হোম অনুষ্ঠান কবি জয় গোস্বামী : নেহাত সাধারণ একজন গৃহস্থ মানুষ

কবি জয় গোস্বামী : নেহাত সাধারণ একজন গৃহস্থ মানুষ

কবি জয় গোস্বামী : নেহাত সাধারণ একজন গৃহস্থ মানুষ
482
0

“কবিতা বা সাহিত্য যারা লেখেন তাই দিয়ে পৃথিবীর অত্যাচার বা হত্যার পরিবেশ বদলে দিতে পারেন না। কবিদের কোন দেশ-ধর্ম নেই।”

—গত ১৮ই সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের জামালখানে অবস্থিত গ্রন্থ-বিপণি বাতিঘর-এর দশ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত ‘আমার জীবন আমার রচনা’ শিরোনামের অনুষ্ঠানে পাঠকের মুখোমুখি হয়ে উপরের এই কথাগুলো বলেছিলেন কলকাতার বিখ্যাত কবি জয় গোস্বামী। আর কথাগুলো মনে প্রাণে বিশ্বাস করি বলেই তাঁকেও শুধুমাত্র কলকাতার কবি—এই ব্র্যাকেটে আটকে রাখতে পারি না। তিনি সার্বজনীন।

কবিতার পাঠক কমে যাচ্ছে, কবিতার বই বিক্রিও কমে যাচ্ছে—এই ধরনের প্রচারণার মুখে ছাই দিতেই যেন তাঁর চট্টগ্রামে আসা। কী পরিমাণ জনপ্রিয়তা একজন কবির হতে পারে সেটা প্রমাণ হয়ে গেল শুরুতেই, অনুষ্ঠানের হলঘর ভরে গেল মুহূর্তে! আর এক সময় আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেয়া হল, দুঃখিত, আর স্থান সঙ্কুলান হবে না, বাকিদের বাতিঘর-এর ভেতরে প্রোজেক্টরের স্ক্রিনে দেখতে হবে অনুষ্ঠান। আর দেখতে দেখতে সেখানেও একই অবস্থা! এত বড় আমাদের ‘বাতিঘর’-কে মনে হল কত ছোট! কবি বিশ্বজিৎ চৌধুরীর সূচনা বক্তব্য এবং অন্যান্য  আনুষ্ঠানিকতা শেষে ‘হৃদি ভেসে যায় অলকানন্দা জলে…’ কবিতা দিয়ে তাঁর কবিতা পাঠের শুরু। তারপর একে একে নুন, মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয়, হাঁস, শান্তি কল্যাণ, আমার দোতারা-সহ বিভিন্ন কবিতা। আর মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনে গেল চট্টলা-বাসী।

“ফরমায়েশি লেখাটা একপ্রকার দাসত্বের মতোই বলে অনেকে মনে করেন। আমি অনেক ফরমায়েশি কবিতা লিখেছি, কিন্তু তার ভাল-মন্দ বিচার আমার হাতে নেই”

কবিতা পাঠের ফাঁকে ফাঁকে তিনি উপস্থিত শ্রোতাদের অনেক প্রশ্নেরও জবাব দেন—

“আমি কোনোদিন যুদ্ধে যাই নি, জঙ্গল-সমুদ্রে যাই নি, নেহাত সাধারণ গৃহস্থ মানুষ। আমার বলার বিশেষ কিছু নেই, যা রোমাঞ্চিত হবার মতো। গান শুনতে ও কবিতা পড়তে গিয়ে উচ্ছ্বসিত হই।” এমন কথা কজন মানুষ এত সহজ এবং সাবলীলভাবে উচ্চারণ করতে পারেন আজকাল! তিনি আরও বলেন, বেশিরভাগ কবিতা রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বা ট্রামে চলতে গিয়ে লেখা হয়েছে এবং আজও যেকোনো লেখা লিখতে গিয়ে খেই হারিয়ে ফেলেন তিনি। ব্যক্তি হিসেবে সময়ের ব্যবধানে তাঁর আমূল পরিবর্তন হয়েছে এবং বিশ-পঁচিশ বছর আগের লেখা এখনকার থেকে আলাদা হয়ে গেছে। হয়তো শরীর বা নাম হিসেবে তিনি ঠিক আছেন, ডাকলে সাড়া দেবেন।

12029119_850809621704333_1787720042_n“আমি রবীন্দ্রনাথ-আইনস্টাইনের মতো মেধাবী নই। কোন কবিতা কখন লিখব তা আমার হাতে থাকে না, নিয়তিই তা ঠিক করে দেয়।” ফরমায়েশি লেখা সম্বন্ধে বলেন, “ফরমায়েশি লেখাটা একপ্রকার দাসত্বের মতোই বলে অনেকে মনে করেন। আমি অনেক ফরমায়েশি কবিতা লিখেছি, কিন্তু তার ভাল-মন্দ বিচার আমার হাতে নেই”।

জয় গোস্বামী যে আমজনতার প্রিয় কবি হয়ে উঠেছেন তার অন্যতম কারণ সাধারণের সাথে একাত্ম হয়ে থাকবার দুর্দান্ত একটা ক্ষমতা। সহজ সাবলীল ভাষা, গণমানুষের গল্প এসবই তার কবিতার মূল উপাদান।  অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং অত্যাচারিতের পাশে দাঁড়ানোর মতন সাহস তিনি দেখিয়েছেন বহুবার। গুজরাতের দাঙ্গার পর তাঁর কবিতায় ধিক্কার যেমন দেখেছি, তেমনি সিঙ্গুর এবং নন্দী গ্রামের জমি বাঁচাও আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং মুখ্যমন্ত্রীকে সরাসরি তাঁর কবিতায় ধিক্কার জানিয়েছেন।

দূর থেকে কবি আবুল মোমেনকে দেখতে পেয়ে এগিয়ে এসে অন্তরঙ্গ আলাপ করা হয়তো কিছুই নয়; এতোটা শরীর খারাপের মধ্যে ভক্তদের সাথে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার আবদার মেটানো, অসংখ্য অটোগ্রাফ দিয়ে যাওয়া—এসবও হয়তো কিছুই নয়; সহজ সাবলীল উক্তি, “আমার এত বই কেউ পড়বে, সেটা আমি আশা করি না”—এও কিছুই নয়;  এসমস্ত কিছুকেই যদি উপেক্ষা করে গিয়ে শুধু তাঁর কবিতা পড়ি, যেখানে লিখেছেন—

“আমি শুধু একটি দিন তোমার পাশে তাকে
দেখেছিলাম আলোর নীচে অপূর্ব সে আলো
স্বীকার করি দুজনকেই মানিয়েছিল ভালো।
জুড়িয়ে দিলো চোখ আমার পুড়িয়ে দিলো চোখ
বাড়িতে এসে বলেছিলাম ওদের ভালো হোক।“

আমাদের কণ্ঠ চিরেও আপনাতেই বেড়িয়ে আসে, হে প্রিয় কবি, আপনার ভালো হোক। আমি গর্বিত, আপনাকে এতটা কাছ থেকে দেখবার সুযোগ পেয়েছি।

(কেন যেন মনে হচ্ছে এই কথাগুলো না বললে এই লেখাটা অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে। বাতিঘরের সত্ত্বাধিকারী দীপঙ্কর দাশ এবং তাঁর টিমকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। সবার আগে তাঁর বাতিঘরএর মতন এমন সাহসী ও দারুণ উদ্যোগ-এর জন্যে, যা নিয়ে আমরা চট্টলবাসী গর্ব করি। তাঁর এইসমস্ত উদ্যোগের ফলেই দেশ-বিদেশের কত খ্যাতিমান মানুষদের আমরা এতটা কাছ থেকে দেখতে এবং শুনতে পাচ্ছি। বাতিঘর-এর জয় হোক।)