হোম অনুবাদ সেইন্ট দানিয়েলের কবিতা

সেইন্ট দানিয়েলের কবিতা

সেইন্ট দানিয়েলের কবিতা
976
0

সেইন্ট দানিয়েল (খ্রিস্টপূর্বাব্দ ৪০৯-৪৯৩) মেসোপটেমিয়ার (বর্তমানে ইরাক) সামোসাটা’র কাছাকাছি মারাথা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাইবেলীয় যুগের একজন ঋষি পুরুষ। ধর্ম এবং জীবন সম্পর্কে তার বোধ তিনি বিবৃত করে গেছেন। সেখান থেকে কিছু অনুবাদ।


 

১.
আমাদের মধ্যে কেউ কেউ আছে
যারা নিজেই নিজের মাথায় গুলি করে,
কেউ বা ফাঁসিতে ঝুলে যায়, কেউ বিষ খায়,
কেউ আবার ব্রিজ থেকে ঝাঁপ দেয়,
কেউ বা নিজের কব্জিতে ব্লেড চালায়,
রক্তপাত ঘটায়—যতক্ষণ পর্যন্ত না মৃত্যু আসে।

এবং আমাদের মধ্যে কেউ কেউ আছে
যারা প্রেমকে নির্বাচন করে—
ধীরে ধীরে এই পদ্ধতির মাধ্যমে মৃত্যুর
দিকে এগিয়ে যায়।

২.
তোমাদের চোখ,
যদিও তারা কথা বলতে পারে না;
তাদের তীক্ষ্ণ কণ্ঠে চেঁচাতে দেখি আমি।

এবং আমার হস্ত-যুগল,
যদিও তারা ক্ষতবিক্ষত নয়—
কিন্তু সেখান থেকে অপর প্রান্তের কাগজের উপর
রক্ত উপচে পড়ে।

৩.
রাত্রিকালীন নৈঃশব্দ্য থেকে
নেকড়ের দীর্ঘ আর্তনাদ শোনা যায়।

নির্ঘুম বিছানা থেকেও
বেরিয়ে আসে সত্যবদ্ধ প্রার্থনা বাণী।

অন্ধকারাচ্ছন্ন আকাশে
নৃত্য করে জোনাকি পোকার দল।

এবং
দুঃখভারাতুর হৃদয় থেকে ঝরে পড়ে
সুন্দরতম কবিতা।

৪.
কে দিয়েছে আমাকে এই চিন্তাশীল মগজ?
কে সেই ধর্ষকামী ধর্মাবতার?
কে সেই নৃশংস জারজ,
যে আমার খুলির ভেতর পুরে দিয়েছে একটা আস্ত নরক?

৫.
খুব ভালো করেই জানি, আমার ভেতরে বোকামি কাজ করে এই কারণে যে
আমি বয়সে এখনও যথেষ্ট তরুণ—
আমার ভেতরেই এই স্বার্থপরতা এবং দাম্ভিকতা আসে তারুণ্যদীপ্ত উদ্দীপনা থেকে
এবং এই স্বার্থপরতা এবং দাম্ভিকতা দ্রুতই রূপান্তরিত হবে পাগলামিতে;
কেউ যখন তরুণ এবং সুন্দর থাকে তখন তার পাগলামি আরও বলবান হয়
এবং দ্রুতই সে অমরত্বের দিকে এগিয়ে যেতে চায়।
আমার ভেতরের দাম্ভিকতার বীজ শরীরী নয় এর বীজ অনেক গভীরে প্রোথিত,
এটা পারমার্থিক।
কেউ কি আমাকে বলবেন—
সেই ব্যক্তির চেয়ে কে বেশি দাম্ভিক হতে পারবে যে তার মস্তিষ্কের
গোপন স্বরকে অনায়াসে অমরত্বের দিকে ঠেলে দিতে চায়।

সম্ভবত আমি সত্যিকারার্থে পাগল হয়ে গেছি;
কিন্তু এ কথাও ঠিক যে কেবলমাত্র পাগলরাই আজীবন বেঁচে থাকে।

16215865_1209292249107831_450014213_n
সেইন্ট দানিয়েল

৬.
কিছু হতভাগ্য আত্মাদের মধ্য থেকে ঈশ্বর
কাউকে কাউকে কবি বানান—
এরপর তাদের উপর দাহ্য পদার্থ ছিটিয়ে দেন
এবং তাদেরকে আগুনের উপর ঝুলান।

শুধুমাত্র কিছু একটা পোড়ার বিনিময়েই সেই আগুন থেকে
বিচ্ছুরিত হয় আলো;

৭.
নিঃসঙ্গতা একটা উপহার—
যদি তুমি নিজেকে ভালোবাসো তবেই।

তাই একাকিত্বকে ভয় পেয়ো না;

নিঃসঙ্গতা এমন একটা জিনিস যা তোমাকে
শেখাবে কিভাবে একাকিত্বকে আলিঙ্গন করতে হয়।

৮.
সে আমার বিছানায় শোয়া ভঙ্গিতে,
সম্পূর্ণ উদোম,
তার চোখ, লজ্জাবনত এবং প্রীতিকর;

সুগন্ধযুক্ত, আমার বায়ুতন্ত্রে কামনা উপচে পড়েছিল,
তার চুল ছিল সুদীর্ঘ এবং গুচ্ছবদ্ধ, ছিল কুচকুচে কালো
যেমন নিরীহ রাতের ঘন অন্ধকার ঘিরে রাখে আমাদের;
তার ত্বক বিছানা পাশের ল্যাম্পের মতো পিঙ্গল
যা শিখাহীন উজ্জ্বল আলোর শিখা হয়ে আভা দিচ্ছে।

তার দেহের সমস্ত অংশই সৌন্দর্যমণ্ডিত,
সে মাথা থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত ত্রুটিহীন।
এবং আমি একজন অনিশ্চিত মানুষ;
বুঝতে পারি না কোথা থেকে স্পর্শ করা আরম্ভ করব।

৯.
হে সুন্দরের নশ্বরী;
যদি তোমাকে একথা বলি যে,
আমি পাগল হয়েই বেশি আনন্দিত,
তাহলে তুমিও কি আমার সঙ্গে পাগল হবে?

১০.
তুমি হওয়া ছাড়া তোমার কাছে আর কোনো বিকল্প নেই;
হতে পারে এটা তোমার জন্য আশীর্বাদ, হতে পারে অভিশাপ।
নিশ্চয় তুমি তোমাকে মিথ্যা বলতে পারো, অবশ্যই অন্য কেউ নয়।
কিন্তু তোমার মৃত্যুশয্যায় তুমি ঠিকই অনুধাবন করতে পারবে যে
তুমি আসলে কে ছিলে।
আসন্ন মৃত্যুই একজন মানুষকে সর্বাধিক সৎ করে তুলতে পারে
অন্য কিছু নয়।

মৃত্যু অকৃত্রিম, খুবই অকৃত্রিম।
জীবিতাবস্থায় প্রায় পুরোটা সময় আমরা জীবননামক একটা
ধোঁকার সম্প্রসারণ করি মাত্র।  

 

 

Ashraf Jewel

আশরাফ জুয়েল

জন্ম ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮, চাঁপাইনবাবগঞ্জ। কবি, কথাসাহিত্যিক।

এম বি বি এস, ডিপ্লোমা ইন এনেসথেসিয়া (ঢাকা ইউনিভার্সিটি)।
পেশা : চিকিৎসক, স্পেশালিস্ট, ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট, ইউনাটেড হসপিটাল।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
যুদ্ধ ছাড়া শুদ্ধতা অসম্ভব [অনুপ্রাণন, ২০১৩]
অতীতা দুঃখরা পাখি হয়ে গেল [প্রিয়মুখ প্রকাশন, ২০১৪]
অনুজ্জ্বল চোখের রাত [নন্দিতা, ২০১৬]

ই-মেইল : ashrafjewel78@gmail.com
Ashraf Jewel