হোম অনুবাদ সংগীতশিল্পী

সংগীতশিল্পী

সংগীতশিল্পী
388
0

‘সংগীতশিল্পী’ একটি ভালোবাসার গল্প, যে-ভালোবাসা দাবি করে বিচ্ছেদ, দাবি করে দূরে সরে গিয়ে কাছে থাকা—মুক্ত হওয়া। এই গল্পের ভাঁজে ভাঁজে আছে জীবনের নানা রঙের আরো কিছু গল্প। একটি গল্পের ভেতরে কিভাবে আরো কিছু গল্পের ঘর তৈরি হয়, গল্পের স্বপ্ন তৈরি হয়, এক গল্প ডেকে আনে অন্য গল্প, এবং সেই গল্পগুলো কিভাবে সংশ্লিষ্ট সব গল্পের সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত হয়ে অভিন্ন গল্প রচনার পরিপ্রেক্ষিত আনতে পারে, তা সুন্দরভাবে দেখিয়েছেন কাজুও ইশিগুরো এই ‘সংগীতশিল্পী’ গল্পে। ২০১৭ সালে সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন এ কথাশিল্পী।


❑❑

সেদিনই বসন্তের শুরু হলো ভেনিসে, যেদিন সকালে কিছু টুরিস্টের মাঝে বসা টনি গার্ডনারের সাথে আমার দেখা হয়েছিল। আমাদের পয়লা পুরো সপ্তাহ শেষ তখন। পিয়াজ্জা স্কয়ারের বাইরে, ওটা একটা মুক্তির স্বাদ পাওয়া আসলে। আপনাকে বলি, ঐ দম-আটকা কয়েক ঘণ্টা ওফ! ক্যাফের পেছন দিকে অনুষ্ঠান, যেদিকে কাস্টমারদের ঢুকবার রাস্তা, তাও তারা সিঁড়ি ব্যবহার করতে চাইছিল। একটা ঘিঞ্জি পাকানো ঝামেলাভরা ছিল ঐ সকাল। আমাদের বড় নতুন তাবুর পল্লা আমাদের চারদিকে ঝাপটা মারছিল। তবু আমরা কিছুটা চনমনে ভাবের মাঝে ছিলাম। আমার মনে হয়, আমাদের সংগীতে সেই মনোভাব ফুটেছিল।

কিন্তু এখানে আমি কথা বলছি একজন নিয়মিত ব্যান্ড সদস্যের মতো। আসলে, আমি ‘জিপসিদের’ একজন। মানে, অন্য শিল্পীরা যেভাবে আমাদের ডাকে আরকি। তাদের একজন পিয়াজ্জার চারপাশে ঘুরে ঘুরে তিনটি ক্যাফে অর্কেস্ট্রার কোনো একটিতে আমাদেরকে নেওয়ার ব্যাপারে সাহায্য করে। বেশিরভাগ আমি ক্যাফে লাভেনাতে বাজাই। কিন্তু এক ব্যস্ত দুপুরে কোয়াদ্রি অর্কেস্ট্রার ছেলেদের সাথে ফ্লোরিয়ানে গিয়ে এক সেটে অংশ নিই। পরে লাভেনাতে ফিরে আসি। তাদের সাথে আমার জমে ভালো। ওয়েটারদের সাথেও। অন্য শহরে হলে এতদিনে আমি একটা ভালো অবস্থানে থাকতাম। কিন্তু এখানে পুরান চিন্তা-ভাবনায় আচ্ছন্ন সব, সবকিছু যেন ঠ্যাং উপরে মাথা নিচে অবস্থায়। অন্য কোথাও হলে, গিটারবাদক বলে মানুষের নজরে পড়তাম। কিন্তু এখানে ক্যাফের ম্যানেজারেরই ভালো লাগে না। যেন আমাদের এসব বেশি আধুনিক, টুরিস্টদের পছন্দ না। গত শরতে আমি হয়েছিলাম একজন ভিনটেইজ জাজ মডেল। আমার হাতে ছিল ওভাল সাউন্ড গর্তের গিটার, যেটি হয়তো দিয়াংগো রেইনহার্দত বাজিয়েছিলেন। তাই মানুষ আমাকে রক-অ্যান্ড-রলার বিবেচনা করতে ভুল করত না। এতে আমার দিকটা সাবলীল হয় কিন্তু এই ক্যাফে ম্যানেজার এখনও পছন্দ করে না এটা। সত্য হলো, আপনি যদি গিটারবাদক হন, আপনি জো পাস হয়ে গেলেও আপনাকে এরা নিয়মিত ডাকবে না এই স্কয়ারে।

আরেকটা ছোট ব্যাপার এখানে আছে, আমি ইতালীয় না হওয়া। আল্টো সেক্সাফোনবাদক ঐ চেকোশ্লোভাকিয়ার বড় সাইজের লোকটির বেলায়ও একই অবস্থা। অন্য সংগীতশিল্পীরা আমাদেরকে পছন্দ করে। কিন্তু অফিসের বিল সন্তোষজনক না। ম্যানেজারগুলো বলে, ‘বাজাও আর মুখ বন্ধ রাখবা।’ ফলে টুরিস্টরা বুঝতে পারে না আপনি ইতালীয় না। স্যুট পরেন, সানগ্লাস লাগান, চুল পিছের দিকে আচড়ান, কে কোথা থেকে আসছে কেউ বুঝতে পারবে না, ব্যস, কোনো কথা বলা যাবে না।

তবে আমি খারাপ করি না। তিনটি ক্যাফে অর্কেস্ট্রাই, যখন তাদেরকে এক সাথে অনুষ্ঠান করতে হয়, তখন তাদের এমন গিটার দরকার যেটি কিছু একটা নরম কিন্তু জমাট সুরধ্বনি তুলবে, এবং সেটি ছড়িয়ে বাজাবে, পেছন থেকে ধরে দর্শনীয়ভাবে তারগুলোতে রিদম তুলবে। আপনি হয়তো ভাবছেন তিনটা ব্যান্ড এক স্কয়ারে একসাথে অনুষ্ঠান করা নিয়ে। ব্যাপারটা একেবারে খাঁটি তালগোল অবস্থার মতোই শোনায়। কিন্তু পিয়াজ্জা সান মার্কো বেশ বড়। অনুষ্ঠান চলার সময় একজন টুরিস্ট স্কয়ারে ঘুরলে, সে শুনবে একটা সুর থামছে আরেকটা উঠছে, ব্যাপারটা যেন রেডিওর স্টেশন বদলানোর মতো। ক্লাসিক আইটেম টুরিস্টরা বেশি পছন্দ করে না। মানে, বিখ্যাত গীতিনাট্যগুলোর যন্ত্রসংগীত ভার্শন তাদের ভালো লাগে না। কিন্তু এ জায়গা সান মার্কো। এখানের ম্যানেজমেন্ট অত্যাধুনিক পপ হিট চায় না। প্রতি মিনিটে তারা চায় চেনাজানা সুর-সংগীত হোক। হোক সেটা জুলি এন্ডুর একটা খণ্ড বা বিখ্যাত কোনো ছবি থেকে থিম। আমার মনে আছে, গত গ্রীষ্মে এক দুপুরেই এক ব্যান্ড থেকে আরেক ব্যান্ডে গিয়ে নয় বার ‘দি গডফাদার’ বাজাতে হয়েছে।


মনে হলো ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের ইশারায় আমার দিকে ফিরলেন। ফ্যানরা এসে ভিড় করে চারপাশে তার। পরে আমি পরিচয় দিলাম, ভালো করে বললাম আমি তার কতটা প্রশংসক। 


যা হোক, সেই বসন্তের সকালে, টুরিস্টদের ভালো একটা ভিড়ে বাজাচ্ছিলাম যখন, তখনই টনি গার্ডনারকে দেখি। একা বসে আছেন তার কফি নিয়ে, প্রায় আমাদের সামনেই। হয়তো ছয় মিটার পেছনে আমাদের স্টেইজ থেকে। বিখ্যাত লোকজন আমরা পাই সব সময় স্কয়ারে। আমরা কখনও অতিরিক্ত উত্তেজনা দেখাই না। একটা খণ্ড শেষ হলে ব্যান্ড সদস্যদের মাঝে আস্তে আস্তে দুয়েকটা কথা চলতে থাকে। যেমন : ‘ঐ দেখ ওয়ারেন বিট্টি’ কিংবা ‘দেখ এই হলো কিসিঞ্জার’ অথবা ‘ঐ মেয়েলোকটা একটা ফিল্মের, যে ফিল্মে পুরুষেরা তাদের মুখ বদল করেছিল’। এসব আমাদের নিত্যদিনের বিষয়। আসল কথা, এটা সান মার্কোর পিয়াজ্জা। কিন্তু ঐ লোকটা টনি গার্ডনার নিশ্চিত হওয়ার পর আমার অন্যরকম অনুভূতি হয়। আমি উদ্দীপিত হই।

আমার মায়ের খুব প্রিয় ছিল টনি গার্ডনার। আমার দেশে, কমিউনিস্টদের আমলে, এ রকম রেকর্ড করা কঠিন ব্যাপার ছিল। কিন্তু আমার মায়ের কাছে টনির সব কালেকশন ছিল। দুরন্ত কিশোরবেলায় আমি মায়ের এমন মূল্যবান কালেকশনের একটি নষ্ট করেছিলাম। ঘরটা সবদিকে বন্ধ ছিল। সারা ঘরে দৌড়াদৌড়ি করি। শীতের মাসগুলোতে বাইরে যাওয়া সম্ভব না। আমি সোফায় চেয়ারে লাফালাফি করছিলাম। এক পর্যায়ে ভুল করে রেকর্ড প্লেয়ারে আঘাত করি। রেকর্ডটা নষ্ট হয়। এটা সিডি বের হওয়ার অনেক আগের ঘটনা। মা রান্নাঘর থেকে এসে আমার উপর চিল্লান। আমার খুব খারাপ লাগল। এই কারণে না যে, মা চিল্লিয়েছেন। খারাপ লাগল, কারণ, আমি জানি ওটা টনি গার্ডনারের রেকর্ড, আর সেটা আমার আম্মার খুব প্রিয়। আর আমি এও জানি, এটিও টনির অন্যতম জনপ্রিয় ক্রুন রেকর্ড আমেরিকান গানের। পরে যখন আমি ওয়ারশো-তে কাজ করছিলাম, জানতে পারলাম, গোপনে টনির রেকর্ড বিক্রির খবর। আমি একে একে তিন বছরে মায়ের সব নষ্ট হওয়া রেকর্ড কিনে এনে মাকে দেই।

এখন বুঝলেন ত কেন আমি খুব উত্তেজিত হলাম টনি গার্ডনারকে মাত্র ছয় মিটার দূরে দেখার পর। প্রথমে আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না। গিটারের তার বদলে একটু দেরিও হয়ে গেল টনিকে দেখে চমকে যাওয়ায়। টনি গার্ডনার! মা জানতে পারলে কী বলতেন! মায়ের খাতিরে, আম্মার স্মৃতির খাতিরে তাকে গিয়ে আমার কিছু বলা উচিত ছিল। অন্য মিউজিশিয়ানেরা আমাকে বেলবয় মনে করলে করত।

কিন্তু আমি টেবিল চেয়ার ধুসধাস সরিয়ে তার কাছে দৌড়ে যাই নি। সংগীতের সেট শেষ হওয়া বাকি ছিল। আরও তিন সেট, চার পর্ব বাকি ছিল। প্রতি সেকেন্ডে আমার মনে হতো তিনি মনে হয় এখন উঠে বাইরের দিকে হাঁটা দিবেন। কিন্তু তিনি যান নি। ওয়েটারের রেখে যাওয়া কফি নাড়ছেন আর এমনভাবে দেখছিলেন যেন-বা ওয়েটার যা রেখে গেছে তা দেখে হতভম্ব তিনি। তাকে অন্য আমেরিকান টুরিস্টদের মতোই লাগছিল। হালকা নীল পলো শার্ট, ধূসর ঢিলা প্যান্ট পরেছেন। তার খুব কালো চকচকে চুল এখন সব প্রায় শাদা। আগে যখন প্রোগ্রাম করতেন তখন চুলগুলো জ্বলজ্বলে ছিল। তবে এখনও আগের মতো মাথাভরা আর যুবক বরের মতো দেখতে। যখন প্রথম দেখি, তখন কালো চশমাটি তার হাতে ছিল। আমি একটু সন্দেহে ছিলাম—ঠিক চিনলাম কিনা। কিন্তু যখন প্রোগ্রাম শুরু হলো, আমি তার দিকে নজর রাখতে থাকি। দেখলাম, চশমা চোখে দেন, একটু পরে আবার হাতে নেন, এমন করতে থাকেন বার বার, আর তাকে মনে হলো, কোনো ভাবনায় ব্যস্ত। আমি একটু হতাশ হলাম এই কারণে যে তিনি আসলে আমাদের মিউজিক শুনছেন না।

পরে আমাদের সংগীতানুষ্ঠান শেষ হলো। আমি তাড়াতাড়ি তাবুর বাইরে যাই কাউকে কিছু না বলে। যাই টনি গার্ডনারের টেবিলের কাছে। কিন্তু আমার মুখে কথা ফোটে না—কেমনে আলাপ শুরু করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকি। মনে হলো ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের ইশারায় আমার দিকে ফিরলেন। ফ্যানরা এসে ভিড় করে চারপাশে তার। পরে আমি পরিচয় দিলাম, ভালো করে বললাম আমি তার কতটা প্রশংসক। আর ব্যান্ড সেটে আমার পারফরম্যান্স কেমন লাগল তার। আমার মা যে তার অনেক আন্তরিক ফ্যান তাও বললাম। সব বলে ফেলি ভিড়ের মধ্যেই। তিনি আমার কথাগুলো এমন গুরুগম্ভীর মনোভাবে মাথা নেড়ে নেড়ে শুনলেন যেন তিনি আমার ডাক্তার। আমি কথা বলে যাচ্ছি আর তিনি ফাঁকে ফাঁকে বলছিলেন ‘তাই নাকি?’ কিছুক্ষণ পর আমি বুঝলাম আমার সরে যাওয়া দরকার, যখন তিনি বললেন : 

‘ত তুমি ঐ রকম কমিউনিস্ট দেশগুলার একটা থাইকা আইছ যেইখানে খুব টাইট অবস্থা ছিল।’

‘ওইসব আগে আছিল। আমরা এখন মুক্ত, গণতান্ত্রিক।’ আমি খুশিতে মাথা লাছাই।

বললেন—

‘তাইলে ঠিক আছে। এইই তোমার সাথীরা শোনাইল আমাদের এখন। বও বও। কফি আনাই তোমার লাইগা?’

আমি তাকে জানাই, আমি কারো উপর কোনো বোঝা চাপাতে চাই না। কিন্তু টনি গার্ডনারের একটা কথা আমাকে আটকাতে চাইছিল। কথাটি—

‘আরে না না বও বও, তুমি এখন কইলা তোমার মা আমার রেকর্ড পছন্দ করতেন, বও বও।’

তাই বসে আরও কিছুক্ষণ কথা বললাম। লুকিয়ে রেকর্ড কেনা, আমাদের এপার্টমেন্ট আর আমার মা সম্পর্কে আলাপ করলাম। অ্যালবামগুলোর নাম মনে নাই আমার। ওগুলোর উপরের ছবির কথা উল্লেখ করে বললাম। প্রত্যেকবার তিনি ইশারায় যোগ করেন—

”ওহ, অইটার নাম ‘ইনইমিটেবল…’ মানে ‘দ্য ইনইমিটেবল টনি গার্ডনার।’”

আলাপ বেশ মজা লাগছিল আমাদের। এক পর্যায়ে দেখলাম তার নজর অন্যদিকে গেল। দেখলাম একজন নারী আমাদের টেবিলের দিকে আসছেন, সেদিকে গার্ডনার দেখছেন।

উনি একজন আমেরিকান নারী। মাথাভরা চুল, পোশাকে গঠনে অভিজাত। এ ধরনের নারীরা কাছে না আসা পর্যন্ত টের পাওয়া যায় না তাদের বয়স হয়েছে। দূরে থাকলে আমি ভুল করে মনে করতে পারি ফ্যাশন মডেল ম্যাগাজিনের কেউ। যখন উনি এসে মি. গার্ডনারের পাশে বসে কালো চশমা কপালে তুললেন, আন্দাজ করা সম্ভব হলো বয়স হবে পঞ্চাশের কাছাকাছি বা বেশি।

গার্ডনার পরিচয় করিয়ে দিলেন—
‘ইনি আমার স্ত্রী লিন্ডি।’

মিসেস গার্ডনার আমার দিকে একটা ঝলমলে কৃত্রিম হাসি দিলেন। পরে বললেন তার স্বামীকে—

‘কে ইনি? তুমি দেখি একটা বন্ধু পেয়ে গেছ?’

‘হুম, সময় ভালো কাটছিল তার সাথে কথা বলতে বলতে… ও ইয়ে… দুঃখিত বন্ধু, আমি তোমার নাম জানি না।’

‘জান’ আমি ঝটপট বললাম। ‘কিন্তু বন্ধুরা আমাকে ‘জানেক’ ডাকে’।

লিন্ডি গার্ডনার বললেন, ‘মানে কি এই যে তোমার ডাকনাম বড় আর আসল নাম ছোট? এইটা কেমনে হয়?’

‘না না, তুমি মানুষের সাথে অভদ্র ব্যবহার কইরো না।’

‘আমি অভদ্র হইতেছি না।’

‘মানুষের নাম নিয়ে ঠাট্টা কইরো না।’

লিন্ডি আমার দিকে অসহায় মনোভাবে তাকিয়ে বললেন—
‘তুমি ত বুঝতেছ, উনি কী বলতেছেন? আমি কি তোমাকে অপমান করছি?’

‘না না ম্যাডাম, একটুও না।’

‘উনি সবসময় বলে আমি মানুষের সাথে খারাপ ব্যবহার করি। কিন্তু আমি অভদ্র না। এই এখন আমি কি তোমার লগে অভদ্র ব্যবহার করছি?’

আমাকে কথাটা বলেই গার্ডনারের দিকে—
‘আমি স্বাভাবিক কথা বলি মানুষের সাথে। এইটাই আমার অকৃত্রিম আচরণ। আমি কখনই অভদ্র না।’

‘আচ্ছা ঠিক আছে বিবিসাব, তিলকে তাল কইরো না, যাই হোক, এখানে একজন মানুষ, উনি পাবলিক না।’ গার্ডনার বললেন।

ওহ হো রে! সে পাবলিক না হলে সে কে হন? বহুদিন পর খুঁইজা পাওয়া ভাগিনা?’ লিন্ডি বললেন।

‘আহা সুন্দর করে কথা কও না! এই লোকটি আমার লাইনের—একজন যন্ত্রসংগীতশিল্পী, আমাদের সহযোগী, এই ত তাদের অনুষ্ঠান উপভোগ করতেছিলাম।’

কথা বলতে বলতে গার্ডনার আমাদের স্টেইজে উপর নজর রাখছিলেন।

‘ও আচ্ছা!’ লিন্ডি আমার দিকে ফিরলেন। ‘তুমি এইখানে বাজাইতেছিলা? ভালো, চমৎকার! তুমি একর্ডিয়ন বাজাও, ঠিক না? আসলেই চমৎকার!

‘ধন্যবাদ, আমি আসলে গিটার বাজাই।’

‘গিটারিস্ট? ঠাট্টা করতেছ? এখানে বসে একটু আগে আমি দেখলাম তুমি ঐ মটকু লোকটার পাশে একর্ডিয়ন বাজাইতেছ।’

‘না না, ঐ মটকু টাকলু ত কার্লো, একর্ডিয়নে ছিল।’

‘তুমি নিশ্চিত? মশকারি করতেছ না ত?’

‘এই, তোমারে কইলাম মাইনসের লগে খারাপ ব্যবহার না করতা।’

কথাটা গার্ডনার বললেন শক্ত করে রাগে কিন্তু অনুচ্চ স্বরে বলে তার বউকে। অদ্ভুত একটা নীরবতা নেমে এল আমাদের মাঝে। আবার গার্ডনারই নীরবতাকে দৌড়ালেন নম্রস্বরে এই কথা বলে :

‘আমি দুঃখিত! আমি তোমারে কষ্ট দিতে চাই নাই আসলে।’

গার্ডনার তার বউয়ের একটা হাত টেনে নিয়ে স্পর্শ করে থাকলেন। আমি মনে করছিলাম ঝাড়া দিয়ে লিন্ডি ফেলে দিবেন। ওমা! দেখি, লিন্ডি বরং চেয়ারটা এগিয়ে গার্ডনারের দিকে ঘেঁষেন আর স্পর্শ করে থাকা দুই হাতের উপর অন্য হাতটি রাখেন। কয়েক সেকেন্ডে এভাবে গেল। গার্ডনার ঝুঁকলেন। তার গর্দানের উপর দিয়ে লিন্ডি কোনোকিছু দেখছে না এমন মনোভাবে স্কয়ারের উপর দিয়ে বাসিলিকার উপর নজর রাখেন। শূন্যদৃষ্টি যাকে বলে আরকি। কোনো কিছু না দেখার মতো দেখতে থাকলেন। ঐ মুহূর্তটা এমন হয়ে গেল, আমি যে তাদের পাশে আছি তা কেবল তারা ভুলে যান নি, স্কয়ারের সব মানুষের উপস্থিতিও ভুলে গেছেন। তারপর লিন্ডি প্রায় ফিসফিস করে গার্ডনারকে বললেন :

‘ঠিক আছে, আমার ভুল হইছে, আমার কারণে তোমরা মলিন হইয়া গেছ।’

তারা একটু বেশি সময় হাত ধরে বসে থাকেন। তারপর লিন্ডি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। যেন দুঃখবোধ থেকে মুক্ত হয়েছেন। মি. গার্ডনারকে উঠতে বললেন আমার দিকে তাকিয়ে। তিনি আগেও আমার দিকে নজর রাখছিলেন কিন্তু এখন নজরটা অন্য রকম। এখন তার চোখের দিকে তাকিয়ে আমি মায়া অনুভব করতে পারলাম। এখন যদি আমার কোনো সহযোগিতা চান আমি করতে রাজি। এমনকি যদি বলতেন, স্কয়ারের ঐপাশ থেকে কিছু ফুল এনে দিতে, আমি আনতাম খুশি মনে।

লিন্ডি বললেন—
‘জানেক। এইটা তোমার নাম, ঠিক না? আমি দুঃখিত জানেক, টনি ঠিক বলছেন, আমি তোমার সাথে যেইভাবে কথা বলছি এইটা বিজনেস স্পিকিং হয় নাই।’

‘ম্যাডাম এইটা কোনো ব্যাপারই না, চিন্তা কইরেন না।’

‘আর তোমরা মিউজিশিয়ানদের আলাপে আমি ডিস্টার্ব করছি। আমি নিশ্চিত, ব্যাপারটা তুমি জান? আমি তোমাদের দুজনকে ছাইড়া যাইতেছি।’

গার্ডনার বললেন—
‘যাওয়ার দরকার নাই।’

‘না না, যাওয়া লাগবে। আমি প্রাদা স্টোরে যাওয়ার অপেক্ষায়। আইছিলাম তোমারে কইতে যে সেইখানে আমি একটু বেশি সময় থাকব, মানে যতটুকু সময়ের কথা আগে বলছিলাম, তার চেয়ে বেশি লাগবে।’

‘আচ্ছা ঠিক আছে।’ টনি গার্ডনার বললেন লম্বা শ্বাস নিয়ে সোজা হয়ে। বললেন, ‘যতক্ষণ থাকলে তোমার ভালো লাগে ততক্ষণ থাক।’

‘স্টোরে আমি চমৎকার সময় কাটাতে যাইতেছি। তোমরা তোমাদের আলাপ কর।’

আমার পিট চাপড়ে বললেন, ‘নিজের খেয়াল রাইখো জানেক।’

আমরা ওর চলে যাওয়া দেখছিলাম।

পরে ভেনিসে মিউজিশিয়ান হওয়া নিয়ে কিছু আলাপ করলেন গার্ডনার। কাদরি অর্কেস্ট্রা তখন প্রোগ্রাম করছিল। এদের প্রসঙ্গেও কথা বললেন গার্ডনার। দেখলাম উনি ঠিক আমার উত্তরের দিকেও মনোযোগী না। আমি চলে যেতে চাইলাম যখন উনি হঠাৎ বললেন :

‘আমি তোমারে কিছু কইতে চাই বন্ধু। তোমার মনে না ধরলে আমার কথা প্রত্যাখ্যান করতে পার।’ তিনি মাথা সামনের দিকে নুইয়ে এগিয়ে এলেন। বললেন, ‘কিছু কই তোমারে? প্রথম আমি আর লিন্ডি ভেনিসে আইছিলাম হানিমুনে। সাতাশ বছর আগে। অনেক মজার স্মৃতি আছে এই জায়গার। পরে এত বছর আর এক সাথে আসি নাই। এবার এ অঞ্চলের দিকে আসবার প্লান করার সময় আমরা সিদ্ধান্ত নিই, এ ভ্রমণও স্পেশাল হবে, কিছুদিন কাটাব ভেনিসে।’

‘ও আচ্ছা, তাইলে আপনাদের বিয়েবার্ষিকী উপলক্ষে আসা?’

‘বিয়েবার্ষিকী?’—চমকে গেলেন তিনি যেন।

‘দুঃখিত’, বললাম আমি।’ আপনি বিশেষ ট্রিপ বলায় আমি মনে করছি বিয়েবার্ষিকী।’

চমকিত ভাব কিছুক্ষণ থাকল তার চোখেমুখে। পরে হাসলেন, চওড়া ঠা ঠা হাসি। তখনই মনে পড়ল, টনির একটা গান, মায়ের পছন্দের, যে-গানের মাঝখানে তিনি কিছু কথা বলেন। গানের বিষয়টাও এই রকম যেন, এখন যেভাবে লিন্ডি চলে গেলেন তার প্রতি খেয়াল না করে একা ফেলে। এরই মাঝে তিনি অবজ্ঞাসূচক হাসিটা দিলেন। সারা স্কয়ারে যেন হাসিটা ছড়িয়ে আছে।

পরে বললেন—
‘না না, এইবার বিয়েবার্ষিকী উপলক্ষে আসা না। তবে বিশেষ কিছু হিশাবে এর থাইকা খুব আলাদা কিছু না। কারণ আমি খুব রোমান্টিক কিছু করতে চাই। আমি তাকে গান শোনাইতে চাই বরাবর ভেনিসীয় স্টাইলে। তুমি বাজাইলে গিটার। আমি গান ধরলাম। প্রোগ্রামটা হবে একটা গন্ডোলোতে। (গন্ডোলা এক ধরনের প্রমোদতরী, ভেনিসের খালে ব্যবহার করা হয়।) জানালা নিচ দিয়া যাইতে যাইতে আমি লিন্ডিতে গান শুনাইলাম, একটা পালাজ্জো (ইতালির এক প্রকার দালান আয়তকার।) ভাড়া নিলাম কাছেই এখান থেকে, এর বেডরুমের জানালা থাইকা খালে বাইয়া যাওয়া গন্ডোলা দেখা যায়, রাতে আন্ধার নামলে মজা লাগে বেশি, দেয়ালের বাতিগুলো চমৎকার, লিন্ডি বেডরুমের জানালায় আইলো, তুমি আমি  গন্ডোলাতে, সব ওর প্রিয় পর্ব, বেশি লম্বা সময় ধইরা না, তিন বা চারটা গাইলাম, এই আরকি, তুমি কী কও?’

‘মি. গার্ডনার, এইটা হইলে আমি খুব খুশি হইব। আমি ত কইছি, আপনি ত আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ সম্মানিত একজন শিল্পী। কোন সময় এই প্রোগ্রাম করবেন?’

বৃষ্টি না আইলে আইজ রাইতেই সাড়ে আটটার দিকে। আমরা রাইতে জলদি খাই। এর মধ্যেই ফিরতে পারব। আমি একটা বাহানা দেখাইয়া এপার্টমেন্ট থাইকা বাইরে আইসা তোমার সাথে দেখা করলাম। গন্ডোলা ভাড়া করে রাখলাম আগে থেকেই। খালে নৌকায় অন্য জাগা থাইকা আইলাম জানালার নিচে। খুব মজা হইবে না? তুমি কি কও?’


আপনে ক্লাসিক। আপনে সিনাট্রা বা ডিন মার্টিনের মতো। আপনাদের মতো যারা, তারা যুগের ফ্যাশনে চাপা পড়ে না। আপনারা ক্ষণস্থায়ী পপস্টার না।


আপনি মনে করতে পারেন, এটা একটা স্বপ্ন বাস্তবায়নের মতো। তাছাড়া এটা এমন এক মজার আইডিয়া। স্বামী স্ত্রী তারা, স্বামীর বয়স ষাটের আশপাশ, আর স্ত্রীর পঞ্চাশের কাছে। কিন্তু ভাবসাব যেন ষোল বা আটার বছর বয়সের প্রেমে পড়া। ব্যাপারটা আসলেই মজার। তবে এটা ঠিক যে, আমার মনে হচ্ছে, গার্ডনার যে মনোভাব দেখাচ্ছেন, অতটা সহজ-সরল না বিষয়টা।

পরে কিছু সময় আমি আর গার্ডনার ঐ প্রোগ্রাম নিয়ে বিস্তারিত আলাপ করলাম। কোন গানগুলো তিনি গাইতে চান, কোন কীঈ তার পছন্দ এসব নিয়ে। তখন আমার সময় হয়ে গেল আমাদের পরবর্তী পর্বের। আমি উঠে হাত মিলিয়ে যেতে যেতে বললাম এই সন্ধ্যায় তিনি পুরোপুরি আমার উপর ভরসা রাখতে পারেন।

রাস্তা অন্ধকার ও শান্ত তখন, যখন ঐ রাতে আমি যাচ্ছিলাম গার্ডনারের সাথে দেখা করতে। তাছাড়া, পিয়াজ্জা সান মারকো থেকে বেশি দূরে কোথাও গেলেই ঐ দিনগুলোতে দিশা হারিয়ে ফেলতাম আমি। যথেষ্ট সময় নিলাম ছোট ব্রিজের কাছে যেতে যেখানে গার্ডনার বলেছিলেন যাওয়ার জন্যে। কয়েক মিনিট দেরি হলো পৌঁছতে।

তিনি বাতির নিচে দাঁড়িয়েছিলেন। পরনে কালো উসখুস স্যুট, শার্টের বোতাম উপরের দিক থেকে পেট পর্যন্ত খোলা। ড্যাশিং ইয়াং-ভাব। বুকের লোম দেখা যাচ্ছে। দেরি হওয়ার জন্যে আমি ক্ষমা চাইলাম।

বললেন—
‘কয়েক মিনিট কিছু না। লিন্ডি আর আমার বিয়ার সাতাশ বছর হইল। কয়েক মিনিট কিছুই না রে বন্ধু।’

তিনি রেগে আছেন বলে মনে হলো না। মনোভাব গম্ভীর ঠান্ডা একদম রোমান্টিক না, বলা যায়।

23515812_1949071108442708_1554098085_nগন্ডোলা (নৌকা) তার পেছনেই পানিতে নড়ছে আস্তে। নৌকার মাঝি (গন্ডোলিয়ার) লোকটা ভিট্টোরিও ধরনের। এ ধরনের মানুষ আমার ভালো লাগে না আসলে। (ভিট্টোরিও খাঁটি ইতালীয় মানুষ। এদের মাঝে হামবড়া ভাব থাকে— নেতাগিরি ভাব থাকে। ভিক্টর নামটাকে তারা ভিট্টোরিও বলে। ভিট্টোরিও ম্যানুয়েল ইতালীকে সংযুক্ত দেশ হিশাবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।—অনুবাদক) আমার সাথে এমনিতে এই নামের মানুষের বন্ধুভাবও হয়েছে। কিন্তু আমি জানি এরা ফালতু কথা বলে—একেবারে বাজে বকবক করে। আমাদের মতো লোকদেরে বলে, ‘নতুন দেশের বিদেশি’। এই কারণে সেদিন গন্ডোলায় উঠবার সময় আমাদেরকে আপনজনের মতো সম্ভাষণ জানালে আমি নিস্পৃহভাবে মাথা ঝাঁকাই আর দেখতে থাকি গার্ডনারকে নৌকায় তুলতে সাহায্য করা। পরে আমার স্পেনিশ গিটার দেই গার্ডনারকে, গোল গর্তের ঐটা আমার কাছে রাখি।

মি. গার্ডনার জুইত হয়ে বসতে বার বার নড়াচড়া করছিলেন। এক পর্যায়ে জুইত হয়ে বসতে গিয়ে এমন নাড়া দিলেন, সব ডুবে যাওয়ার অবস্থা হয়েছিল, কিন্তু উনি টের পান নাই, অন্যকিছুতে মনোযোগ ডুবেছিলেন, তাকিয়ে আছেন পানির দিকে।

নৌকা চলছে। দালানের পর দালান অতিক্রম হচ্ছে। কয়েক মিনিট ধরে নীরব থেকে, মগ্ন গার্ডনার গভীর চিন্তার ভিতর থেকে বের হয়ে এসে বললেন :

‘শোন বন্ধু, আমরা কী কী গাইব সেইটা ত আগে সেট করছিলাম, কিন্তু আমি ভাবতেছিলাম, লিণ্ডি এই গানটা পছন্দ করে, এইটা— ‘বাই দ্য টাইম আই গেট টু ফোনিক্স’। অনেক আগে একবারই এটা রেকর্ড করছিলাম।’

‘নিশ্চয়ই মি. গার্ডনার, আমার মা বলতেন, সিনাট্রা-র চাইতে আপনার ভার্শন অনেক ভালো, অথবা গ্লেন ক্যাম্পবেলের বিখ্যাত কণ্ঠে।’

মি. গার্ডনার মাথা ঝাঁকালেন। তারপর কিছুক্ষণ তার মুখ দেখতে পেলাম না আমি অন্ধকার আসায়। খালের মোড়ে এসে ভিট্টোরিও তার মাঝিগিরি হাঁক ছাড়ে, সে-হাঁক দুপাশের দালানের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়।

গার্ডনার বললেন, ‘এইটা আমি আমার বউরে অনেক শুনাইছি। আজ রাতে এইটা তার শুনতে ভালো লাগবে। টিউন ত তোমার জানা।’

আমার গিটার বাক্সের বাইরেই ছিল। গানটির কয়েক চরণ সুর তুললাম।

গার্ডনার বললেন, ‘ঠিক আছে, উপরে তোল আরো, ই-ফ্লাট পর্যন্ত যাও, আমি এইভাবেই  অ্যালবামে তুলছিলাম।’

আমি ঐ স্বরসঙ্গতিতেই সুর বাঁধলাম। এক মর্তবা পুরা গানের সুর তোলা শেষ করার পর মি. গার্ডনার গান ধরলেন। খুব আস্তে, শ্বাসের ভিতর থেকে, যেন গানের কথা আধা-ছাধা তার মনে আছে। কিন্তু প্রশান্ত খাল-জলে তার আওয়াজ ভালো অনুরণন হচ্ছিল। চমৎকার লাগছিল আমার। মুহূর্তেই আমি বাল্যকালে চলে গেলাম। কার্পেটে শুয়ে আছি, মা ক্লান্ত পরিশ্রান্ত, হয়তো মনভাঙা কোনো কারণে, রুমের কোনায় ঘুরছে গার্ডনারের গ্রামোফোন রেকর্ড।

মি. গার্ডনার হঠাৎ থামলেন। বললেন, ‘আমরা ই-ফ্লাটে ফনিক্স করব, পরে হয়তো ‘আই ফল ইন লাভ টুউ ইজিলি’ আমাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বুঝছ? আর শেষ করব ‘ওয়ান ফর মাই বেইবি’। এইই যথেষ্ট। সে এর চে বেশি শুনব না।’

এরপর আবার গার্ডনার গভীর চিন্তায় ডুব দিল। আমরা অন্ধকারের ভিতর দিয়ে বয়ে যাচ্ছিলাম ভিট্টোরিওর বৈঠা দিয়ে ধীরে জলের ছপাৎ ছপাৎ শব্দের দিকে।

শেষে আমি মুখ খুলি। কথা বলি গার্ডনারের সাথে। ‘মি. গার্ডনার, একটা কথা জিগাই, মনে কিছু নিয়েন না। মিসেস গার্ডনার কি এইরকম কিছু শুনতে চান? না এইটা একটা সারপ্রাইজ দেওন?’

তিনি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। বললেন, ‘এইটাকে অদ্ভুত চমক ক্যাটাগরিতে রাখা দরকার। আল্লাহ জানে কিরম প্রতিক্রিয়া হয় ওর। আমরা ত সারা পথ ‘ওয়ান ফর মাই বেইবি’ গাইতাম না।’

ভিট্টোরিও আরেকটা কোনা অতিক্রম করল। হঠাৎ দেখি—হাসি আর মিউজিকের আওয়াজ, চকমকে আলোকিত রেস্টুরেন্ট, গন্ডোলা আমাদেরকে দ্রুত নিয়ে যাচ্ছিল তখন। টেবিল একটাও খালি না। ওয়েটারেরা দৌড়ের উপর। ডিনার খেতে আসা সবাই উৎফুল্ল খুব, যদিও বছরের এ সময়ে খালে এখানে খুব যুৎসই প্রাণবন্ত অনুষ্ঠান হওয়ার কথা না। অন্ধকার ও শান্ত কিছু পথ পার হয়ে এসে আমরা এই পার্টি-বোট-রেস্টুরেন্টের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। রেস্টুরেন্টটা কিছুটা অগোছাল। মনে হলো, আমরা জাহাজঘাটায় দাঁড়িয়ে দেখছি তাদের যখন ঐ ঝকমকে পার্টি-বোট আমরা অতিক্রম করছিলাম। ওটা থেকে কিছু লোক আমাদেরকে দেখে কিন্তু কেউ মনোযোগ দেয় নাই। পরে ওটাকে পিছে ফেলে আমরা এগিয়ে যাই।

আমি বললাম—
‘মজার ব্যাপার হলো, আপনি চিন্তা করতে পারেন কি যে, এই টুরিস্টরা যদি জানতে পারত তাদের পাশ দিয়ে একটা নৌকায় একজন বিখ্যাত গায়ক টনি গার্ডনার যাচ্ছেন, তাইলে তারা কী করত?’

ভিট্টোরিও বেশি ইংরেজি বুঝে না। মোটামুটি বুঝেছে আমি যা বলেছি তাই একটু হাসল। মি. গার্ডনার চুপ। আমরা আবার অন্ধকারে পড়ি। খালটা এখন ছোট। পাশের দালানগুলোর দরজা দিয়ে আবছা আলো আসছে সেখানে, এ জায়গা অতিক্রম করার সময় মি. গার্ডনার বললেন—

‘বন্ধু তুমি ত আইছো একটা কমিউনিস্ট দেশ থাইকা। সেই কারণে এইখানের অনেক ব্যাপারস্যাপার তোমার বুঝে আসতেছে না।’

আমি জবাব দিলাম—
‘আমার দেশ ত এখন আর কমিউনিস্ট না। আমরা মুক্ত এখন।’

‘আমি দুঃখিত, আমি তোমার জাতিরে যা তা ভাবতেছি না। তোমরা সাহসী মানুষ। আমি মনে করি তোমরা শান্তি ও সমৃদ্ধি পাইছ। আমি আসলে বলতে চাইছি, বিষয়টা খুব স্বাভাবিক, তুমি একটা সংস্কৃতির ভিতর থাইকা আইছো, এইখানে অন্য চাল-চলন, অনেক ব্যাপার তোমার বুঝে আসবে না, ঠিক যেমন তোমার দেশে গেলে আমিও অনেক কিছু বুঝতাম না। আমি এই কথাটাই বলছি, বন্ধু।’ গার্ডনার বললেন।

‘সেইটা বোধ হয় ঠিক আছে।’ আমি জানাই।

যে লোকগুলারে আমরা পাস কইরা আইলাম এখন, এদের কাউরে এখন তুমি গিয়া যদি জিগাও টনি গার্ডনারকে তাদের কারো মনে আছে কিনা। হয়তো কেউ কেউ, হয়তো বেশিরভাগ, হয়তো সবাই বলবে চিনে। আমরা যেইভাবে তাদের পাশ দিয়া আইলাম, এমনকি তারা আমারে চিনলেও, তারা কি খুব আগ্রহী হইয়া উঠব? আমার মনে হয় না। তারা তাদের অনুষ্ঠানের সব ছেড়ে, খাবার ছেড়ে কেন আগ্রহ দেখাইব? আমি ত সেই বিগত যুগের একজন সংগীতশিল্পী।’

‘আমি আপনের এই কথায় বিশ্বাস করি না। আপনে ক্লাসিক। আপনে সিনাট্রা বা ডিন মার্টিনের মতো। আপনাদের মতো যারা, তারা যুগের ফ্যাশনে চাপা পড়ে না। আপনারা ক্ষণস্থায়ী পপস্টার না।’ আমি বললাম।

‘তুমি বেশ দরদি হইয়া কথা কইতেছ বন্ধু, তুমি সুন্দর কইরা বলতে পারো, কিন্তু আজকের রাতটা অন্য রাতের মতো না, আজকে তুমি মশকারি কইরো না।’

আমি তার কথার প্রতিবাদ করতে চাইছিলাম কিন্তু তার মনের অবস্থা দেখে বিষয়টা নিয়ে কথা বলা বাদ দেই। গন্ডোলা চলতে থাকে, আমরা বয়ে চলি, কেউ কোনো কথা বলি না। সত্য হলো, আমি অবাক হচ্ছি, এই মনোহর আয়োজনের মানে কী! তারা দুজন ত আমেরিকার মানুষ। মি. গার্ডনার গান শুরু করলে জানালায় এসে বন্দুক নিয়ে আমাদেরকে গুলি করবে কি!

হয়তো ভিট্টোরিও এমনই ভাবছে। কারণ দেয়ালের লন্ঠনের আলো অতিক্রম করার সময় সে এমনভাবে তাকাত, যেন বলছে : অদ্ভুত একটা কিছু কি পাইলাম এখানে আমরা, আমিকো? আমি চুপ থাকি। মি. গার্ডনারের বিপক্ষে যায় এমন কিছুতে আমি সায় দেই না। ভিট্টোরিও মনে করে আমার মতো লোকেরা এখানে এসে ডাকু সন্ত্রাসীদের আচরণ করে সব বরবাদ করে যায়। তার মুড খারাপ হলে আমাদেরকে ডাকাত ধর্ষক বলতে পারে। একবার তাকে আমি জিগ্যেস করি এসব কথা যা সে বকবক করে ছড়ায়, তা সত্য কিনা। সে জানায়, ওসব মিথ্যা বাণ্ডিল মারা কেবল। কিন্তু সে কেমনে বর্ণবাদী হবে? তার ত এক ইহুদি ফুফু আছে, যাকে সে মায়ের মতো ভালোবাসে। তবে এক বিকেলে আমাদের সেটের বিরতির সময়, দরশোদুরো ব্রিজে দাঁড়িয়ে সময় কাটাচ্ছিলাম, নিচ দিয়ে তিন জন টুরিস্ট নিয়ে একটি গন্ডোলা যাচ্ছিল। সেখানে ভিট্টোরিওর বজ্জাতি দেখেছি আমি।

‘আচ্ছা, তোমাকে একটু গোপন ব্যাপার বলি।’ গার্ডনার বললেন। বললেন, ‘একটা সিক্রেট বলি পারফরম্যান্সের বিষয়ে। বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠান করা নিয়া। কিছু জিনিস তোমার বুইঝা নেওন লাগব। মনে করো তুমি মিলঔকি-তে প্রোগ্রাম করতেছ। তুমি নিজেরে জিগাও—অন্য জায়গার অডিয়েন্স আর এইখানের অডিয়েন্সের মইধ্যে পার্থক্য কী? মেডিসন-র অডিয়েন্স আর এইটার বেশকম কী? মিলঔকিতে ভালো শুয়োরের চপ খায় তারা, এইটা তুমি জাইনা গেলা, ব্যস, এইটা মাথায় রাখবা, যাদের সামনে তুমি গান গাইতেছ তারা ঐটা খায়, এই শুয়োরের চপ সম্পর্কে মন্দ কিছু তুমি কইবা না। মানে, এইভাবে তুমি তোমার অডিয়েন্সের রুচি সম্পর্কে জাইনা নিবা।’

‘সুন্দর, ধন্যবাদ মি. গার্ডনার, আমি কোনো সময় এই রকম ভাবি নাই। আপনের মতো বিখ্যাত একজনের কাছ থাইকা এই পয়েন্ট পাইলাম, জীবনেও ভুলতাম না।’

‘ত আইজ রাতে’ তিনি বলতে থাকলেন, ‘আমরা শুনাইব লিন্ডিরে, লিন্ডি হইল অডিয়েন্স, তোমারে লিন্ডি সম্পর্কে কিছু কই? শুনবা?’

‘অবশ্যই, তাইনের সম্পর্কে শুনতে বেশি আগ্রহী আছি।’

পরে প্রায় বিশ মিনিট হবে, আমরা গন্ডোলায় বসে মোড়ের পর মোড় পার হয়ে যাই। গার্ডনারের কাছ থেকে শুনতে থাকি। কখনও তার কথা অনুচ্চস্বরে, যেনবা নিজের সাথে কথা বলছিলেন। কখনও পাশের জানালা দিয়ে আলো পড়লে আমাদের উপর, তিনি আওয়াজ বাড়ান, যেনবা আমাকে মনে পড়ল, তখন এও বলেন, ‘তুমি বুঝছো আমি কি বলতেছি, বন্ধু?’

তিনি বললেন, মধ্য আমেরিকার মিনেসোটার এক ছোট শহর থেকে এসেছেন লিন্ডি। সেখানে স্কুলটিচারদের কড়া শাসনে ছিল। কারণ স্কুলের পড়া না পড়ে ম্যাগাজিনে কেবল মুভিস্টারদের দেখত।

‘দেখো, লিন্ডির মাথায় জীবনে অনেক দূর যাওয়ার প্লান ছিল। ঐ টিচারেরা সেইটা ধরতে পারে নাই। এখন ওরা ঐখানেই টিচারি করতেছে, আর লিন্ডি দেখো, সারা দুনিয়ায় ঘুইরা বেড়ায়, ধনী সুন্দরী। ওরা কেমন জীবন পাইল? তারা যদি মুভি ম্যাগাজিন দেখত, তাদের মইধ্যে স্বপ্ন তৈরি হইত, তারা লিন্ডির মতো না হইলেও কাছাকাছি কিছু ত হইত।’

উনিশ বছর বয়সে লিন্ডিকে বিনা ভাড়ায় গাড়িঅলা ক্যালিফোর্নিয়া নিয়ে যায়। চেয়েছিল হলিউডে যাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার জীবন আটকায় লস এঞ্জেলসে। সেখানে একটি ছোট রেস্টুরেন্টে ওয়েট্রেসের কাজ করে।

‘অবাক ব্যাপার হইল দেখো,’ গার্ডনার বললেন, ‘হাইওয়ের পাশের এই ছোট রেস্টুরেন্ট তারে উঠাইয়া দিল। কারণ ঐখানে সব উচ্চাকাঙ্ক্ষী মেয়েরা আইতো সকাল সন্ধ্যা। তারা সাত আট বা বার জন আইতো, কফি হটডগ খাইত, ঘণ্টার পর ঘণ্টা বইসা গপ করত। মেয়েগুলা সব লিন্ডির চাইতে একটু বড় বয়সে। তারা প্রায় আমেরিকার সব সাইড থাইকা আসছে। আর দুই তিন বছর ধইরা লসএঞ্জেলসে থাকে। তারা ঐখানে আইসা তাদের পোড়াকপালের গপ করত, কার কী উন্নতি হইছে সেই খবরও নিত, নানা কৌশল নিয়াও পরামর্শ করত। কিন্তু ঐখানে আসবার আসল আকর্ষণ মেগ নামের চল্লিশোর্ধ এক নারী, যার সাথে লিন্ডি কাজ করতেছে।

মেয়েগুলা মেগকে তাদের দিশাদেনেওয়ালি বড় বইন মনে করে। কারণ এক সময় এই মেয়েদের মতোই ছিল মেগ। তুমি খেয়াল করো জানেক, মেয়েগুলা সিরিয়াস, উপরে উঠবার জিদ আছে ভিতরে। তারা কি অন্য মেয়েদের মতন ড্রেস জুতা মেকাপ নিয়া বকবক করত? নিশ্চয় করত। কিন্তু যে-ড্রেস জুতা মেকাপ পিনলে একজন তারকা টাইপের লোকেরে বিয়া করা যাইব সেইটা নিয়া গপ করত। তারা মিউজিক নিয়া, মুভি নিয়াও কথা বলত ঐ বিষয়ে যে, কোনো সিঙ্গার বা মুভি স্টার বিয়া করে নাই, কিংবা কে বিয়া কইরাও সুখী না, অথবা কে কারে তালাক দিবার পথে, এইসব খবর তাদেরকে বেশি দিত মেগ। মেগ ত অনেক দিন থাইকা ঐখানে, সব প্যাঁচ, ভিতরের খবর, কারে বিয়া করার এখনই সময়, সব বলত। লিন্ডি এসবের ভিতরে থাইকা সবকিছু মাথায় নিছে। ঐ ছোট হটডগ রেস্টুরেন্টটা হইল ওর হার্ভার্ড বা ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়, বুঝলা? এখন এইটা ভাইবা শিহরিত হই যে উনিশ বছরের মিনেসোটার মেয়েটির কি অবস্থা হইতে পারত, যদি কোনো দিশা না পাইত! কিন্তু ওর ভাগ্য ভালো’

আমি বললাম, ‘মি. গার্ডনার, মাফ কইরা দিয়েন, আপনের কথা কাইটা কই, মেগ যদি সবকিছু জানতই, তাইলে সে কেন কোনো স্টার বিয়া না কইরা ঐ রেস্টুরেন্টেই রইয়া গেল?’

‘ভালো প্রশ্ন, একটু দম লও, তাড়াহুড়া কইরো না, দেখ, কেমনে কী হয়। মেগ ঐরকম করে নাই। যে করছে তারে সে পর্যবেক্ষণ করতেছিল, বুঝলা বন্ধু? সে আছিল ঐ মেয়েগুলার মতো, দেখল, কিছু মেয়ে সফল হইছে, বাকিরা হয় নাই। সে দেখছে ভুল-ভ্রান্তি, সে দেখছে সাফল্যের সোনালি সিঁড়ি। সে ঐসব দুইদিকের কথা মেয়েদেরকে বলত, ওরা শুনত, ওরা শিখত। লিন্ডি তাদের মইধ্যে একজন, যে-কিনা তার দরকার মতো বুইঝা নিয়া একটা ছেলেরে কবুল করছিল। ছয় বছর পর তালাকের বছর বুঝতে পারে এই ছেলের সাথে আর থাকার দরকার নাই। ছয় বছর ধইরা ঐ ছেলের সাথে থাইকা লিন্ডি তার নিজের জীবনের উচ্চাকাঙ্ক্ষার টার্গেটের দিকে অনড় থাকে। ক্লান্ত হয় নাই, হতাশ হয় নাই, নিজের সৌন্দর্যও মলিন হইতে দেয় নাই। আগাইছে পিছাইছে আবার আগাইছে। অনেক মেয়ে আছে দেখবা, দেখে বুঝে, কাউকে বিয়া করে না, একা থাকে। কারণ ধাক্কা খাইয়া জীবনের কঠিন মোড়ে থাইমা যায়, উচ্চাশা ত্যাগ করে, শক্ত হয় না, ফাইট করে না, সাহস করে না। লিন্ডি হইল এইরকম যে, আঘাত থাইকা, বাধা-বিপত্তি থাইকা শক্তি জমা কইরা নিজের মইধ্যে, তার পথে অবিচল থাকছে। অনেক মেয়েরা তার নিজের সৌন্দর্যের ভুল ব্যবহার কইরা শরীর বেচে, পতিতা হয়। লিন্ডি সেইরকম হয় নাই। নিজেরে গোছাইছে একটা জায়গায় থাইকা, তারপর ছয় বছরের মাথায় বিয়া ভাইঙা দিছে।’

‘তারপর আপনের লগে দেখা হইল, মি. গার্ডনার?’

‘আমি? না না। সে বিয়া করে ডিনো হার্টম্যানকে। ডিনোকে চিনো?”

একটা টিটকারি হাসি দিলেন। বললেন—
‘বেচারা ডিনো। আমার ধারণা কমিউনিস্ট দেশগুলোতে ডিনোর রেকর্ড যায় নাই। তবে ঐ সময় তার কিছু নাম ছিল। ভেগাসে অনেক গাইছে। কিছু গোল্ড রেকর্ড পাইছে। আমার সাথে যখন দেখা হইছিল লিন্ডির, তখন সে ডিনোর বউ। লিন্ডি ডিনোকেও ছাড়ল। এই ব্যাপার কেমনে ঘটে বুড়ি মেগ সব জানে। লিন্ডিরে দেইখা আমি তার মইধ্যে ডুইবা আছি কিন্তু ডিনো পাক্কা ভদ্রলোক, তাই আমি নীরবেই ডুবতে থাকি, কিছু বলি না লিন্ডিরে, আমিও ভদ্রলোক থাইকা যাই। আমার এই ভালোমানুষী থাকাটাই লিন্ডির মনে দাগ কাটতে থাকে। সে আমার প্রতি বেশি আগ্রহী হইতে থাকে। এরিমইধ্যে ডিনোর জনপ্রিয়তায় ধস নামে। মানুষ বিটলস শুনতে থাকে, রোলিং স্টোন শুনতে থাকে। ঐ সময়টাতেই আমার ধারণা, জানেক, তোমার মা আমার গান শুনতেন বেশি। ডিনো আর লিন্ডির ছাড়াছাড়ি হইয়া গেল। আমি ওরে বিয়া করলাম। এতে ডিনোও নারাজ হয় নাই। কেউ আমাদের দোষাদোষী করে নাই।

‘ভেগাসে আমাদের বিয়া হইল ঐ হোটেলে যেইটাতে বাথটাবভরা শ্যাম্পেইন থাকে। আইজ রাইতে আমি ‘আই ফল ইন লাভ টুউ ইজিলি’ এইটা কেন শুনাইতে চাইতেছি তুমি বুঝছ? বলব? বিয়ার পরে, বেশি পরে না, আমরা লন্ডনে গেছলাম একবার। ত, নাস্তার পরে সকালে আমরা রুমে ফিরছি। ক্লিনার আমাদের স্যুট পরিষ্কার করতেছিল। এদিকে আমরা দুজনের শরীর তৃষ্ণার্ত। আমরা ভিতরে ঢুকলাম। পার্টিশনের ঐপাশে ক্লিনার লাউঞ্জ পরিষ্কার করতেছে। বেডরুম পরিষ্কার কইরা গেছে ক্লিনার। আমরা বেডরুমে গিয়া দরজা বন্ধ কইরা দিলাম। ক্লিনার এখানে আবার আইব কিনা নিশ্চিত জানি না। কিন্তু আমাদেরকে আটকায় কে! আমরা বিছানায় যাইয়া কাম শুরু করি। ক্লিনার জানে না আমরা ভিতরে। পরে পুরা ব্যাপারটা পাগলামি মনে হয় আমাদের কাছে আর আমরা হাসতে থাকি। ক্লিনার মেয়েটা ভ্যাকুয়াম ক্লিনিং শেষ কইরা গান গায়। আমরা বেডরুমে নীরবে হাসি আর হাসি। একটু পরে মেয়েটা গান বন্ধ কইরা রেডিও চালু করে। আরে! রেডিওতে আমরা শুনি চেট বেকার গাইতেছেন—’আই ফল ইন লাভ টুউ ইজিলি’। মধুর সুর। শোনার পরে আমরা পাশাপাশি শুয়ে আছি, আমার হাতে ওর মাথা, আমি গানটা গাইলাম, লিন্ডি আবেগে আপ্লুত হইয়া আমারে জড়াইয়া ধরল। এই গানটা আইজ রাইত গাইব। ওর মনে পড়বে কি সেই স্মৃতি? কে জানে!’

মি. গার্ডনার কথা বলা থামালেন। আমি দেখলাম তিনি অশ্রু মুছলেন। ভিট্টোরিও আমাদেরকে আরেকটা মোড় পার করল। আমার মনে হলো, ঐ পার্টিবোটরেস্টুরেন্ট আবার অতিক্রম করছি। এবার আগের চেয়ে অনেক প্রাণবন্ত। পিয়ানো যে বাজাচ্ছে কোনায় বসে তাকে আমি চিনি। তার নাম আঁদ্রিয়া।

যখন আমাদের গন্ডোলা আবার অন্ধকারে পড়ল, আমি গার্ডনারকে বললাম—
‘মি. গার্ডনার, আমি জানি এই বিষয়টা নিয়া কথা বলা আমার দরকারে পড়ে না, তবুও, মনে হইতেছে, আপনার আর মিসেসের মইধ্যে কোনো ঝামেলা আছে, মানে, বিয়ার অনেক পরে থাইকাই হয়তো সম্পর্ক তিতা হইয়া যাইতে লাগছে। মানে, আমি আপনারে এইটা বলতে চাইতেছি যে, এই ধরনের ব্যাপার আমি বুঝি। আমার মা মাঝে মাঝে দেখছি দুঃখিত থাকতেন। কাউকে পাইবেন জীবনসঙ্গী হিশাবে এমন চিন্তাও করতেন। কখনও আমারে কইতেন এই লোকটা তর নতুন বাবা হইব। প্রথম কয়েকবার আমি মায়ের কথা বিশ্বাস করছি। পরে বুঝছি, মায়ের এইসব কথা বাস্তব হইব না। কিন্তু তাইনে অবিরাম বিশ্বাস রাখতেন কেউ আইব তাইনের জীবনে। তাইনে অনুভব করতেন, হয়তো আজকের আপনের অনুভূতির মতো। কি করতেন মা, জানেন? লম্বা শীতের মৌসুমে বসে বসে আপনের গান শুনতেন আর সাথে সাথে গাইতেন। কখনো আপনের চড়া স্বরের পর্বগুলো আমাদের উপরতলার প্রতিবেশীদের বিরক্ত করত, তারা আওয়াজ দিত। মা ত শুনছেন না প্রতিবেশীদের কথা। তাইনে পুরা গানে ডুইবা মাথা ঝাকান। মায়ের দুঃসময়ে আপনের গান অনেক সাহায্য করছে। নিশ্চয় মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষকে সাহায্য করছে আপনার গান। আজকের রাইতে আমি আপনারে খুব আন্তরিকভাবে সাহয্য করব, আমি বুঝতেছি আপনের মনের অবস্থা। হয়তো ভালো একটা রেজাল্ট আইসা যাইতে পারে। প্রত্যেক জামাই বউ কঠিন সময়ের ভিতর দিয়া যায়।’ মি. গার্ডনার হাসলেন।

‘তুমি বেশ চমৎকার মানুষ। আমি কদর করি তোমার আইজ রাইতের সহযোগিতা, আমারে। কিন্তু আমাদের হাতে আলাপ করার সময় আর বেশি নাই। লিন্ডি ওর রুমে, দেখতেছি লাইট জ্বলতেছে রুমে।’

আমরা একটা আয়তাকার দালানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। দুইবার কমপক্ষে এটা পার হয়েছি। এখন আমি বুঝতে পারছি, কেন ভিট্টোরিও আমাদেরকে নিয়ে চক্কর দিচ্ছে একই খালে। মি. গার্ডনারের চোখ একটা দালানের জানালার দিকে, খোলা আছে কিনা দেখতে থাকেন। কয়েকবার দেখেছেন জানালা যে-রুমের সেটি অন্ধকার। আবার চক্কর দিয়ে ঘুরে আসি আমরা। এবার তিনতলা দালানের ঐ জানালাটির ভিতর আলো দেখা যাচ্ছে। আমরা এর নিচেই। জানালার ভিতর দিয়ে আবছা ঘরের ছাদ দেখা যাচ্ছে। গার্ডনার ভিট্টোরিওকে ইশারা দিলেন নৌকা কিনার লাগাতে। গন্ডোলা একেবারে জানালার নিচে।

গার্ডনার দাঁড়ালেন। নৌকা ঝাড়া খেল। ভিট্টোরিও বৈটা দিয়ে সামলে নিল। গার্ডনার দুইবার ডাকলেন— ‘লিন্ডি’ ‘লিন্ডি’। জবাব না পেয়ে আওয়াজ বড় করলেন।

জানালার শাটার সরাল একটি হাত। বেলকনিতে বেরিয়ে এলেন লিন্ডি। দেখা যাচ্ছিল ছায়ামানবীর মতো। আমি তার চুলের স্টাইল দেখে চিনি, কারণ পিয়াজ্জাতে প্রথম দেখি যেদিন, ঐদিনই তার চুলের স্টাইল দেখেছিলাম।

বেলকনির রেল ধরে নিচের দিকে ঝুঁকে লিন্ডি বললেন ‘ওওও তুমি সুইটি! আমি দুশ্চিন্তায় আছিলাম তোমারে কেউ কিডন্যাপ করল কিনা।’

‘বোকা-বোকা কথা কইও না হানি। এইরকম একটা শহরে কি আর হইতে পারে? যাই হোক, আমি ত তোমারে একটা কাগজে নোট দিয়া আইছলাম।’

‘আমি ত কোনো নোট-ফোট দেখি নাই সুইটি।’

‘আমি নোট দিয়া আইলাম যাতে তুমি টেনশন না করো।’

‘কই নোট? কী লেখছিলা?’

মনে নাই হানি, কি লেখছিলাম?’ গার্ডনার একটু বিরক্ত হলো দেখলাম। ‘ঐটা ত ঐরকমই, ঐযে আমি বাইরে যাইতে যেমন লেইখা যাই—সিগারেট বা অন্য কিছু আনতে গেলে।

‘ত তুমি এখন নিচে সিগারেট কিনতেছ?’

‘না জান, এখন অন্যরকম কিছু করতেছি, তোমারে গান শুনাইব হানি।’

‘এইটা কি নতুন স্টাইলের ঠাট্টা?’

‘না হানি, এইটা ভেনিস, এইখানে মানুষ এইরকম আলাদা কিছু করতে আসে।’  

এই কথা বলে গার্ডনার তাকালেন আমার ও ভিট্টোরিওর দিকে, যেন আমাদের উপস্থিতি আলাদা কিছু করার প্রমাণ।

‘এই রকম কিছু করা ত খুব জোশের কিছু মনে হইতেছে না আমার কাছে, সুইটি।’ 

মি. গার্ডনার একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।

‘তাইলে তুমি রুমের ভিতরে গিয়া আরাম কইরা বসো, হানি। নিজেরে স্বাভাবিক কইরা লও, জানালাগুলা খুইলা রাখ, শুরু করতেছি গান, আমরার শুনতে মজা লাগবে।’

মিসেস গার্ডনার নিচের দিকে দেখলেন একটু, নিচ থেকে দেখলেন গার্ডনার  উপরের দিকে। দেখা বিনিময়, কেউ কোনো কথা বলেন নি। রুমের ভিতরে গেলেন লিন্ডি। হতাশ হলেন গার্ডনার, এমন করতে পারেন লিন্ডি, এইই আগে আলাপে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মাথা নিচু করলেন তিনি। আমি টের পেলাম তিনি দ্বিধায় আছেন—গান করবেন কিনা। তাই বললাম :

‘চলেন মি. গার্ডনার, আমরা শুরু করি, শুরু করি— ‘বাই দ্য টাইম আই গেট টু ফনিক্স’ এইটা।’

আমি শুরু করলাম ধীরে, কোনো বিটে উঠি নি, এমন যে, একটা গানে যেতে পারে এই বাজনা অথবা এমনি এমনি ধীরে ধীরে থেমে যেতে পারে। আমি চেষ্টা করলাম, আমেরিকার লম্বা হাইওয়ের পাশে বসে বাজাচ্ছি চড়া ধ্বননে, মাকে যেন মনে পড়ছিল, যেমন আমি ঘরে এসে দেখছিলাম মা রেকর্ড শুনছেন  সোফায় বসে, রেকর্ড স্লিভে আমেরিকার হাইওয়ের ছবি কিংবা শিল্পী বসে আছেন একটি আমেরিকান গাড়িতে। মানে, আমি বলতে চাচ্ছি, আমি বাজাচ্ছিলাম এমনভাবে, মা মনে করতেন রেকর্ড স্লিভের ছবি থেকেই গানটি আসছে।


২৭ বছর অনেক লম্বা সময় জানেক, ভেনিসে এই শেষবার এক সাথে আইছি। এইখান থাইকা ফিরা গিয়া আমরা আলাদা হইয়া যাইমু।


এখনো স্থির কোনো সুরধ্বনিতে পৌঁছি নি আমি, দেখি, গার্ডনার গান ধরে ফেলছেন। গন্ডোলায় এমনভাবে দাঁড়িয়ে গান ধরেছেন, আমি ভয় পাচ্ছিলাম, যেকোনো মুহূর্তে ব্যালেন্স হারিয়ে ফেলতে পারেন। কিন্তু শান্ত সুন্দর দরাজ আওয়াজে গাইছেন, যেন আওয়াজ আসছিল কোনো অদৃশ্য মাইক থেকে। একেবারে বেস্ট আমেরিকান সিঙ্গারের মতন— ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত, দ্বিধান্বিত, যেন মন খুলে গাইতে পারবেন না এইভাবে, এইভাবেই বড় মাপের শিল্পীরা গেয়ে থাকেন, এইভাবে তিনি গাচ্ছিলেন।

গানটা গাইলাম আমরা, চলতে চলতে বিদায় নেয়ার গান। একজন আমেরিকান পুরুষ তার স্ত্রীকে ছেড়ে যাচ্ছে। সে তার স্ত্রীকে ভাবছিল যখন শহরের পর শহর অতিক্রম করে যাচ্ছিল। পঙ্‌ক্তির পর পঙ্‌ক্তি, ফনিক্স, এলবোকোয়ার্ক, ওকলাহোমা, একের পর এক।

গানটির শেষে গার্ডনার বললেন, ‘চলো এখন সোজা পরের গানে—আই ফল ইন লাভ টুউ ইজিলি।’

এই প্রথম আমি গার্ডনারের সাথে বাজাচ্ছিলাম বলে সবকিছুর ব্যাপারে আমাকে সতর্ক থাকতে হয়েছে। তবে সমস্যা হয় নি, ভালোই করলাম আমরা। পরে এই গানটা সম্পর্কে তিনি যা বললেন, সেই পরিপ্রক্ষিতে আমি উপরে জানালার দিকে তাকাই। কেউ নাই, লিন্ডি নাই, কোনো সাড়া নাই। গানটা শেষ হল। আমরা নীরব অন্ধকারে। কিছু দূরে অন্য একটি জানালার শাটার মেলে দিবার আওয়াজ পেলাম, ভালো করে আমাদের গান শোনার জন্যে হয়তো। কিন্তু মিসেস গার্ডনারের জানালায় কিছু নাই।

আমরা এবার ধরলাম ‘ওয়ান ফর মাই বেইবি’ গানটি, খুব আস্তে, নিচু লয়ে, কোনো বিট নাই বলতে গেলে। এরপর সব নীরব আবার। আমরা লিন্ডির জানালার দিকে দেখলাম, আমরা কিছু দেখতে চাইছিলাম, এক মিনিট পর, আমরা কিছু শুনতে পেলাম। হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ,  রুমে মিসেস গার্ডনার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন।

আমি ফিসফিস করে গার্ডনারকে বললাম, ‘আমরা যেইটা পাইতে চাইছিলাম, সেইটা পাইছি, তার অন্তরের দেখা পাইছি মি. গার্ডনার।’

কিন্তু গার্ডনার দেখলাম সন্তুষ্ট হলেন না। ক্লান্ত তিনি, মলিন হয়ে মাথা ঝাঁকালেন, ভিট্টোরিওকে বললেন, ‘চলো ফিরে যাই আমরা।’

যখন আমরা রওনা হলাম, দেখি, আমার মনে হলো, মিঃ গার্ডনার আমার দিকে তাকাতে আগ্রহী না। যেন তিনি লজ্জিত এই গানের আয়োজন করায়। আমি ভাবতে থাকলাম—গার্ডনার এ আয়োজন সম্পন্ন করে একটা আক্রোশপূর্ণ ঠাট্টা করলেন লিন্ডির সাথে। আমি বুঝলাম, এই গানগুলো থেকে ভয়ংকর অর্থ পেয়েছেন মিসেস গার্ডনার। আমি গিটার সরিয়ে রেখে বসে থাকি। কিছু চাপা রাগে মুখকালা অবস্থা আমার। কিছুক্ষণ এভাবে গন্ডোলায় বসে ভেসে গেলাম।

ছোট ক্যানেল পার হয়ে বড় ক্যানেলে এসেছি আমরা। একটি জলটেক্সি আমাদেরকে ঢেউ দিয়ে চলে গেল। গার্ডনারের পালাজ্জোর কাছাকাছি আমরা ঘুরে এসেছি। ভিট্টোরিও আমাদেরকে ঘাটের দিকে নিল।

আমি বললাম—
‘মি. গার্ডনার, আমি ছোট থাইকা বড় হইতে থাকার মাঝে আপনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। আর আজকের রাইতও আমার জীবনের একটা উল্লেখযোগ্য রাইত। এখন আমরা বিদায় নিলেও, আমি যদি এই জীবনে আপনারে আর না দেখি, বাকি জীবন, সব সময় অবাক হইতে থাকব। এই কারণে দয়া কইরা আমারে বলেন, মিসেস গার্ডনার সুখের অনুভূতি না দুঃখের অনভূতির কারণে কাঁদলেন?’

আমি মনে করেছিলাম তিনি উত্তর দিবেন না। আবছা আলোয় দেখলাম, তিনি যেন জমে আছেন নৌকার মাথায় দাঁড়িয়ে। ভিট্টোরিও নৌকার রশি বাঁধছে, তখন গার্ডনার শান্তস্বরে বললেন—
‘আমার ধারণা, সে ঐভাবে আমার গান শুনে খুশি, কিন্তু নিশ্চয়ই সে বেদনাভারাক্রান্ত। ২৭ বছর অনেক লম্বা সময় জানেক, ভেনিসে এই শেষবার এক সাথে আইছি। এইখান থাইকা ফিরা গিয়া আমরা আলাদা হইয়া যাইমু।’

‘আমি আসলেই দুঃখ পাইলাম এইটা শুইনা মি. গার্ডনার।’ আমি ধীরে বললাম। ‘আমার মনে হয়, সাতাশ বছর পরেও অনেক বিয়া ভাইঙা যায়। কিন্তু আপনে অন্যভাবে বিদায় নিতেছেন। ছুটির দিনে আসলেন ভেনিস, গন্ডোলায় বইসা গান শুনাইলেন, ফিরা গিয়া দুইজনের জীবন দুইদিকে যাইব। খুব কম মানুষ তালাকের পরে ভদ্র থাকে।’

‘কেন ভদ্র থাকব না। আমরা ত একে অন্যরে এখনও ভালোবাসি। সেই কারণেই ত কানতেছে উনি। তাইনেও আমারে বাসে খুব, আমিও তাইনেরে ভালোবাসি খুব।’

ভিট্টোরিও ঘাটে পা রাখল। কিন্তু আমি আর গার্ডনার অন্ধকারে বসে আছি। আমি তার কাছ থেকে আরো অনেক কথা শুনতে চাচ্ছিলাম। একটু পরে উনি বললেন :

‘ঐ যে তোমারে বলছিলাম, লিন্ডিরে প্রথম দেখেই আমি ওর প্রেমে পড়ি। কিন্তু আমি যেইভাবে পড়লাম, এইভাবে সেও কি তখন থাইকা, মানে প্রথম দেখার পর থাইকাই আমার প্রেমে পড়ছিল? আমার সন্দ হয়, এই প্রশ্ন ওর মনে কখনো আইছিল কিনা। আমি ছিলাম তারকা লেবেলে। এইটাই ওর কাছে আসল বিষয় ছিল। ছোট ঐ রেস্টুরেন্টে থাইকা আমার মতো কাউরে ধরা ওর প্লান ছিল। এর মাঝে আমারে ভালোবাসা বা না-ভালোবাসার ব্যাপারটা নাই। কিন্তু সাতাশ বছরের মইধ্যে অনেক মজার ঘটনা ত থাকতেই পারে। অনেক দম্পতি ভালোবাসা শুরু করে, পরে ক্লান্ত হইয়া যায়, ঘৃণা করা শুরু করে, এক পর্যায়ে আলাদা হয়। কখনো অন্য রকম হয়। কয়েক বছরে একটু একটু কইরা আগে বাইড়া লিন্ডি আমারে ভালোবাসা শুরু করছিল। পাঁচ-ছয় বছর পর দেখলাম আমরা পরস্পরের প্রতি সহজ হইয়া গেছি। আমরা একে অন্যের ব্যাপারে চিন্তায় পড়ি, কেয়ার করি। এইভাবে আমরা ভালোবাসায় মজলাম। এখনও, আজও আমরা একে অন্যরে ভালোবাসি।’

‘বুঝি নাই, কী কইলেন, মি. গার্ডনার? তাইলে আপনেরা আলাদা হইতেছেন কেন?’

তিনি আরেকটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।

‘তুমি কেমনে বুঝবা, বন্ধু, কত দূর থাইকা আইছো? তবে আইজ রাইতে তুমি আমার প্রতি খুব দরদি ছিলা, তাই চেষ্টা কইরা দেখি তোমারে বুঝাইতে পারি কিনা। আসল কথা, আমি ত এখন আগের মতো প্রধান কেউ না। যে সময়ের যে জিনিস, আমার সব—যা কিছু পছন্দসই, সব সামনে আইন্না বুঝাইয়া সুজাইয়া কাউরে রাজি করানোর কিছু নাই রে বন্ধু, আমি এখন আর মেজর কেউ না। এইটা আমি স্বাভাবিক মাইনা নিয়া ধীরে ধীরে নাই হইয়া যাওয়া। পেছনের গৌরব নিয়া বাঁইচা থাকা, অথবা এইটা কইতে পারি, আমি এখনও শেষ হই নাই, ফিরা আসতে পারি আগের পজিশনে। তবে কামব্যাক অত সোজা না। তোমারে অনেক কিছু বদলাইতে হইব, বিস্তর রদবদল, জীবন যেই পথে আছে, সেইটাও বদলাইতে হইব, এমনকি তোমার খুব প্রিয় কাউকেও ছাড়া লাগবে।’

‘মানে, মি. গার্ডনার আপনে কইতে চাইতেছেন, আপনে কামব্যাক করার লাইগা লিন্ডি ম্যাডাম থাইকা সইরা যাইবেন?’

‘দেখ যারা সফলভাবে ফিরা আইছে, তারা সব বদলাইছে, ছাইড়া ছাইড়া বিয়া দুইটা তিনটা চারটা করছে। তারা একেকজনের পাশে কম বয়সের নারী। আমি আর লিন্ডি ত হাস্যকর হইয়া গেছি। তাছাড়া আমি আমার চোখ খোলা রাখছি, সে তার চোখ খোলা রাখছে। হিশাব লিন্ডির জানা আছে। আমি জানার আগে থাইকাই সে জানে, হয়তো ঐ হাইওয়ের পাশের রেস্টুরেন্টের মেগ নামের নারীর কাছ থাইকা। এইটা নিয়া আমাদের মইধ্যেও আলাপ হইছে। সেও বুঝছে, এখন আমাদের আলাদা হওয়ার সময় হইয়া গেছে।’

‘আমি ঠিক বুঝি নাই এখনও মি. গার্ডনার। এইটা ত সবখানে যেইরকম হয়, সেইরকম কিছু হইতেছে। এই কারণে আপনে এত বছর ধইরা এই গানটা গাইতেছিলেন? মানুষ এইটা থাইকা জীবনের শিক্ষা নিছে। এমনকি আমিও এই গানের মর্মে বাঁইচা আছি। এই গান ত বলে—দুই জনের মইধ্যে ভালোবাসা হইলে, তারা একসাথে থাকা দরকার চিরকাল, আলাদা হওয়া দুঃখজনক।—এইই ত বলে গানটাতে।’

গার্ডনার বললেন—
‘আমি বুঝছি তুমি যা বলতেছ বন্ধু, হয়তো এইটা তুমি সহজে নিতে পারবা না। কিন্তু ব্যাপারটা এই রকমই। বিষয়টা শুধু আমার তরফে না, ব্যাপারটা লিন্ডিরও। আমরা আলাদা হইলে ওর লাইগাও ভালো হইব। ওর জোয়ানি শেষ হয় নাই। উনি এখনও সুন্দরী, তুমি ত দেখছই। টাইম আছে যখন ওর বাইর হওয়া দরকার আমাদের বন্ধন থাইকা। দেরি না কইরা তার দরকার নতুন ভালোবাসা খুইজা নেওয়া।’

আমি কী বলব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। কিন্তু পরেই তিনি আমাকে চমক দিয়ে আটকালেন এই কথা বলে— ‘তোমার মা মনে হয় বাইর হন নাই, মুক্ত হন নাই কোনো সময়।’

আমি একটু ভাবলাম এবং শান্তস্বরে বললাম—
‘না, মি. গার্ডনার, আম্মা কোনো সময় বাইর হন নাই, তিনি দেশের পরিবর্তন দেখেন নাই, বেশিদিন বাঁচেন নাই।’

‘ঐটা খুব খারাপ ব্যাপার। আমি নিশ্চিত উনি একজন ভালো নারী ছিলেন। আমার সংগীত তাকে সুখী রাখতে সাহায্য করছিল, এইটা আমার কাছে অনেক বড় ব্যাপার। তবু বলি, মুক্ত না হওয়া খুব খারাপ। আমি চাই না আমার লিন্ডির জীবন এমন হউক, না না, বন্ধু, আমি চাই আমার লিন্ডি মুক্ত হউক।’

ঘাটে বাঁধা নাও ঢেউয়ের কারণে আস্তে আস্তে লাফাচ্ছে। ভিট্টোরিও ভদ্রভাবে নামার কথা বলে হাত বাড়াল। আমরা আস্তে আস্তে গন্ডোলা থেকে নামলাম। ভিট্টোরিওর নৌকা মাগনা চড়তে চাই না আমি—মি. গার্ডনার মানিব্যাগ বার করেন। মনে হলো টাকা যা পাইছে তাতে সে খুশি। আর তার মুখস্ত সম্ভাষণের কথাগুলো শুনিয়ে গন্ডোলা নিয়ে চলে যায়।

আমরা তার চলে যাওয়া দেখলাম। একটু পর সে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। এরপর মি. গার্ডনার অনেকগুলো নোট আমার হাতে জোর করে দিতে লাগলেন। আমি বার বার না করা সত্ত্বেও মানলেন না, দিলেন। উনার সঙ্গ পেয়েছি এইই অনেক বড় পাওয়া আমার, তাকে বললাম।

‘না না এইটা এমন কিছু না’ বলে মুখের কাছ থেকে হাত নেড়ে বিদায় জানালেন। মনে হলো, তিনি এইভাবে সম্পন্ন হওয়াটাই চাইছিলেন, টাকা দেয়া শুধু না, আমার সঙ্গ, এই সন্ধ্যা, এই জায়গা, এই সংগীত আয়োজন, সবকিছুতে তিনি খুশি। তিনি তার পালাজ্জোর দিকে হাঁটছেন, একটু গিয়ে ফিরে তাকাচ্ছেন আমার দিকে। ছোট রাস্তা, ক্যানেল, আশপাশের সবকিছু নীরব হয়ে আছে দূরের টেলিভিশনের আওয়াজ শোনার জন্যে।

‘তুমি আজ রাইতে ভালো বাজাইছ বন্ধু, তোমার হাত পাক্কা।’ বললেন তিনি।

‘ধন্যবাদ মি. গার্ডনার, আপনি অসাধারণ গাইছেন, বরাবরের মতোই।’

‘হয়তো যাইবার আগে স্কয়ারে একবার আইবো তোমাদের প্রোগ্রামে।’

‘আমি তাই আশা করি।’

কিন্তু আমি আর তার দেখা পাই নি। কয়েক মাস পরে, শরতে, শুনেছি তাদের ডিভোর্স হয়েছে। একজন ফ্লোরীয় ওয়েটার পত্রিকায় পড়েছে খবরটা, আমাকে বলেছে। সেই সন্ধ্যার কথা আমার মনে আসে কেবল। আমি বিষণ্ন হই বার বার। মি. গার্ডনারকে ত মনে হচ্ছিল বেশ ভালো একজন মানুষ। যেভাবেই দেখেন, তিনি এই সময়ে আবার প্রধান হয়ে ফিরে আসুন কিংবা না, তিনি থাকবেন সবসময়ের ক্লাসিক তালিকায়।

সারওয়ার চৌধুরী

জন্ম ২৪ ডিসেম্বর, ১৯৬৬; চট্টগ্রাম। নানাবাড়িতে। কবি, গল্পকার, প্রবন্ধিক ও অনুবাদক। প্রাক্তন সদস্য, সিলেট প্রেসক্লাব। পড়াশোনা করেছেন ‘ফেঞ্চুগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ’-এ (বিকম পরীক্ষা দেন নি)। সহকারী সম্পাদক হিশেবে কাজ করেছেন ‘দৈনিক জালালাবাদ’-এ (১৯৯৩- ১৯৯৭)। বিশ বছর ধরে প্রবাসে। একটি পারফিউম কোম্পানিতে সেলস এগজিকিউটিভ হিশেবে কর্মরত আছেন।

প্রকাশিত বই—

একমুঠো ল্যাবিরিন্থমাখা মায়াবী জীবন তৃষ্ণা [উপন্যাস; শুদ্ধস্বর, ২০০৬]
অচিন মানুষটির নানা রঙের গল্প [উপন্যাস; শুদ্ধস্বর, ২০০৭]
বচনে বন্ধনে ঘ্রাণে প্রশ্নোত্তর ফোটে [প্রবন্ধ; আদর্শ, ২০১২]
শিশির ও ধূলিকণা মায়া [গল্প; শুদ্ধস্বর, ২০১৪]
হারুকি মুরাকামির গল্প ও বচনামৃত [অনুবাদ গল্প; চৈতন্য, ২০১৫]
ভালবাসার চল্লিশ নিয়ম [অনুবাদ উপন্যাস; চৈতন্য, ২০১৬]

ই-মেইল : sarwarch@gmail.com