ—এই প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ ৩ বছর অতিক্রম করে আজ আমরা আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি। আমরা ঢাকা থিয়েটার ও লন্ডনের গ্রেআই থিয়েটার যৌথভাবে ব্রিটিশ কাউন্সিলের উদ্যাগে বাংলাদেশের ১৩ জন ভিন্নভাবে সক্ষম মানুষদের নিয়ে আগামী ২৮ ও ২৯ মার্চ ২০১৬, ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় মহান নাট্যকার শেক্সপিয়ারের ‘রোমিও ও জুলিয়েট’ মঞ্চায়ন করব। এ আমাদের জন্য পরম গৌরবের ও আনন্দের।

অনেক আনন্দ-বেদনার অবসানে আমরা অবশেষে এক নতুন আনন্দধামে উপনীত হব আগামী ২৮ মার্চ। বাংলা মঞ্চ দুলে উঠবে আমাদের ভিন্নভাবে সক্ষম অভিনেতাদের পদভারে। শেক্সপিয়ার অন্তর্গত হবে সমাজ দ্বারা অবহেলিত মানুষগুলোর। এ বিশেষ দিনটি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠবার দীর্ঘ অভিযাত্রায় আমাদের যে উপলব্ধি হয়েছে তা আপনাদের অবহিত করতে চাই। বাংলাদেশে ১২ ভাগ মানুষ নানাভাবে প্রতিবন্ধী। কিন্তু এ বিশাল জনসংখ্যা তো দৈনন্দিন দৃশ্যমান নয়। আমরা পারিবারিক ও সামাজিকভাবে এদের অদৃশ্য করে দিয়েছি। সমাজে চলমান ভাবনা—এরা আমাদের জন্য লজ্জার ও অগৌরবের। এদের জন্য সুবিধা-সম্বলিত ঘর নেই , স্কুল নেই, বাথরুম-টয়লেট নেই। অফিস, আদালত, রাস্তা-ঘাট, খেলার মাঠ, ট্রেন, বাস, যানবাহন, সিনেমা হল, থিয়েটার হল, কমিউনিটি সেন্টার, শপিং মল, ব্যাংকসহ কোথাও কোনো প্রকার প্রতিবন্ধীবান্ধব সুযোগসুবিধা নেই। তাহলে এরা কি আমাদের মাঝে নেই? যদিও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের উদ্যোগে বেশকিছু পরিকল্পনা আশার সৃষ্টি করেছে। কিন্তু সামাজিকভাবে বাংলাদেশ প্রস্তুত বলে মনে হয় না। অনেক দূর যেতে হবে আমাদের। আমাদের বিশ্বাস করতে হবে যাদের প্রতিবন্ধী বলে দূরে ঠেলে দিচ্ছি তাঁরাও মানুষ। তাঁদেরও জীবন আছে, স্বপ্ন আছে, স্বাদ-আহ্লাদ আছে। আছে জীবনের দাবি। তারা আমাদের থেকে একটু ভিন্ন। আর তো কিছু নয়। তারা সকল কাজে সক্ষম। ভিন্নভাবে সক্ষম। কোনো কোনো ব্যাপারে আমাদের চেয়ে পারঙ্গম। রোমিও ও জুলিয়েট মঞ্চায়নের মধ্যদিয়ে আমরা দেশবাসীকে সেই বার্তাটুকু দিতে চাই। আসুন আপনারা সকলে আমাদের সহযোগিতা করুন। আমাদের এ স্বপ্নযাত্রার সাথি হোন। এ আমাদের সকলের জরুরি দায়িত্ব।

চমৎকার পরিকল্পনার এ প্রযোজনায় আপনারা শারীরিক-, দৃষ্টি- ও শ্রবণ-প্রতিবন্ধী মানুষের সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে পরিচিত হবেন। নাটকে দুজন রোমিও এবং দুজন জুলিয়েট। অন্যান্য চরিত্র বাচিক ও ইশারা ভাষায় সংগীতসহ মঞ্চে নাটকটি পরিবেশিত হবে।

বিশ্বের ১৩০টি দেশে শেক্সপিয়ারের ৪০০তম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হবে এ বছর। শুধু বাংলাদেশেই ভিন্নভাবে সক্ষম আমাদের সন্তানেরা শেক্সপিয়ারের নাটক মঞ্চায়ন করার মধ্য দিয়ে এ মহান নাট্যকারকে আমরা স্মরণ করব।

আমাদের এ কর্মযজ্ঞে ব্রিটিশ দূতাবাস, ব্রিটিশ কাউন্সিল, সিআরপি, ব্র্যাক, বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার, সুইড বাংলাদেশ, শিল্পকলা একাডেমি ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা ও সাহায্য বিশেষ কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করছি।

ঢাকা থিয়েটার ও গ্রেআই থিয়েটারের সংশ্লিষ্ট সকলকে জানাই অভিনন্দন। এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এগিয়ে যাবেই বাংলাদেশ।

সবাইকে শুভেচ্ছা

বিনীত
নাসির উদ্দীন ইউসুফ
প্রযোজক