হোম অনুবাদ সিমা কালবাসি’র কবিতা

সিমা কালবাসি’র কবিতা

সিমা কালবাসি’র কবিতা
1.14K
0

সিমা কালবাসি মধ্যপ্রাচ্যের তরুণ, উদীয়মান কবি ও সংস্কৃতিকর্মী। একই সাথে মানবাধিকার কর্মী, অনুবাদক ও নানা পুরস্কারে ভূষিত সিমা’র জন্ম ১৯৭২ সালের ২০ নভেম্বর, ইরানের রাজধানী তেহরানে। পোয়েট্রি অব ইরানিয়ান উইমেন প্রজেক্টের পরিচালক সিমা, এক সময় কাজ করেছেন জাতিসংঘে। কাজ করেছেন পাকিস্তানে পালিয়ে আসা যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগান রিফ্যুজিদের মাঝেও। তার প্রথম বই ‘ইকোস ইন এক্সাইল’ (ইংরেজি ভাষায়) এবং ‘সাংসার’ (স্টোনিং) বেরিয়েছে ফারসি ভাষায়। সংখ্যালঘুদের অধিকার ও সুপ্রাচীন ঐতিহ্যজাত স্বাতন্ত্র্যতাবাদী বোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তার কবিতায়। মার্কিন বুক অ্যাওয়ার্ড জেতা লেখক ডেনিয়্যালা গুসেফি সিমার কবিতা সম্পর্কে বলেন : Kalbasi’s poetry exposes the deep heart of a woman who is compassionate with suffering and full of the joy of life, of the innocence of a child, the knowledge of a woman, the aspirations of a peacemaker. These are stirring poems with a worldly view, both accessible and imaginative. They make an excellent cross-cultural exchange that demonstrates our universal humanity.

কালবাসি শুধু কবি নন, তিনি একজন ডকুমেন্ট্রি নির্মাতাও—যেখানে নারীর অবরুদ্ধতার বিরুদ্ধে কথা বলেন তিনি, লড়েন মানবতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য। সিমা বর্তমানে বসবাস করছেন যুক্তরাষ্ট্রে।

কালবাসি’র কবিতাগুলো অনুবাদ করেছেন কবি মাজুল হাসান


ড্রইং

ছবি  আঁকছে ছোট্ট খুকি
হাত ধরাধরি
হাঁটছে
বাবার সাথে
পরনে তার হ্যালোয়েনের পোশাক
একটা ইঁদুর
একটা সূর্য
একটা সাদা বাড়ি।

মাও কিন্তু আঁকছেন ছবি…
কারাপ্রাচীরে বন্দি
মৃত বাবা,
বন্দুকধারী সৈন্য
যুদ্ধ আর
ক্লাস্টার বোমা।

 

মধুর স্বপ্ন এবং আমার স্বপ্ন—বলল সে

আপন মনেই ভাবি, স্বপ্ন কখনো সত্যি হয় না
কখনো পাই নি আমি পাঁচ বছর বয়সের জুতো
থামে নি বোমার গর্জন, তখন আমি আট
কবর থেকে ফেরেন নি মা—এখন আমি একত্রিশ

লেখার মাঝে চাই না তারে, না স্বপ্নে। চাইছি তারে
দিনে রাতে বিরামহীন বেদনায়।

 

কিছু না

কোনো কিছুতেই পুরোপুরি নেই আমি,
এমনিতেই বাড়ছে নিরর্থকতা
এই যে বন্ধ হচ্ছে কপাট
খুলে দিচ্ছে আরো আরো রিক্ত প্রান্তর
যুদ্ধ ছাড়া কোনো কিছুই নির্ধারিত নেই আজ

বোমা, বোমা-ঠিকরানো আলো দিচ্ছে অন্ধ করে; আর
তেহরানের পথ ধরে জ্বলছে দামেস্কো। বোনেরা কাঁদছে—হতাশ
সময়ের বাহুবন্দি নাকাল হচ্ছে ভাই। কিছুই ঘটে না
মরে থাকে শিশু। সাংবাদিকরা ফিতাবন্দি করে নতুন ডেট-লাইন ।

কিছুর পরে আসে না কিছুই
তবু হাঁটু গেড়ে বসি, কাঁদি সেই অনাগত ‘কিছু না’র জন্যই।
আর দেখো—আজও উড়ুক্কু পাখিরা পুড়ে যায় নি।

কিছুই ঘটে না। কেন্দ্রীয় উদ্যান ধরে হাঁটি
সেখানে নেই কিছু—তারপরেই নো-ফ্লাইং জোন
কেবল গলা গলিয়ে নেমে পড়ে না নিরর্থকতা
গুলি চলে, রক্ত ঝরে—তবু এখানে ঘটে না কিছুই
তবু লিখি, নিরর্থকতা যাতে আর নিরর্থকতার ভার বাড়াতে না পারে।

 

ডান্সিং টেংগো

ওহ ওরলান্ডো!
মনে পড়ে সেই রাতের কথা?
বালিয়াড়ির সঙ্গীতের মূর্ছনায় নেচেছিলাম
আমরা। চুপিচুপি বলছিলে, আর আমার
কানের পকেটে ঝরে পড়ছিল বিস্ময়।

ওহ স্পাহান!
তোমার নীল তুর্কি-মসজিদগুলো
জায়ান্দেরুদ তীরে বালিতে লুকিয়ে থাকা
প্রেমিকেরা আজও তাড়া করে
নীলাভ আকাশ। সে কথা আজও
বিস্ময় ঝরায় আমার কানের পকেটে।

সময় অন্তহীন, আমার আত্মসম্মান
জড়িয়ে আছে তোমাতে আর তোমার
শব্দ এক চরম বিস্ময়, আমার কাছে
সেগুলো বহুমূল্য কয়েনের মতো ঝরে পড়ে
আমার কান্নার পকেটে।

 

বুদ্ধ বসে আছেন

বুদ্ধ বসে আছেন
যখন জীবন মাটি হয়ে যাচ্ছে
মাটি হচ্ছে পাথর
গাছেরা হয়ে যাচ্ছে লাকড়ি
আর শীতের অভিশাপ রূপান্তরিত হচ্ছে দরজার ভাঙা হাতলে।

বুদ্ধ বসে আছেন,
তোমরা জানো একদম গভীরে,
স্বর্ণ দিয়ে তৈরি এই পৃথিবী
জানো—ব্রোঞ্জ ও পিপের মধ্য দিয়ে
কিভাবে প্রজ্বলিত হয় আগুন।
আর হ্যাঁ, ভাবনার সমুদ্র দিয়ে হেঁটে যান যিশু,
মোহাম্মদ, নবীগণ, নারীবাদ,
জ্বলন্ত বুশের সাথে কথা বলেন মুসা,
কিন্তু তোমরা নিজেরাই থেকে যেতে চাও নিরক্ষর
স্বপ্ন খাও,
রুটিতে ক্রিম লাগাও,
ভারী ক্রিস্টাল গ্লাসের বাইরে থেকেই
মদ গিলো
যেন তোমাদের হাড় লেগে কাঠের মেঝে
কেঁপে ওঠে; বিশ্রাম চায়, খোঁজে পৃথিবীর সীমানাপ্রাচীর।

তোমাদের হাতের তালু ঢেকে দেয় ছায়া,
তোমাদের চোখ ঢেকে দেয় ছায়া,
তবু চারা জন্মায়, সজীবতায় পাতা মেলে দেয় গাছ,
পরবর্তী… নাভিকেন্দ্রে যেতে
তোমরা সবুজে সবুজে ভরিয়ে ফেল পথ।

তুমি অগম্য নও।

 

পাঁচ ফুট সাত

যদি তুমি থেকে যাও তুমি, আর আমিও আমি—সত্যিই কিছু যায় আসে না তাতে। আমি তো নই কোনো ভিনদেশি ফুল। যে কোট-ই পরবে তুমি উষ্ণতার অন্বেষায় তাই জড়িয়ে নেব শরীরে। আর জুতো… হোক সে যতই ছোট, আমাদের উচ্চতার ফারাক কমাতে তাই পরবো পদযুগলে। আমার জন্য বদলাতে হবে না, এরই মধ্যে তোমাতে বদলে গেছি আমি। যাপিত জীবনে কখনোই ধর্ম ছিল না আমার। জন্মক্ষণে তোমার ভালোবাসা ছাড়া সমস্ত ধর্ম থেকে আমি ছিলাম স্পষ্টতই নগ্ন ।

জানি ওগুলো কোনো কাজের কথা নয়। জানি কোনো বদলপ্রক্রিয়া নেই। কোট নেই, উচ্চতার ভারসাম্য নেই, জুতো নেই। তবু এক চিলতে নগ্ন সত্যের মতো তোমাকেই খুঁজি প্রথমে; তুমি নও, খুঁজি নিজেকেই। তুমি; কদাচিৎ জানবে না—আমি কে, কখন আমি বসে থাকি সফেদ চাদরে।

তুমি, নেই আমার পাশে।

আর যে সব কথা লেখা হয়েছে, যে সব কথা বলা হয়েছে, হয়েছে বোঝা; এরই মধ্যে চিরতরে চলে গেছে তারা।

কিন্তু, আমি ওদের ফিরিয়ে আনতে চাই—হাতের শূন্য-তালুতে। সেই হাত রাখতে চাই বুকে, বুক রাখতে চাই বিশ্রামে, বিশ্রাম—অনন্তের। আর হৃদস্পন্দনকে ফেরাতে চাই আত্মায়। ফিরে এসো আত্মা ‘তুমি’ হয়ে যাবার আগে ঠিক যেমনটি ছিলে।

হায়! আমি মাত্র পাঁচ ফুট সাত।

 

১১ সেপ্টেম্বর

ধূসর পাখিরা আর বসে না
শুকনো গাছের উঁচু চুড়োয় চলে
গেছে লালচে শেয়াল
এই যে কপট-রাত, যথাশীঘ্র সেও
চলে যাবে ভোরের দখলে।

এই আবলুস-কালো অাঁধার গ্রহণের মধ্যেই
ক্ষিপ্র, ছুটতে হবে আমায় সবুজ দিবসে,
তখন হৃদয়ের বুনো কালোয়
ঝকমকিয়ে উঠবে মোমের বিচ্ছুরণ
সেই দর্পণে দেখি এক ভিন্ন পৃথিবী—
আমার জীবনের বাদামি সৌন্দর্য দেখে
আর কেউ আমাকে ঘেন্না করছে না।

 

* ‘১১ সেপ্টম্বর’ কবিতাটি যৌথভাবে লেখা, সিমার সাথে কবিতাটিতে
কলম লাগিয়েছিলেন রোজার হিউমস।
মাজুল হাসান
মাজুল হাসান

মাজুল হাসান

কবি ও গল্পকার
জন্ম : ২৯ জুলাই ১৯৮০, দিনাজপুর।
পড়াশুনা করেছেন দিনাজপুর জিলা স্কুল, নটরডেম কলেজ
ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অর্নাস।।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ:
বাতাসের বাইনোকুলার ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১০।
মালিনী মধুমক্ষিকাগণ ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১৪।
ইরাশা ভাষার জলমুক ● চৈতন্য, ২০১৬।

প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ:
টিয়ামন্ত্র ● ভাষাচিত্র প্রকাশনী, ২০০৯।
নাগর ও নাগলিঙ্গম ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১২।

অনুবাদগ্রন্থ:
টানাগদ্যের গডফাদার, রাসেল এডসনের কবিতা ● চৈতন্য, ২০১৬।

মাজুল হাসান পেশায় সাংবাদিক। বর্তমানে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে বার্তা বিভাগে কর্মরত।
মাজুল হাসান
মাজুল হাসান