হোম অনুষ্ঠান গ্রীষ্মের এক বিকেলে

গ্রীষ্মের এক বিকেলে

গ্রীষ্মের এক বিকেলে
530
0

ভাতঘুমভাব। শরীর পারলে কবরেই ঢুকে যায়। সাড়ে তিনহাত মাটির নিচে নিশ্চয় এতটা দাবদাহ নেই! ‘পরস্পর’-এর কবিতার আড্ডায় চলেছি আর তাপিত তন্দ্রা এসে শরীর যেন শিশার মতো গলিয়ে দিচ্ছে। এমনই গ্রীষ্মকাল! এক সময় ঘুম এসে আমাকে আরেকটা জগতে নিয়ে যায়। ঘুমচোখে দেখি এক বালক স্কুলব্যাগ কাঁধে হাঁটছে। সে স্কুলে যাচ্ছে নাকি বাড়ি ফিরছে, তা চিহ্নিত সত্য নয়। দেখতে পাচ্ছি বালকের চোখে-মুখে রাগ, ক্লান্তি, বিরক্তি। তার পোশাকে ময়লা দাগ, কাঁধব্যাগের জিপার নেই। যেন কোন এক গভীর সন্ত্রাসে বালক দিকহীন। সে কোথায় যাচ্ছে, জানে না। পালাতে পারলেই যেন বাঁচে। একই সঙ্গে করুণ আর ক্রুব্ধ তার চোখের ভাষা। মনে হচ্ছে সিনেমার এক্সট্রিম ক্লোজ শটে সে তাকাচ্ছে, ক্যামেরার লেন্স আমার তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখ। আমি ভয় পেয়ে যাই। শরীর কেঁপে ওঠে। বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেছি। শরীর ঘেমে একাকার! ভরদুপুরে আধোজাগরণে এরকম একটা স্বপ্ন কেন দেখলাম! তাও গাড়িতে চলতে চলতে! এ হয়তো জীবনে প্রথমবার কোনো আসরে নিজের কবিতা পড়তে যাবার টেনশন। স্বপ্নে দেখা বালকও কোথাও যাচ্ছে। আমিও। এটুকু ছাড়া দিবাস্বপ্নটার আগামাথা পাই না।

‘কলম্বাসের জাহাজ’-, ‘বনপর্ব’-খ্যাত কবি গৌতম চৌধুরী বাংলাদেশে বেড়াতে এসেছেন। পূর্ব পুরুষের ভিটার টানে তিনি এখানে আগেও এসেছেন। ঘোরাঘুরি শেষে ভারতে ফেরত যাবার আগে এদেশের তরুণ কবিদের কবিতা শুনতে চেয়েছেন। কবিতা শুনতে চেয়েছেন প্রথিতযশা সাহিত্য সম্পাদক কবি সাজ্জাদ শরিফও। অগ্রজ কবি সোহেল হাসান গালিবের কাছ থেকে এই আড্ডায় কবিতাপাঠের আমন্ত্রণ পেয়ে আড্ডাস্থলে হাজির হয়েই বুঝতে পারি, এ সত্যিই গ্রীষ্মের বিকেল! প্রকৃতির উত্তাপ আর স্নায়ুচাপের তাপ মিলে এসি রুমেও শুরুতে এক প্রকার অস্বস্তি ছিল। কবিতা পাঠ আর আড্ডা শুরু হতেই তা উড়ে গেছে। কেননা, আড্ডায় অগ্রজ-অনুজ বলে কোনো অদৃশ্য দেয়াল অনুভব করি নি। আলোচনায় সকলেই নিজের মত খোলাখুলি প্রকাশ পেরেছেন।


আমার মনে হয়, রোবায়েত তার কবিতা নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত সময় পার করছেন। ইনসিকিউরিটিতে ভুগছেন।


কবিতাপাঠে আমন্ত্রিত অতিথি তরুণ কবিদের মধ্যে একজন হাসান রোবায়েত। রোবায়েতের কবিতা আমার পছন্দ। উনি প্রচুর লিখেন। লেখায় নানারকম বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছেন। এক বছর আগেও রোবায়েত বলতেন, তিনি কখনোই ছন্দে কবিতা লিখবেন না। সেই রোবায়েতের রূপান্তর ঘটেছে। তা নিজ ইচ্ছায় হোক বা অন্যের পরামর্শে, রূপান্তরটা ঘটছে। রোবায়েত এখন টানা গদ্যে যেমন লিখছেন, তেমনি ছন্দও প্রয়োগ করছেন কবিতায়। অনুষ্ঠানে ওনার প্রথম বই ‘ঘুমন্ত মার্কারি ফুলে’ থেকে দুটি কবিতা পড়ার পর যে চারটি কবিতা পড়েছেন, তা অক্ষরবৃত্তে লেখা। একজন কবি যখন একই জায়গায় পড়ে থাকেন না, নানা রকম প্রকরণ নিয়ে কাজ করেন, তাকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। কবির কাজই হলো তার লেখার মধ্যে নানা জায়গায় ভ্রমণ করা। তাই আমি রোবায়েতের জন্য আনন্দিত। আবার শঙ্কিতও। শঙ্কাটা জেগেছে আড্ডার দিন ফেইসবুকে তার একটা স্ট্যাটাস পড়ে। তিনি লিখেছেন, “কবিতা লেখার স্বাধীনতা চাই”। অনেকদিন ধরেই ফেইসবুকে রোবায়েতের কবিতা নিয়ে অনেকের সমালোচনা দেখে আসছি। সেসব কি রোবায়েত আর নিতে পারছেন না? আমার মনে হয়, রোবায়েত তার কবিতা নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত সময় পার করছেন। ইনসিকিউরিটিতে ভুগছেন। আমি যেটা বিশ্বাস করি, কবি এক ও অদ্বিতীয়। তার কোনো শরিক নাই। মানে কবির কোনো বন্ধু নাই। থাকে না। কবি তার কবিতার জগতে পুরোপুরি স্বাধীন। অন্যদের কাছ থেকে কবিতা লেখার স্বাধীনতা চাইতে হবে কেন! আপনি যখন লিখবেন, আপনার লেখার সপক্ষে প্রশংসা যেমন পাবেন, তেমনি বিপক্ষের সমালোচনা নেবার জন্যও তৈরি থাকতে হবে। কেউ আপনাকে এসে লেখার বা যে কোন কাজের ব্যাপারে পরামর্শ দিল, আপনি মানবেন কি মানবেন না তা পুরোটাই আপনার স্বাধীনতা। যেমন এই আড্ডাতে যেসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, তার কোনটুকু আপনার মনে রাখা প্রয়োজন আর কী স্মৃতি থেকে রিসাইকল বিন করে দেবেন, তাও পুরোটাই আপনার সিদ্ধান্ত। আপনার স্বাধীনতা। সেই সিদ্ধান্ত বা স্বাধীনতা বিষয়ে যখন আপনি দ্বিধায় ভুগবেন, তখনই কবিতা লেখার স্বাধীনতা বিষয়ে আপনি চিন্তিত হবেন বা কাব্য রাজনীতিতে জড়িয়ে খুঁটি ধরতে চাইবেন। যেন আপনার হয়ে কেউ কথা বলে। আপনি আপনার কবিতা কিভাবে লিখবেন, তা যদি অন্য কেউ ঠিক করে দিতে চায় আর আপনি যখন সেই ‘ঠিক করে দিতে চাওয়া’ দিয়ে প্রভাবিত হন, তখনই আপনার মধ্যে এই কবিতা লেখার স্বাধীনতা বিষয়ক মনস্তাত্ত্বিক লড়াই শুরু হয়। যা আপনার কবিতার জন্য ক্ষতিকর।

13051782_10154144920869581_7656209568604940255_n
আড্ডা শেষে

কবিতা পড়তে হবে জেনে ক’টা লেখা নিয়ে হাজির ছিলাম। সাজ্জাদ ভাইয়ের দৃষ্টিতে বুড়ো কবি শিমুল সালাহ্উদ্দিনও কবিতা পড়েছেন। আবৃত্তিচর্চা শিমুল ভাইকে কবিতা পাঠের আকর্ষণীয় চরিত্র হিসাবে উপস্থাপিত করে। এবারও ব্যতিক্রম হয় নি। এছাড়াও কবিতা পড়েছেন রাজীব দত্ত, হাসনাত শোয়েব, সারাজাত সৌম, রজত সিকস্তি, রহিমা আফরোজ মুন্নী ও আসমা ঝর্না! দুঃখিত, ওনাদের লেখা আমাকে আকর্ষণ করে নি। সৌম যে গতিতে কবিতা পড়েছেন, মনে হয়েছে কারওয়ান বাজারে কোনো অফিসফেরত সবজিক্রেতা। বাজারে তার দমবন্ধ হয়ে আসছে, তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে। পরিবেশটা কিন্তু ওরকম ছিল না। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে কবিতা পড়ার সুযোগ তো এদেশের তরুণ কবিরা খুব একটা পান না। সৌমের কবিতায় তাই মনোযোগ দিতে পারি নি। রাজীব দত্ত আর হাসনাত শোয়েব এই অনুষ্ঠানে আমাকে একটা উপলব্ধি দিয়েছেন। কবিকে শুদ্ধ উচ্চারণে আবৃত্তির ঢঙে কবিতা পড়তে জানতে হবে, এমন কোনো ব্যাপার নেই। লেখা যদি প্রাণবন্ত হয়, কবির মুখের ভাষায় কবিতা আরো জীবন্ত হয়ে হয়ে ওঠে। তা তিনি মান উচ্চারণেই পড়ুন বা আঞ্চলিক টানে ও ভুল উচ্চারণে; তা তখন আর বিবেচ্য বিষয় থাকে না। রাজীব একটি কবিতা পড়েছেন। শোয়েব ‘শমোসন, তোমাদের নগরে বৃষ্টি নামছে’ সিরিজ থেকে পাঁচটি কবিতা পাঠ করেছেন। তাদের কবিতা আড্ডায় উপস্থিতদের মনযোগ কেড়েছে; চট্টগ্রামের টোনে পাঠ করার পরেও। এটা প্রমাণ করে কবিতার ভাষার কোনো ‘ব্যারিয়ার’ নাই। বহুদিন পর রজত সিকস্তির কবিতার সঙ্গে দেখা হলো। রজতের একটিমাত্র কবিতা শুনে মন ভরল না। আফসোস থেকে গেল।


শ্রদ্ধেয় ফরিদ কবির কোনো তরুণের প্রথম বই গদ্যকবিতার হলে মেনে নেবেন। দ্বিতীয় বইটিও যদি গদ্যকবিতার হয় তাহলে সেটা তিনি আর পড়বেন না।


আড্ডাটাই অনুষ্ঠানের মূল বিষয়। এর ফাঁকে ফাঁকে কবিতাপাঠ চলেছে। কবিতার কাঠামো দেখে, টেক্সট না পড়ে সিদ্ধান্তে আসেন অনেকেই! এই আড্ডার মাধ্যমে এমন বিষয়ও জানা গেল! শ্রদ্ধেয় ফরিদ কবির কোনো তরুণের প্রথম বই গদ্যকবিতার হলে মেনে নেবেন। দ্বিতীয় বইটিও যদি গদ্যকবিতার হয় তাহলে সেটা তিনি আর পড়বেন না। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, কবির কাজ নিবিষ্ট মনে কবিতা লেখা; নিজের কবিতাটাই লেখা। নিবিড় চর্চার ভেতর দিয়ে নিজের কবিতার জগৎ আর ভাষাকে আলাদা করে ফেলা। কবির হয়ে তার কবিতাই তো কথা বলবে। সময় আর পাঠকই তো সিদ্ধান্ত দেবে, কে টিকবে আর কে টিকবে না।

ফরিদ ভাইয়ের ধারণা এখনকার কবিরা যথেষ্ট প্রস্তুতি না নিয়েই কবিতা লিখতে আসছে। এই অভিযোগটা সবকালেই তরুণদের প্রতি ছিল মনে হয়। আমি বিশ্বাস করি, সিরিয়াস কবিমাত্রই প্রস্তুতি নিয়ে লিখতে আসেন। আর কবিতা একটা পারফরমিং আর্ট। যত বেশি চর্চা করা হবে, পারফরমেন্স তত উন্নত হবে। লিখতে লিখতেই একজন কবি অন্যদের থেকে নিজেকে আলাদা করেন। নিজের কাব্যভাষা নির্মাণ করেন। সেটা প্রথম থেকেই হয় না। বছরখানেক সময় নিজেকে অন্বেষণ করেই চলে যায়। প্রস্তুতিপর্ব ওটাই। কবিমাত্রই জানেন, তাকে টিকে থাকতে হলে অন্যদের চেয়ে আলাদা হতে হবে। যথেষ্ট প্রস্তুতি ছাড়া একদম নিজস্ব কবিতা লেখা যায় কি? তবে ফরিদ ভাইয়ের সঙ্গে এই ব্যাপারে একমত, একজন কবিকে কবিতার সকল প্রকরণের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হতে জানতে হয়, কবিতার ঢেউকে সঙ্গী করেই সাঁতরে যেতে হয়।

কেউ কেউ তরুণ কবিকে বলে দিতে চান, এভাবে লিখো! ওভাবে লিখো! কেউ কেউ এসে কবিতা লেখার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি বাতলে দিতে চান। সিদ্ধান্ত দিয়ে যান, কিভাবে লিখলে কবিতা হয়ে ওঠে, কিভাবে লিখলে শব্দ ব্যবহারের চালাকি ছাড়া কিছু হয় না, তরুণ কবি কোনদিকে যাবে, কার মতো করে লিখবে। এসব দেখে-শুনে আমার আধোঘুমে স্বপ্নে দেখা বিভ্রান্ত বালকটির কথা মনে পড়ে। তরুণ কবি তার কবিতাটা নিজের মন যেভাবে চায়, সেভাবেই লিখুক না! রাতারাতি বিখ্যাত হতে বা কারো সুনজরে আসার জন্যে কবিতা লেখার দরকারই-বা কী! সু-লেখা এমনিতেই পাঠকের দৃষ্টি এড়ায় না।


কলকাতায় বসবাস করলেও তার কবিতায় আমরা পূর্ববঙ্গ অর্থাৎ বাংলাদেশের বাংলা ভাষার ব্যবহার দেখতে পাই।


আলোচনার শুরুর দিকে এসব ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হবার আশঙ্কা ছিল। গৌতম চৌধুরী আর সাজ্জাদ শরিফ—দুই বিদগ্ধ কবি এরকম কিছু ঘটতে দেন নি। ওনারা যা বলেছেন, সেটাই যেন বেশিরভাগ তরুণ কবির মনের কথা। বাংলা হরফে লেখা কবিতা। তবু যেন বাংলা কবিতা নয়। বাংলাদেশ আর পশ্চিমবঙ্গ—দু’জায়গাতেই নতুন কবিদের কবিতার ক্ষেত্রে এমন অভিযোগ আছে। গৌতমদা এই অভিযোগকারীদের প্রতি যেন বিষাক্ত তির ছুড়ে দিয়েছেন। তিনি জোর দিয়েই উচ্চারণ করেছেন, তরুণরা বাংলা কবিতাই লিখছে। বাংলা ভাষার তরুণ কবিরা নতুন ধরণের কবিতা লেখার চেষ্টা করছেন, কবিতার ভাষা ও বাঁক বদলে তরুণদের প্রয়াসও গৌতম চৌধুরীর চোখ এড়ায় নি। তিনি একজন কবিকে নানা আঙ্গিকে লিখতে দেখতেই পছন্দ করেন। জনাব চৌধুরী নিজেও তার কবিতার ভাষায় বৈচিত্র্য আনতে চেয়েছেন সব সময়। কলকাতায় বসবাস করলেও তার কবিতায় আমরা পূর্ববঙ্গ অর্থাৎ বাংলাদেশের বাংলা ভাষার ব্যবহার দেখতে পাই। তা কতটা সার্থকভাবে করেছেন, তা নিয়ে তর্ক হতে পারে। ছন্দে যেমন লিখেছেন, টানা গদ্যেও লিখেছেন। নিজের বিশ্বাস থেকেই গৌতম চৌধুরী উচ্চারণ করে গেলেন, অন্য যে কোনো কিছুর চেয়ে একজন কবির স্বতন্ত্র ভাষা থাকাটা আবশ্যক। ভাষার পৃথক সত্তাই একজন কবিকে ভিন্নভাবে চিহ্নিত করে।

ছুরিচিকিৎসা-র কবি সাজ্জাদ শরিফের উচ্চারিত প্রতিটি বাক্য ‘সাহস’ হয়ে আড্ডায় কবিতা পড়তে আসা তরুণদের হৃদয়ের মর্মমূলে গেথে থাকার কথা। সাজ্জাদ ভাই চলতি প্যারাডক্সের বাইরে গিয়ে কবিতার দিকেই তরুণ কবিকে মনোযোগ দিতে বললেন। কবিতা মানে নিজের কবিতা। তো সেই কবিতাটা লেখা অত সহজ বিষয় না। সাধনাটা দরকার। ওনার আলোচনাতেও কবিতার ভাষা এল প্রধান বিষয় হিসাবে। তিনি একটি উদাহরণ দিয়েছেন। ধরেন, কাঁঠাল আপনার প্রিয় ফল। আপনার চারপাশে শুধু কাঁঠালই দেখছেন। এত বেশি কাঁঠাল দেখছেন, ভাল লাগাটা বিরক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে। একদিন গহিন জঙ্গলের দিকে যেতে যেতে দেখলেন একটা গাছ। সেই গাছে একটা ফল। দেখতে কাঁঠাল-কাঁঠাল, কিন্তু আপনি সিদ্ধান্তে আসতে পারছেন না ওটা আরেক প্রকার ফল নাকি কাঁঠাল। আপনি ফলটা খেলেন, মজা পেলেন এবং বুঝতে পারলেন ওটা ঠিক কাঁঠাল নয়। তখন কিন্তু অচেনা ওই ফলটাকে বর্ণনা করতে গেলে আপনার ভাষা ও ভঙ্গিও বদলে যাবে। কবিতাও ঠিক সেরকম। লেখা পড়ে যদি সব একই রকম মনে হয়, পাঠকের মধ্যে যদি নতুন অভিঘাত তৈরি না হয়, তা হলে আর কবিতা কী! পাঠক কবিতায় নতুন কিছু আবিষ্কার করতে চায়, কবিতার ভাষার কাছে ধাক্কা খেতে চায়। সেই ধাক্কাটা যেসব কবি দিতে পারেন, তারা আলাদা হতে পারেন। সাজ্জাদ ভাইয়ে কাছে সেটিই কবিতা, যা পড়ার পর তার আগের পৃথিবীর অবস্থান থেকে অন্য একটা পৃথিবীতে সরিয়ে নিয়ে নো ম্যানস ল্যান্ডে দাঁড় করিয়ে দেয়। বোধের চারপাশ জুড়ে ওই কবিতার জগৎটুকু ছাড়া বাকি সব মিথ্যে মনে হয়। সেই কবিতা টানা গদ্যে লেখা হোক বা প্রচলিত কাঠামোতে, তা বিবেচ্য নয়। আমার মনে হয়, তরুণ কবিরা ঠিক এভাবেই ভাবেন!


কবিতার ভাষা কবিতারই ভাষা—মান বা আঞ্চলিক নয়।


বাংলা কবিতায় আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার নিয়ে আলোচনাটা বেশ মনে ধরেছে আমার। সোহেল হাসান গালিব আঞ্চলিক শব্দে বা মুখের ভাষায় লেখা কবিতাকে কেন শুধু স্যাটায়ার বা গিমিক মনে হয়, এ ব্যাপারে প্রশ্ন তুলেছিলেন। ফরিদ ভাইসহ দু-একজন মত দিয়েছেন, কবিতা মুখের ভাষায় রচিত হয় না। কবিতার ভাষা কবিতারই ভাষা—মান বা আঞ্চলিক নয়। এই বিষয়ের আলোচনায় মাজুল হাসান খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা বলেছেন। তার মতে, মানভাষা বা লিখিত ভাষায়ই কবিতা লিখতে হবে এমন একটা স্ট্যান্ডার্ড ঠিক করে দেওয়াও কবিতার প্রতি সন্ত্রাস। কবিতার মুহূর্ত, যাপন এবং বিষয় যদি মুখের ভাষাকে প্রত্যাশা করে, তাহলে জোর করে চলিত ভাষা চাপিয়ে দিতে হবে কেন? কবিতাই কবিকে কবিতার ভাষা সুপারিশ করুক না! আঞ্চলিক ভাষার কবিতা বাংলা কবিতা হবে না, বা মুখের ভাষায় লেখা কবিতা শুধুই ব্যঙ্গাত্মক ভাব প্রকাশ করে, এসব আসলে এক প্রকার ট্যাবু। যা আমাদের অজান্তেই মনের ভেতর সেট হয়ে গেছে। মাজুল ভাইয়ের সঙ্গে সহমত পোষণ করি। যদি গত কুড়ি-পঁচিশ বছরে বাংলা কবিতার উল্লেখযোগ্য কয়টা বইয়ের নাম নিতে বলা হয়, বেশিরভাগ তরুণ কবিই ব্রাত্য রাইসুর আকাশে কালিদাসের লগে মেগ দেকতাছি তার তালিকায় রাখবেন। বিগত কয়েক বছর ধরে কবিতা লিখতে আসা তরুণ কবিরা যে ভাষাকে গুরুত্ব দিচ্ছে, তা বাতিল করে দেয়া বুদ্ধিমানের কাজ না। আবার রবীন্দ্রভাষার ‘গেনু’ ‘গিয়েছিনু’ ‘হনু’ ‘মোর’ ‘করিনু’ এখন চলে না। সময় কবিতার ভাষা বদলে নিশ্চয় প্রভাব রাখে। কবিতার ফর্মও পরিবর্তনশীল। সেটাও পাঠক এবং ফান্ডামেন্টালিস্ট কবি-সমালোচককে ধর্তব্যে নিতে হবে।

পরিশেষে বলব, এরকম আড্ডার দরকার আছে। অনেক কিছু বোঝা যায়। সংশয়ে থাকা বিষয়গুলো পরিষ্কার হয়। তার চেয়েও বড় ব্যাপার, কবির উচ্চারণে তার কবিতা শোনা যায়। পরস্পর ও দাঁড়কাক এই আড্ডাটা যেন নিয়মিতই আয়োজন করে, এটুকু চাওয়া রইল। অনুষ্ঠানের শোভা বাড়াতে গিয়ে যা কিছু উল্টো কদর্যরূপ এনে দেয়, তা এড়িয়ে চলার অনুরোধও রাখি। বাংলা কবিতার জয় হোক।

রুহুল মাহফুজ জয়

রুহুল মাহফুজ জয়

জন্ম ৩১ মার্চ ১৯৮৪, ফুলবাড়ীয়া, ময়মনসিংহ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতক। পেশা : সাংবাদিকতা।

শিল্প-সাহিত্যের ওয়েবজিন শিরিষের ডালপালা’র সমন্বয়ক।

প্রকাশিত বই :
আত্মহত্যাপ্রবণ ক্ষুধাগুলো [কবিতা, ২০১৬, ঐতিহ্য]

ই-মেইল : the.poet.saint@gmail.com
রুহুল মাহফুজ জয়